কবি ফররুখ আহমদ: আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর
jugantor
কবি ফররুখ আহমদ: আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর

  আবুল কাসেম হায়দার  

১৩ জুন ২০২১, ১৭:৫০:৫৫  |  অনলাইন সংস্করণ

কবি ফররুখ আহমদ: আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর

‘যেখানে উত্তাল স্রোতে দিশাহারা মত্ত এ নাবিক
সমুদ্রের ঘন বনে নাহি খুঁজে পায় তার দিক
শুধু দেখে বহু দূরে জোনাকির উজ্জ্বল প্রদীপ
জ্বলিয়া মাটির মেয়ে মরীচিকা তালে পরে টীপ,
যার লাগি প্রতি রগে জেগে উঠে টান
মৃত্তিকা সে নাবিকের প্রাণ।’

কবি ফররুখ আহমদ কথাগুলো তার গ্রন্থ ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’ সমগ্র শিরোনামে লিখেছেন। বইটি প্রকাশিত হয় নভেম্বর ১৯৭৬ সালে। ফররুখ আহমদ কেন্দ্রীয় স্মৃতি সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত। প্রকাশক ছিলেন বিখ্যাত সচিব, সাহিত্যিক মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।

কবি ফররুখ আহমদকে আমরা জানি একজন মুসলিম রেনেসার কবি হিসাবে। ১৯৭৪ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, তখন একবার কবিকে- দেখার জন্য তার সরকারি বাসভবন ইস্কাটনে গিয়েছিলাম। বাসায় গিয়ে কবিকে নিজ চোখে দেখে এসেছিলাম।

তখন তেমন বেশী কিছু কবি সম্পর্কে আমি জানতাম না। বন্ধুদের মুখে কবির সুবর্ণনা শোনে কবিকে দেখার ইচ্ছা হয়। তখন সবে মাত্র এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি। অবশ্য স্কুল জীবনে আমার কবিতা লেখার বেশ ঝোক ছিল। কবিতা ও লিখে ছিলাম।

চট্টগ্রামের আজাদী পত্রিকায় আমার বেশ কয়েকটি কবিতা ছাপা হয়। তবে প্রবন্ধ লিখে আমি স্কুল জীবনে বেশ পুরস্কৃত হয়েছি। একবার যখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার পক্ষ থেকে “সন্দ্বীপ উন্নয়ন সমস্যা ও সম্ভাবনা” শীর্ষক রচনা প্রতিযোগীতায় একমাত্র প্রথম পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলাম।

১৯৬৯ সালের কথা। নগদ পুরষ্কার পেয়েছিলাম। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আবুল খায়ের স্যার এই আনন্দে স্কুল ছুটি ঘোষণা করেন। সে কি আনন্দ। স্কুল জুড়ে আমার প্রশংসা। যাক সেই কথা। আজ আমাদের প্রিয় কবি ফররুখকে নিয়ে ভাবনা।

কবি ফররুখ আহমদ এর জীবনের কর্মময় সময়কে আমরা দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি। কবির সৃষ্টি কাব্য সাত সাগরের মাঝ, সিরাজাম মুনীরা, নৌফেল ও হাতেম প্রভৃতি কয়েকটি কাব্য প্রকাশের পূর্বেকার কর্মময় জীবন। আর দ্বিতীয় অধ্যায় হচ্ছে উল্লিখিত কাব্যগ্রন্থ রচনা থেকে পরবর্তী তার সাহিত্য চর্চা জীবন।

কবি ফররুখ আহমদ ১০ই জুন ১৯১৮ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯শে অক্টোবর ১৯৭৪ সাল। বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক কবি ফররুখ আহমদ। যদিও তাকে অনেকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসাবে বলে থাকেন।

কবি ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ভাষার উপর তার কবিতা আজও পাঠকে মোহিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবির অকুন্ঠ সমর্থন জাতিকে উদীপ্ত করে।

বাংলা ভাষার উপর কবিতায় কবি বলেন, কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক লেখক গবেষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কবির লেখা “হে বন্য স্বপ্নেরা” কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, “যে সব কারণে কোন কবির প্রাথমিক রচনা সঞ্চায়নযোগ্য বলে গণ্য হয় তার সবগুলিই এই কাব্যে বর্তমান।

প্রথমত: সেই কবিকে অবশ্যই একজন অসামান্য কবি হতে হবে। দ্বিতীয়ত: সেই কবিতাগুলির একটা স্বকীয় মূল্য থাকতে হবে। এবং তৃতীয়ত: ঐ কবির পরিণত রচনার সাথে এসব কবিতার একটা যোগসূত্র থাকতে হবে।

আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, মাইকেল যদি মহাভারত, রামায়ণ নিয়ে তার কাব্য রচনার মূল বিষয় নির্ধারণ করতে পারেন, তবে ফররুখ কেন আলিফ লায়লা, হাতেম তাই বা মুসলিম সাহিত্যের গভীর বিষয় নির্ধারণ করতে পারবেন না!

সমালোচকদের এক কেন্দ্রীক চিন্তা এখানে যুক্তিতে মোটেই টিকে না। প্রথম দিকে কবি ফররুখ বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তিনি মুসলিম রেনেসাঁর সমর্থক হয়ে পড়েন।

ফররুখ তার লেখনিতে ‘মুহূর্তের কবিতায়’ বলেন,

‘যখন শুনেছি আমি মৃত্যু আছে সূর্যেরও সমান
অগণন জ্যোতিষ্কের ভাগ্যলিপি মৃত্যু দিয়ে ঘেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ আকাশ রহস্যের ডেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ জীবন ক্ষণিকের গান।’

কবি নজরুলের যখন সাহিত্য জীবনের সমাপ্তি তখন কবি ফররুখের আগমন। নজরুল এসেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়।

ফররুখ এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, পাকিস্তান আন্দোলন ও দুর্ভিক্ষের করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে।

আল্লামা ইকবালের ভাবশিষ্য নিজ জাতির সমস্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে ফররুখ আমাদের দেখিয়ে তার লেখনির মাধ্যমে বলেছিলেন,
‘হে মাঝি এবার তুমিও পেয়ো না ভয়
তুমিও কুড়াও হেরার পথিক তারকার বিস্ময়
ঝরুক এ ঝড়ে নারঙ্গী পাতা তবু পাতা অগণন
ভিড় করে সেথা জাগছে আকাশে হেরার রাজতোরণ।’

কবি ফররুখ ছিলেন সাম্যের কবি, দরিদ্রের কবি নিপীড়িত মানবতার কবি। স্বধর্ম আর স্বজাতির প্রতি ভালবাসা কবিকে কখনও বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনায় বিরত করেনি।

সাম্যবাদ কিংবা গণতন্ত্রেও চরম উদ্দেশ্য সামাজিক শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে কবিকে বিরত করেনি। ফররুখ কবি জীবনে নিঃশ্বাসের মধ্যে সমস্যার মূল সমাধান খুজে পেয়েছিলেন।

তাই তার কলম ও কন্ঠে বার বার অভাব, অভিযোগ, অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়েছে। বিশ্ব মানবতার কন্ঠে কবি কন্ঠ বলে উঠে-
“লোহুতে পার্থক্য নাই বণি আদমের
শিরায় শিরায় আর ধমনীতে দেখি বহমান
এক রক্ত ধারা।”

ফররুখ ছিলেন অতি উঁচু মাপের আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা ফররুখের কবিতায় দৃশ্যমান।

কবি হাসান হাফিজুর রহমান ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’ বই ১৯৯৩ সালে কবি সম্পর্কে বলেন, “ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তোলণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তার কাব্যভাষা এবং অঙ্গিকের প্রয়োগে।”

চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারে ফররুখ ছিলেন অনন্য। তাই কবির ভাষায়-
“রাত্রির অগাধ বনে ঘোরে একা আদম-সুরত
তীব্রতর দৃষ্টি মেলে তাকায় পৃথিবী
জাগো জনতার আত্মা ওঠো। কথা কও।
কতোকাল আর তুমি ঘুমাবে নিসাড় নিস্পন্দ।”

কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, আইয়ুব শহীর বিরুদ্ধের গণআন্দোলন প্রভৃতি সকল স্তরে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তার লেখনি আমাদের সেই সময় অনেক বেশী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের সকল সম্মান পেয়েছেন। একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পদক, স্বাধীনতা পদক, আমজীপদ, ইউনেস্কো পদক সহ সকল মর্যাদাবান সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন।

কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী তার লেখনির মাধ্যমে যে তরুণ সমাজ সৃষ্টি করতে চেয়ে ছিলেন তাতে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি তখন আর সমাজের সঙ্গে কেন যেন মিলিয়ে বলে নিজকে ধরে রাখতে হোঁচট খেয়েছেন।

অর্থনৈতিক দৈন্যতা সকল কবি, সাহিত্যিকদের জীবনে থাকে। নজরুলের সবচেয়ে বেশী ছিল। কবি ফররুখও জীবনের শেষ অভাবের তীব্রতা বেশ অনুভব করেছিলেন।

কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্ম মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, শির উঁচু করে পুরো জীবন কাটিয়েছেন। তখনকার সরকার ও সাহিত্যমোদী ব্যক্তিগণ ও তেমন কবিকে সহযোগীতা করে নাই।

তবুও কবি আমাদের প্রিয়, তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে অমর। কালজয়ী। আমাদের ভবিষ্যত গড়ার অনুপ্রেরণার বাতিঘর।

লেখক: শিক্ষানুরাগী ও শিল্প উদ্যোক্তা

কবি ফররুখ আহমদ: আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর

 আবুল কাসেম হায়দার 
১৩ জুন ২০২১, ০৫:৫০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
কবি ফররুখ আহমদ: আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর
ছবি: সংগৃহীত

‘যেখানে উত্তাল স্রোতে দিশাহারা মত্ত এ নাবিক
সমুদ্রের ঘন বনে নাহি খুঁজে পায় তার দিক 
শুধু দেখে বহু দূরে জোনাকির উজ্জ্বল প্রদীপ
জ্বলিয়া মাটির মেয়ে মরীচিকা তালে পরে টীপ,
যার লাগি প্রতি রগে জেগে উঠে টান
মৃত্তিকা সে নাবিকের প্রাণ।’

কবি ফররুখ আহমদ কথাগুলো তার গ্রন্থ ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’ সমগ্র শিরোনামে লিখেছেন। বইটি প্রকাশিত হয় নভেম্বর ১৯৭৬ সালে।  ফররুখ আহমদ কেন্দ্রীয় স্মৃতি সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত। প্রকাশক ছিলেন বিখ্যাত সচিব, সাহিত্যিক মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। 

কবি ফররুখ আহমদকে আমরা জানি একজন মুসলিম রেনেসার কবি হিসাবে। ১৯৭৪ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, তখন একবার কবিকে- দেখার জন্য তার সরকারি বাসভবন ইস্কাটনে গিয়েছিলাম। বাসায় গিয়ে কবিকে নিজ চোখে দেখে এসেছিলাম। 

তখন তেমন বেশী কিছু কবি সম্পর্কে আমি জানতাম না। বন্ধুদের মুখে কবির সুবর্ণনা শোনে কবিকে দেখার ইচ্ছা হয়। তখন সবে মাত্র এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি। অবশ্য স্কুল জীবনে আমার কবিতা লেখার বেশ ঝোক ছিল। কবিতা ও লিখে ছিলাম। 

চট্টগ্রামের আজাদী পত্রিকায় আমার বেশ কয়েকটি কবিতা ছাপা হয়। তবে প্রবন্ধ লিখে আমি স্কুল জীবনে বেশ পুরস্কৃত হয়েছি। একবার যখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার পক্ষ থেকে “সন্দ্বীপ উন্নয়ন সমস্যা ও সম্ভাবনা” শীর্ষক রচনা প্রতিযোগীতায় একমাত্র প্রথম পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলাম। 

১৯৬৯ সালের কথা। নগদ পুরষ্কার পেয়েছিলাম। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আবুল খায়ের স্যার এই আনন্দে স্কুল ছুটি ঘোষণা করেন। সে কি আনন্দ। স্কুল জুড়ে আমার প্রশংসা। যাক সেই কথা। আজ আমাদের প্রিয় কবি ফররুখকে নিয়ে ভাবনা। 

কবি ফররুখ আহমদ এর জীবনের কর্মময় সময়কে আমরা দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি। কবির সৃষ্টি কাব্য সাত সাগরের মাঝ, সিরাজাম মুনীরা, নৌফেল ও হাতেম প্রভৃতি কয়েকটি কাব্য প্রকাশের পূর্বেকার কর্মময় জীবন। আর দ্বিতীয় অধ্যায় হচ্ছে উল্লিখিত কাব্যগ্রন্থ রচনা থেকে পরবর্তী তার সাহিত্য চর্চা জীবন। 

কবি ফররুখ আহমদ ১০ই জুন ১৯১৮ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯শে অক্টোবর ১৯৭৪ সাল। বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক কবি ফররুখ আহমদ। যদিও তাকে অনেকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসাবে বলে থাকেন। 

কবি ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ভাষার উপর তার কবিতা আজও পাঠকে মোহিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবির অকুন্ঠ সমর্থন জাতিকে উদীপ্ত করে। 

বাংলা ভাষার উপর কবিতায় কবি বলেন, কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক লেখক গবেষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কবির লেখা “হে বন্য স্বপ্নেরা” কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, “যে সব কারণে কোন কবির প্রাথমিক রচনা সঞ্চায়নযোগ্য বলে গণ্য হয় তার সবগুলিই এই কাব্যে বর্তমান। 

প্রথমত: সেই কবিকে অবশ্যই একজন অসামান্য কবি হতে হবে। দ্বিতীয়ত: সেই কবিতাগুলির একটা স্বকীয় মূল্য থাকতে হবে। এবং তৃতীয়ত: ঐ কবির পরিণত রচনার সাথে এসব কবিতার একটা যোগসূত্র থাকতে হবে। 

আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, মাইকেল যদি মহাভারত, রামায়ণ নিয়ে তার কাব্য রচনার মূল বিষয় নির্ধারণ করতে পারেন, তবে ফররুখ কেন আলিফ লায়লা, হাতেম তাই বা মুসলিম সাহিত্যের গভীর বিষয় নির্ধারণ করতে পারবেন না! 

সমালোচকদের এক কেন্দ্রীক চিন্তা এখানে যুক্তিতে মোটেই টিকে না। প্রথম দিকে কবি ফররুখ বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তিনি মুসলিম রেনেসাঁর সমর্থক হয়ে পড়েন। 

ফররুখ তার লেখনিতে ‘মুহূর্তের কবিতায়’ বলেন, 

‘যখন শুনেছি আমি মৃত্যু আছে সূর্যেরও সমান 
অগণন জ্যোতিষ্কের ভাগ্যলিপি মৃত্যু দিয়ে ঘেরা, 
তখনি হয়েছে মনে এ আকাশ রহস্যের ডেরা, 
তখনি হয়েছে মনে এ জীবন ক্ষণিকের গান।’

কবি নজরুলের যখন সাহিত্য জীবনের সমাপ্তি তখন কবি ফররুখের আগমন। নজরুল এসেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়। 

ফররুখ এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, পাকিস্তান আন্দোলন ও দুর্ভিক্ষের করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে। 

আল্লামা ইকবালের ভাবশিষ্য নিজ জাতির সমস্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে ফররুখ আমাদের দেখিয়ে তার লেখনির মাধ্যমে বলেছিলেন, 
‘হে মাঝি এবার তুমিও পেয়ো না ভয় 
তুমিও কুড়াও হেরার পথিক তারকার বিস্ময় 
ঝরুক এ ঝড়ে নারঙ্গী পাতা তবু পাতা অগণন 
ভিড় করে সেথা জাগছে আকাশে হেরার রাজতোরণ।’

কবি ফররুখ ছিলেন সাম্যের কবি, দরিদ্রের কবি নিপীড়িত মানবতার কবি। স্বধর্ম আর স্বজাতির প্রতি ভালবাসা কবিকে কখনও বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনায় বিরত করেনি। 

সাম্যবাদ কিংবা গণতন্ত্রেও চরম উদ্দেশ্য সামাজিক শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে কবিকে বিরত করেনি। ফররুখ কবি জীবনে নিঃশ্বাসের মধ্যে সমস্যার মূল সমাধান খুজে পেয়েছিলেন। 

তাই তার কলম ও কন্ঠে বার বার অভাব, অভিযোগ, অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়েছে। বিশ্ব মানবতার কন্ঠে কবি কন্ঠ বলে উঠে-
“লোহুতে পার্থক্য নাই বণি আদমের 
শিরায় শিরায় আর ধমনীতে দেখি বহমান 
এক রক্ত ধারা।” 

ফররুখ ছিলেন অতি উঁচু মাপের আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা ফররুখের কবিতায় দৃশ্যমান। 

কবি হাসান হাফিজুর রহমান ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’ বই ১৯৯৩ সালে কবি সম্পর্কে বলেন, “ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তোলণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তার কাব্যভাষা এবং অঙ্গিকের প্রয়োগে।”

চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারে ফররুখ ছিলেন অনন্য। তাই কবির ভাষায়-
“রাত্রির অগাধ বনে ঘোরে একা আদম-সুরত 
তীব্রতর দৃষ্টি মেলে তাকায় পৃথিবী 
জাগো জনতার আত্মা ওঠো। কথা কও। 
কতোকাল আর তুমি ঘুমাবে নিসাড় নিস্পন্দ।” 

কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, আইয়ুব শহীর বিরুদ্ধের গণআন্দোলন প্রভৃতি সকল স্তরে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তার লেখনি আমাদের সেই সময় অনেক বেশী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। 

কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের সকল সম্মান পেয়েছেন। একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পদক, স্বাধীনতা পদক, আমজীপদ, ইউনেস্কো পদক সহ সকল মর্যাদাবান সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন। 

কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী তার লেখনির মাধ্যমে যে তরুণ সমাজ সৃষ্টি করতে চেয়ে ছিলেন তাতে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি তখন আর সমাজের সঙ্গে কেন যেন মিলিয়ে বলে নিজকে ধরে রাখতে হোঁচট খেয়েছেন। 

অর্থনৈতিক দৈন্যতা সকল কবি, সাহিত্যিকদের জীবনে থাকে। নজরুলের সবচেয়ে বেশী ছিল। কবি ফররুখও জীবনের শেষ অভাবের তীব্রতা বেশ অনুভব করেছিলেন। 

কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্ম মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, শির উঁচু করে পুরো জীবন কাটিয়েছেন। তখনকার সরকার ও সাহিত্যমোদী ব্যক্তিগণ ও তেমন কবিকে সহযোগীতা করে নাই। 

তবুও কবি আমাদের প্রিয়, তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে অমর। কালজয়ী। আমাদের ভবিষ্যত গড়ার অনুপ্রেরণার বাতিঘর। 

লেখক: শিক্ষানুরাগী ও শিল্প উদ্যোক্তা
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন