Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজা

আপসহীন তোমায় বিদায়ি সালাম

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত খালেদা জিয়া

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আপসহীন তোমায় বিদায়ি সালাম

শুধু বাংলাদেশ নয়, মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজার মধ্য দিয়ে যবনিকা ঘটল দেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের। বুধবার লাখ লাখ জনতার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে সমাহিত করা হয়।

এ সময় রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানান তাদের সামরিক সচিব। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তিন বাহিনীর প্রধান। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্মরণকালের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এ জানাজায় শরিক হতে সারা দেশ থেকে ঢাকায় ছুটে আসেন দলমতনির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষ। চারদিক থেকে জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের স্রোত এমন ছিল যে, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাপিয়ে তা যেন ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাজধানীতে। এ সময় সবাই চোখভরা অশ্রু আর মনভরা ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন তাদের প্রিয় অভিভাবক বাংলাদেশের কিংবদন্তি রাজনীতিক বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। অনেককে বলতে শোনা যায়, ‘আপসহীন নেত্রী তোমাকে বিদায়ি সালাম। অনেক দোয়া তোমার জন্য। ভালো থেকো পরপারে। আল্লাহ যেন জান্নাত নসিব করেন।’

এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়াকে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তার মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে, বুধবার ছিল সাধারণ ছুটি। বিএনপি থেকে পালন করা হচ্ছে সাত দিনের শোক কর্মসূচি।

বুধবার জানাজা শেষে সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় জাতীয় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে লাশ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। সমাধির কাছাকাছি নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার লাশবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে যান সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে খালেদা জিয়া সবশেষ এসেছিলেন ৭ বছর পর, ৮২ দিন আগে। সেদিন খালেদা জিয়া তার স্বামীর সমাধিতে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। কে জানত, এভাবে এই দেখাই যে শেষ দেখা।

এদিকে বিকালে নরম রোদের আবহে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়ার লাশবাহী গাড়ি যখন দাফনের গন্তব্যে এগোচ্ছিল, তখন সঙ্গী হন ছেলে তারেক রহমান, দুই পুত্রবধূ, তিন নাতনি, ভাই, স্বজন, সহকর্মী ছাড়াও তিন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে। এ সময় কফিন বহন করেন সেনা সদস্যরা। বাবার পাশে মাকে সমাহিত করতে কবরে নামেন তারেক রহমান। সঙ্গী হন দুই মামাতো ভাই।

দাফন শেষে খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তাদের সামরিক সচিব। এছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল, পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে তারেক রহমান। তিন বাহিনীর প্রধানরাও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কবরে। একে একে সম্পন্ন করা হয় রাষ্ট্রীয় সব আনুষ্ঠানিকতা। দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। দূর থেকে দাঁড়িয়ে শেষবিদায় জানান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।

এর আগে সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নেওয়া হয় গুলশানে ছেলে তারেক রহমানের ১৯৬ নম্বর বাসায়। পরে জাতীয় পতাকাশোভিত লাশবাহী গাড়ি বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। গাড়িবহরে একটি বাসে সেখানে পৌঁছান খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও পরিবারের সদস্যরা। বাদ জোহর খালেদা জিয়ার জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই সংসদ ভবন এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে আশপাশে আরও কয়েক কিলোমিটার ছড়িয়ে যায় জানাজার সীমা। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। মূল সড়কের দুই পাশ, ফুটওভারব্রিজ, রাস্তার পাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদ-সবখানে মানুষ। ঢাকা শহর যেন এক বিশাল শোকযাত্রার নগরীতে পরিণত হয়। কোনো স্লোগান নেই, নেই কোনো আহ্বান, তবু লাখ লাখ মানুষ চারদিক থেকে ছুটে আসেন জানাজায় অংশ নিতে। কয়েক হাজার নারীও শরিক হন জানাজা ও দোয়ায়।

জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। আরও উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, নৌপরিবহণ ও শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ।

এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলটির নেতাকর্মীরা। আরও ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রমুখ। এছাড়া ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের শায়খ আহমাদুল্লা এবং বিশিষ্ট ইসলামী বক্তা মাওলানা ড. মিজানুর রহমান আজহারীও বিএনপি নেত্রীর জানাজায় অংশ নেন।

বেলা ৩টা ৩ মিনিটে জানাজা শুরু হয়ে ৩টা ৫ মিনিটে শেষ হয়। জানাজা পড়ান বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক।

জানাজার আগে পরিবারের তরফে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালে যদি কারও কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে তারা যেন তার (তারেক রহমান) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি তা পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন। তারেক রহমান আরও বলেন, খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালে তার কোনো ব্যবহারে, কোনো কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।

এর আগে বেলা পৌনে ৩টার দিকে জানাজা কার্যক্রম সঞ্চালনা শুরু করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি খালেদা জিয়ার জীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাফল্য ও নিগ্রহের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না। খালেদা জিয়া দেশ-বিদেশের কোনো অপশক্তির সামনে কখনো মাথা নত করেননি। যারা তাকে (খালেদা জিয়া) জেলে পাঠিয়েছে, যারা তাকে গৃহহীন করেছে, তারা রান্না করা খাবার পর্যন্ত খেতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণতন্ত্রকে ভালোবেসে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। দায়িত্ব পেয়ে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলেই দেশ-বিদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ তাকে ‘গণতন্ত্রের মাতা’ বলে সম্মানিত করেছেন। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে তার গৃহীত কর্মসূচি ছিল অসংখ্য। নারীশিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি প্রথা ও ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি এবং মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবাসীদের কল্যাণের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ছিল তার অন্যতম কাজ।

তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার দুই শিশুপুত্রসহ ১৯৭১ সালের ২ জুলাই থেকে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছেন। স্বামী স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর এবং ফোর্সেস কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর ফলস্বরূপ খালেদা জিয়া তার দুই শিশুপুত্রসহ ছিলেন পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই পরিবারের অবদান এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলমতনির্বিশেষে পুরো দেশবাসীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়া নিয়ে খালেদা জিয়া বিদায় নিলেন। পেছনে রেখে গেলেন এক মহীয়সী নারী, সংগ্রামী এক রাজনীতিবিদ, একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের অনন্য কর্মজীবনের উদাহরণ; যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এদিকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় ছুটে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুংগেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চশিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ। এছাড়া চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শেষযাত্রায় অংশ নেন। এদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম