খালেদা জিয়ার জানাজা যেন জনতার মহাসমুদ্র
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বুধবার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তিন বাহিনীর প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা অংশ নেন -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শুধু একটি জানাজা নয়, দেশের বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাই শোক, আবেগ ও ভালোবাসা যেন জনস্রোত হয়ে নেমেছিল রাজপথে। বুধবার ঢাকা যেন জানাজার নগরীতে পরিণত হয়েছিল। মানুষের ভিড়ে থমকে গিয়েছিল রাজধানী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা এভাবেই জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে জানাজার নামাজে এত লোকের উপস্থিতি বিরল ঘটনা। মানুষের আবেগ, নীরব কান্না ও মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা বলে দেয় খালেদা জিয়া মানুষের মনের কত গভীরে ছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারসহ ৩২টি দেশ ও মিশনপ্রধানরাও অংশ নিয়েছেন জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে।
এদিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন গুলশান হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে পৌঁছানোর সময় পথে পথে শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। কফিনের পাশে বসে কুরআন তেলাওয়াত করেন তারেক রহমান।
এই মহীয়সী রাজনীতিবিদ মঙ্গলবার ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বুধবার জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থান ছিল রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। বেলা ৩টা ২ মিনিটে জানাজা শুরু হয়। শেষ হয় ৩টা ৫ মিনিটে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক জানাজা পড়ান।
জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে। সারা দেশ থেকে খুব সকালে মানুষ জড়ো হতে থাকেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে জানাজার সারি পেছনে ফার্মগেট, কাওরান বাজার হয়ে প্রায় শাহবাগে আসে। উত্তর দিকে ছাড়িয়েছিল জাহাঙ্গীর গেট। পেছনে তেজগাঁও এলাকা। সামনে সংসদ ভবনের তিনটি মাঠ ছাড়িয়ে ধানমন্ডির সোবহানবাগ পেরিয়ে ৩২ নম্বর, আসাদ গেট থেকে মোহাম্মদপুর টাউন হল পর্যন্ত। এছাড়া আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন, শেওড়াপাড়া, মিরপুর রোড পর্যন্ত যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষের ঢল। মাইকের সাউন্ড সব জায়গায় পৌঁছাতে না পারায় লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেও জানাজায় অংশ নিতে পারেননি।
প্রিয় নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন নেতাকর্মীরা। বাইরে থেকে যারা খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন তাদের অনেকেই ভোর থেকে অবস্থান নেন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। সরেজমিন দেখা যায়, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহসহ অনেক জেলা থেকে মানুষ আসছে। অনেকে এসেছেন ভোর ৪টা বা তারও আগে। তাদের অনেকেরই বুকে ছিল কালো ব্যাজ। বেলা যত বাড়তে থাকে ততই মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। সকাল ১০টা নাগাদ সংসদ ভবন ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। বেলা ২টা পর্যন্ত মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আশপাশ, বিজয় সরণি, খামারবাড়ি, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ঢল। এ সময় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরেন খালেদা জিয়ার জন্য।
এই জনসমুদ্র সামাল দিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে হিমশিম খেতে হয়েছে। পুরো এলাকার নিরাপত্তায় ১০ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এদিন পুরো রাজধানী হয়ে উঠেছিল জনসমুদ্র। মানুষের সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। কেউ বলেছে ৩০ লাখ, কেউ ৫০ লাখ, আবার কেউ বলেছে আরও বেশি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, মুসলিম বিশ্বে কারও এমন জানাজা বিরল। ১৯৮৯ সালের জুনে মারা যান ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি। তার জানাজা ছিল ঐতিহাসিক। সেখানে এক কোটির বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। মিসরের কামাল আবদেল নাসের এবং ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাতের জানাজাও বিশ্বে উল্লেখযোগ্য। খালেদা জিয়ার জানাজাও তেমনিভাবে বিশ্বের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই জনস্রোত কেবল এক নেত্রীর বিদায় নয়-দেশকে ভালোবাসে এমন রাজনীতিবিদদের মানুষ কীভাবে মূল্যায়ন করে, এটি তার একটি দলিল।
ঐতিহাসিক এই জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক। জানাজায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে ছিলেন। তারেক রহমানের আরেক পাশে দাঁড়িয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, নৌপরিবহণ ও শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ও শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। এছাড়াও অংশ নিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এতে রাজনীতিবিদদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রমুখ।
এভারকেয়ার থেকে গুলশান হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শোকার্ত মানুষের ঢল : বুধবার খালেদা জিয়ার কফিন এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসা হয়ে নেওয়া হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। এই পুরো পথেই ছিল শোকার্ত মানুষের ঢল। দীর্ঘ সময় সড়কে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন তারা। এ সময় কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউবা দুই হাত তুলে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করেন। এদিন সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে লাল-সবুজ রঙে দেশের পতাকায় মোড়ানো ফ্রিজার ভ্যানে খালেদা জিয়ার কফিন হাসাপাতাল থেকে গুলশানের বাসায় নেওয়া হয়। নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে কফিন বাসার ভেতরে নেওয়া হলে স্বজনদের মধ্যে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আত্মীয়স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কফিনের পাশে বসে কুরআন তেলাওয়াত করেন তারেক রহমান। পাশে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং ভ্রাতৃবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি দোয়া-দরুদ পাঠ করেন। বাসার বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী থাকলেও তখন দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়। প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো একনজর দেখার চেষ্টা করেন অনেকে। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
বেলা ১১টা ৪ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে কফিনবাহী গাড়িটি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পথে যাত্রা করে, তখন সড়কের দুই পাশে শোকাতুর এক দীর্ঘ মিছিল। গাড়ির সামনে ও পেছনে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর ভিড় এবং কড়া নিরাপত্তা। এই শেষযাত্রায় তার সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্য ও দলের শীর্ষ নেতারা। খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িবহরে ছিলেন তার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। ফ্রিজার ভ্যানটি গুলশান-২, কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ, এয়ারপোর্ট রোড, মহাখালী ফ্লাইওভার, জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, উড়োজাহাজ ক্রসিং হয়ে বামে মোড় নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ৬ নম্বর গেট দিয়ে জানাজাস্থলে নেওয়া হয়।
