দেশে দেশে মে দিবস

প্রকাশ : ০১ মে ২০১৮, ১১:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  মনোজ সরকার

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস যা সাধারণত মে দিবস নামে অভিহিত প্রতি বছর ১ মে তারিখে সারা বিশ্বে উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। ১৮৮৬ সালে আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে দিবসটি পালিত হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১ মে জাতীয় ছুটির দিন। আরও অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।

আট ঘণ্টা কাজের অধিকার এখন বিশ্বে এমনভাবে স্বীকৃত যে তাকে স্বতঃসিদ্ধ বলেই মনে হয়। কিন্তু এই অধিকার মানুষ এমনি এমনি পায়নি। এর জন্য অসংখ্য মানুষের শ্রম, ঘাম, মেধা কাজ করেছে। অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। 

সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে কোনো আন্দোলনই হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। নানা ঘটনা, বাদ-প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলে। মে দিবসের আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে হে মাকের্টের আন্দোলনে হঠাৎ করে লাখ লাখ শ্রমিক যোগ দেয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি।

তখনকার সময় কলকারখানায় ১২ ঘণ্টা, ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হতো শ্রমিকদের। এর ওপরে ছিল মজুরি সংকোচন। বহুদিন ধরে চলে আসা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা মুখর হতে শুরু করেছিল উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে।

১৮৬৪ সাল থেকে এই দাবিতে নানা স্থানে গড়ে উঠতে থাকে ‘আট ঘণ্টার শ্রম সমিতি’। ন্যশনাল লেবার ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে আট ঘণ্টা আইন পাস করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছিল। অবশেষে ১৮৬৮ সালে আমেরিকার আইন সভায় ‘আট ঘণ্টার কাজ’-এর একটি আইনও পাস হলো।

কার্ল মার্ক্স এই আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। শ্রমিকরা ভেবেছিলেন, এবার তাদের দাবি বাস্তবায়িত হতে শুরু করবে। কিন্তু সেই সময়কার সরকারব্যবস্থায় আইন পাস করানোটাই যে যথেষ্ট নয়, তার প্রয়োগের দাবিতেও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি, সেটা বুঝতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর।

অবশেষে ১৮৮৬ সালে ১ মে এই শ্রমিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হয়। সেদিন দৈনিক আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদের ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়।

১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।

এর পরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সব সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংগঠনের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

সেই সম্মেলনে শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না খাকলে বিশ্বজুড়ে সব শ্রমিক সংগঠন ১ মে তারিখে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকরী হয়।

দীর্ঘদিন ধরে কিছু সমাজতান্ত্রিক সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসেবে বেছে নেয়। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে।

পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেসব দেশে এমনকি এ উপলক্ষে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। তবে যে দেশের শ্রমিকদের রক্তের বিনিময়ে এই দিনটি অর্জিত হলো সেই আমেরিকাতে মে দিবস পালিত হয় না।

ভারতে মে দিবসের সূচনা বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। ১৯২৩ সালের ১ মে, মাদ্রাজের সমুদ্রসৈকতে শ্রমিক নেতা সিঙ্গারাভেলু চেটিয়ারের সভাপতিত্বে ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয়েছিল। সেই সভা থেকেই এই দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। শোনা যায় হাতের কাছে লাল ঝাণ্ডা না থাকার কারণে চেটিয়ার তার কন্যার শাড়ি ছিঁড়ে তাই দিয়ে পতাকা তৈরি করেছিলেন।

এ ছাড়া ভারতের মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে বিশেষ মর্যাদায় দিনটি পালিত হয়। আসামে এই দিনের জন্য বিশেষ সংগীত রয়েছে। তারা সেটি গেয়ে গেয়ে দিনটি পালন করেন।

তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রাণকেন্দ্র কলকাতায় ১৯২৭ সালে প্রথম মে দিবস পালন করা হয়। দেশ বিভাগের পূর্বে নারায়ণগঞ্জে মে দিবস পালিত হয় ১৯৩৮ সালে।

১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫২ সালের মে মাস পর্যন্ত মে দিবস সীমিত পরিসরে পালিত হয়। ১৯৫৩ সালে পল্টনে মে দিবসের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। তবে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বাংলাদেশের শ্রমিকরা প্রথমবারের মতো বিপুল উৎসাহ নিয়ে মে দিবস পালন করে।

আদমজীতে ৩০ হাজার শ্রমিক লাল পতাকা নিয়ে সভা সমাবেশ মিছিলে অংশ নেয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পূর্ব পর্যন্ত মে দিবস বেশ বড় আকারে সমাবেশের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এই সময় ১ মে দিনটিকে সরকার ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণার দাবি ওঠে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়। ’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর শ্রমিকদের বিরাট অংশ বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করে। ১৯৭০ সালে মে দিবস পালনে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ করা যায়।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয়। স্বাধীনতার পর মে দিবসটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। বঙ্গবন্ধু ১ মে-কে মহান মে দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালের মহান মে দিবস উপলক্ষে তৎকালীন সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধু মহান মে দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

আর্জেন্টিনায় বিশ্বের সর্ব প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৮৯০ সালে। ১৯৩০ সালে সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়। মে দিবসে দেশটিতে সাধারণ ছুটি থাকে। এদিন তাদের বড় বড় শহরের প্রধান সড়কে শ্রমিক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মে দিবস পালিত হয়। তবে যে দেশে ঘটনার জন্ম, সেই দেশ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে দিনটি সরকারিভাবে পালিত হয় না। এ ছাড়া তাদের প্রতিবেশী দেশ কানাডায় দিবসটি সরকারিভাবে পালন করা হয় না। তবে বেসরকারিভাবে কিছু শ্রমিক সংগঠন দিনটি পালন করতে শোভাযাত্রা ও র্যা লি বের করে।

আমেরিকা ও কানাডাতে সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোক্তা। হে মার্কেটের হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যে কোনো আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

সোভিয়েত ইউনিয়নে জাঁকজমকপূর্ণভাবে মে দিবস পালিত হয়। তারা সেদিন আগুন জ্বালিয়ে শিকাগো শহরে নিহতদের স্মরণ করে।

চীন ও কিউবা রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি উদযাপন করে। এদিন তারা সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করে। বের করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

বলিভিয়ায় ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন শ্রমিকদের সম্মানে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ব্রাজিলে শ্রমিক দিবস হিসেবে দিনটিতে ছুটি থাকে। এদিন ঐতিহ্যগতভাবে অধিকাংশ পেশাদার বিভাগের ন্যূনতম বেতনকাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ফলে শ্রমিকদের দিনটি আনন্দের।

নেপালে সরকারি ছুটি থাকে। এদিন নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বড় শ্রমিক সমাবেশ ও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্যটক ছাড়া অন্যান্য যানবাহনও বন্ধ থাকে।

জাপানে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে দিনটি পালিত হয়। এদিন জাপানের রাজধানী টোকিওতে শ্রমিকরা পদযাত্রা ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করেন।

জার্মানিতে জাতীয় ছুটি হিসেবে দিনটি পালিত হয়। এদিন বার্লিনে শ্রমিকদের বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে তারা বিভিন্ন মেলার আয়োজন করে থাকে।

হাঙ্গেরিতে সরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হয়। এদিন তারা বিশেষ নাচ পরিবেশন করে দিনটিকে আলাদা মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।

ইউরোপজুড়েই মে দিবসে থাকে সরকারি ছুটি। তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দিনটি পালন করে। এ জন্য বিশেষ নাচ-গানের ব্যবস্থাও রয়েছে। বড় বড় শহরে অনুষ্ঠিত হয় শ্রমিক সমাবেশ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এ দিনটি উপলক্ষে বিশেষ বোনাস দেয়ার রীতিও চালু রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় মে দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে মে ট্রি বা গাছ। একটি বৃক্ষ আকৃতির উঁচু বস্তুকে ঘিরে তারা নাচ-গানের আয়োজন করে।