শিল্প সাহিত্যে মেহেরপুর
jugantor
মেহেরপুর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন
শিল্প সাহিত্যে মেহেরপুর

  আবদুল্লাহ আল-আমিন  

১৭ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  অনলাইন সংস্করণ

জোতিন্দ্রনাথ

বৈদ্যনাথতলা মেহেরপুরের এক প্রাচীন গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে এ গ্রামের এক ছায়াঢাকা, মায়াময় আম্রকানন সমগ্র বাঙালিকে দেখিয়েছিল মুক্তির পথ, স্বাধীনতার পথ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে আমবাগানটির বর্ণনা আছে। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগর (পূর্বনাম বৈদ্যনাথতলা) আম্রকাননের ছায়াঘন শ্যামলিমার নিচে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথগ্রহণ করে। নবাব আলিবর্দির আমল থেকে মেহেরপুর একটি প্রসিদ্ধ জনপদ, তখন থেকে এখানে শিল্প সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটে। ঊনিশ শতকের পঞ্চাশ দশকে নদীয়া জেলার একটি মহকুমা হিসাবে প্রশাসনিক স্বীকৃতি লাভের পর মেহেরপুরের নামডাক অবিভক্ত বঙ্গদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কালের উতল হাওয়ায় ‘মেহেরপুর’ নামক বর্ধিষ্ণু গ্রামটির গায়ে লাগে শহুরে ছোঁয়া। বিলেত থেকে আসতে থাকেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত রমেশচন্দ্র দত্ত, জে ডি এন্ডারসন, এফ এ শ্ল্যাক, পি জি মেলিটসের মতো ডাকসাইটে সিভিলিয়ানরা। রমেশচন্দ্র দত্ত মেহেরপুরে হাকিমি করতে এসে রচনা করেন ‘মাধবীকঙ্কণ’ (১৮৬৮-৬৯) উপন্যাস। ‘ইন্দ্র সেন’ নামে পরিচিত জে ডি এন্ডারসন ছিলেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী, সিভিল সার্ভিসের ত্যাগ করে অক্সফোর্ডে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) জন্ম নদীয়ার কৃষ্ণনগরে, কিন্তু যৌবন কেটেছে মেহেরপুরে। তার বড় ভাই রাজেন্দ্রলাল মেহেরপুরে চাকরি করতেন। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিক যতীন্দ্রমোহন বাগচীর (১৮৭৮-১৯৪৮) জন্ম নদীয়া জেলার মেহেরপুরের জামশেরপুর গ্রামের (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বাগচী জামশেরপুর) জমিদার পরিবারে। ‘কাজলা দিদি’ ও ‘অন্ধবধূ’ কবিতার জন্য খ্যাত এই শক্তিমান কবি তার কবিতায় পল্লিপ্রকৃতির সৌন্দর্য ও পল্লিজীবনের সুখ-দুঃখ, ভাগ্যবিড়ম্বিত বাঙালি নারীদের কথা গভীর মমতায় প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নে-জামাই সুকুমার হালদার মেহেরপুরের হাকিম ছিলেন, তার মাধ্যমে মেহেরপুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছিল। উনিশ শতকের মেহেরপুরে মুখার্জি ও মল্লিক বংশের জমিদারদের ছিল প্রবল-প্রতাপ। মুখার্জি বংশের জমিদারদের মধ্যে মথুরানাথ মুখোপাধ্যায় ও দীননাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রজাবৎসল, সাহিত্য ও সংগীতানুরাগী। জাঁকজমকের সঙ্গে তারা দুর্গোৎসব উদযাপন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বারোয়ারিতলায় বসত যাত্রা ও কবিগানের আসর। মুখার্জি জমিদাররা যাত্রা, থিয়েটার, কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি শৌখিন যাত্রাদল। মুখার্জি জমিদারের মতো মল্লিক জমিদারদেরও প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। তারাও শিল্প-সহিত্য, গান বাজনার সবিশেষ অনুরাগী ছিলেন। মল্লিক পরিবারের রমনীমোহন মল্লিক ছিলেন বৈষ্ণব সাহিত্যে পণ্ডিত। ‘চণ্ডীদাস’, ‘জ্ঞানদাস’, ‘বলরাম দাস’ প্রভৃতি গ্রন্থ তিনি টিকাসহ সম্পাদনা করেন। জমিদার শ্রীকৃষ্ণ মল্লিক ছিলেন আমোদপ্রিয় ব্যক্তি। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়পুকুর প্রাঙ্গণে মহাসমারোহে বসত বাসন্তী মেলা। মেলাপ্রাঙ্গণের মণ্ডপ সাজাতে আসত কৃষ্ণনগরের খ্যাতিমান শিল্পীরা। কলকাতা থেকে আসত থিয়েটারের দল; মঞ্চস্থ হতো বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র মতো কালজয়ী উপন্যাসের নাট্যরূপ। দীনেন্দ্রকুমার রায় ‘সেকালের স্মৃতি’ (১৩৯৫) গ্রন্থে মেহেরপুর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেকালে বারোয়ারিতলায় যেমন যাত্রাগান হইত। তেমনি কবিগানও হইত। কবিদলের লড়াই সাহিত্য হিসাবেও উপভোগ্য ছিল।’ এন্টনি ফিরিঙ্গি, রাসুনৃসিংহ, দাশরথি রায়ের কবিগান মেহেরপুরের লোকসমাজে জনপ্রিয় ছিল। সে সময় বছরজুড়ে মেহেরপুরের গ্রামে গ্রামে নানা ধরনের লোকউৎসব লেগে থাকত। কিন্তু কালের ঝড়ো-হাওয়ায় ওলট-পালট ও দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে মেহেরপুরের শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস। ১৯৪৭-এর দেশভাগের প্রতিক্রিয়ায় ভিটেমাটি ছেড়ে হিন্দুরা দেশত্যাগ করলে ম্লান হয়ে যায় মেহেরপুরের অসংখ্য গ্রাম ও এর গৌরবময় ঐতিহ্য। অবিভক্ত বাংলার মতো মেহেরপুর একই নিয়তি বরণ করে, কয়েকশত বছরের গৌরবময় সাহিত্য-সংস্কৃতির স্রোতধারা দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। স্রোতদ্বয়ের মৃদু-ক্ষীণ স্রোতটি প্রবেশ করে পূর্ব বাঙলায় আর পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে ব্যাপক বিস্তৃত উত্তাল, তরঙ্গ ক্ষুব্ধ স্র্রোতটি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রচিত হয় মেহেরপুরের নতুন সাহিত্যিক মানচিত্র, নতুন ইতিহাস।

শ্রীচৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩) প্রেমভক্তিবাদ নদীয়া জেলার নবদ্বীপ সন্নিহিত মেহেরপুরে এনেছিল ভাব-ভাবুকতার জোয়ার। সেই ভাবের জোয়ারে ভাবাবিষ্ট হয়ে মেহেরপুর নিবাসী কবি জগদীশ গুপ্ত, রমনীমোহন মল্লিকসহ অসংখ্য বৈষ্ণব পদকর্তা রচনা করেন অসংখ্য বৈষ্ণব পদাবলী। চৈতন্য প্রবর্তিত সেই বৈষ্ণবীয় ধারাটি আজও মেহেরপুরে বহমান রয়েছে। বৈষ্ণবধর্মের অবক্ষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আঠারো শতকের শেষে বলরামী বা হাড়ি সম্প্রদায় নামে একটি লৌকিক গৌণধর্মের আবির্ভাব ঘটে মেহেরপুরে। এ ধর্মের প্রবর্তক বলরাম হাড়ি ছিলেন হিন্দু ভক্তের কাছে হাড়িরাম আর মুসলমান ভক্তের হাড়িআল্লা। এ সম্প্রদায়ের অনুসারীরা অধিকাংশই হাড়ি, ডোম, বাগদী, মুচি এবং নিুশ্রেণির মুসলমান। রবীন্দ্রনাথের ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানে ‘কোন বলরামের আমি চেলা’ শব্দের লক্ষ বলরাম হাড়ি ও তার সম্প্রদায়। বলরাম হাড়ি সারা জীবন মানুষ ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং তার অনুসারীরা বৈদিকমন্ত্র, পূজা অর্চনা, দেব-দেবতা, গুরুবাদ মানেন না।

মোগল আমলে মেহেরপুরের বাগোয়ান ভবানন্দ মজুন্দার প্রতিষ্ঠা করেন ‘নদীয়া রাজবংশ’ নামে এক বিশাল রাজবংশ। বাগোয়ানের সন্তান ভবানন্দ মজুন্দারের জীবনালেখ্য নিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্র (১৭১২-১৭৬০) রচনা করেন ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য। এ কাব্যের তৃতীয় খণ্ড অন্নপূর্ণা মঙ্গল বা ‘মানসিংহ, ভবানন্দ উপাখ্যান’। এই কাব্যে ভারতচন্দ্র একটি ঘাটের বর্ণনা করেছেন। এ ঘাটটি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ থেকে ৩/৪ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর কোণে অবস্থিত রসিকপুরের ঘাট। এ ঘাটেই খেয়া পারাপার করত ঈশ্বরী পাটুনী। মাঝি দেবীকে পার করার পর বর প্রার্থনা করে বলেছিলেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। তখন দেবী মাঝিকে আশীর্বাদ করে বলেন, ‘দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান।’

বিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন মেহেরপুরের গাড়াডোবের মুনসী জমিরুদ্দিন (১৮৭০-১৯৩৭)। তিনি ছিলেন একাধারে ধর্মপ্রচারক, বাগ্মি ও সুসাহিত্যিক এবং মেহেরুল্লাহর ভাবশিষ্য। নদীয়া সাহিত্য সভা তাকে ‘কাব্যবিনোদ’ ও ‘কাব্যনিধি’ উপাধিতে ভূষিত করে। মেহেরপুরের রাধাকান্তপুরে জন্মগ্রহণ করেন নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিগমানন্দ (১৮৮০-১৯৩৭) নামে এক মহান ধর্মসাধক, সাহিত্যিক ও সংস্কারক। তার ধর্মচিন্তায় চৈতন্যদেব ও শঙ্করের দর্শনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। নিগমানন্দের ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্যভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে তার ‘জ্ঞানীগুরু’ (১৩১৫), ‘প্রেমিক গুরু’, ‘তান্ত্রিক গুরু’ (১৩১৮), ‘যোগীগুরু’ (১৩১২) প্রভৃতি গ্রন্থে।

মোঘল ও নবাবি আমল থেকে মেহেরপুরে শিল্প সাহিত্য চর্চার প্রসার ঘটে। কবি কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী (১৭৯১-১৮৪৪), বৈষ্ণব পদকর্তা জগদীশ্বর গুপ্ত (১৮৪৫-১৮৮২), রমনীমোহন মল্লিক, দীনেন্দ্রকুমার রায় (১৮৬৯-১৯৪৩), মুন্সি জমিরুদ্দীন (১৮৭০-১৯৩৭) প্রমুখ সাহিত্যিকের জন্ম মেহেরপুরে এবং বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এদের অবদান অসামান্য। দীনেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন একাধারে লেখক, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, সংবাদ সাময়িকপত্র সম্পাদক এবং ডিটেকটিভ উপন্যাসের রচয়িতা ও অনুবাদক। তার রচনা পড়ে অভিভূত হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এবং দীনেন্দ্রকুমার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের হৃদয় হইতে আনন্দ ও শান্তি বহন করিয়া আনিয়া আমাকে উপহার দিয়াছ।’ তার রচিত ‘পল্লীচিত্র’, পল্লীবৈচিত্র্য, পল্লীবধূ, সেকালের স্মৃতি রবীন্দ্র-সমকালে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। ‘দীনেন্দ্রকুমার রায় রচনাসমগ্র’ (২০০৪) গ্রন্থের ভূমিকায় কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন, ‘এই রচনাগুলোর ধমনিতে যে রক্তস্রোত বয়ে চলেছে তা এই এক শতাব্দী পরেও জীবন্ত করেছে।’ ‘রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ উপন্যাসের লেখক; সাহিত্যিক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডায়সনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে। লেখিকার বাবা অবণীমোহন কুশারী ১৯৪৫-৪৬ সাল পর্যন্ত মেহেরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কেতকী কুশারী ডায়সন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠগ্রহণ করেন মেহেরপুর থেকে।

শিল্প সাহিত্যচর্চাকে এগিয়ে নিতে ইংরেজ আমলেই বেশ কয়েকটি সাহিত্য-সংগঠন গড়ে ওঠে এখানে। ১৯১২ খ্রি. ‘নদীয়া সাহিত্য সম্মিলনী’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন গঠিত হয় এবং এর মুখপাত্র ‘সাধক’ সাহিত্য-সাময়িকপত্র হিসাবে উল্লেখ করার মতো গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ‘সাধক’ পত্রিকার পর অমরেন্দ্রনাথ বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় পল্লীশ্রী (১৩৪২)। স্বাধীনতা-উত্তরকালে মধুচক্র, অনুশীলন, ভৈরব, জাতীয় সাহিত্য পরিষদ, নীল মোড়ক পাঠক পরিবার, উন্মুক্ত পাঠাগার সাহিত্যপত্রিকা বের করে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর মেহেরপুর শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে এক ধরনের শূন্যতা নেমে আসে, কিন্তু ষাটের দশকে শিল্প সাহিত্যচর্চার ধারা বেগবান হয়। আয়ুব খানের সামরিক শাসন ও বৈরী পরিবেশে সাহিত্যচর্চা করেছেন আনসার উল হক, নাসিরুদ্দীন মিরু, আবদুস সামাদ, আলী ওবায়দুর রহমান মেরাজ মিয়া, ননীগোপাল ভট্টাচার্য, রওশন আলী মনা প্রমুখ। মেরাজ মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় ‘জয় বাংলা’ নামে একটি পত্রিকা।

মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে সত্তর দশকে সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি হয় রফিকুর রশীদ, গাজী রহমান, তারিক উল ইসলাম, রবিউল আলম, রফিক হাসান প্রমুখের। কথাসাহিত্যিক, ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক হিসাবে রফিকুর রশীদ (জ. ১৯৫৮) দেশে ও দেশের বাইরে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রায় চার দশকের সাহিত্য পরিক্রমায় তিনি লিখেছেন অজস্র ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গান। বহুমাত্রিক সৃজন কুশলতার অধিকারী রফিকুর রশীদ নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস। বাংলাদেশের মানুষ, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে তার গল্প উপন্যাসে। ‘দাঁড়াবার সময়’, মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০০৬), শেকড় ছেঁড়া মানুষের গল্প (২০০৬), রৌদ্রছায়ার নকশা (২০০৬), এইসব জীবন যাপন (২০০৯), জীবনের মতো জল ছবি (২০১১), স্বপ্নের ঘরবাড়ি প্রভৃতিসহ শতাধিক গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে (২০২১) ভূষিত হয়েছেন। ড. গাজী রহমান মূলত কবি ও গবেষক। তিনি ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট এবং ‘রবীন্দ্র থিয়েটার : থিয়েটার সংযোগে নতুন মাত্রা’ অভিসন্দর্ভের জন্য ডিলিট উপাধি অর্জন করেন। গল্পকার ও অনুবাদক হিসাবে দেশের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে তরুণ লেখক মোজাফফর হোসেনের নাম। ‘তিমির যাত্রা’ উপন্যাসের জন্য কালি-কলম তরুণ লেখক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার। আশির দশক মেহেরপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে উজ্জ্বলতর দশক। এ দশকে যারা মেহেরপুরে সাহিত্যচর্চা করেছেন তাদের মধ্যে ড. সাইদুর রহমান, মাসুদ অরুন, মানস চৌধুরী, কাজী হাফিজ, সৈকত রুশদী, রোকনুজ্জামান রোকন অন্যতম। আশির দশকে মেহেরপুরের কবিদের সঙ্গে সখ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও কথাসাহিত্যিক আবুল বাশারের। আবুল বাশার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মেহেরপুরে অবস্থান করতেন। এ দশকের তরুণ কবিদের মধ্যে উজ্জ্বলতর ছিলেন মাসুদ অরুন। তার ‘সশস্ত্র সুন্দর হও’ কবিতাগ্রন্থ পড়ে অভিভূত হন শামসুর রাহমান ও নির্মলেন্দু গুণ। ২০০১ সালে তিনি মেহেরপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে গ্রাম-থিয়েটার আন্দোলন, সাহিত্যচর্চা বেগবান হয়। প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি লিটলম্যাগ তার সম্পাদনায়। ‘মেহেরপুর জেলার ইতিহাস ও মেহেরপুরের লোকজ সংস্কৃতি’ গ্রন্থের লেখক সৈয়দ আমিনুল ইসলামও কবিতা ও কথাসাহিত্য চর্চা করতেন। সাংবাদিক তোজাম্মেল আযম এখনো সাহিত্যচর্চায় যুক্ত আছেন। তিনি মূলত অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও কথাসাহিত্যিক। তার গবেষণার বিষয় মেহেরপুরের মুক্তিযুদ্ধ ও লোকায়ত সংস্কৃতি। ড. ইয়াসমিন আরা সাথী ও ড. শামস আলদীন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লিখছেন নানা ধরনের সৃজনশীল ও মননশীল প্রবন্ধ। আবদুল হাকিম, হাসানুজ্জামান মালেক, নিশান সাবের, মশিউজ্জামান বাবুর রচিত মঞ্চনাটক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মঞ্চায়িত হয়েছে।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল আমিন একজন প্রাবন্ধিক ও অনুসন্ধিৎসু গবেষক। সমাজ-সংস্কৃতিমনস্ক ও ঐতিহ্যসন্ধানী। তার চর্চা ও অনুসন্ধিৎসার বিষয় সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব, আঞ্চলিক ইতিহাস, লোকধর্ম ও লোকজ সংস্কৃতি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : ব্রাত্যজনের রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০১২), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি : মেহেরপুর (২০১৩), ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালির সম্প্রীতি সাধনা (২০১৬), ভাটপাড়া নীলকুঠি ও উনিশ শতকের বাংলাদেশ (২০১৮) ইত্যাদি।

শাশ্বত নিপ্পন নিজেকে কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক হিসাবে সবলভাবে মেলে ধরেছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্য-সাময়িকী, লিটলম্যাগে প্রকাশিত তার গল্পগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। কথাসাহিত্যিক রাফিয়া আক্তার পলির উপন্যাসগুলোও পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মেহেরপুরে হাল আমলের কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য ফজলুল হক সিদ্দিকী। তার প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতাও কবি ছিলেন। গীতিকবি আবদুল হামিদের গীতিকবিতায় কণ্ঠ দিয়েছেন দেশবরেণ্য শিল্পীরা। কবিতা ও ছড়া লিখছেন সৈকত রুশদী, আলকামা সিদ্দিকী, মুরাদ হোসেন, মহাম্মদ সামসুজ্জোহা, ড. শামস আল দীন, মঈনুল ইসলাম, সুশীল চক্রবর্তী, নূরুল আহমেদ, রওশন আলী মনা, মিনা পারভীন, নন্দিতা ঊর্মি, আবিরা পারভীন, বাশরী মোহন দাস, মেহের আমজাদ, ম গোলাম মোস্তফা, নূর আলম, মহাম্মদ মহসীন, ফৌজিয়া আফরোজ তুলি, হাসনাত শাহীন, হাসান রুদ্র প্রমুখ। সাহিত্য-সংগঠক মমতাজ উল আলম, আনিসুজ্জামান মেন্টু, সামাদুল ইসলাম, রজব আলী নিবিড়ভাবে কবিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিগত শতকের ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকে বেশ কিছু সাহিত্য পত্রিকা ও লিটলম্যাগ সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পত্রিকা কিছু সাংস্কৃতিক-সংগঠন এবং কিছু ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত হয়। প্রবাহ, ধারাপাত, মুজিবনগর, পরিচয়, ধানকী, প্রদীপ, স্রোত, ইদানীং, ঠিকানা, যুগপত্র, শব্দতরু, সুবর্ণরেখা, সুবর্ণপরিচয় ইত্যাদি।

সময়ের প্রবহমানতায় অনেক কিছুই বদলে যায়। বদলে যায় সংস্কৃতিবোধ এবং সাহিত্যরুচি ও চর্চার ধরন। পরিবর্তিত সময়, ভোগবাদী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রযুক্তির প্রতি তরুণদের আসক্তি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি বদলে দিয়েছে মেহেরপুরের সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যকে। তারপরও অনেকেই এই প্রান্তে অবস্থান করেও কবিতা রচে, গল্প বোনে, গান বাঁধে।

মেহেরপুর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন

শিল্প সাহিত্যে মেহেরপুর

 আবদুল্লাহ আল-আমিন 
১৭ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
জোতিন্দ্রনাথ
জোতিন্দ্রনাথ

বৈদ্যনাথতলা মেহেরপুরের এক প্রাচীন গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে এ গ্রামের এক ছায়াঢাকা, মায়াময় আম্রকানন সমগ্র বাঙালিকে দেখিয়েছিল মুক্তির পথ, স্বাধীনতার পথ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে আমবাগানটির বর্ণনা আছে। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগর (পূর্বনাম বৈদ্যনাথতলা) আম্রকাননের ছায়াঘন শ্যামলিমার নিচে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথগ্রহণ করে। নবাব আলিবর্দির আমল থেকে মেহেরপুর একটি প্রসিদ্ধ জনপদ, তখন থেকে এখানে শিল্প সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটে। ঊনিশ শতকের পঞ্চাশ দশকে নদীয়া জেলার একটি মহকুমা হিসাবে প্রশাসনিক স্বীকৃতি লাভের পর মেহেরপুরের নামডাক অবিভক্ত বঙ্গদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কালের উতল হাওয়ায় ‘মেহেরপুর’ নামক বর্ধিষ্ণু গ্রামটির গায়ে লাগে শহুরে ছোঁয়া। বিলেত থেকে আসতে থাকেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত রমেশচন্দ্র দত্ত, জে ডি এন্ডারসন, এফ এ শ্ল্যাক, পি জি মেলিটসের মতো ডাকসাইটে সিভিলিয়ানরা। রমেশচন্দ্র দত্ত মেহেরপুরে হাকিমি করতে এসে রচনা করেন ‘মাধবীকঙ্কণ’ (১৮৬৮-৬৯) উপন্যাস। ‘ইন্দ্র সেন’ নামে পরিচিত জে ডি এন্ডারসন ছিলেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী, সিভিল সার্ভিসের ত্যাগ করে অক্সফোর্ডে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) জন্ম নদীয়ার কৃষ্ণনগরে, কিন্তু যৌবন কেটেছে মেহেরপুরে। তার বড় ভাই রাজেন্দ্রলাল মেহেরপুরে চাকরি করতেন। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিক যতীন্দ্রমোহন বাগচীর (১৮৭৮-১৯৪৮) জন্ম নদীয়া জেলার মেহেরপুরের জামশেরপুর গ্রামের (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বাগচী জামশেরপুর) জমিদার পরিবারে। ‘কাজলা দিদি’ ও ‘অন্ধবধূ’ কবিতার জন্য খ্যাত এই শক্তিমান কবি তার কবিতায় পল্লিপ্রকৃতির সৌন্দর্য ও পল্লিজীবনের সুখ-দুঃখ, ভাগ্যবিড়ম্বিত বাঙালি নারীদের কথা গভীর মমতায় প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নে-জামাই সুকুমার হালদার মেহেরপুরের হাকিম ছিলেন, তার মাধ্যমে মেহেরপুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছিল। উনিশ শতকের মেহেরপুরে মুখার্জি ও মল্লিক বংশের জমিদারদের ছিল প্রবল-প্রতাপ। মুখার্জি বংশের জমিদারদের মধ্যে মথুরানাথ মুখোপাধ্যায় ও দীননাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রজাবৎসল, সাহিত্য ও সংগীতানুরাগী। জাঁকজমকের সঙ্গে তারা দুর্গোৎসব উদযাপন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বারোয়ারিতলায় বসত যাত্রা ও কবিগানের আসর। মুখার্জি জমিদাররা যাত্রা, থিয়েটার, কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি শৌখিন যাত্রাদল। মুখার্জি জমিদারের মতো মল্লিক জমিদারদেরও প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। তারাও শিল্প-সহিত্য, গান বাজনার সবিশেষ অনুরাগী ছিলেন। মল্লিক পরিবারের রমনীমোহন মল্লিক ছিলেন বৈষ্ণব সাহিত্যে পণ্ডিত। ‘চণ্ডীদাস’, ‘জ্ঞানদাস’, ‘বলরাম দাস’ প্রভৃতি গ্রন্থ তিনি টিকাসহ সম্পাদনা করেন। জমিদার শ্রীকৃষ্ণ মল্লিক ছিলেন আমোদপ্রিয় ব্যক্তি। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়পুকুর প্রাঙ্গণে মহাসমারোহে বসত বাসন্তী মেলা। মেলাপ্রাঙ্গণের মণ্ডপ সাজাতে আসত কৃষ্ণনগরের খ্যাতিমান শিল্পীরা। কলকাতা থেকে আসত থিয়েটারের দল; মঞ্চস্থ হতো বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র মতো কালজয়ী উপন্যাসের নাট্যরূপ। দীনেন্দ্রকুমার রায় ‘সেকালের স্মৃতি’ (১৩৯৫) গ্রন্থে মেহেরপুর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেকালে বারোয়ারিতলায় যেমন যাত্রাগান হইত। তেমনি কবিগানও হইত। কবিদলের লড়াই সাহিত্য হিসাবেও উপভোগ্য ছিল।’ এন্টনি ফিরিঙ্গি, রাসুনৃসিংহ, দাশরথি রায়ের কবিগান মেহেরপুরের লোকসমাজে জনপ্রিয় ছিল। সে সময় বছরজুড়ে মেহেরপুরের গ্রামে গ্রামে নানা ধরনের লোকউৎসব লেগে থাকত। কিন্তু কালের ঝড়ো-হাওয়ায় ওলট-পালট ও দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে মেহেরপুরের শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস। ১৯৪৭-এর দেশভাগের প্রতিক্রিয়ায় ভিটেমাটি ছেড়ে হিন্দুরা দেশত্যাগ করলে ম্লান হয়ে যায় মেহেরপুরের অসংখ্য গ্রাম ও এর গৌরবময় ঐতিহ্য। অবিভক্ত বাংলার মতো মেহেরপুর একই নিয়তি বরণ করে, কয়েকশত বছরের গৌরবময় সাহিত্য-সংস্কৃতির স্রোতধারা দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। স্রোতদ্বয়ের মৃদু-ক্ষীণ স্রোতটি প্রবেশ করে পূর্ব বাঙলায় আর পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে ব্যাপক বিস্তৃত উত্তাল, তরঙ্গ ক্ষুব্ধ স্র্রোতটি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রচিত হয় মেহেরপুরের নতুন সাহিত্যিক মানচিত্র, নতুন ইতিহাস।

শ্রীচৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩) প্রেমভক্তিবাদ নদীয়া জেলার নবদ্বীপ সন্নিহিত মেহেরপুরে এনেছিল ভাব-ভাবুকতার জোয়ার। সেই ভাবের জোয়ারে ভাবাবিষ্ট হয়ে মেহেরপুর নিবাসী কবি জগদীশ গুপ্ত, রমনীমোহন মল্লিকসহ অসংখ্য বৈষ্ণব পদকর্তা রচনা করেন অসংখ্য বৈষ্ণব পদাবলী। চৈতন্য প্রবর্তিত সেই বৈষ্ণবীয় ধারাটি আজও মেহেরপুরে বহমান রয়েছে। বৈষ্ণবধর্মের অবক্ষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আঠারো শতকের শেষে বলরামী বা হাড়ি সম্প্রদায় নামে একটি লৌকিক গৌণধর্মের আবির্ভাব ঘটে মেহেরপুরে। এ ধর্মের প্রবর্তক বলরাম হাড়ি ছিলেন হিন্দু ভক্তের কাছে হাড়িরাম আর মুসলমান ভক্তের হাড়িআল্লা। এ সম্প্রদায়ের অনুসারীরা অধিকাংশই হাড়ি, ডোম, বাগদী, মুচি এবং নিুশ্রেণির মুসলমান। রবীন্দ্রনাথের ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানে ‘কোন বলরামের আমি চেলা’ শব্দের লক্ষ বলরাম হাড়ি ও তার সম্প্রদায়। বলরাম হাড়ি সারা জীবন মানুষ ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং তার অনুসারীরা বৈদিকমন্ত্র, পূজা অর্চনা, দেব-দেবতা, গুরুবাদ মানেন না।

মোগল আমলে মেহেরপুরের বাগোয়ান ভবানন্দ মজুন্দার প্রতিষ্ঠা করেন ‘নদীয়া রাজবংশ’ নামে এক বিশাল রাজবংশ। বাগোয়ানের সন্তান ভবানন্দ মজুন্দারের জীবনালেখ্য নিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্র (১৭১২-১৭৬০) রচনা করেন ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য। এ কাব্যের তৃতীয় খণ্ড অন্নপূর্ণা মঙ্গল বা ‘মানসিংহ, ভবানন্দ উপাখ্যান’। এই কাব্যে ভারতচন্দ্র একটি ঘাটের বর্ণনা করেছেন। এ ঘাটটি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ থেকে ৩/৪ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর কোণে অবস্থিত রসিকপুরের ঘাট। এ ঘাটেই খেয়া পারাপার করত ঈশ্বরী পাটুনী। মাঝি দেবীকে পার করার পর বর প্রার্থনা করে বলেছিলেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। তখন দেবী মাঝিকে আশীর্বাদ করে বলেন, ‘দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান।’

বিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন মেহেরপুরের গাড়াডোবের মুনসী জমিরুদ্দিন (১৮৭০-১৯৩৭)। তিনি ছিলেন একাধারে ধর্মপ্রচারক, বাগ্মি ও সুসাহিত্যিক এবং মেহেরুল্লাহর ভাবশিষ্য। নদীয়া সাহিত্য সভা তাকে ‘কাব্যবিনোদ’ ও ‘কাব্যনিধি’ উপাধিতে ভূষিত করে। মেহেরপুরের রাধাকান্তপুরে জন্মগ্রহণ করেন নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিগমানন্দ (১৮৮০-১৯৩৭) নামে এক মহান ধর্মসাধক, সাহিত্যিক ও সংস্কারক। তার ধর্মচিন্তায় চৈতন্যদেব ও শঙ্করের দর্শনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। নিগমানন্দের ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্যভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে তার ‘জ্ঞানীগুরু’ (১৩১৫), ‘প্রেমিক গুরু’, ‘তান্ত্রিক গুরু’ (১৩১৮), ‘যোগীগুরু’ (১৩১২) প্রভৃতি গ্রন্থে।

মোঘল ও নবাবি আমল থেকে মেহেরপুরে শিল্প সাহিত্য চর্চার প্রসার ঘটে। কবি কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী (১৭৯১-১৮৪৪), বৈষ্ণব পদকর্তা জগদীশ্বর গুপ্ত (১৮৪৫-১৮৮২), রমনীমোহন মল্লিক, দীনেন্দ্রকুমার রায় (১৮৬৯-১৯৪৩), মুন্সি জমিরুদ্দীন (১৮৭০-১৯৩৭) প্রমুখ সাহিত্যিকের জন্ম মেহেরপুরে এবং বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এদের অবদান অসামান্য। দীনেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন একাধারে লেখক, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, সংবাদ সাময়িকপত্র সম্পাদক এবং ডিটেকটিভ উপন্যাসের রচয়িতা ও অনুবাদক। তার রচনা পড়ে অভিভূত হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এবং দীনেন্দ্রকুমার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের হৃদয় হইতে আনন্দ ও শান্তি বহন করিয়া আনিয়া আমাকে উপহার দিয়াছ।’ তার রচিত ‘পল্লীচিত্র’, পল্লীবৈচিত্র্য, পল্লীবধূ, সেকালের স্মৃতি রবীন্দ্র-সমকালে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। ‘দীনেন্দ্রকুমার রায় রচনাসমগ্র’ (২০০৪) গ্রন্থের ভূমিকায় কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন, ‘এই রচনাগুলোর ধমনিতে যে রক্তস্রোত বয়ে চলেছে তা এই এক শতাব্দী পরেও জীবন্ত করেছে।’ ‘রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ উপন্যাসের লেখক; সাহিত্যিক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডায়সনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে। লেখিকার বাবা অবণীমোহন কুশারী ১৯৪৫-৪৬ সাল পর্যন্ত মেহেরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কেতকী কুশারী ডায়সন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠগ্রহণ করেন মেহেরপুর থেকে।

শিল্প সাহিত্যচর্চাকে এগিয়ে নিতে ইংরেজ আমলেই বেশ কয়েকটি সাহিত্য-সংগঠন গড়ে ওঠে এখানে। ১৯১২ খ্রি. ‘নদীয়া সাহিত্য সম্মিলনী’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন গঠিত হয় এবং এর মুখপাত্র ‘সাধক’ সাহিত্য-সাময়িকপত্র হিসাবে উল্লেখ করার মতো গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ‘সাধক’ পত্রিকার পর অমরেন্দ্রনাথ বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় পল্লীশ্রী (১৩৪২)। স্বাধীনতা-উত্তরকালে মধুচক্র, অনুশীলন, ভৈরব, জাতীয় সাহিত্য পরিষদ, নীল মোড়ক পাঠক পরিবার, উন্মুক্ত পাঠাগার সাহিত্যপত্রিকা বের করে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর মেহেরপুর শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে এক ধরনের শূন্যতা নেমে আসে, কিন্তু ষাটের দশকে শিল্প সাহিত্যচর্চার ধারা বেগবান হয়। আয়ুব খানের সামরিক শাসন ও বৈরী পরিবেশে সাহিত্যচর্চা করেছেন আনসার উল হক, নাসিরুদ্দীন মিরু, আবদুস সামাদ, আলী ওবায়দুর রহমান মেরাজ মিয়া, ননীগোপাল ভট্টাচার্য, রওশন আলী মনা প্রমুখ। মেরাজ মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় ‘জয় বাংলা’ নামে একটি পত্রিকা।

মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে সত্তর দশকে সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি হয় রফিকুর রশীদ, গাজী রহমান, তারিক উল ইসলাম, রবিউল আলম, রফিক হাসান প্রমুখের। কথাসাহিত্যিক, ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক হিসাবে রফিকুর রশীদ (জ. ১৯৫৮) দেশে ও দেশের বাইরে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রায় চার দশকের সাহিত্য পরিক্রমায় তিনি লিখেছেন অজস্র ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গান। বহুমাত্রিক সৃজন কুশলতার অধিকারী রফিকুর রশীদ নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস। বাংলাদেশের মানুষ, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে তার গল্প উপন্যাসে। ‘দাঁড়াবার সময়’, মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০০৬), শেকড় ছেঁড়া মানুষের গল্প (২০০৬), রৌদ্রছায়ার নকশা (২০০৬), এইসব জীবন যাপন (২০০৯), জীবনের মতো জল ছবি (২০১১), স্বপ্নের ঘরবাড়ি প্রভৃতিসহ শতাধিক গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে (২০২১) ভূষিত হয়েছেন। ড. গাজী রহমান মূলত কবি ও গবেষক। তিনি ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট এবং ‘রবীন্দ্র থিয়েটার : থিয়েটার সংযোগে নতুন মাত্রা’ অভিসন্দর্ভের জন্য ডিলিট উপাধি অর্জন করেন। গল্পকার ও অনুবাদক হিসাবে দেশের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে তরুণ লেখক মোজাফফর হোসেনের নাম। ‘তিমির যাত্রা’ উপন্যাসের জন্য কালি-কলম তরুণ লেখক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার। আশির দশক মেহেরপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে উজ্জ্বলতর দশক। এ দশকে যারা মেহেরপুরে সাহিত্যচর্চা করেছেন তাদের মধ্যে ড. সাইদুর রহমান, মাসুদ অরুন, মানস চৌধুরী, কাজী হাফিজ, সৈকত রুশদী, রোকনুজ্জামান রোকন অন্যতম। আশির দশকে মেহেরপুরের কবিদের সঙ্গে সখ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও কথাসাহিত্যিক আবুল বাশারের। আবুল বাশার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মেহেরপুরে অবস্থান করতেন। এ দশকের তরুণ কবিদের মধ্যে উজ্জ্বলতর ছিলেন মাসুদ অরুন। তার ‘সশস্ত্র সুন্দর হও’ কবিতাগ্রন্থ পড়ে অভিভূত হন শামসুর রাহমান ও নির্মলেন্দু গুণ। ২০০১ সালে তিনি মেহেরপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে গ্রাম-থিয়েটার আন্দোলন, সাহিত্যচর্চা বেগবান হয়। প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি লিটলম্যাগ তার সম্পাদনায়। ‘মেহেরপুর জেলার ইতিহাস ও মেহেরপুরের লোকজ সংস্কৃতি’ গ্রন্থের লেখক সৈয়দ আমিনুল ইসলামও কবিতা ও কথাসাহিত্য চর্চা করতেন। সাংবাদিক তোজাম্মেল আযম এখনো সাহিত্যচর্চায় যুক্ত আছেন। তিনি মূলত অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও কথাসাহিত্যিক। তার গবেষণার বিষয় মেহেরপুরের মুক্তিযুদ্ধ ও লোকায়ত সংস্কৃতি। ড. ইয়াসমিন আরা সাথী ও ড. শামস আলদীন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লিখছেন নানা ধরনের সৃজনশীল ও মননশীল প্রবন্ধ। আবদুল হাকিম, হাসানুজ্জামান মালেক, নিশান সাবের, মশিউজ্জামান বাবুর রচিত মঞ্চনাটক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মঞ্চায়িত হয়েছে।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল আমিন একজন প্রাবন্ধিক ও অনুসন্ধিৎসু গবেষক। সমাজ-সংস্কৃতিমনস্ক ও ঐতিহ্যসন্ধানী। তার চর্চা ও অনুসন্ধিৎসার বিষয় সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব, আঞ্চলিক ইতিহাস, লোকধর্ম ও লোকজ সংস্কৃতি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : ব্রাত্যজনের রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০১২), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি : মেহেরপুর (২০১৩), ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালির সম্প্রীতি সাধনা (২০১৬), ভাটপাড়া নীলকুঠি ও উনিশ শতকের বাংলাদেশ (২০১৮) ইত্যাদি।

শাশ্বত নিপ্পন নিজেকে কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক হিসাবে সবলভাবে মেলে ধরেছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্য-সাময়িকী, লিটলম্যাগে প্রকাশিত তার গল্পগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। কথাসাহিত্যিক রাফিয়া আক্তার পলির উপন্যাসগুলোও পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মেহেরপুরে হাল আমলের কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য ফজলুল হক সিদ্দিকী। তার প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতাও কবি ছিলেন। গীতিকবি আবদুল হামিদের গীতিকবিতায় কণ্ঠ দিয়েছেন দেশবরেণ্য শিল্পীরা। কবিতা ও ছড়া লিখছেন সৈকত রুশদী, আলকামা সিদ্দিকী, মুরাদ হোসেন, মহাম্মদ সামসুজ্জোহা, ড. শামস আল দীন, মঈনুল ইসলাম, সুশীল চক্রবর্তী, নূরুল আহমেদ, রওশন আলী মনা, মিনা পারভীন, নন্দিতা ঊর্মি, আবিরা পারভীন, বাশরী মোহন দাস, মেহের আমজাদ, ম গোলাম মোস্তফা, নূর আলম, মহাম্মদ মহসীন, ফৌজিয়া আফরোজ তুলি, হাসনাত শাহীন, হাসান রুদ্র প্রমুখ। সাহিত্য-সংগঠক মমতাজ উল আলম, আনিসুজ্জামান মেন্টু, সামাদুল ইসলাম, রজব আলী নিবিড়ভাবে কবিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিগত শতকের ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকে বেশ কিছু সাহিত্য পত্রিকা ও লিটলম্যাগ সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পত্রিকা কিছু সাংস্কৃতিক-সংগঠন এবং কিছু ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত হয়। প্রবাহ, ধারাপাত, মুজিবনগর, পরিচয়, ধানকী, প্রদীপ, স্রোত, ইদানীং, ঠিকানা, যুগপত্র, শব্দতরু, সুবর্ণরেখা, সুবর্ণপরিচয় ইত্যাদি।

সময়ের প্রবহমানতায় অনেক কিছুই বদলে যায়। বদলে যায় সংস্কৃতিবোধ এবং সাহিত্যরুচি ও চর্চার ধরন। পরিবর্তিত সময়, ভোগবাদী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রযুক্তির প্রতি তরুণদের আসক্তি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি বদলে দিয়েছে মেহেরপুরের সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যকে। তারপরও অনেকেই এই প্রান্তে অবস্থান করেও কবিতা রচে, গল্প বোনে, গান বাঁধে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন