‘আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে’
jugantor
‘আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে’

  জুননু রাইন  

০৫ মার্চ ২০২১, ০০:৩৯:২১  |  অনলাইন সংস্করণ

‘আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে’

ড. আতিউর রহমান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ অন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের নির্বাহী কমিটির সভাপতি।

দীর্ঘকাল বিআইডিএস-এ যুক্ত থাকার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন ২০০৬-এ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে ২০০৯ থেকে প্রায় সাত বছর আর্থিক সেবা খাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

প্রযুক্তিনির্ভর সেবাসহ অন্যান্য উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নীরব বিপ্লব’-এ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। জনবান্ধব গবেষণার জন্য ‘গরিবের অর্থনীতিবিদ’ এবং সবুজ অর্থায়নে নেতৃত্বর করণে ‘সবুজ গভর্নর’ হিসাবে পরিচিত।

মোট ৬৭টি গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতি ও উন্নয়ন গবেষণাধর্মী লেখালেখির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাহিত্যকর্মের জন্যও তিনি সমান সমাদৃত।

তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো, এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের জীবন সদস্য এবং জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদের নির্বাহী সভাপতি। তার লেখা/সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Peasants and Classes, ভাষা-আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি, জনমানুষের মুক্তিযুদ্ধ, Bangabandhu Primer, এবং শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম।

বেস্ট সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক ২০১৫ (ফাইনান্সিয়াল টাইমস), গুসি শান্তি পুরস্কার, ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পদক ২০১৫-সহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন।

সাক্ষাৎকার গ্রহন: জুননু রাইন

যুগান্তর: অর্থনীতির সঙ্গে সাহিত্য ও সমাজ জীবনের সম্পর্কটি আপনার অনেক লেখায় তুলে ধরেছেন। আমরা অর্থনৈতিকভাবে অনেকদূর এগোলেও সাহিত্য সংস্কৃতিতে এগোতে পেরেছি কিনা অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে।

আপনি একই সঙ্গে একজন শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ এবং সাহিত্যিক; বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই

আতিউর রহমান: নিশ্চয়ই, অর্থনীতির সঙ্গে সাহিত্য ও সমাজের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ অর্থনৈতিকভাবে খানিকটা স্বস্তি লাভ করলেই সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। সে জন্য অবসর খুব জরুরি। আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধে বাড়ছে। আমাদের জীবনের গড় আয়ু বাড়ছে। এর পাশাপাশি দারিদ্র্যও কমছে। তাই মানুষের খেয়ে-পরে বাঁচার দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক এ অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজের সচেষ্টতা একই হারে বাড়েনি। বরং আগের চেয়ে ঢের বেশি ব্যক্তি-স্বার্থে মানুষ আরও বেশি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন।

সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি ধীরে ধীরে পেছনের সারিতে চলে যাচ্ছে। সমাজে ধনী মানুষের সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে। কিন্তু এরা প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের ধনী বলে সমাজের জন্য এদের খুব একটা দায়বোধ আছে বলে মনে হয় না। তাই শিল্প-সাহিত্য নিয়ে তাদের খুব একটা ভাবতে দেখি না। সামাজিক দায়বোধ থেকে এসব ক্ষেত্রে তারা খুব বেশি বিনিয়োগও করতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। তবে ব্যতিক্রমও যে নেই তা বলব না।

বস্তুত আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে। আশার কথা যে, বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন নিয়মিত সাহিত্য পুরস্কার দিয়ে থাকে। একটি ব্যাংক নিয়মিত গুণিজনদের সম্মাননা দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে শিল্পী সাহিত্যিকও থাকেন।

প্রকাশনা খাতে স্বল্প সুদে এসএমই ঋণ দেওয়ার নীতিমালা কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করেছে। তা সত্ত্বেও এ কথা জোর দিয়ে বলা চলে সাহিত্য প্রসারে আমাদের সমাজের মাথাদের পৃষ্ঠপোষকতা তেমন জোরালো নয়। এত কিছুর পরও হালে প্রচুর প্রকাশনা উদ্যোগ চোখে পড়ে।

তরুণ উদ্যোক্তারা নিজেদের এবং পারিবারিক সহায়তায় প্রকাশনা শিল্পকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তাদের প্রকাশনার মান এবং উপস্থাপনাও বেশ চোখে পড়ার মতো। অনেক তরুণ লেখক-লেখিকা নিজেদের আনন্দেই লিখছেন। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগ।

ইন্টারনেটে প্রচুর ভালো লেখাও অনেকেই পোস্ট করছেন। তবে ফেসবুকের এ যুগে সামাজিক মাধ্যমে এত হইহুল্লোড়ের মাঝে হয়তো ভালো লেখাগুলোর সন্ধান মেলাই ভার। মন্দ মুদ্রাগুলো ভালো মুদ্রাকে আড়াল করে ফেলছে। তবে দেশে এবং বিদেশের শুভজনেরা ঠিকই খোঁজ রাখেন কারা ভালো লিখছেন। একজন ভালো লেখক আরেকজনকে উৎসাহ দিতে কার্পণ্য করেন না।

আর প্রতিবছর বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক ই-বইও আজকাল প্রকাশিত হচ্ছে। প্রযুক্তির জোয়ার যেভাবে প্রবল হচ্ছে এক সময় হয়তো ইলেকট্রনিক বই-ই মূলধারার বই হিসেবে গণ্য হবে। তা হোক। তবে সে বইগুলোও যেনো গুণমানের হয় সেই প্রত্যাশাই করছি।
শিক্ষক হিসাবে মানতেই হবে আমাদের শিক্ষার্থীরা এখন আর সাহিত্যের বই পড়তে তেমন আগ্রহী নয়। সবাই ‘শর্টকাট’ পছন্দ করে। সামাজিক মাধ্যমে তারা ‘বুঁদ’ হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এমনকি পাঠক্রমের অংশ হিসাবেও বই পড়তে তাদের আগ্রহ বেশ কম। তবে ব্যতিক্রম তো আছেই।

আমার কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে দেখি তারা গণ্ডির বাইরের বই পড়তে বেশ উৎসাহী। তবে এটা মূলধারা নয়। এর জন্য তাদের দোষ দিতে চাই না। আমরা শিক্ষকরাই হয়তো শিক্ষার্থীদের মনের জানালা সেভাবে খুলে দিতে পারছি না। এ দায় আমাদের নিতেই হবে।

যখন আমাদের অর্থনীতি ততটা গতিময় ছিল না তখনই বরং আমাদের সৃজনশীলতার ঝোঁক বেশি ছিল। আর সামাজিক-রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসাবেই অনেক ভালো কবিতা, গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হতে দেখেছি।

ভাষা আন্দোলনের পর বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা ও দ্রোহের জোয়ার এসেছিল। পুরো ষাটের দশকে আমরা আমাদের জাতিসত্তার সন্ধানে প্রচুর নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষণ দেখেছি। সংস্কৃতি অঙ্গনেও তখন প্রাণের স্পন্দন দেখেছি।

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেও এ ধারা পঁচাত্তর অবধি অব্যাহত ছিল। পঁচাত্তরের পর কিছুটা সময় থমকে থাকার পর এ দেশের কবি ও লেখকরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর বিদ্রোহী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। নির্মলেন্দু গুণ এ ক্ষেত্রে পথিকৃত। একুশের ভোরে তিনি যে দ্রোহের সূচনা করেছিলেন তা পরবর্র্তী সময়ে পুরো কবিতাঙ্গনকে আলোড়িত ও আলোকিত করেছিল।

তা ছাড়া প্রয়াত আবুল ফজল, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হাসান এবং জীবিত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হকসহ অনেকেই বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর সৃজনশীল রচনা করেছেন। আমিও তাকে নিয়ে প্রচুর লিখছি। তাই এ কথা বললে ভুল হবে না যে ভালো-মন্দ মিলেই এগিয়ে চলেছে আমাদের সাহিত্যচর্চা।

আমরা বড়রাই তরুণদের উজ্জীবিত করে আমাদের সাহিত্যের রূপ-রস-গন্ধের সঙ্গে যুক্ত করে উঠতে পারিনি বলে মাঝে মধ্যে মনে হয়। তবে আমি আশাবাদী সাহিত্যের এ খরা নিশ্চয় কেটে যাবে। নতুন করে ফের সৃষ্টিশীলতার বাতাস জোরেশোরেই বইবে বলে আমার বিশ্বাস।

যুগান্তর: প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সে সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই।

আতিউর রহমান: প্রথম লেখা ছাপা হয় ‘দৈনিক বাংলাদেশ অবজার্ভার’-এ ১৯৭২ সালের প্রথমার্ধেই। তার কিছুদিন পর পূর্বদেশে। এরপর ইত্তেফাকে। তারপর তো অনেক কাগজেই লিখেছি। প্রথম লেখা তো প্রথম সন্তানের মতোই। সেই চোখেই তাকে দেখি।

প্রথম বই ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি’। বন্ধু ইউসুফ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে বইটি যৌথভাবে লিখেছিলাম। নিউমার্কেটের বইঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তখন আমরা দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র। নতুন দেশে বাংলায় অর্থনীতি চর্চা হবে এমন স্বপ্নে বিভোর হয়েই ছোট্ট বইটি লিখেছিলাম। ওই বইটির কথা এখনো অন্তরে গেঁথে আছে।

এরপর কত বই-ই তো লিখেছি। কিন্তু প্রথম বইয়ের প্রতি আদরই আলাদা। তখন তো সবে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে। সেই বাংলাদেশে তারুণ্যের সৃষ্টিশীলতার দারুণ উন্মেষ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বত্র সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছিল।

অনেকেই নতুন কিছু লেখার বা করার চেষ্টা করছিল। প্রায়ই স্বরচিত কবিতার আসর বসত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। আমি একবার টিএসসির ব-দ্বীপে আমার লেখা একটি কবিতা পড়েছিলাম। ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রায়’ আমার ছবিসহ কয়েকটি লাইন ছাপাও হয়েছিল। সেই প্রথম। সেই শেষ। কবিতা আর লেখা হয়ে ওঠেনি। তবে সময়টা ছিল খুবই সৃষ্টিশীল।

প্রায়ই কবি আবুল হাসানের সঙ্গে দেখা হতো শরিফের ক্যান্টিনে। পরে অবশ্যি একটি মিডিয়া হাউসে একসঙ্গে কিছুদিন কাজও করেছিলাম। আসলেই, সে সময়টা ছিল টগবগে।

যুগান্তর: বর্তমানে কী নিয়ে কাজ করছেন? সামনের বইমেলায় কোন ধরনের বই আসবে?

আতিউর রহমান : বর্তমানে আমি বঙ্গবন্ধু এবং সমকালীন অর্থনীতি নিয়েই বেশি কাজ করছি। বইমেলাতে পাঁচটি বই বের করার ইচ্ছা রাখি। তিনটি বঙ্গবন্ধুর ওপর। দুটি সমকালীন অর্থনীতি নিয়ে।

একটি বই এরই মধ্যে বের হয়ে গেছে। বাকিগুলোও আশা করি বের হয়ে যাবে। অন্যপ্রকাশ, সদর প্রকাশনী, বাংলা প্রকাশ এবং ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বইগুলো বের হচ্ছে।

যুগান্তর: আপনি তো গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশাপাশি সাহিত্য এবং সাম্প্রতিক বিষয়-আশয় নিয়েও নিয়মিত লিখেন। আপনি নিজেকে রবীন্দ্র-গবেষক না অর্থনীতিবিদ ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

আতিউর রহমান: রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু আমার প্রিয় মানুষ। তাদের দু’জনের ওপরই গবেষণা করি। বই লিখি। কখনোই অর্থনীতিবিদের গণ্ডির মধ্যে পড়ে থাকতে চাইনি। আমি একজন শিক্ষক, গবেষক এবং লেখক পরিচয়েই পরিচিত হতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

যুগান্তর: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার গবেষণাধর্মী কাজও পাঠক-মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। কোন ধরনের কাজে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে?

আতিউর রহমান: ঠিকই বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই এখন আমি ডুবে আর্ছি। আমি আমার তরুণ সহকর্মী ও পাঠকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম মুজিববর্ষের প্রতি সপ্তাহেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু না কিছু লিখব।

আমি পুরো মুজিববর্ষ ধরেই দুটি কাগজে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কলাম লিখছি। একটি ইংরেজিতে এবং অন্যটি বাংলায়। আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বলছি তাকে নিয়ে। তাদের অনুরোধে লিখছিও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। আর গণমাধ্যমে তো বলেই চলেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ আমাকে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এ সুযোগে বঙ্গবন্ধুর ওপর নিবিড় গবেষণার সুযোগ পেয়েছি। সেসব গবেষণার ফসলই এসব লেখা এবং বলা। করোনাকালের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। তা না হলে এতটা সময় ধরে গবেষণা ও লিখতে পারতাম কি না সন্দেহ। নিঃসন্দেহে এ অখণ্ড সময়ে আমি দু’হাত খুলে লিখতে পেরেছি এবং এখনো পারছি।

ক্লান্তিহীনভাবে আমি লিখে যাচ্ছি। তাতেই আমার আনন্দ। কেননা আমার লেখায় আমি জীবনের গান গাই। আশার কথা বলি। বেঁচে থাকার আনন্দের কথা বলি।

যুগান্তর: সাধারণত অনেক আলোচক এবং লেখকেরই ধারণা, ভালো লেখা খুব একটা জনপ্রিয় হয় না। যদি সে রকমই হয়, তাহলে এটা কি ওই লেখকের সীমাবদ্ধতা? নাকি পাঠকের সীমাবদ্ধতা?

আতিউর রহমান: এ কথাটি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ যে এত জনপ্রিয় একজন লেখক তাতে কী প্রমাণিত হয়? তিনি কি ভালো লেখক নন? হুমায়ুন আজাদ কি জনপ্রিয় বলেই ভালো লেখক নন? এটা লেখকের সীমাবদ্ধতা নয়। পাঠকদেরও নয়।

এ সীমাবদ্ধতা সমালোচকের। সব ভালো লেখাই জনপ্রিয় হতে পারে উপস্থাপনার গুণে। অনেক কঠিন বিষয়ও সহজ করে লেখা সম্ভব। তা না হলে অর্থনীতির মতো রসকষহীন বিষয়ও কেমন করে পাঠকপ্রিয়তা পায়? সহজ করে বলা এবং লেখাই একজন ভালো লেখকের বড় গুণ।

আমি নিজে অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখার সময় সহজবোধ্য ভাষায় সবার বোধগম্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করি। যখন পাঠকরা আমার এসব লেখাতে সাহিত্যরস খুঁজে পান বলেন, তখন নিজেকে স্বার্থক মনে হয়।

যুগান্তর: সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বর্তমানে বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো-মন্দ বলবেন?

আতিউর রহমান: লেখক মনের আনন্দেই লেখেন। পাঠক-প্রিয়তাই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এর বাইরে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে সাহিত্য পুরস্কার পেলে নিশ্চয়ই লেখকের ভালো লাগে। তবে পাঠকের ভালো লাগাটাই আমি মনে করি লেখকের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিশ্চয় আমাকে প্রাণিত করেছে। রবীন্দ্রচর্চার জন্য চ্যানেল আই আজীবন পুরস্কার দিয়ে নিশ্চয় আমাকে উৎসাহিত করেছে। কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণ স্মারকে পুরস্কৃত করে আমাকে নিঃসন্দেহে আশাবাদী করেছে।

তেমনি শেলটেক পুরস্কারও আমি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছি। অ-সরকারি পুরস্কার পাওয়ার পর আমার পাঠক ও গুণগ্রাহীদের যে উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসার প্রকাশ দেখেছি তাতে সত্যিই আমি সন্তুষ্ট। বেশ কিছু ভালো সাহিত্য পুরস্কার বাংলাদেশে রয়েছে। এগুলো উপযুক্ত জুরি বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই দেওয়া হয়।

এমন ধারার পুরস্কার অব্যাহত থাকলে বিশেষ করে তরুণ লেখকদের উৎসাহী করার কাজটি সহজতর হবে।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২১ সালে এসে কী বলবেন?

আতিউর রহমান: নিঃসন্দেহে একাত্তর আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। সে ছিল এক হিরণ্ময় সময়। দুঃখের সময়। আনন্দেরও সময়। একাত্তর বাঙালির লড়াকু মনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তাই একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যে সৃজনশীলতার প্লাবন এসেছিল।

সেই প্লাবন হয়তো খানিকটা থিতু হয়েছে তবে অবনতি হয়নি। একাত্তরের ফল্গুধারা আমাদের সাহিত্যের ভুবনে এখনো অবারিত বইছে। তাই এখনো প্রচুর নয়া সৃষ্টির সন্ধান পাই সাহিত্য অঙ্গনে। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও প্রয়াণ।

পুরোনো ও নবীন সবাই এখনো মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নিরন্তর সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছেন। পৃথিবীতে আর কোনো রাষ্ট্রনায়ককে নিয়ে এত সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সামাজিক অসঙ্গতি, বঞ্চনা ও বৈষম্য বরং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নান্দনিক ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তির আলোকে আরও বেশি সৃজনশীল ও দ্রোহী হওয়ার শক্তি জোগাচ্ছে।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

আতিউর রহমান: হ্যাঁ। আমাদের গ্রন্থ সমালোচনার ঐতিহ্যটি দিন দিন দুর্বল হয়ে আসছে। আমাদের দৈনিকগুলোর সাহিত্য পাতা ছোট হয়ে গেছে। আগের মতো লেখালেখি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনাও তেমনটি দেখি না।

আহসান হাবিব ও আবুল হাসনাতদের মতো সাহিত্য সম্পাদকদের এখন বড়ই অভাব। তবে তরুণ কয়েকজন সাহিত্য সম্পাদক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সাহিত্য পাতার হালটি ধরে আছেন। হতে পারে ডিজিটাল এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা তাল সামলে উঠতে পারছেন না। তবে তাদের অমূল্য সৃষ্টির গুণেই তারা চিরদিন গুরুত্বপূর্ণ থেকে যাবেন। সময় তাদের নিঃশেষ হতে দেবে না।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

আতিউর রহমান: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছাড়াও আমার মনে হয় শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ এবং নির্মলেন্দু গুণের মতো কালজয়ী কবিদের লেখা বিদেশি ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর তিনটি বই-ই সাহিত্য গুণে গুণান্বিত।

এ বইগুলোও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

যুগান্তর: দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্তাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে।

আতিউর রহমান: অনেক কবি-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য আমি পেয়েছি। তাদের স্নেহ, ভালোবাসার কথা ভুলতেই পারি না।

বিশেষ করে প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, শাসমুল হক, বেলাল চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, সনজিদা খাতুন, বন্ধু জাফর ইকবাল, সেলিনা হোসেন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ আরও অনেকের কথাই চলে আসে।

তবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছি হায়াৎ মামুদের কাছ থেকে। কি নিষ্ঠার সঙ্গেই না তিনি আমার সম্পাদিত ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি গ্রন্থমালার সম্পাদনা করে দিয়েছেন তা বলে শেষ করতে পারব না। একইভাবে বৈরী সময় সত্ত্বেও তিনি ‘শেখ মুজিব’ বাংলাদেশের আরেক নাম’ গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন এবং ভূমিকা লিখে দিয়ে আমাকে চিরঋণী করে রেখেছেন। তার এ সহযোগিতা কিছুতেই ভোলার নয়। তিনি দীর্ঘজীবী হোন।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

আতিউর রহমান: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে- এক. হাসান আজিজুল হক; দুই. সেলিনা হোসেন; তিন. জাফর ইকবাল।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ ও একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ।

আতিউর রহমান: অগ্রজ- হাসান আজিজুল হক ও অনুজ- মুস্তাফিজ শফি

যুগান্তর: এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

আতিউর রহমান: এক. শেখ মুজিবুর রহমান- ‘আমার দেখা নয়া চীন।’ দুই. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- ‘প্রথম আলো’

‘আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে’

 জুননু রাইন 
০৫ মার্চ ২০২১, ১২:৩৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
‘আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে’
ছবি: যুগান্তর

ড. আতিউর রহমান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ অন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের নির্বাহী কমিটির সভাপতি। 

দীর্ঘকাল বিআইডিএস-এ যুক্ত থাকার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন ২০০৬-এ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে ২০০৯ থেকে প্রায় সাত বছর আর্থিক সেবা খাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

প্রযুক্তিনির্ভর সেবাসহ অন্যান্য উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নীরব বিপ্লব’-এ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। জনবান্ধব গবেষণার জন্য ‘গরিবের অর্থনীতিবিদ’ এবং সবুজ অর্থায়নে নেতৃত্বর করণে ‘সবুজ গভর্নর’ হিসাবে পরিচিত। 

মোট ৬৭টি গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতি ও উন্নয়ন গবেষণাধর্মী লেখালেখির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাহিত্যকর্মের জন্যও তিনি সমান সমাদৃত। 

তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো, এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের জীবন সদস্য এবং জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদের নির্বাহী সভাপতি। তার লেখা/সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Peasants and Classes, ভাষা-আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি, জনমানুষের মুক্তিযুদ্ধ, Bangabandhu Primer, এবং শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম। 

বেস্ট সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক ২০১৫ (ফাইনান্সিয়াল টাইমস), গুসি শান্তি পুরস্কার, ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পদক ২০১৫-সহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন।

সাক্ষাৎকার গ্রহন: জুননু রাইন

যুগান্তর: অর্থনীতির সঙ্গে সাহিত্য ও সমাজ জীবনের সম্পর্কটি আপনার অনেক লেখায় তুলে ধরেছেন। আমরা অর্থনৈতিকভাবে অনেকদূর এগোলেও সাহিত্য সংস্কৃতিতে এগোতে পেরেছি কিনা অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। 

আপনি একই সঙ্গে একজন শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ এবং সাহিত্যিক; বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই

আতিউর রহমান: নিশ্চয়ই, অর্থনীতির সঙ্গে সাহিত্য ও সমাজের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ অর্থনৈতিকভাবে খানিকটা স্বস্তি লাভ করলেই সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। সে জন্য অবসর খুব জরুরি। আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধে বাড়ছে। আমাদের জীবনের গড় আয়ু বাড়ছে। এর পাশাপাশি দারিদ্র্যও কমছে। তাই মানুষের খেয়ে-পরে বাঁচার দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক এ অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজের সচেষ্টতা একই হারে বাড়েনি। বরং আগের চেয়ে ঢের বেশি ব্যক্তি-স্বার্থে মানুষ আরও বেশি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। 

সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি ধীরে ধীরে পেছনের সারিতে চলে যাচ্ছে। সমাজে ধনী মানুষের সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে। কিন্তু এরা প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের ধনী বলে সমাজের জন্য এদের খুব একটা দায়বোধ আছে বলে মনে হয় না। তাই শিল্প-সাহিত্য নিয়ে তাদের খুব একটা ভাবতে দেখি না। সামাজিক দায়বোধ থেকে এসব ক্ষেত্রে তারা খুব বেশি বিনিয়োগও করতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। তবে ব্যতিক্রমও যে নেই তা বলব না। 

বস্তুত আমাদের সামাজিক পুঁজি আগের চেয়ে কমে গেছে। আশার কথা যে, বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন নিয়মিত সাহিত্য পুরস্কার দিয়ে থাকে। একটি ব্যাংক নিয়মিত গুণিজনদের সম্মাননা দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে শিল্পী সাহিত্যিকও থাকেন। 

প্রকাশনা খাতে স্বল্প সুদে এসএমই ঋণ দেওয়ার নীতিমালা কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করেছে। তা সত্ত্বেও এ কথা জোর দিয়ে বলা চলে সাহিত্য প্রসারে আমাদের সমাজের মাথাদের পৃষ্ঠপোষকতা তেমন জোরালো নয়। এত কিছুর পরও হালে প্রচুর প্রকাশনা উদ্যোগ চোখে পড়ে। 

তরুণ উদ্যোক্তারা নিজেদের এবং পারিবারিক সহায়তায় প্রকাশনা শিল্পকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তাদের প্রকাশনার মান এবং উপস্থাপনাও বেশ চোখে পড়ার মতো। অনেক তরুণ লেখক-লেখিকা নিজেদের আনন্দেই লিখছেন। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগ। 

ইন্টারনেটে প্রচুর ভালো লেখাও অনেকেই পোস্ট করছেন। তবে ফেসবুকের এ যুগে সামাজিক মাধ্যমে এত হইহুল্লোড়ের মাঝে হয়তো ভালো লেখাগুলোর সন্ধান মেলাই ভার। মন্দ মুদ্রাগুলো ভালো মুদ্রাকে আড়াল করে ফেলছে। তবে দেশে এবং বিদেশের শুভজনেরা ঠিকই খোঁজ রাখেন কারা ভালো লিখছেন। একজন ভালো লেখক আরেকজনকে উৎসাহ দিতে কার্পণ্য করেন না। 

আর প্রতিবছর বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক ই-বইও আজকাল প্রকাশিত হচ্ছে। প্রযুক্তির জোয়ার যেভাবে প্রবল হচ্ছে এক সময় হয়তো ইলেকট্রনিক বই-ই মূলধারার বই হিসেবে গণ্য হবে। তা হোক। তবে সে বইগুলোও যেনো গুণমানের হয় সেই প্রত্যাশাই করছি। 
শিক্ষক হিসাবে মানতেই হবে আমাদের শিক্ষার্থীরা এখন আর সাহিত্যের বই পড়তে তেমন আগ্রহী নয়। সবাই ‘শর্টকাট’ পছন্দ করে। সামাজিক মাধ্যমে তারা ‘বুঁদ’ হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এমনকি পাঠক্রমের অংশ হিসাবেও বই পড়তে তাদের আগ্রহ বেশ কম। তবে ব্যতিক্রম তো আছেই। 

আমার কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে দেখি তারা গণ্ডির বাইরের বই পড়তে বেশ উৎসাহী। তবে এটা মূলধারা নয়। এর জন্য তাদের দোষ দিতে চাই না। আমরা শিক্ষকরাই হয়তো শিক্ষার্থীদের মনের জানালা সেভাবে খুলে দিতে পারছি না। এ দায় আমাদের নিতেই হবে। 

যখন আমাদের অর্থনীতি ততটা গতিময় ছিল না তখনই বরং আমাদের সৃজনশীলতার ঝোঁক বেশি ছিল। আর সামাজিক-রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসাবেই অনেক ভালো কবিতা, গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হতে দেখেছি।

ভাষা আন্দোলনের পর বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা ও দ্রোহের জোয়ার এসেছিল। পুরো ষাটের দশকে আমরা আমাদের জাতিসত্তার সন্ধানে প্রচুর নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষণ দেখেছি। সংস্কৃতি অঙ্গনেও তখন প্রাণের স্পন্দন দেখেছি। 

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেও এ ধারা পঁচাত্তর অবধি অব্যাহত ছিল। পঁচাত্তরের পর কিছুটা সময় থমকে থাকার পর এ দেশের কবি ও লেখকরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর বিদ্রোহী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। নির্মলেন্দু গুণ এ ক্ষেত্রে পথিকৃত। একুশের ভোরে তিনি যে দ্রোহের সূচনা করেছিলেন তা পরবর্র্তী সময়ে পুরো কবিতাঙ্গনকে আলোড়িত ও আলোকিত করেছিল। 

তা ছাড়া প্রয়াত আবুল ফজল, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হাসান এবং জীবিত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হকসহ অনেকেই বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর সৃজনশীল রচনা করেছেন। আমিও তাকে নিয়ে প্রচুর লিখছি। তাই এ কথা বললে ভুল হবে না যে ভালো-মন্দ মিলেই এগিয়ে চলেছে আমাদের সাহিত্যচর্চা। 

আমরা বড়রাই তরুণদের উজ্জীবিত করে আমাদের সাহিত্যের রূপ-রস-গন্ধের সঙ্গে যুক্ত করে উঠতে পারিনি বলে মাঝে মধ্যে মনে হয়। তবে আমি আশাবাদী সাহিত্যের এ খরা নিশ্চয় কেটে যাবে। নতুন করে ফের সৃষ্টিশীলতার বাতাস জোরেশোরেই বইবে বলে আমার বিশ্বাস।

যুগান্তর: প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সে সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই।

আতিউর রহমান: প্রথম লেখা ছাপা হয় ‘দৈনিক বাংলাদেশ অবজার্ভার’-এ ১৯৭২ সালের প্রথমার্ধেই। তার কিছুদিন পর পূর্বদেশে। এরপর ইত্তেফাকে। তারপর তো অনেক কাগজেই লিখেছি। প্রথম লেখা তো প্রথম সন্তানের মতোই। সেই চোখেই তাকে দেখি। 

প্রথম বই ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি’। বন্ধু ইউসুফ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে বইটি যৌথভাবে লিখেছিলাম। নিউমার্কেটের বইঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তখন আমরা দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র। নতুন দেশে বাংলায় অর্থনীতি চর্চা হবে এমন স্বপ্নে বিভোর হয়েই ছোট্ট বইটি লিখেছিলাম। ওই বইটির কথা এখনো অন্তরে গেঁথে আছে। 

এরপর কত বই-ই তো লিখেছি। কিন্তু প্রথম বইয়ের প্রতি আদরই আলাদা। তখন তো সবে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে। সেই বাংলাদেশে তারুণ্যের সৃষ্টিশীলতার দারুণ উন্মেষ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বত্র সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছিল। 

অনেকেই নতুন কিছু লেখার বা করার চেষ্টা করছিল। প্রায়ই স্বরচিত কবিতার আসর বসত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। আমি একবার টিএসসির ব-দ্বীপে আমার লেখা একটি কবিতা পড়েছিলাম। ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রায়’ আমার ছবিসহ কয়েকটি লাইন ছাপাও হয়েছিল। সেই প্রথম। সেই শেষ। কবিতা আর লেখা হয়ে ওঠেনি। তবে সময়টা ছিল খুবই সৃষ্টিশীল। 

প্রায়ই কবি আবুল হাসানের সঙ্গে দেখা হতো শরিফের ক্যান্টিনে। পরে অবশ্যি একটি মিডিয়া হাউসে একসঙ্গে কিছুদিন কাজও করেছিলাম। আসলেই, সে সময়টা ছিল টগবগে।

যুগান্তর: বর্তমানে কী নিয়ে কাজ করছেন? সামনের বইমেলায় কোন ধরনের বই আসবে?

আতিউর রহমান : বর্তমানে আমি বঙ্গবন্ধু এবং সমকালীন অর্থনীতি নিয়েই বেশি কাজ করছি। বইমেলাতে পাঁচটি বই বের করার ইচ্ছা রাখি। তিনটি বঙ্গবন্ধুর ওপর। দুটি সমকালীন অর্থনীতি নিয়ে। 

একটি বই এরই মধ্যে বের হয়ে গেছে। বাকিগুলোও আশা করি বের হয়ে যাবে। অন্যপ্রকাশ, সদর প্রকাশনী, বাংলা প্রকাশ এবং ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বইগুলো বের হচ্ছে। 

যুগান্তর: আপনি তো গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশাপাশি সাহিত্য এবং সাম্প্রতিক বিষয়-আশয় নিয়েও নিয়মিত লিখেন। আপনি নিজেকে রবীন্দ্র-গবেষক না অর্থনীতিবিদ ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

আতিউর রহমান: রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু আমার প্রিয় মানুষ। তাদের দু’জনের ওপরই গবেষণা করি। বই লিখি। কখনোই অর্থনীতিবিদের গণ্ডির মধ্যে পড়ে থাকতে চাইনি। আমি একজন শিক্ষক, গবেষক এবং লেখক পরিচয়েই পরিচিত হতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। 

যুগান্তর: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার গবেষণাধর্মী কাজও পাঠক-মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। কোন ধরনের কাজে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে?

আতিউর রহমান: ঠিকই বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই এখন আমি ডুবে আর্ছি। আমি আমার তরুণ সহকর্মী ও পাঠকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম মুজিববর্ষের প্রতি সপ্তাহেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু না কিছু লিখব। 

আমি পুরো মুজিববর্ষ ধরেই দুটি কাগজে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কলাম লিখছি। একটি ইংরেজিতে এবং অন্যটি বাংলায়। আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বলছি তাকে নিয়ে। তাদের অনুরোধে লিখছিও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। আর গণমাধ্যমে তো বলেই চলেছি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ আমাকে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এ সুযোগে বঙ্গবন্ধুর ওপর নিবিড় গবেষণার সুযোগ পেয়েছি। সেসব গবেষণার ফসলই এসব লেখা এবং বলা। করোনাকালের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। তা না হলে এতটা সময় ধরে গবেষণা ও লিখতে পারতাম কি না সন্দেহ। নিঃসন্দেহে এ অখণ্ড সময়ে আমি দু’হাত খুলে লিখতে পেরেছি এবং এখনো পারছি। 

ক্লান্তিহীনভাবে আমি লিখে যাচ্ছি। তাতেই আমার আনন্দ। কেননা আমার লেখায় আমি জীবনের গান গাই। আশার কথা বলি। বেঁচে থাকার আনন্দের কথা বলি। 

যুগান্তর: সাধারণত অনেক আলোচক এবং লেখকেরই ধারণা, ভালো লেখা খুব একটা জনপ্রিয় হয় না। যদি সে রকমই হয়, তাহলে এটা কি ওই লেখকের সীমাবদ্ধতা? নাকি পাঠকের সীমাবদ্ধতা?

আতিউর রহমান: এ কথাটি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ যে এত জনপ্রিয় একজন লেখক তাতে কী প্রমাণিত হয়? তিনি কি ভালো লেখক নন? হুমায়ুন আজাদ কি জনপ্রিয় বলেই ভালো লেখক নন? এটা লেখকের সীমাবদ্ধতা নয়। পাঠকদেরও নয়। 

এ সীমাবদ্ধতা সমালোচকের। সব ভালো লেখাই জনপ্রিয় হতে পারে উপস্থাপনার গুণে। অনেক কঠিন বিষয়ও সহজ করে লেখা সম্ভব। তা না হলে অর্থনীতির মতো রসকষহীন বিষয়ও কেমন করে পাঠকপ্রিয়তা পায়? সহজ করে বলা এবং লেখাই একজন ভালো লেখকের বড় গুণ। 

আমি নিজে অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখার সময় সহজবোধ্য ভাষায় সবার বোধগম্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করি। যখন পাঠকরা আমার এসব লেখাতে সাহিত্যরস খুঁজে পান বলেন, তখন নিজেকে স্বার্থক মনে হয়।

যুগান্তর: সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বর্তমানে বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো-মন্দ বলবেন?

আতিউর রহমান: লেখক মনের আনন্দেই লেখেন। পাঠক-প্রিয়তাই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এর বাইরে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে সাহিত্য পুরস্কার পেলে নিশ্চয়ই লেখকের ভালো লাগে। তবে পাঠকের ভালো লাগাটাই আমি মনে করি লেখকের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। 

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিশ্চয় আমাকে প্রাণিত করেছে। রবীন্দ্রচর্চার জন্য চ্যানেল আই আজীবন পুরস্কার দিয়ে নিশ্চয় আমাকে উৎসাহিত করেছে। কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণ স্মারকে পুরস্কৃত করে আমাকে নিঃসন্দেহে আশাবাদী করেছে। 

তেমনি শেলটেক পুরস্কারও আমি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছি। অ-সরকারি পুরস্কার পাওয়ার পর আমার পাঠক ও গুণগ্রাহীদের যে উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসার প্রকাশ দেখেছি তাতে সত্যিই আমি সন্তুষ্ট। বেশ কিছু ভালো সাহিত্য পুরস্কার বাংলাদেশে রয়েছে। এগুলো উপযুক্ত জুরি বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই দেওয়া হয়। 

এমন ধারার পুরস্কার অব্যাহত থাকলে বিশেষ করে তরুণ লেখকদের উৎসাহী করার কাজটি সহজতর হবে। 

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২১ সালে এসে কী বলবেন?

আতিউর রহমান: নিঃসন্দেহে একাত্তর আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। সে ছিল এক হিরণ্ময় সময়। দুঃখের সময়। আনন্দেরও সময়। একাত্তর বাঙালির লড়াকু মনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তাই একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যে সৃজনশীলতার প্লাবন এসেছিল। 

সেই প্লাবন হয়তো খানিকটা থিতু হয়েছে তবে অবনতি হয়নি। একাত্তরের ফল্গুধারা আমাদের সাহিত্যের ভুবনে এখনো অবারিত বইছে। তাই এখনো প্রচুর নয়া সৃষ্টির সন্ধান পাই সাহিত্য অঙ্গনে। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও প্রয়াণ। 

পুরোনো ও নবীন সবাই এখনো মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নিরন্তর সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছেন। পৃথিবীতে আর কোনো রাষ্ট্রনায়ককে নিয়ে এত সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সামাজিক অসঙ্গতি, বঞ্চনা ও বৈষম্য বরং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নান্দনিক ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তির আলোকে আরও বেশি সৃজনশীল ও দ্রোহী হওয়ার শক্তি জোগাচ্ছে।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

আতিউর রহমান: হ্যাঁ। আমাদের গ্রন্থ সমালোচনার ঐতিহ্যটি দিন দিন দুর্বল হয়ে আসছে। আমাদের দৈনিকগুলোর সাহিত্য পাতা ছোট হয়ে গেছে। আগের মতো লেখালেখি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনাও তেমনটি দেখি না। 

আহসান হাবিব ও আবুল হাসনাতদের মতো সাহিত্য সম্পাদকদের এখন বড়ই অভাব। তবে তরুণ কয়েকজন সাহিত্য সম্পাদক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সাহিত্য পাতার হালটি ধরে আছেন। হতে পারে ডিজিটাল এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা তাল সামলে উঠতে পারছেন না। তবে তাদের অমূল্য সৃষ্টির গুণেই তারা চিরদিন গুরুত্বপূর্ণ থেকে যাবেন। সময় তাদের নিঃশেষ হতে দেবে না।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

আতিউর রহমান: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছাড়াও আমার মনে হয় শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ এবং নির্মলেন্দু গুণের মতো কালজয়ী কবিদের লেখা বিদেশি ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর তিনটি বই-ই সাহিত্য গুণে গুণান্বিত। 

এ বইগুলোও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

যুগান্তর: দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্তাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে।

আতিউর রহমান: অনেক কবি-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য আমি পেয়েছি। তাদের স্নেহ, ভালোবাসার কথা ভুলতেই পারি না। 

বিশেষ করে প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, শাসমুল হক, বেলাল চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, সনজিদা খাতুন, বন্ধু জাফর ইকবাল, সেলিনা হোসেন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ আরও অনেকের কথাই চলে আসে। 

তবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছি হায়াৎ মামুদের কাছ থেকে। কি নিষ্ঠার সঙ্গেই না তিনি আমার সম্পাদিত ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি গ্রন্থমালার সম্পাদনা করে দিয়েছেন তা বলে শেষ করতে পারব না। একইভাবে বৈরী সময় সত্ত্বেও তিনি ‘শেখ মুজিব’ বাংলাদেশের আরেক নাম’ গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন এবং ভূমিকা লিখে দিয়ে আমাকে চিরঋণী করে রেখেছেন। তার এ সহযোগিতা কিছুতেই ভোলার নয়। তিনি দীর্ঘজীবী হোন।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

আতিউর রহমান: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে- এক. হাসান আজিজুল হক; দুই. সেলিনা হোসেন; তিন. জাফর ইকবাল।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ ও একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ। 

আতিউর রহমান: অগ্রজ- হাসান আজিজুল হক ও অনুজ- মুস্তাফিজ শফি

যুগান্তর: এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

আতিউর রহমান: এক. শেখ মুজিবুর রহমান- ‘আমার দেখা নয়া চীন।’ দুই. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- ‘প্রথম আলো’
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন