মোহাম্মাদ জাকারিয়ার ‘দূরবীন চোখ’ পাঠ প্রতিক্রিয়া

  হাসনাত কাদীর ০৬ মে ২০১৮, ১৭:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

মোহাম্মাদ জাকারিয়ার ‘দূরবীন চোখ’ পাঠ প্রতিক্রিয়া

মোহাম্মাদ জাকারিয়া তাঁর দূরবীন চোখে জীবনকে দেখেন সহজিয়া লেন্সে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দূরবীন চোখ’ পড়ে আমার এরকমই বোধ হয়েছে। তরুণ এই কথাশিল্পী প্রথমত একজন চলচ্চিত্রকার।

তিনি ইতিমধ্যে তাঁর নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব লেন্সে কয়েকটি ছোট ছবি বানিয়ে নব-বাংলা-চলচ্চিত্রাঙ্গনে নিজের উজ্জ্বল উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। সেই সূত্রে সাহিত্যিক হিসেবে জানার আগে তাকে আমি সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্রকার হিসেবে চিনি।

এবার তাঁর গল্প পড়ে বোঝা গেল শিল্পী যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন তাঁর শিল্পকর্মটি কেমনতর হবে তা নির্ভর করে তাঁর জীবনবোধ ও দর্শনের উপর।

জাকারিয়ার যেহেতু একটি নিজস্ব সহজিয়া লেন্স আছে, আর তাঁর যেহেতু আছে নিজস্ব দূরবীন চোখ তাই তাঁর গল্পে দূরের জিনিসও ধরা দিয়েছে কাছের বিষয় হয়ে। সহজ ঢঙে উঠে এসেছে মানুষ ও জীবন।

সেই মানুষদের একজন সেকেন্ড হ্যান্ড মালের ব্যবসায়ী জামিল হোসেন। তার সুন্দরী বউ সামাদের সাথে ভেগে গেলে সে আপন মনে হেসে হেসে বলে, ''শালা সামাইদ্যা তুই আমার বউরে বিয়া করছোস। তুই সেকেন্ড হ্যান্ড বউ বিয়া করছোস।''

তারপরই তাঁর নীলুফাকে মনে পড়ে। নীলুফা ডিভোর্সী, এক বাচ্চার মা। কিন্তু জামিলের সাথে বড় রঙ করে কথা কয়। মোবাইলে সুখ-দুঃখের আলাপকালে জামিলের বুকে নিজের বুকখানা খুলে দেয়।

জামিল সেই বুকের দুঃখগুলোতে ক্ষতনাশক প্রলেপ দিতে দিতে স্বপ্ন দেখছে, নীলুফাকে নিয়ে আবার ঘর বাঁধবে। নীলুফাকে মনে পড়তেই প্রায় অশিক্ষিত জামিল উন্নীত হয় এক দার্শনিক বোধে।

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে টোকা মেরে ফিল্টারটা ফেলে বলে, ''না, এ আমি কী কইলাম? ময়মনা সেকেন্ড হ্যান্ড হইলে নীলুফাও তো সেকেন্ড হ্যান্ড!... নীলুফার আগে বিয়া হইছিল বলে নীলুফা কি বাতিল বা অচল হইয়া গেছে? তামাম দুনিয়ার সব কিছু সেকেন্ড হ্যান্ড হইতে পারে কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ কখনো সেকেন্ড হ্যান্ড হইতে পারে না।''

জামিল হোসেনের এই বোধের ভিতর দিয়ে গল্পকার জাকারিয়া আসলে এই 'ব্রেকাপের' যুগে, 'ডিভোর্স কালচারের' 'সেকেন্ডহ্যান্ড মানসিক রোগের' এক মোক্ষম দাওয়াই বাতলে দিলেন। এমন দাওয়াই, মনযোগী পাঠকের জন্য যা 'এক গল্পই' যথেষ্ট।

'দূরবীন চোখ' বইতে গল্প আছে এগারোটি। কোনটির সাথে কোনটির তুলনা চলে না। প্রতিটি গল্প নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। তেমনি সমুজ্জ্বল এক গল্পের নাম 'তুলনা'।

হেলেনের বয়স বেড়ে চলেছে। কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। বরপক্ষ হেলেনকে দেখতে এসে পছন্দ করে যায় ছোট বোন হেমাকে। পরেরবার হেমাকে লুকিয়ে রাখলে পছন্দ করে যায় বান্ধবী মনিকাকে।

এভাবেই যাচ্ছিলো। কিন্তু এইবার হেমা এক অদ্ভূত কাজ করলো। বড় আপুকে দেখতে আসার দিনে সে হাজির হল সিনেমার এক মার্কেট হারানো মেকাপ আর্টিস্টের কাছে।

মেকাপ আর্টিস্টকে সব বলে হেলেনের ছবি দেখায় হেমা। মেকাপ আর্টিস্ট বলেন, ছবি লাগবে না। হেমা বলে, ''নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আমি কেন এত সুন্দরী হলাম...। আংকেল, আপনি আমাকে এমনভাবে মেকাপ করে দেবেন যাতে আমার চেয়ে আমার বোনকে বেশি সুন্দরী দেখায়।''

'সেদিন দিবাগত রাতেই হেলেনের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পরদিন হেমা বাড়ি ছেড়ে নানার বাড়ি চলে যায়। কৃত্রিম মেকআপ তো সারা জীবনের জন্য না। বড়জোড় দু'দিন মুখে থাকে। বিয়ের পর নিজের বউয়ের তুলনায় অপরূপা সুন্দরী শালী দেখলে নিজের বউয়ের প্রতি নজর কমে যেতে পারে।

যদিও আশরাফ (দুলাভাই) সে ধরনের ছেলে নয়। তবুও হেমার মনে অনুশোচনা- সে যা করেছে তা তো একপ্রকার ধোঁকাবাজি।... নানার গ্রামের লন্ডল প্রবাসী যুবকের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেলে কিছু দিনের মধ্যেই হেমার বিয়ে হয়।'

তারপর হেমা স্বামীর সাথে লন্ডনে থিতু হয়। পাঁচ বছর পর যখন হেমা দেশে আসে তখন সে এক ছেলের মা। হেলেনের ঘরেও চার বছরের এক ফুটফুটে মেয়ে।

এই প্রথম হেমাকে মেকআপ ছাড়া দেখে দুলাভাই আশরাফ। তারপর রাতে হেলেনার দিকে পাশ ফিরে বলে, 'মানুষ বিদেশ গেলে কত চেঞ্জ হয়ে যায়, তাই না হেলেনা?'

হেলেনা পাশ ফিরে তাকায় না। কেবল অস্পষ্ট উচ্চারণে বলতে পারে, 'হুম'। এরপর 'বর্ষার নতুন পানির স্রোতের মতো দু'ফোঁটা অশ্রু হেলেনার শিথানের বালিশ ভিজিয়ে দিল।' সেই অশ্রুতে লেখক জাকারিয়া ভিজিয়ে দেবেন পাঠক আপনাকেও।

'দূরবীন চোখ'-এর তৃতীয় গল্প 'রিভার্স'। মাত্র আড়াই পৃষ্ঠার গল্প পড়ে পাঠক নড়েচড়ে বসে ভাববেন- আসলেই তো, মানুষ মাত্রই মুখোশ এঁটে ঘোরে। তাই কারো বাহিরটা দেখে তাকে বিচার করা চলে না।

'দরজা-জানালা ও ভালোবাসার গল্প'তে লেখক লেখেন, অধিকাংশ বাড়ির বিছানার চাদর ফুলের ছাপযুক্ত হয় কেন? গাছের ছাপ, মাছের ছাপও তো থাকতে পারে? 'লাইফ ইজ নট আ বেড অব রোজেস' এই নির্মম সত্য থেকে সাময়িক মানসিক শান্তি লাভের জন্য?

নাকি নির্মম সত্যটাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিছানাকে পুষ্পশয্যা বানিয়ে আরামসে ঘুমাতে চায় মানুষ?' গল্পের শেষে লেখক মনে করিয়ে দেন যে, প্রকৃত ভালোবাসা জনালাবন্ধ ছোট্ট বাসাতেও আনন্দে থাকে। ভেন্টিলেটর দিয়ে আসা সামান্য আশার আলোতেই হয়ে থাকে উজ্জ্বল।

'আয়না-১' গল্পে লেখক সেই চিরন্তন সত্যটি মনে করিয়ে দেন- আমি কেউ না।নো বডি।

'আয়না-২' গল্পে 'ছাবির ভয়ে অস্থির হয়ে ওঠে। ঘামে তাঁর শরীর ভিজে যাচ্ছে। ওই তো আয়নায় দেখা যাচ্ছে- ছাবিরের সামনে দাঁড়িয়ে পারভীন কেঁদে কেঁদে বলছে; ছাবির, আমি গর্ভবতী। আমার গর্ভে এ সন্তান তোমার। ... তুমি আমাকে বিয়ে করে স্বীকৃতি দাও।

ছাবিরের দুই পা জরিয়ে ধরেছে পারভীন। ...পারভীনকে এক লাথি মেরে হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছে ছাবির।'

কিন্তু মোহাম্মাদ জাকারিয়া তো ছাবিরকে এভাবে যেতে দিতে পারেন না। তাই ছাবির যখন নিজের দিকে তাকায় তখন তার পাপ তার চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। নিজের সামনে দাঁড়ানোর স্পৃহা সে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলে।

'সাদা ভাত' গল্পে আপনার উপলব্ধি হবে- ঘৃণা করে দূরে সরে আসাই শেষ কথা নয়। আপনজনের মুখে ভাত তুলে দেয়ার দায়িত্বও নিতে হয়। কিন্তু এই ভাতের জন্যই তো পৃথিবীর সব অশুচি, নোংরা, ঘৃণিত কার্য। পৃথিবীর সব পাপ। গল্পের শেষ দৃশ্যে তাই ভাত বিক্রেতা বালকটি ভাতের গন্ধে বমি করে দেয় পৃথিবীর গায়ে।

কিন্তু ভাতের গন্ধে বমি করে দেয়াও তো শেষ কথা নয়। জাকারিয়া তাই লিখলেন 'হোটেল সমাচার'। সেখানে নিঃসন্তান ছবুরা খালা কয়েকজন তরুণের মুখে ভাত তুলে দিয়ে শান্তি পান। উদায়স্ত পরিশ্রম করেন।

রাতের খাবার খেয়ে তরুণেরা যখন হোটেল থেকে বের হয় তখন হোটেল মালিক সবুরা খালা সামনের রাস্তা ঝাড়ু দেয়ার উছিলায় যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায় তরুণদের দিকে চেয়ে থাকেন।

'জনম জনম' গল্পে জাকারিয়া লিখলেন, 'রাত যত গভীরই হোক না কেন, মধ্যবিত্ত মায়েদের চোখ বন্ধ হয় না।হয় জেগে জেগে ঘুমায় না হয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জেগে থাকে।' গল্পের শেষে বহুদূরাবাদ এক্সপ্রেস যখন ঘনঘন হুইসেল বাজাতে থাকে পাঠকের তখন মনে পড়ে যাবে এই দুনিয়ায় আমরা সবাই ক'দিনের অতিথি মাত্র। সময় এসে যাচ্ছে চলে যাওয়ার।

বইয়ের 'দূরবীন চোখ' শিরোনামের গল্পটি সম্পর্কে আমি শুধু বলতে পারি, গল্পটি আপনাকে পড়তে হবে। পড়তে হবে যদি আপনি জানতে চান, তৃতীয় চক্ষুধারীদেরকে এ-সমাজ কেমন করে দেখে? কেমন করে তাকায় তাদের চোখে?'

মানুষের জীবন বৃষ্টির ফোঁটার মতো। মাটিতে মিশে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।' কী কাব্যিকতায় ভরা দর্শন!আর কেনই বা শেষ দৃশ্যে অন্ধ দীপুর পাশে দূরবীনটা ফেলে রাখেন লেখক মোহাম্মাদ জাকারিয়া?গল্পটা যেখানে শেষ হয়েছে তাতে মনে হয় লেখক দ্বিতীয় কিস্তি আমাদেরকে উপহার দেবেন।

'দূরবীন চোখ' গ্রন্থে সবই কি নিখুঁত দূরবীনে তুলে আনা চিত্র? সবই কি শুধুই ভালো? এই প্রশ্নের উত্তরে একবাক্যে 'হ্যা' বলা যায় না। গ্রন্থের অনেক অংশেই বাক্য বিন্যাসে পাঠক হিসেবে আমি 'মেদ' অনুভব করেছি।

যেমন 'ডাঙার মাছ' গল্পের গদ্য আরও স্মার্ট হতে পারতো। তাতে 'ডাঙার মাছ' আরও সুস্বাদু হত। যেমন- গল্পের একস্থানে 'তাহের উদ্দিন স্বপ্ন দেখা শেষে ঘুম ভেঙে গেলে ধড়ফড়িয়ে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে ওঠে'।

লেখক আরেকটু সচেতন হলে বাক্যটি আরও স্মার্ট হতে পারতো। আরও কম শব্দে প্রাঞ্জল ভাবে ভাব ব্যক্ত হত তখন। তাতে পাঠক হিসেবে আমার মতো অনেককেই গল্পটি আরও সহজে ছুঁয়ে যেত। এছাড়া কোথাও কোথাও যুক্তির শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয়। যুক্তির অভাব নয়।

বলছি যুক্তি স্পষ্ট করতে কৃপণতা করতে দেখা যায় লেখককে। ইজ্জত আলীর ঘরের মধ্যে অবৈধ মাল। গল্পের শেষে পুলিশের কাছে তা ধরা পড়ে। গল্পের শুরুতেই দেখা যায় ইজ্জতের গ্রামে কয়েকদিন হল পুলিশ টহল দিচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে,পুলিশ এরকম একজন দু'নম্বরী কারবারীকে টহল দিয়ে কেন খুঁজবে? গোয়েন্দা পুলিশরা তখন নাক ডেকে কোথায় ঘুমায় লেখক সে যুক্তি খন্ডনে সচেষ্ট হন না। আর ইজ্জত কেন অতিরিক্ত সচেতনতা অবলম্বন করলো না সে ব্যাপারেও লেখককে বেশ অসচেতন মনে হয়।

কিন্তু তা হলেও দিন শেষে জাকারিয়া সমাজের কালো মানুষের অন্ধকার পরিণতির গল্পটা ঠিকই বলতে পারেন। তার মতো করে, নিজস্ব ফ্রেমে, নিজস্ব লেন্সে। এখানেই লেখকের সম্ভাবনা। এখানেই তাঁর উজ্জ্বলতা।

তরুণ এই লেখক ও চলচ্চিত্রকার যে, দিন-শেষে স্বমহিমায় আরও উজ্জ্বল হবেন তা-ই দেখালেন তিনি 'দূরবীন চোখ' দিয়ে। দিন শেষে তিনি ঝরে যাবেন না, টিকে রইবেন, থেকে যাবেন নিজস্ব আসন পেতে।

এ কথা হলফ করেই বলা যাবে আজ। কারণ, তরুণ লেখক ও চলচ্চিত্রকার মোহাম্মাদ জাকারিয়া তাঁর দূরবীন চোখে জীবনকে দেখেন সহজিয়া লেন্সে।

লেখক: হাসনাত কাদীর, লেখক ও চলচ্চিত্রকার

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.