আমার লিখিত প্রকাশ আমি

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ২১:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

  মো. মামুন উদ্দীন

আমি বহির্মুখী নই, অন্তর্মুখী। আমি বক্তা নই, ভালো শ্রোতা। কাজী নজরুল বলেছেন, ‘আমি বক্তাও নহি। আমি কম-বক্তার দলে।’ অনেকটা সে রকম। আমি আমার কথা, হৃদয়ের কথা বলতে ব্যাকুল হলেও বাধা অন্তর্মুখিতা। চার আনা বলতে পারি তো বাকি থাকে বারো আনা। কখন বক্তা হয়ে উঠতে পারব তা-ও বলতে পারি না। মার্ক টোয়েন নাকি তার প্রথম বক্তৃতার সময় পচা ডিমের আতিথেয়তা পেয়েছিলেন। সে জন্যই হয়তো তিনি দিগ্বিজয়ী বক্তা হতে পেরেছিলেন। আমি তো পাইনি। পেলে ভালো হতো অবশ্যই। জীবনের চিত্রনাট্যটাও তখন ভিন্ন হতে পারত।

তবে এই তুচ্ছ, নগণ্য ‘আমি’-কে অতিসামান্য হলেও খুঁজে পাচ্ছি কলমের কালি, কি-বোর্ডের কী আর মোবাইলের ক্ষুদে বার্তায়। খুব ভালো হতো যদি চিঠি লিখতে পারতাম। নিয়ম করে। সময়ে সময়ে। তীর্থের কাকের মতো আমার পত্রের আশায় কেউ অপেক্ষা করত। আর আমি সাহিত্যপত্র লিখতাম। আমিও ফলাবর্তন পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতাম। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রচণ্ড খরতাপে বিদীর্ণ জমির বড় বড় ছিদ্রগুলো যেমন বৃষ্টির পানির আশায় অপেক্ষমাণ থাকে ঠিক তেমন। সেদিন আর আছে কৈ? তাই তো বাউল আবদুল করিমের গানের আর্তি, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ ভার্চুয়াল জগতে তাই এখন ক্ষুদে বার্তাই আমার হৃদয়ের কাকুতি-মিনতি, আর্তি প্রকাশের অনন্য মাধ্যম।

একজন ব্যক্তির লেখার ব্যাপ্তি তার বলার ব্যাপ্তির চেয়ে হাজার গুণ বড়। অন্তত আমি তা বিশ্বাস করি। বলার পরিধি যদি হয় একটি পষ্কুরিনী, তাহলে লেখার পরিধি হবে একটি মহাসাগর। ‘ভালবাসি’ শব্দটি দিয়েই একটি কবিতা হতে পারে। আবার সেই ‘ভালবাসি’ শব্দটি দিয়ে একটি মহাকাব্যও রচনা করা সম্ভব। পৃথিবীর আদি থেকে অদ্যাবধি শুধু ‘তুমি’ বা ‘তোমাকে’ শব্দদ্বয় দিয়েই তো কত হাজার গান, কাব্য, মহাকাব্য, নাটক, উপন্যাস, চিঠি রচিত হল। সেই তুমি’র বর্ণনার ব্যাপ্তি বা পরিধি আজও কি পূর্ণরূপে ধরা দিয়েছে? উত্তরও একশব্দে ‘না’।

তাই আমি লিখতে চাই। নানা বিষয় বৈচিত্র্যে মনের ভাব প্রকাশ করতে চাই। তবে রাজনীতি আমার লেখনীর বিষয় বৈচিত্র্যের আওতাবহির্ভূত একটি বিষয় হিসেবেই থাকবে। আমি লিখে যাব। ধর্ম, নীতিনৈতিকতা, ভালোবাসা, মানবীয় যোগাযোগ, সফলতা, উন্নয়ন- সব বিষয়েই আমি লিখব। আমি নিজের জন্য লিখি। নিজের জন্য লিখব। আমার লেখা কেউ পড়বে- এটা আমি ভাবি না। সমাজে, ব্যক্তিমানসে আমার লেখার কী প্রভাব পড়েছে বা পড়ছে, বা পড়বে সেটা চিন্তা করে লেখা আমার রুচিবিগর্হিত কাজ।

আমার লেখনী কারো মনে যদি অণুপরিমাণ নাড়াও দেয় সেটা আমার কর্মের উপফল (বাইপ্রোডাক্ট)। আমার পরিতৃপ্তি, আমার সন্তুষ্টি আমার প্রথম এবং একমাত্র লক্ষ্য। বাকি সব অলক্ষ্যের উপলক্ষ্য। নজরুল যেমন বলেছেন, ‘আমি কবি। বনের পাখির মত স্বভাব আমার গান করা। কাহারও ভালো লাগিলেও গাই, ভালো না লাগিলেও গাহিয়া যাই।’

১৮৫৩ সালে নেদারল্যান্ডের জুনডারটে জন্মগ্রহণ করেন উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ তুলির জাদুকরদের একজন ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ। তার চিত্রকর্মগুলো তাকে শিল্পের দরবারে যুবরাজের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তবে জীবিত অবস্থায় সবার কাছে একপ্রকার অচ্ছুৎ ছিলেন গগ। ভ্যান গগ যদি মনের আনন্দে না আঁকতেন, তুলির আঁচড়ে ভাব প্রকাশ না করতেন, তাহলে কিভাবে তার পক্ষে সম্ভব ছিল ২১০০’র বেশি চিত্রকর্ম আঁকা! 

মৃত্যুর পরে তার আঁকা ‘দি পটেটো ইটার্স’বা ‘সানফ্লাওয়ার্স’কেবল বিখ্যাত হয়নি, পাশাপাশি ‘স্টারি নাইট’, ‘পোট্রেট অব ডা. গেচেট’, ‘সরো, ‘বেডরুম ইন আর্লেস’ কালকে জয় করে কালজয়ী হয়েছে। ‘সানফ্লাওয়াস’বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে একটি। বর্তমানে এই ছবিটির বাজারমূল্য ৭৪ মিলিয়ন ডলার।

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আধুনিক বাঙালি কবি ও লেখক জীবনানন্দ দাশ। তিনিও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন মৃত্যুর পর থেকেই। মনের আনন্দে দু'হাত ভরে লিখে গেছেন। তাই সাড়ে আট শ’র বেশি কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর, যার একটিও তিনি প্রকাশের ব্যবস্থা করেননি। এ ছাড়া ষাট-পয়ষট্টিটিরও বেশি খাতায় ‘লিটেরেরি নোটস’ লিখেছিলেন। এগুলোরও অধিকাংশ অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে।

তবে যারা অমিত প্রতিভাবান তাদের কথা আলাদা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী অসাধারণ প্রতিভাবান। নিজের প্রতি, সফলতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল বলেই রবীন্দ্রনাথ বলতে পেরেছিলেন, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌতূহলভরে--/ আজি হতে শতবর্ষ পরে।’ আর নজরুল বলেছিলেন, ‘আজি হতে শত বর্ষ আগে/ কে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদেরে/ শত অনুরাগে/ আজি হতে শত বর্ষ আগে!’

আমার আমিকে কখনোই বলার মধ্যে, কথার মধ্যে, বক্তৃতার মধ্যে খুঁজে পাই না। যা বলতে চাই, বলা হয়ে উঠে না। যা চিন্তা করি, লালন করি, ধারণ করি, তা কখনোই আংশিক ব্যতীত পূর্ণরূপে প্রকাশ করা হয়ে উঠে না। কখনো স্মৃতির প্রতারণা, কখনো তাৎক্ষণিক সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ চিন্তাশক্তির ঘাটতি আমার গলাকে টিপে ধরে। ভুলোমনা মনও আমার বাকপ্রকাশের প্রতিবন্ধকতার অন্যতম কারণ। একে তো আমি যোগাযোগীয় প্রাণী, আবার যোগাযোগের শিক্ষার্থীও।

তবুও আমার যোগাযোগ ভীতি বা শঙ্কা কখনোই গেল না। নিকট ভবিষ্যতে কাটবে তার ক্ষীণ সম্ভাবনাও দেখছি না। ‘বলি বলি করে তবু বলা হলো না! কী জানি কিসের এত দ্বন্দ্ব!’ এ দ্বন্দ্ব আমার মনের শঙ্কা, মনের সংশয়, কে কি মনে করে তার ভয়।

তাই আমি আশ্রয় নিয়েছি, আশ্রিত হয়েছি বাচনিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম লেখনীতে। আমার চিন্তা, ধ্যানধারণা, আচরণ, অনুভূতির সমষ্টি আমি। আমার মুখের অব্যক্ত কথাগুলোর লিখিত প্রকাশই আমি। তাই লেখনীতেই আমার আমিকে প্রকাশ করতে চাই। 

আমার অব্যক্ত শব্দের ছন্দ দিয়ে কবিতা লিখতে চাই। না বলা শব্দ দিয়ে ভাষার মালা গাঁথতে চাই। প্রান্তজনদের কথা তুলে ধরতে চাই। মানবিক আবেদন দিয়ে জগতের সব সুন্দর-অসুন্দর, উৎকৃষ্ট-নিকৃষ্ট, সফলতা-ব্যর্থতা, ভালোবাসা-ভালোবাসাহীনতা তুলে ধরতে চাই। মনের সব কথাকে উজাড় করে প্রকাশ করতে চাই। লেখনীই আমার ভালোবাসা।

লেখক: মো. মামুন উদ্দীন
শিক্ষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিট