‘পুরস্কার একজন লেখককে অধিকতর দায়িত্বশীল করতে পারে’
jugantor
‘পুরস্কার একজন লেখককে অধিকতর দায়িত্বশীল করতে পারে’

  জুননু রাইন  

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:২৪:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

ফারুক মাহমুদ। জন্ম : ১৭ জুলাই ১৯৫২, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।

নানা পেশায় জড়িত হলেও থিতু হয়েছেন সাংবাদিকতায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যাদের হাতে নতুন কবিতা-ধারার সূত্রপাত হয়েছিল, তাদের মধ্যে ফারুক মাহমুদ অন্যতম।

তিনি দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখায় নিবিষ্ট রয়েছেন। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে তিনি কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙিমা তৈরি করেছেন।

গীতিময়তার সঙ্গে প্রতীকী ব্যঞ্জনা, সংকেত, দর্শন এবং ভাবুকতায় তার কবিতা একটি জলবিন্দুর মধ্যে বহুবর্ণের প্রতিফলন। তার হাতে ছন্দের ব্যবহার খুবই সচ্ছল এবং ঋদ্ধ।

কোমল অথচ ঋজু উচ্চারণে তিনি ব্যক্ত করেন জীবন এবং কবিতা আলাদা কিছু নয়। উজ্জ্বল, স্থিতধী নির্মাণরীতির অক্লান্ত শব্দনির্মাতা, শব্দ ব্যবহারে তিনি পারদর্শী। শব্দের ওজন তার জানা। সত্তর দশকের কবি হিসাবে পরিচিত হলেও ফারুক মাহমুদ সমকালীন বাংলা কবিতা-ধারায় নিজের একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। দেশ, দেশের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন নানা মাত্রিকতায় তার কবিতায় উচ্চারিত হয়।

প্রকাশিত কাব্য : ‘পাথরের ফুল’, ‘অপূর্ণ তুমি আনন্দ বিষাদে’, ‘অনন্ত বেলা থেকে আছি’, ‘এত কাছে এত দূরে’, ‘সৌন্দর্য হে ভয়ানক’, ‘বাঘের বিষণ্ন দিন’, ‘হৃদয়ে প্রেমের দিন’, ‘ভ্রূণপদ্য’, ‘অন্ধকারে মুগ্ধ’, ‘রৌদ্র এবং জলের পিপাসা’, ‘সমান্য আগুন যথেষ্ট জীবন’, ‘নির্বাচিত শত পদ্য’, ‘মহাভারতের প্রেম’, ‘ফিরে যাব দূরত্বের কাছে’ ‘আগুনে আপত্তি নেই’, ‘দাগ নয় চিহ্ন’, ‘দুই হৃদয়ে নদী’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘ও স্মৃতিমেঘ ও স্মৃতিরোদ’।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জুননু রাইন

যুগান্তর : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সে সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই

ফারুক মাহমুদ : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি ছিল অভূতপূর্ব, অনন্য শিহরণ এবং স্বপ্নময়তায় ভরপুর। সেটা ছিল স্কুল-জীবনের শেষ দিককার ঘটনা। সেসময় সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না।

যুগান্তর : এ সময়ের অধুনিক ধারার কবিদের মধ্যে আপনি অন্যতম। আপনার সঙ্গে কবি সিকদার আমিনুল হক এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের ভালো সম্পর্ক ছিল বলেই সাহিত্য মহলে আলোচিত। বাংলা সাহিত্যে সিকদার আমিনুল হক এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের অবদান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

ফারুক মাহমুদ : সামান্য লেখালেখি করলেও, বলা যায়, স্বাধীনতার সংলগ্ন সময় থেকে কবিতার সঙ্গে আমার সংযুক্তি। দীর্ঘ পথচলায় অনেকের সঙ্গে চেনা জানা হয়েছে।

প্রায় সবার সঙ্গেই আমার ছিল সহনীয় সম্পর্ক। তবে অগ্রজদের মধ্যে সিকদার আমিনুল হক এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে অন্তত আরও দু’জনের কথা বলা যায়। রফিক আজাদ এবং অরুণাভ সরকার। উল্লিখিত চারজনই বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা কবিতার পথরেখার গুরুত্বপূর্ণ কবি।

আবদুল মান্নান সৈয়দ সহিত্যের যে শাখায় কলম রেখেছেন, সোনা ফলেছে। রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, অরুণাভ সরকার এরা বাংলাদেশের কবিতায় বিশেষ স্থান সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

যুগান্তর : দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্ত্বাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে

ফারুক মাহমুদ : অনেকের সহযোগিতা সাহচর্য আমি পেয়েছি। এ প্রসঙ্গে অগ্রজ সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদের কথা বলা যায়।

যুগান্তর : স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলা সাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলা সাহিত্যের অবস্থান এখন কোন পর্যায়ে?

ফারুক মাহমুদ : সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর থেকেই পূর্ব বাংলার সাহিত্যধারা নতুন বাঁক লাভ করেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর এ ধারাটি জাতীয়তাবাদী চেতনায় বেগবান হয়েছে। একাত্তর পরবর্তীতে তো সেটি আরও স্পষ্ট এবং সুচিহ্নিত অবস্থান তৈরি করেছে।

যুগান্তর : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো বা মন্দ বলবেন?

ফারুক মাহমুদ : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যে কোনো কাজে আসে না। তবে হ্যাঁ, পুরস্কার একজন লেখককে অধিকতর দায়িত্বশীল এবং তার কাজে উৎসাহ জোগাতে পারে।
যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

ফারুক মাহমুদ : গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কম আলোচিত হন, এমনটি নয়। তবে জনপ্রিয় লেখকদের নিয়ে পাঠকের আলাদা উৎসাহ থাকে।
যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

ফারুক মাহমুদ : ভালো লেখক গণ্ডা গণ্ডা হন না। বাংলাদেশের সাহিত্যের সব শাখাতেই গুরুত্বপূর্ণ লেখক রয়েছেন। ভালো লেখা থাকলে ভালো মানের পাঠক তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক।

যুগান্তর : এখনকার কবিতা দুর্বোধ্য, নাকি কবিতা পড়তে পারা বা বুঝতে পারার মতো পাঠক কমে যাচ্ছে?

ফারুক মাহমুদ : চিরকাল কবিতাকে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ শুনতে হয়েছে। আবার এটাও সত্যি, কোনো কোনো কবি অকারণে নিজের লেখাকে দুর্বোধ্য করে তোলেন। ইচ্ছাকৃতভাবে কবিতার কাঁধে দুর্বোধ্যতার বোঝা চাপালে, কবিতা দাঁড়াতে পারে না। কবিতার পাঠক কি কখনো অগণিত ছিল?

যুগান্তর : বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫ হাজার বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

ফারুক মাহমুদ : বই প্রকাশের অবাধ সুযোগ রয়েছে। যে কেউ চাইলেই বই প্রকাশ করতে পারে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। একুশের বইমেলায় প্রচুর অযোগ্য বই বেরোচ্ছে। উত্তরণের আপাতত আমি কোনো পথ দেখছি না। এর জন্য লেখক, প্রকাশকের ঔচিত্যবোধ অর্জন করতে হবে। অসম্পাদিত, নিুমানের বই প্রকাশ রোধে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নিতে হবে।

যুগান্তর : সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

ফারুক মাহমুদ : সাহিত্য তো দশক বিভাজন মেনে সৃষ্টি হয় না। তবে সাহিত্যের প্রবণতা চিহ্নিত করতে এর আবশ্যকতা আছে।

যুগান্তর : অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে, অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কী সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

ফারুক মাহমুদ : সৃষ্টিশীল এবং মননশীলতায় সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। বাংলাদেশে দু’ধরনের সাহিত্যচর্চাই হচ্ছে। সংখ্যার দিক থেকে কমবেশি হতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই।

যুগান্তর : বাংলাদেশে কোন ধরনের/বিষয়ের কবিতা বেশি জনপ্রিয়? আপনার কোন ধরনের কবিতা পছন্দ? কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে?

ফারুক মাহমুদ : এটা আসলে সময়, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সময়ের দাবি এলে, উচ্চকিত কবিতা জনপ্রিয়তা পায়। তবে যদি জনপ্রিয়তার কথা বলেন, যে কবিতা সহজে পাঠক শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারে, সেগুলা প্রিয়তা পায়। আমি আসলে কবিতা লিখতে চাই। ধরন বিবেচনা আমার কাছে মুখ্য নয়।

যুগান্তর : জীবিতদের মধ্যে আপনার প্রিয় একজন অগ্রজ এবং অনুজ কবির নাম বলুন। আপনার বিবেচনায় যারা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ফারুক মাহমুদ : এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। জীবিতদের এক-দু’জনের নাম বলে ঝুঁকিতে পড়তে চাই না। অগ্রজ-অনুজদের মধ্যে অনেকের কবিতাই আমি আনন্দ নিয়ে পড়ি।
যুগান্তর : এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

ফারুক মাহমুদ : আমার প্রিয় গ্রন্থতালিকায় অনেক বই-ই আছে। নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবু বলি, আমার প্রতিদিনের পাঠ্য হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’। পছন্দের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অনেক বই। নাম নাই-বা বললাম।

‘পুরস্কার একজন লেখককে অধিকতর দায়িত্বশীল করতে পারে’

 জুননু রাইন 
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:২৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ফারুক মাহমুদ। জন্ম : ১৭ জুলাই ১৯৫২, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।

নানা পেশায় জড়িত হলেও থিতু হয়েছেন সাংবাদিকতায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যাদের হাতে নতুন কবিতা-ধারার সূত্রপাত হয়েছিল, তাদের মধ্যে ফারুক মাহমুদ অন্যতম।

তিনি দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখায় নিবিষ্ট রয়েছেন। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে তিনি কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙিমা তৈরি করেছেন।

গীতিময়তার সঙ্গে প্রতীকী ব্যঞ্জনা, সংকেত, দর্শন এবং ভাবুকতায় তার কবিতা একটি জলবিন্দুর মধ্যে বহুবর্ণের প্রতিফলন। তার হাতে ছন্দের ব্যবহার খুবই সচ্ছল এবং ঋদ্ধ।

কোমল অথচ ঋজু উচ্চারণে তিনি ব্যক্ত করেন জীবন এবং কবিতা আলাদা কিছু নয়। উজ্জ্বল, স্থিতধী নির্মাণরীতির অক্লান্ত শব্দনির্মাতা, শব্দ ব্যবহারে তিনি পারদর্শী। শব্দের ওজন তার জানা। সত্তর দশকের কবি হিসাবে পরিচিত হলেও ফারুক মাহমুদ সমকালীন বাংলা কবিতা-ধারায় নিজের একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। দেশ, দেশের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন নানা মাত্রিকতায় তার কবিতায় উচ্চারিত হয়।

প্রকাশিত কাব্য : ‘পাথরের ফুল’, ‘অপূর্ণ তুমি আনন্দ বিষাদে’, ‘অনন্ত বেলা থেকে আছি’, ‘এত কাছে এত দূরে’, ‘সৌন্দর্য হে ভয়ানক’, ‘বাঘের বিষণ্ন দিন’, ‘হৃদয়ে প্রেমের দিন’, ‘ভ্রূণপদ্য’, ‘অন্ধকারে মুগ্ধ’, ‘রৌদ্র এবং জলের পিপাসা’, ‘সমান্য আগুন যথেষ্ট জীবন’, ‘নির্বাচিত শত পদ্য’, ‘মহাভারতের প্রেম’, ‘ফিরে যাব দূরত্বের কাছে’ ‘আগুনে আপত্তি নেই’, ‘দাগ নয় চিহ্ন’, ‘দুই হৃদয়ে নদী’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘ও স্মৃতিমেঘ ও স্মৃতিরোদ’।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জুননু রাইন

যুগান্তর : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সে সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই

ফারুক মাহমুদ : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি ছিল অভূতপূর্ব, অনন্য শিহরণ এবং স্বপ্নময়তায় ভরপুর। সেটা ছিল স্কুল-জীবনের শেষ দিককার ঘটনা। সেসময় সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না।

যুগান্তর : এ সময়ের অধুনিক ধারার কবিদের মধ্যে আপনি অন্যতম। আপনার সঙ্গে কবি সিকদার আমিনুল হক এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের ভালো সম্পর্ক ছিল বলেই সাহিত্য মহলে আলোচিত। বাংলা সাহিত্যে সিকদার আমিনুল হক এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের অবদান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

ফারুক মাহমুদ : সামান্য লেখালেখি করলেও, বলা যায়, স্বাধীনতার সংলগ্ন সময় থেকে কবিতার সঙ্গে আমার সংযুক্তি। দীর্ঘ পথচলায় অনেকের সঙ্গে চেনা জানা হয়েছে।

প্রায় সবার সঙ্গেই আমার ছিল সহনীয় সম্পর্ক। তবে অগ্রজদের মধ্যে সিকদার আমিনুল হক এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে অন্তত আরও দু’জনের কথা বলা যায়। রফিক আজাদ এবং অরুণাভ সরকার। উল্লিখিত চারজনই বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা কবিতার পথরেখার গুরুত্বপূর্ণ কবি।

আবদুল মান্নান সৈয়দ সহিত্যের যে শাখায় কলম রেখেছেন, সোনা ফলেছে। রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, অরুণাভ সরকার এরা বাংলাদেশের কবিতায় বিশেষ স্থান সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

যুগান্তর : দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্ত্বাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে

ফারুক মাহমুদ : অনেকের সহযোগিতা সাহচর্য আমি পেয়েছি। এ প্রসঙ্গে অগ্রজ সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদের কথা বলা যায়।

যুগান্তর : স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলা সাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলা সাহিত্যের অবস্থান এখন কোন পর্যায়ে?

ফারুক মাহমুদ : সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর থেকেই পূর্ব বাংলার সাহিত্যধারা নতুন বাঁক লাভ করেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর এ ধারাটি জাতীয়তাবাদী চেতনায় বেগবান হয়েছে। একাত্তর পরবর্তীতে তো সেটি আরও স্পষ্ট এবং সুচিহ্নিত অবস্থান তৈরি করেছে।

যুগান্তর : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো বা মন্দ বলবেন?

ফারুক মাহমুদ : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যে কোনো কাজে আসে না। তবে হ্যাঁ, পুরস্কার একজন লেখককে অধিকতর দায়িত্বশীল এবং তার কাজে উৎসাহ জোগাতে পারে।
যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

ফারুক মাহমুদ : গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কম আলোচিত হন, এমনটি নয়। তবে জনপ্রিয় লেখকদের নিয়ে পাঠকের আলাদা উৎসাহ থাকে।
যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

ফারুক মাহমুদ : ভালো লেখক গণ্ডা গণ্ডা হন না। বাংলাদেশের সাহিত্যের সব শাখাতেই গুরুত্বপূর্ণ লেখক রয়েছেন। ভালো লেখা থাকলে ভালো মানের পাঠক তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক।

যুগান্তর : এখনকার কবিতা দুর্বোধ্য, নাকি কবিতা পড়তে পারা বা বুঝতে পারার মতো পাঠক কমে যাচ্ছে?

ফারুক মাহমুদ : চিরকাল কবিতাকে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ শুনতে হয়েছে। আবার এটাও সত্যি, কোনো কোনো কবি অকারণে নিজের লেখাকে দুর্বোধ্য করে তোলেন। ইচ্ছাকৃতভাবে কবিতার কাঁধে দুর্বোধ্যতার বোঝা চাপালে, কবিতা দাঁড়াতে পারে না। কবিতার পাঠক কি কখনো অগণিত ছিল?

যুগান্তর : বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫ হাজার বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

ফারুক মাহমুদ : বই প্রকাশের অবাধ সুযোগ রয়েছে। যে কেউ চাইলেই বই প্রকাশ করতে পারে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। একুশের বইমেলায় প্রচুর অযোগ্য বই বেরোচ্ছে। উত্তরণের আপাতত আমি কোনো পথ দেখছি না। এর জন্য লেখক, প্রকাশকের ঔচিত্যবোধ অর্জন করতে হবে। অসম্পাদিত, নিুমানের বই প্রকাশ রোধে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নিতে হবে।

যুগান্তর : সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

ফারুক মাহমুদ : সাহিত্য তো দশক বিভাজন মেনে সৃষ্টি হয় না। তবে সাহিত্যের প্রবণতা চিহ্নিত করতে এর আবশ্যকতা আছে।

যুগান্তর : অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে, অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কী সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

ফারুক মাহমুদ : সৃষ্টিশীল এবং মননশীলতায় সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। বাংলাদেশে দু’ধরনের সাহিত্যচর্চাই হচ্ছে। সংখ্যার দিক থেকে কমবেশি হতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই।

যুগান্তর : বাংলাদেশে কোন ধরনের/বিষয়ের কবিতা বেশি জনপ্রিয়? আপনার কোন ধরনের কবিতা পছন্দ? কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে?

ফারুক মাহমুদ : এটা আসলে সময়, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সময়ের দাবি এলে, উচ্চকিত কবিতা জনপ্রিয়তা পায়। তবে যদি জনপ্রিয়তার কথা বলেন, যে কবিতা সহজে পাঠক শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারে, সেগুলা প্রিয়তা পায়। আমি আসলে কবিতা লিখতে চাই। ধরন বিবেচনা আমার কাছে মুখ্য নয়।

যুগান্তর : জীবিতদের মধ্যে আপনার প্রিয় একজন অগ্রজ এবং অনুজ কবির নাম বলুন। আপনার বিবেচনায় যারা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ফারুক মাহমুদ : এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। জীবিতদের এক-দু’জনের নাম বলে ঝুঁকিতে পড়তে চাই না। অগ্রজ-অনুজদের মধ্যে অনেকের কবিতাই আমি আনন্দ নিয়ে পড়ি।
যুগান্তর : এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

ফারুক মাহমুদ : আমার প্রিয় গ্রন্থতালিকায় অনেক বই-ই আছে। নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবু বলি, আমার প্রতিদিনের পাঠ্য হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’। পছন্দের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অনেক বই। নাম নাই-বা বললাম।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন