কন্ঠালীর জীবন
jugantor
কন্ঠালীর জীবন

  কুলসুম কবির ঊর্মি  

১০ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩১:১৫  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রতীকী ছবি

চমৎকার মেধার অধিকারিণী সে। খেটে খাওয়া পরিবারে জন্ম তার। বাবা বদমাশ শ্রেনির লোক। সঙ্গে বদমেজাজী চরিত্র। মা বাসায়-বাসায় ঝি এর কাজ করেন। সে আরেক ইতিহাস।

দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেও রীতিমতো পাওনাটুকু জোটে না তার ভাগ্যে। নানা রকম জুলুম তো তাকে প্রতিনিয়তই সহ্য করতে হয়। কেবল পেটের দায়ে নয়; একমাত্র মেয়েকে সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার উদ্দেশ্যে। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেড়িয়ে উচ্চ-মাধ্যমিকে উঠেছে সে সবেমাত্র।

ঢাকা বোর্ডে ফার্স্ট হয়েই মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। সবার কাছে সে আইডিয়েল গার্ল নামে পরিচিত। তার ছিল না কোন চাওয়া-পাওয়া, কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা, কোন ন্যায়-অন্যায় আবদার। ছিল না কোন বিলাসিতা। রুগ্ন দেহ, হতশ্রী জামা-কাপড়, দুই রুমের ছোট্ট ঘরে বাস তাদের। কালবৈশাখী নয়; যেন হালকা ঝড়-হাওয়াতেই খুঁটি হেলে পড়বে। এমনই এক ঘর তাদের।

ঘরের আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে একটি পড়ার টেবিল, দুটি চৌকি এবং গুনে ধরা কাঠের আলনা। নারী দিবস, মাতৃভাষা দিবস ও মা দিবস, এসব দিবসে তাকে বেশ অনরকম লক্ষ্য করা যায়। আনন্দ আমেজে এক চাঞ্চল্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে সে তার চারিদিকে। কেবল ভ্যালেন্টাইন্স ডে-ই তার জীবনে অনুপস্থিত।

এক সুন্দরী তরুণী হওয়া সত্ত্বেও প্রেমলাভ করতে চায়নি সে কখনো, চায়নি প্রণয়যাচিকা হতে। তার ধ্যানে-জ্ঞানে শুধু একটাই ভাবনা তাকে বড় হতে হবে, কিছু করে দেখাতে হবে, নিজ পায়ে দাঁড়াতে হবে। এক দুপুরে ক্লান্ত হয়ে সে কলেজ থেকে বাসায় ফিরছিল। হঠাৎ মনে হলো কেউ পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। সে ফেইস দর্শনার্থে থুতনি উপরে তুলল এবং রীতিমতো বিব্রতবোধ করল।

থতমতভাবে বলল, আমি বাসায় যাচ্ছি। কাইন্ডলি, আমার পথ ছাড়ুন। অপরিচিত লোকটাকে পথ ছাড়ার কোনো ভাবাবেগ না দেখে, সে খানিকটা ভড়কে গেল। কথা শুনে তার মনে হলো হয়তো পাগল নয়তো এলাকার সেরা বখাটে। বুদ্ধিমতি মেয়েটি কৌশলে আপত্তিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করল।

দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর কেটে যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে এইচ,এস,সি পরিক্ষার ডেট ততই এগিয়ে আসছে। মেয়েটি খেটে পড়ছে দিনরাত এক করে। এক পর্যায়ে কন্ঠালীর মা বিরক্ত হয়ে আগুন গলায় বললেন, সারাদিনই বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে থাকলে চলবে?

খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস না-কি? ওসব কিছু লাগবে না? মায়ের থেকেও বিরক্ত গলায় মেয়ে বলল, যাও তো মা! বিরক্ত করো না। সামনে পরীক্ষা আমার। মন দিয়ে পড়তেও কি দিবে না? পালাক্রমে এক এক করে সব পরিক্ষার চিন্তা চুকে গেল। রেজাল্টের দিন সকাল থেকেই সে ঝিম মেরে বসে ছিলো।

খুব ভোরে নামাজ পড়তে উঠেছিল। শেষে যখন রেজাল্ট দিলো তখন তাদের আনন্দ আর দেখে কে! বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বোর্ডে ফার্স্ট হয়েছে সে। দেশের মধ্যে চতুর্থতম স্থানের অধিকারিণী। মা আবেগাপ্লুত হয়ে প্রায় কেঁদেই দিলেন।

শয্যাশায়ী বুড়ো বাবা বিছানা ছেড়ে উঠে মিষ্টি আনতে গেল। প্রচন্ড বারিশের দিনে বুড়ো সাহেব গায়ে জ্বর বাধিয়ে বসল। দিন তিনেক পর সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। বুড়ো সাহেব এখন প্রায় সুস্থ।

কন্ঠালী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল। কিন্তু এবার বালিকাটি কোথাও আনন্দের আমেজ দেখতে পেল না।

দেখতে পেল দুঃচিন্তার সুদীর্ঘ রেখা। মেয়ে বড় হয়েছে। বেশ বড় হয়ে গেছে। তাকে বিয়ে দিতে হবে। লোকমুখে কন্ঠালীর বাবার বিয়ের উদ্যেগের কথা শুনে ২-৩ বছর আগের সেই বখাটে অপরিচিত ছেলেটি হাজির।

বাবাও কোনো খোঁজ-খবর না নিয়ে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে দিলেন। কন্ঠালী অস্ফুটস্বরে কাঁদতে শুরু করল। কাঁপা গলায় বাবাকে বুঝানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালো। কিন্তু হায়! বাবা তার বুঝলেন না।

কন্ঠালীর জীবন

 কুলসুম কবির ঊর্মি 
১০ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৩১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

চমৎকার মেধার অধিকারিণী সে। খেটে খাওয়া পরিবারে জন্ম তার। বাবা বদমাশ শ্রেনির লোক। সঙ্গে বদমেজাজী চরিত্র। মা বাসায়-বাসায় ঝি এর কাজ করেন। সে আরেক ইতিহাস। 

দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেও রীতিমতো পাওনাটুকু জোটে না তার ভাগ্যে। নানা রকম জুলুম তো তাকে প্রতিনিয়তই সহ্য করতে হয়। কেবল পেটের দায়ে নয়; একমাত্র মেয়েকে সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার উদ্দেশ্যে। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেড়িয়ে উচ্চ-মাধ্যমিকে উঠেছে সে সবেমাত্র। 

ঢাকা বোর্ডে ফার্স্ট হয়েই মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। সবার কাছে সে আইডিয়েল গার্ল নামে পরিচিত। তার ছিল না কোন চাওয়া-পাওয়া, কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা, কোন ন্যায়-অন্যায় আবদার। ছিল না কোন বিলাসিতা। রুগ্ন দেহ, হতশ্রী জামা-কাপড়, দুই রুমের ছোট্ট ঘরে বাস তাদের। কালবৈশাখী নয়; যেন হালকা ঝড়-হাওয়াতেই খুঁটি হেলে পড়বে। এমনই এক ঘর তাদের। 

ঘরের আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে একটি পড়ার টেবিল, দুটি চৌকি এবং গুনে ধরা কাঠের আলনা। নারী দিবস, মাতৃভাষা দিবস ও মা দিবস, এসব দিবসে তাকে বেশ অনরকম লক্ষ্য করা যায়। আনন্দ আমেজে এক চাঞ্চল্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে সে তার চারিদিকে। কেবল ভ্যালেন্টাইন্স ডে-ই তার জীবনে অনুপস্থিত।  

এক সুন্দরী তরুণী হওয়া সত্ত্বেও প্রেমলাভ করতে চায়নি সে কখনো, চায়নি প্রণয়যাচিকা হতে।  তার ধ্যানে-জ্ঞানে শুধু একটাই ভাবনা তাকে বড় হতে হবে, কিছু করে দেখাতে হবে, নিজ পায়ে দাঁড়াতে হবে। এক দুপুরে ক্লান্ত হয়ে সে কলেজ থেকে বাসায় ফিরছিল। হঠাৎ মনে হলো কেউ পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। সে ফেইস দর্শনার্থে থুতনি উপরে তুলল এবং রীতিমতো বিব্রতবোধ করল। 

থতমতভাবে বলল, আমি বাসায় যাচ্ছি। কাইন্ডলি, আমার পথ ছাড়ুন। অপরিচিত লোকটাকে পথ ছাড়ার কোনো ভাবাবেগ না দেখে, সে খানিকটা ভড়কে গেল। কথা শুনে তার মনে হলো হয়তো পাগল নয়তো এলাকার সেরা বখাটে। বুদ্ধিমতি মেয়েটি কৌশলে আপত্তিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করল। 

দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর কেটে যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে এইচ,এস,সি পরিক্ষার ডেট ততই এগিয়ে আসছে। মেয়েটি খেটে পড়ছে দিনরাত এক করে। এক পর্যায়ে কন্ঠালীর মা বিরক্ত হয়ে আগুন গলায় বললেন, সারাদিনই বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে থাকলে চলবে? 

খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস না-কি? ওসব কিছু লাগবে না? মায়ের থেকেও বিরক্ত গলায় মেয়ে বলল, যাও তো মা! বিরক্ত করো না। সামনে পরীক্ষা আমার। মন দিয়ে পড়তেও কি দিবে না? পালাক্রমে এক এক করে সব পরিক্ষার চিন্তা চুকে গেল। রেজাল্টের দিন সকাল থেকেই সে ঝিম মেরে বসে ছিলো। 

খুব ভোরে নামাজ পড়তে উঠেছিল। শেষে যখন রেজাল্ট দিলো তখন তাদের আনন্দ আর দেখে কে! বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বোর্ডে ফার্স্ট হয়েছে সে। দেশের মধ্যে চতুর্থতম স্থানের অধিকারিণী। মা আবেগাপ্লুত হয়ে প্রায় কেঁদেই দিলেন। 

শয্যাশায়ী বুড়ো বাবা বিছানা ছেড়ে উঠে মিষ্টি আনতে গেল। প্রচন্ড বারিশের দিনে বুড়ো সাহেব গায়ে জ্বর বাধিয়ে বসল। দিন তিনেক পর সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। বুড়ো সাহেব এখন প্রায় সুস্থ। 

কন্ঠালী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল। কিন্তু এবার বালিকাটি কোথাও আনন্দের আমেজ দেখতে পেল না।

দেখতে পেল দুঃচিন্তার সুদীর্ঘ রেখা। মেয়ে বড় হয়েছে। বেশ বড় হয়ে গেছে। তাকে বিয়ে দিতে হবে। লোকমুখে কন্ঠালীর বাবার বিয়ের উদ্যেগের কথা শুনে ২-৩ বছর আগের সেই বখাটে অপরিচিত ছেলেটি হাজির। 

বাবাও কোনো খোঁজ-খবর না নিয়ে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে দিলেন। কন্ঠালী অস্ফুটস্বরে কাঁদতে শুরু করল। কাঁপা গলায় বাবাকে বুঝানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালো। কিন্তু হায়! বাবা তার বুঝলেন না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন