সাহিত্য সময় ও সমাজের সমান্তরালে চলে
jugantor
সাহিত্য সময় ও সমাজের সমান্তরালে চলে

  মোহাম্মদ সাদিক  

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৮:৩১  |  অনলাইন সংস্করণ

মোহাম্মদ সাদিক। জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে সুনামগঞ্জ জেলায়। বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি।

কবিতায় অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৬ সালে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৭৭ সালে এমএ সম্পন্ন করা ড. মোহাম্মদ সাদিক যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪-৯৫ সালে পারসোনাল ম্যানেজমেন্টের ওপর পড়াশোনা করেন এবং পরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সিলেটি নাগরী লিপির ওপর গবেষণার জন্য ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

ড. সাদিক বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা সচিব ও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অবসরে যান।

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘আগুনে রেখেছি হাত’, ‘ত্রিকালের স্বরলিপি’, ‘বিনিদ্র বল্লম হাতে সমুদ্রের শব্দ শুনি’, ‘কে লইব খবর’, ‘শফাত শাহের লাঠি’।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জুননু রাইন

যুগান্তর : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সেই সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই

মোহাম্মদ সাদিক : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি অন্য রকম। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৮২ সালে। বিষয়টি অসাধারণ আনন্দের। সব সময় তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তখন সাহিত্যের পরিবেশ কিছুটা অন্য রকম ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু স্বপ্ন ভঙের বেদনায় আড়ষ্ট জীবন। এক দশকের মধ্যে জাতির পিতাকে হারানো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত এক অস্বাভাবিক সময়। শিল্পে-সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে একটি প্রতিবাদের প্রবাহ চলমান। বেদনাহত মানুষের আশ্রয় হয়েছে শিল্প সাহিত্য। দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাহিত্য পাতার সম্পাদক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কাজ করছেন।

যুগান্তর : আপনি মরমি ঘরানার অধুনিক কবি। বাংলাসাহিত্যে এ দুটি ধারার সমন্বয়ে লেখা কবিতা খুব একটা চোখে পড়ে না। এটা আপনি সচেতনভাবে করেছেন? আপনি কী সুফিবাদকে অধুনিক ফ্লেভারে নিয়ে আসতে চাইছেন?

মোহাম্মদ সাদিক : আমি তা করতে চাইনি। নিজে যা বিশ্বাস করি, তাই লিখছি। সুফিবাদকে আধুনিক ফ্লেভারে আনার কোনো প্রয়াস আমার নেই। এই মরমি ঘরানার আমি একজন মুগ্ধ মানুষ।

যুগান্তর : আপনার কবিতার কাঠামো অধুনিক হলেও বক্তব্য বিমূর্ত না। আপনি আপনার প্রায় সব কবিতায়ই একটি ঘটনা বা গল্প বুনে যান। যেটা বর্তমান বাংলা সাহিত্যে দেখা যায় না। যা এখনকার সাহিত্য-ধারার প্রায় বিপরীত অবস্থান। আপনি যেভাবে লেখেন আর সচরাচর (আধুনিক কবিতা হিসাবে বিমূর্ততায় আচ্ছন্ন) লেখা কবিতার মধ্যে কোনটি পাঠকের জন্য ভালো এবং কেনো?

মোহাম্মদ সাদিক : সব ক্ষেত্রে তা সত্য নয়। কবিতা বিমূর্ত হলেই আধুনিক, আর সব আধুনিক কবিতাই বিমূর্ত- তা নয়। কবিতা নানা রকম- এ কথা আমার নয়, কবি জীবনানন্দ দাশের। পাঠক কোনটি নেবেন- এটি তার পছন্দ। পাঠক কি আসলে সব কবিতা পড়েন? কিছু পাঠক কিছু কবিতা পড়েন, কিছু কবিতা দেখেন, কিছু কবিতা শোনেন। কবিতা কি সব সময় খুব জনপ্রিয় মাধ্যম?

যুগান্তর : আপনার ‘ছোটো’পা তোর নকশি কাঁথা’ কবিতাটি বাংলা কবিতায় সংযোজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। এই কবিতাটি লেখার প্রেক্ষাপট এবং প্রথম প্রকাশিত হওয়ার ঘটনাটি জানতে চাই

মোহাম্মদ সাদিক : এটি কবি আহসান হাবীবের সম্পাদনায় দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত আমার প্রথম কবিতা। গুরুত্বপূর্ণ কি না তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি আমার কোনো কবিতাকে অতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।

যুগান্তর : দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্ত্বাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে

মোহাম্মদ সাদিক : অনেকেই আমাকে সহায়তা করেছেন, বিশেষ কারও নাম উল্লেখ করে অন্য বন্ধুদের বিরাগভাজন হতে চাই না। এমনিতেই আমার বন্ধুভাগ্য খুব ভালো নয়। এখন তো আরও কমে গেছে। আমি যোগাযোগ রাখতে পারি না। কখনো কখনো রাখি না। কথাশিল্পী শহীদুল জহির বলতেন, ‘কোথায় যাবেন! চারপাশে বাঘ নখ।
অনেক আশা করে যাবেন ঘরে এসে দেখবেন শরীরে রক্ত লেগে আছে।’ এই ‘বাঘ’ নখের কথা মনে পড়ে যায়!

যুগান্তর : স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলা সাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলা সাহিত্যের অবস্থান এখন কোন পর্যায়ে?

মোহাম্মদ সাদিক : বর্তমানে সাহিত্য আরও বিস্তৃত হয়েছে, স্বাধীন দেশে তা হয়। কিন্তু পরাধীন দেশেও প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে সাহিত্যের অন্য এক তীব্রতা থাকে। এখন প্রসন্নতা এসেছে, বিস্তৃতি বেড়েছে, ব্যাপকতা বেড়েছে। সমাজ পরিবর্তনশীল। সাহিত্য সময় ও সমাজের সমান্তরালে চলে- তা সে সাহিত্য যতই ক্লাসিক হোক না কেনো। আমাদের সাহিত্য নিয়ে গর্ব করার অনেক কিছু আছে। তবে এ নিয়ে একেবারে আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নেই। এখনো অনেক প্রত্যাশা আমাদের।

যুগান্তর : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো বা মন্দ বলবেন?

মোহাম্মদ সাদিক : যে যাই বলুন, পুরস্কার সাহিত্যের জন্য অবশ্যই গুরুত্বের। খুব কম লেখকই সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। একটি শিল্পমাধ্যমে স্বীকৃতি লেখককে অনুপ্রাণিত করে, পাঠককে সচকিত করে। অনেকে পুরস্কারকে তুলোধুনা করেন। তবে সে পুরস্কার তিনি যখন পান তখন প্রীত হন। তবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচনের বিষয়ে সমালোচনার সুযোগ থাকে।

যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

মোহাম্মদ সাদিক : গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কম আলোচিত- এর অর্থ স্পষ্ট নয়। আপনি যদি মনে করেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ লেখক- এটাই তো স্বীকৃতি। আর তা ছাড়া তবলা, ঢোল এবং ড্রাম- শব্দ ও ধ্বনিতে এগুলোর পার্থক্য তো আছেই। অনেকে তার ইচ্ছামতো বাজায়, শিল্পের তোয়াক্কা করে না। কেউ কেউ ফাটিয়েও ফেলে। আলোচনার বিষয়টি পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। সবই সমান কামেল হতে পারেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহিত্যই জয়ী হয়।

যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

মোহাম্মদ সাদিক : এটি পরস্পর সম্পর্কিত। বিশ্বায়নের এ সময়ে শিল্প সাহিত্য নিয়ে এ রকম সরাসরি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর কারও কাছে আছে কি না জানি না। একটি রাষ্ট্রে, সমাজে, একটি সময়ে লেখক ও পাঠকের বিষয়টি পরস্পর সম্পর্কিত এবং একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে।

যুগান্তর : এখনকার কবিতা দুর্বোধ্য, নাকি কবিতা পড়তে পারা বা বুঝতে পারার মতো পাঠক কমে যাচ্ছে?

মোহাম্মদ সাদিক : ‘যে দুর্বোধ্যতার জন্ম পাঠকের আলস্যে, তার জন্য কবিকে দায়ী করা যায় না’- সুধীন দত্তের মতো এত কড়া করে বলার প্রয়োজন নেই। যিনি কবিতা ভালোবাসেন, তিনি কবিতা পড়বেন এটিই স্বাভাবিক। সবার তো সব কবিতা ভালো লাগবে না, এ নিয়ে জোর জবরদস্তিরও কিছু নেই।

যুগান্তর : বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫ হাজার বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

মোহাম্মদ সাদিক : এ পরিসংখ্যানের ভিত্তি কী আমি জানি না। ৫ হাজার বই কি বছরে প্রকাশ হয়, বিশেষ করে সাহিত্যের? ৫ হাজার বই যদি প্রকাশিত হয়, ৫০টি বই গুরুত্বপূর্ণ হলে তো অসাধারণ। এটি একটি ধারাবাহিকতা, এক পা দুই পা করে এগিয়ে যাওয়া, সব সময় লাফিয়ে পার হওয়া যায় না।

যুগান্তর : সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ সাদিক : গণিতের হিসাবে। যদিও একজন লেখক একই সঙ্গে একাধিক দশকে বেঁচে থাকেন এবং লেখেন। এগুলো লেবেল দিয়ে রাখার জন্য সুবিধার হয় বোধ করি।

যুগান্তর : অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে, অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কী সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

মোহাম্মদ সাদিক : আমাদের এগিয়ে যাওয়া পিছিয়ে পড়া এগুলো একটি অন্যটির সমান্তরাল। মননশীল সাহিত্য সৃষ্টিশীল সাহিত্যের শুধু পোস্টমর্টেম করে তা নয়। স্বয়ম্ভু সংসার আছে তার। অসাধারণ কিছু মননশীল লেখক আছেন আমাদের। আমরা সবাইকে আলোচনায় আনি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, গণমাধ্যমে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে অনেকেই আছেন- যারা মননশীলতায় অনেক উঁচুমানের রচনা উপহার দেন। আমরা খুচরা বাজারে পণ্য দেখি মহাজনদের বেশি দেখি না।

যুগান্তর : বাংলাদেশে কোন ধরনের/বিষয়ের কবিতা বেশি জনপ্রিয়? আপনার কোন ধরনের কবিতা পছন্দ? কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে?

মোহাম্মদ সাদিক : এ বিষয়ে আমার কোনো পরিসংখ্যান নেই। বাংলা কবিতার ঐতিহ্যে লালিত কবিতাই আমার পছন্দ, কবিতা বা যে-কোনো শিল্প মাধ্যম এক ধরনের প্রশান্তি দেয়। সমৃদ্ধি দেয় বলে তো মনে হয় না, দেয় নাকি? আমার জানা নেই।

যুগান্তর : জীবিতদের মধ্যে আপনার প্রিয় একজন অগ্রজ এবং অনুজ কবির নাম বলুন। আপনার বিবেচনায় যারা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

মোহাম্মদ সাদিক : এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমি গুরুদণ্ডের দায় নিতে পারব না। অগ্রজ কবিদের অনেকেই আমার প্রিয়। অনুজ কবিদের অনেকেরই আমি মুগ্ধ পাঠক। এর মধ্যেই আপনার কথিত অগ্রজ ‘একজন’ এবং অনুজ ‘একজন’ আছেন। একজনের নাম না বলাই শ্রেয়।

যুগান্তর : এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।


মোহাম্মদ সাদিক : মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য এবং শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’।

সাহিত্য সময় ও সমাজের সমান্তরালে চলে

 মোহাম্মদ সাদিক 
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০৮ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মোহাম্মদ সাদিক। জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে সুনামগঞ্জ জেলায়। বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি।

কবিতায় অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৬ সালে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৭৭ সালে এমএ সম্পন্ন করা ড. মোহাম্মদ সাদিক যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪-৯৫ সালে পারসোনাল ম্যানেজমেন্টের ওপর পড়াশোনা করেন এবং পরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সিলেটি নাগরী লিপির ওপর গবেষণার জন্য ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

ড. সাদিক বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা সচিব ও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অবসরে যান।

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘আগুনে রেখেছি হাত’, ‘ত্রিকালের স্বরলিপি’, ‘বিনিদ্র বল্লম হাতে সমুদ্রের শব্দ শুনি’, ‘কে লইব খবর’, ‘শফাত শাহের লাঠি’।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জুননু রাইন

যুগান্তর : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সেই সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই

মোহাম্মদ সাদিক : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি অন্য রকম। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৮২ সালে। বিষয়টি অসাধারণ আনন্দের। সব সময় তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তখন সাহিত্যের পরিবেশ কিছুটা অন্য রকম ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু স্বপ্ন ভঙের বেদনায় আড়ষ্ট জীবন। এক দশকের মধ্যে জাতির পিতাকে হারানো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত এক অস্বাভাবিক সময়। শিল্পে-সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে একটি প্রতিবাদের প্রবাহ চলমান। বেদনাহত মানুষের আশ্রয় হয়েছে শিল্প সাহিত্য। দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাহিত্য পাতার সম্পাদক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কাজ করছেন।

যুগান্তর : আপনি মরমি ঘরানার অধুনিক কবি। বাংলাসাহিত্যে এ দুটি ধারার সমন্বয়ে লেখা কবিতা খুব একটা চোখে পড়ে না। এটা আপনি সচেতনভাবে করেছেন? আপনি কী সুফিবাদকে অধুনিক ফ্লেভারে নিয়ে আসতে চাইছেন?

মোহাম্মদ সাদিক : আমি তা করতে চাইনি। নিজে যা বিশ্বাস করি, তাই লিখছি। সুফিবাদকে আধুনিক ফ্লেভারে আনার কোনো প্রয়াস আমার নেই। এই মরমি ঘরানার আমি একজন মুগ্ধ মানুষ।

যুগান্তর : আপনার কবিতার কাঠামো অধুনিক হলেও বক্তব্য বিমূর্ত না। আপনি আপনার প্রায় সব কবিতায়ই একটি ঘটনা বা গল্প বুনে যান। যেটা বর্তমান বাংলা সাহিত্যে দেখা যায় না। যা এখনকার সাহিত্য-ধারার প্রায় বিপরীত অবস্থান। আপনি যেভাবে লেখেন আর সচরাচর (আধুনিক কবিতা হিসাবে বিমূর্ততায় আচ্ছন্ন) লেখা কবিতার মধ্যে কোনটি পাঠকের জন্য ভালো এবং কেনো?

মোহাম্মদ সাদিক : সব ক্ষেত্রে তা সত্য নয়। কবিতা বিমূর্ত হলেই আধুনিক, আর সব আধুনিক কবিতাই বিমূর্ত- তা নয়। কবিতা নানা রকম- এ কথা আমার নয়, কবি জীবনানন্দ দাশের। পাঠক কোনটি নেবেন- এটি তার পছন্দ। পাঠক কি আসলে সব কবিতা পড়েন? কিছু পাঠক কিছু কবিতা পড়েন, কিছু কবিতা দেখেন, কিছু কবিতা শোনেন। কবিতা কি সব সময় খুব জনপ্রিয় মাধ্যম?

যুগান্তর : আপনার ‘ছোটো’পা তোর নকশি কাঁথা’ কবিতাটি বাংলা কবিতায় সংযোজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। এই কবিতাটি লেখার প্রেক্ষাপট এবং প্রথম প্রকাশিত হওয়ার ঘটনাটি জানতে চাই

মোহাম্মদ সাদিক : এটি কবি আহসান হাবীবের সম্পাদনায় দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত আমার প্রথম কবিতা। গুরুত্বপূর্ণ কি না তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি আমার কোনো কবিতাকে অতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।

যুগান্তর : দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্ত্বাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে

মোহাম্মদ সাদিক : অনেকেই আমাকে সহায়তা করেছেন, বিশেষ কারও নাম উল্লেখ করে অন্য বন্ধুদের বিরাগভাজন হতে চাই না। এমনিতেই আমার বন্ধুভাগ্য খুব ভালো নয়। এখন তো আরও কমে গেছে। আমি যোগাযোগ রাখতে পারি না। কখনো কখনো রাখি না। কথাশিল্পী শহীদুল জহির বলতেন, ‘কোথায় যাবেন! চারপাশে বাঘ নখ।
অনেক আশা করে যাবেন ঘরে এসে দেখবেন শরীরে রক্ত লেগে আছে।’ এই ‘বাঘ’ নখের কথা মনে পড়ে যায়!

যুগান্তর : স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলা সাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলা সাহিত্যের অবস্থান এখন কোন পর্যায়ে?

মোহাম্মদ সাদিক : বর্তমানে সাহিত্য আরও বিস্তৃত হয়েছে, স্বাধীন দেশে তা হয়। কিন্তু পরাধীন দেশেও প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে সাহিত্যের অন্য এক তীব্রতা থাকে। এখন প্রসন্নতা এসেছে, বিস্তৃতি বেড়েছে, ব্যাপকতা বেড়েছে। সমাজ পরিবর্তনশীল। সাহিত্য সময় ও সমাজের সমান্তরালে চলে- তা সে সাহিত্য যতই ক্লাসিক হোক না কেনো। আমাদের সাহিত্য নিয়ে গর্ব করার অনেক কিছু আছে। তবে এ নিয়ে একেবারে আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নেই। এখনো অনেক প্রত্যাশা আমাদের।

যুগান্তর : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো বা মন্দ বলবেন?

মোহাম্মদ সাদিক : যে যাই বলুন, পুরস্কার সাহিত্যের জন্য অবশ্যই গুরুত্বের। খুব কম লেখকই সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। একটি শিল্পমাধ্যমে স্বীকৃতি লেখককে অনুপ্রাণিত করে, পাঠককে সচকিত করে। অনেকে পুরস্কারকে তুলোধুনা করেন। তবে সে পুরস্কার তিনি যখন পান তখন প্রীত হন। তবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচনের বিষয়ে সমালোচনার সুযোগ থাকে।

যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

মোহাম্মদ সাদিক : গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কম আলোচিত- এর অর্থ স্পষ্ট নয়। আপনি যদি মনে করেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ লেখক- এটাই তো স্বীকৃতি। আর তা ছাড়া তবলা, ঢোল এবং ড্রাম- শব্দ ও ধ্বনিতে এগুলোর পার্থক্য তো আছেই। অনেকে তার ইচ্ছামতো বাজায়, শিল্পের তোয়াক্কা করে না। কেউ কেউ ফাটিয়েও ফেলে। আলোচনার বিষয়টি পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। সবই সমান কামেল হতে পারেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহিত্যই জয়ী হয়।

যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

মোহাম্মদ সাদিক : এটি পরস্পর সম্পর্কিত। বিশ্বায়নের এ সময়ে শিল্প সাহিত্য নিয়ে এ রকম সরাসরি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর কারও কাছে আছে কি না জানি না। একটি রাষ্ট্রে, সমাজে, একটি সময়ে লেখক ও পাঠকের বিষয়টি পরস্পর সম্পর্কিত এবং একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে।

যুগান্তর : এখনকার কবিতা দুর্বোধ্য, নাকি কবিতা পড়তে পারা বা বুঝতে পারার মতো পাঠক কমে যাচ্ছে?

মোহাম্মদ সাদিক : ‘যে দুর্বোধ্যতার জন্ম পাঠকের আলস্যে, তার জন্য কবিকে দায়ী করা যায় না’- সুধীন দত্তের মতো এত কড়া করে বলার প্রয়োজন নেই। যিনি কবিতা ভালোবাসেন, তিনি কবিতা পড়বেন এটিই স্বাভাবিক। সবার তো সব কবিতা ভালো লাগবে না, এ নিয়ে জোর জবরদস্তিরও কিছু নেই।

যুগান্তর : বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫ হাজার বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

মোহাম্মদ সাদিক : এ পরিসংখ্যানের ভিত্তি কী আমি জানি না। ৫ হাজার বই কি বছরে প্রকাশ হয়, বিশেষ করে সাহিত্যের? ৫ হাজার বই যদি প্রকাশিত হয়, ৫০টি বই গুরুত্বপূর্ণ হলে তো অসাধারণ। এটি একটি ধারাবাহিকতা, এক পা দুই পা করে এগিয়ে যাওয়া, সব সময় লাফিয়ে পার হওয়া যায় না।

যুগান্তর : সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ সাদিক : গণিতের হিসাবে। যদিও একজন লেখক একই সঙ্গে একাধিক দশকে বেঁচে থাকেন এবং লেখেন। এগুলো লেবেল দিয়ে রাখার জন্য সুবিধার হয় বোধ করি।

যুগান্তর : অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে, অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কী সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

মোহাম্মদ সাদিক : আমাদের এগিয়ে যাওয়া পিছিয়ে পড়া এগুলো একটি অন্যটির সমান্তরাল। মননশীল সাহিত্য সৃষ্টিশীল সাহিত্যের শুধু পোস্টমর্টেম করে তা নয়। স্বয়ম্ভু সংসার আছে তার। অসাধারণ কিছু মননশীল লেখক আছেন আমাদের। আমরা সবাইকে আলোচনায় আনি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, গণমাধ্যমে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে অনেকেই আছেন- যারা মননশীলতায় অনেক উঁচুমানের রচনা উপহার দেন। আমরা খুচরা বাজারে পণ্য দেখি মহাজনদের বেশি দেখি না।

যুগান্তর : বাংলাদেশে কোন ধরনের/বিষয়ের কবিতা বেশি জনপ্রিয়? আপনার কোন ধরনের কবিতা পছন্দ? কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে?

মোহাম্মদ সাদিক : এ বিষয়ে আমার কোনো পরিসংখ্যান নেই। বাংলা কবিতার ঐতিহ্যে লালিত কবিতাই আমার পছন্দ, কবিতা বা যে-কোনো শিল্প মাধ্যম এক ধরনের প্রশান্তি দেয়। সমৃদ্ধি দেয় বলে তো মনে হয় না, দেয় নাকি? আমার জানা নেই।

যুগান্তর : জীবিতদের মধ্যে আপনার প্রিয় একজন অগ্রজ এবং অনুজ কবির নাম বলুন। আপনার বিবেচনায় যারা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

মোহাম্মদ সাদিক : এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমি গুরুদণ্ডের দায় নিতে পারব না। অগ্রজ কবিদের অনেকেই আমার প্রিয়। অনুজ কবিদের অনেকেরই আমি মুগ্ধ পাঠক। এর মধ্যেই আপনার কথিত অগ্রজ ‘একজন’ এবং অনুজ ‘একজন’ আছেন। একজনের নাম না বলাই শ্রেয়।

যুগান্তর : এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।


মোহাম্মদ সাদিক : মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য এবং শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন