‘১০ টাকায় এক গ্লাস, খান রোগবালাই কইমা যাইবো’

শরবত বিক্রেতা আউয়াল

প্রকাশ : ০২ মে ২০১৮, ০৮:২০ | অনলাইন সংস্করণ

  সামিনা আকতার

‘প্রতিদিন এক গ্লাস কইরা সরবত খান, প্রাণ জুড়াইয়া যাইবো, সেই সঙ্গে হাক্কা সমস্যা (কষ্টকাঠিন্য), জন্ডিস ও পেটের সমস্যাসহ রোগবালাই কইমা যাইবো। শরীরেও বল পাইবেন। ফিল্টারের পানি দিয়ে শরবত তৈরি হয়। এতে তোকমা ইসবগুলের ভুসি, গুড়, উড়ত কোমল, তাল মাহানাসহ ২১ রকমের মজা দেয়া আছে; এক গ্লাস লন মাত্র ১০ টাকা।’

কল্যাণপুর নতুনবাজারের একপাশে বসে শরবত বিক্রি করেন আলিউল আউয়াল। তিনিই এক ক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছিলেন।বেঁচে থাকার তাগিদে জীবিকা হিসেবে নানাজন বেছে নিয়েছেন বিভিন্ন পেশা। তাদের মধ্যে অনেকে আছেন যাদের অল্প আয়ের পেশাই জীবিকার একমাত্র পথ। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, সারি সারি গাড়ি, যানজট আর মানুষের ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকে। ঠিক এমন কোলাহলপূর্ণ জায়গায় প্রতিদিন বসে শরবত বিক্রি করেন আউয়াল। 

আউয়ালের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম? আজ মে দিবসেও আপনি কাজ করছেন কেন? বাসায় আজকের দিনটা বিশ্রাম নিতে পারতেন? উত্তরে তিনি বলেন, কাম না করলে খামু কী? মে দিবস আসে আর যায়, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কি কোনো পরিবর্তন হয়? আমাদের রোজ একই কাম করণ লাগে। বরং আজকে বিক্রি- বাট্টা ভালো হইব। আইজগা বেশি কামাই হইবো।

আলিউল আউয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর কল্যাণপুর দক্ষিণ পাইকপাড়া এলাকায় একটি মেসে থাকেন তিনি। গ্রামে আছেন মা, ভাইবোন, এক মেয়ে ও স্ত্রী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের ব্যক্তি তিনি। প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা কামাই হয়। মাসের শেষে বাড়িতে সাড়ে চার হাজার টাকা পাঠাতে হয়। আর বাকি টাকা দিয়ে তাকে চলতে হয়।

এভাবে মাস চলতে আপনার কষ্ট হয় না?  জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক কষ্ট তো হয়ই, কিন্তু কী করবো বলেন? আমার তো পূঁজি নাই। তাই এভাবেই শরবত বিক্রি কইরা চলতে হয়। তার ওপর যেখানে বসি তার ভাড়াও দিতে হয়। মাঝেমধ্যে আবহাওয়া খারাপ থাকলে কামাই বন্ধ থাকে। এদিকে সন্তান বড় হচ্ছে তাকেও আগামী বছর স্কুলে দেওয়ান লাগবো। তাই বেশি কইরা কাজ করণ লাগবোই। পরিবারের সুখের জন্য একটু বেশি কষ্ট তো করণই লাগবো।

শরবত বিক্রেতা আলিউল আউয়ালের পাশেই রয়েছেন সবজি বিক্রেতা  মাহামুদ। প্রতিদিন তিনি দোতালা মসজিদের সামনে ভ্যানে দাঁড়িয়ে সবজি বিক্রি করেন। তার বাড়ি রাজশাহীতে। 

মাহামুদ বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভ্যানে সবজি বিক্রি করি। এতে মাসে ৯ হাজার টাকা কামাই হয়। এ টাকায় পরিবার নিয়ে চলতে কষ্ট হয়।

মিরপুর দুই নম্বর মনিপুর স্কুলগেটের সামনে বসেন বাদাম বিক্রেতা মোতালেব আলী। তিনি বলেন, স্কুলগেটে বাদাম বিক্রি করেই সংসারের খরচ চালাতে হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাদাম বিক্রি শেষে গড় ৩০০ টাকা আয় হয়।

জীবিকার সন্ধানে সারা দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসেন নগরে, যাদের বড় একটি অংশ বস্তিতে আশ্রয় নেয়। বস্তিতে গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে হয় তাদের।  তাদের মধ্যে অনেকের গ্রামে জমি নেই, কাজও নেই। তাদের মতো রাজধানী ঢাকা শহরে এসে নতুনবাজারের ফুটপাতে বসে তালা-চাবি ঠিক করেন রহমান।
তিনি বলেন, এখন বৈশাখ মাস, তাই আকাশের মর্জির ওপর নির্ভর করে আমাদের কাজে বসতে হয়। যেদিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, সেদিন কামাই ভালো হয়, আর বৃষ্টি-বজ্রপাত হলে কামাই একদম থাকে না। রোজগার ঠিকমতো না হলে পরিবার নিয়ে আধা পেটা খেয়ে ঘুমাতে হয়।

ফুটপাতে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অনেক সময় চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের খপ্পরে পড়তে হয়। অনেক সময় দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি প্রাণও হারাতে হয়।

গত বছরের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই হাজার ২১৫ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৪৩০ কিলোমিটার ফুটপাতে হকারদের বসতে দেখা যায়।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ওই গবেষণার ফল অনুযায়ী, ফুটপাতের বিক্রেতাদের বিভিন্ন অপরাধী চক্রকে বছরে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা দিতে হয়।

ফুটপাত থেকে তোলা এই অর্থের পরিমাণ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সমুদয় বাজেটের কাছাকাছি।

বাংলাদেশ হকার ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেমের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর প্রায় এক লাখ   ফুটপাত বিক্রেতা চাঁদাবাজ গ্যাংয়ের হাতে জিম্মি হয়ে রয়েছেন। চাঁদা হিসেবে প্রতিদিন তাদের ৫০-৫০০ টাকা দিতে হয়। এভাবে চাঁদা দিয়ে জীবন হাতের মুঠোয় দিয়ে রাজধানীতে টিকে থাকেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।