সুঁই-সুতায় ৭০ বছর

প্রকাশ : ০১ মে ২০১৮, ০৮:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

  রীনা আকতার তুলি

না দেখলে বোঝাই যাবে না। হার মানবে যাদুকরী কৌশলকেও।অনবরত চলছে হাতের কসরত।যেন দম ফেলানোরও ফুসরত নেই। দু'আঙুলের মাঝ দিয়ে ওঠানামা করছে সুইটা। মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই সেলাই মেশিনের চাকা। ঘরঘর শব্দে বনবন ঘুরছে চাকা।আর তার সঙ্গে চলছে ধারালো সূঁচের ওঠানামা।

চোখদুটো তীক্ষ্ম দৃষ্টি পড়ে থাকে সেই সূঁচাগ্রের ওঠানামা সেলাই পড়া কাপড়ের দিকে।এতটুকু হেরফের হওয়ার সুযোগ নেই।একটু পরপরই সূঁচের কাছাকাছি হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাপড় সোজা করে দিতে হয়। এই বুঝি গেঁথে যাবে তীব্র গতিতে ওঠানামা করা সুঁই। কিন্তু যায় না। অথবা যায় কখনো কখনো। কিন্তু তাতেও তোয়াক্কা নেই...।

ঝুঁকি নিয়েই চলে সেলাইয়ের কাজ।  অনেক টাকা আয় করে সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে স্বপ্ন বুনে সেলাইয়ের ফুঁড়ে ফুঁড়ে। সে বুননে তৈরি হয় সভ্যতা টিকিয়ে রাখার পোশাক-পরিচ্ছদ।

পৃথিবীটাকে রঙিন ও আনন্দময় করতেই তাদের এই টানা  পরিশ্রম। ভোরের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে হাতের টিফিন কেরিয়ারটা নিয়ে।

ঢাকা শহরে একা থাকা জীবনের ব্যস্ততাও কম নয়। ৮০ বছরের আমির হোসনের কাজে যাওয়ার আগেও থাকে আরও অনেক কাজ। স্বল্প আয়ের জীবনে কে করে দেবে ঘর গেরস্থলীর কাজ।
ঘর ভাড়া আর খাওয়া-দাওয়ার পুরো টাকাটাই আয় হয় না। তার ওপর আবার কাজের লোক রাখা- এতো স্বপ্ন দেখাও দুঃসাহস।

সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে ঘর গেরস্থলীর কাজ সেরে তবেই রুটি-রুজির কাজে যাওয়া। আর রাতে কাজ শেষে ঘরে ফিরে বাকি কাজ শেষ করে ঘুমুতে যাওয়া।

যে ঘুমের জন্য তখন বাকি থাকে মোটে হাতেগোনা কয়েকটি ঘণ্টা।যা দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যায়।একটু আয়েশ করে বসা আর কপালে জোটে না।আর কাজ না করলে খাওয়া জুটবে না।

আমির হোসনের এ এক অন্যরম জীবনের ঘানি টানা। ৭০ বছর ধরে সুই-সুতার সাথে তার জীবনটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। মিরপুর ১-এর মুক্তবাংলা মার্কেটের নিচ তলায় প্রায় ৫০টির মত সেলাই মেশিন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। তাদের একজন হচ্ছে আমির হোসেন।

পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি ছিল কলকাতার দমদমে। দেশ বিভাগের সময় চলে আসেন বাংলাদেশে।বর্তমানের তার বাড়ি কুমিল্লায়। একমাত্র মেয়ে নিপা ও স্ত্রী সায়েদাকে নিয়ে আমিরের সংসার।

আমির জানান, শত অভাব অনটনের মধ্যে ছাড়েনি সুইয়ের গাঁথুনি দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশা। ভালোবাসা থেকে প্রতিটি ফোড়ের গাঁথুনিতে বুনেন স্বপ্ন।বসন সেলাই সুন্দর হলে কেউ কেউ খুশি হয়ে দু’ চার টাকা বেশিও দেয়।

পেটের তাগিদে বাল্যকালেই স্কুল ছাড়তে হয়েছে। প্রায় ১০ জনের সংসারে আয় উপার্জন বাড়াতে বাবার সঙ্গে তাকে কাজে লেগে যেতে হয়।

আর্থিক অনটনের কারণে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছিল আমিরের। পড়ালেখা ভালো লাগলেও দারিদ্রতা কেড়ে নেয় তার আলোকিত মানুষ হ্ওয়ার স্বপ্ন।

বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলেন আমির হোসেন। কিন্তু কালের অমোঘ নিয়মে বয়সের ভাড়ে নতজানু  আজ আমির হোসেনের।

ভাগ্য তাঁর সহায় ছিল না স্বপ্নপূরণ হয়নি।সাধারণ শ্রমিকের ভাগ্য নিয়েই তাঁকে আজ হতে হয়েছে বসনের কারিগর।

আমির জানান, মুক্তবাঙলা মার্কেটের নিচ তলার এই ফ্লোরে ঘুটঘুঠে অন্ধকার। তাই সারা দিন বাতি জ্বালিয়ে চলে সেলাইয়ের কাজ।তার ওপর বয়স বাড়ায় এখন চোখের জ্যোতিও কমে এসেছে।চোখে ভালো দেখতে পারেন না তিনি।মনের জোরে কাজ করেন সেলাইয়ের।এ থেকে উপার্জিত টাকা দিয়েই চলে পুরো সংসার।

অভাবের সংসারে দু’মুঠো অন্ন জোটাতে তিনি ঢাকা শহরে এসেছেন।কিন্তু স্ত্রী আর সন্তানকে রেখে আসতে হয়েছে গ্রামের বাড়িতে।কারণ উপার্জনের টাকায় পেটে দু’মুঠো দানা-পানির ব্যবস্থা হলেও সম্ভব হয়নি পরিবারকে সঙ্গে রাখা। তাই এই বয়সের ভার নিয়ে সংসারের চালানোর যুদ্ধ তাকে একাই করে যেতে হচ্ছে।

এই সুঁই-সুতার কারিগর আরও জানান, মেয়ে নিপা বিএসসি অনার্স পড়ছে কুমিল্লায়।শুধু মেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে এই বয়সে তাকে করতে হয় এ বয়সেও নিরান্দের এই কাজ। তবে তিনি মনে বড় শান্তি পান নিজে যা পারেননি তা তাঁর মেয়েকে আলোকিত মানুষ বানাতে পারবেন।এটাই তার স্বপ্ন।

আমির আরো জানান, দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়।মেশিন নিজের হলেও বসার এই জায়গাটায় মাস গেলে ভাড়া গুনতে হয় তিন হাজার টাকা।এরপর যে পয়সা পকেটে থাকে তা দিয়ে তিনবেলা খাওয়া চলে।

তিনি বলেন, মেয়েটা লেখাপড়া শেষ করে যদি একটা চাকরি পায়।তবে তার এই শ্রমের সার্থকতা। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই চাওয়া আমার জন্য নয়- মেয়েকে যদি পড়ালেখা শেষে একটা চাকরি পায়।সংসারে আসে আর্থিক স্বচ্ছলতা। তবে বড় উপকৃত হবেন তিনি।

এই মুক্তবাংলা মার্কেটে আমিরের মত আরো অনেক শ্রমিক রয়েছেন। তারাও সেলাইয়ের কাজ করে  জীবিকা নির্বাহ করেন। সেলাইয়ের এই কাজ করেই চলে তাদের জীবন সংসার।