Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

চির-উন্নত মম শির

Icon

আবু রূশদ

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চির-উন্নত মম শির

৩০ ডিসেম্বর আমার আম্মার মৃত্যুবার্ষিকী। চোখের কোণে এমনিতেই অশ্রুবিন্দু। সেই অশ্রুর ধারায় যোগ হলো আরও অসংখ্য বিন্দু, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে। সাংবাদিকতার সুবাদে বহুবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাকে নিজের লেখা গ্রন্থ উপহার দিয়েছি, কুশলবিনিময় করেছি। শেষবার যখন তার সঙ্গে দেখা হয়, তখন তিনিই ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিশেষ একটা কাজে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রাত প্রায় এগারোটার দিকে গিয়ে হাজির হলাম। সঙ্গে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর। শিমুল বিশ্বাসের রুমে গিয়ে বসলাম, কফি খেলাম। তিনি সময়মতো নিয়ে গেলেন খালেদা জিয়ার কামরায়। মোবাইল বাইরে রেখে যেতে হলো নিরাপত্তা স্বার্থে। খালেদা জিয়া টিভিতে খবর দেখছিলেন। সালাম বিনিময়ের পর বসতে বললেন। তাকে আমার সম্পাদিত ডিফেন্স জার্নালের সর্বশেষ কপিটি দিলাম, যাতে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে একটি লেখা ছিল। তিনি পাতা উলটাতে উলটাতে জানতে চাইলেন-রূশ্দ আপনাকে তো অনেকদিন থেকেই চিনি, কিন্তু কোনোদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি আপনি সেনাবাহিনীর কোন কোর্সের?

ম্যাডাম, আমি ১৩ বিএমএ লং কোর্সের।

বলেন কী? আপনি ডিজিএফআইয়ের ডিজির কোর্সমেট? ও তো আমাকে, আমার দলকে ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে! বাংলাদেশের ক্ষতি করছে। আর আমি তো আপনার সামনে বসে আছি! আমি আমার ওই কোর্সমেটের হাতেই পার্সোনা নন গ্রাটা অর্থাৎ অবাঞ্ছিত হয়েছি সব সেনানিবাসে। বন্ধুত্ব এখানে প্রসঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়নি, আমি কোনদিকে আছি, সেটাই বড় ব্যাপার। নিঃসংকোচে বললাম খালেদা জিয়াকে।

ও, তাই নাকি? সাংবাদিক হওয়ার পরও পিএনজি করেছে? তিনি অবাক হলেন। ছেলেমেয়ের খবর নিলেন। তারপর চলে এলেন কাজের কথায়। সেসময় সাংবাদিকতা করাও কঠিন ছিল। আর পর্দার আড়ালে বিশেষ কিছু কাজ করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য।

খালেদা জিয়া টু দি পয়েন্ট কিছু কাজের কথা বললেন, একটি বিষয়ে কিছু যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। নির্দেশনা দিলেন এবং কাজ শেষে জে. আকবরের কাছে বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করলেন। সেই চিরচেনা কেতাদুরস্ত, অসীম ভদ্রতায় জড়ানো তার ভাষা। আলোচনাকালে কিছু বিষয় নিয়ে আমি দ্বিমত করলাম। ভাবা যায়? তিনি হাসিমুখে সব শুনলেন। পালটা যুক্তি দিলেন। কিন্তু আমাকে পুরো কথা বলতে দিলেন। একসময় তিনি দৃঢ়স্বরে একটি বিশেষ বৃহৎ বন্ধুরাষ্ট্র সম্পর্কে এমন কিছু কথা বললেন, তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন, যা চমকে দেওয়ার মতো। তিনি তার স্বামী জে. জিয়ার শহীদ হওয়ার প্রেক্ষাপট, পরবর্তী কিছু ঘটনাবলি, বাংলাদেশের কৌশলগত ও কূটনৈতিক পর্যায়ে অবস্থান নিয়ে বেশ কতক্ষণ তার মতামত তুলে ধরলেন। এসব কথা বা তথ্য হয়তো কখনোই প্রকাশ করা যাবে না, উচিতও হবে না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য, খালেদা জিয়ার মুখ থেকে ওই তথ্যগুলো জানতে পারলাম। জে. আকবর পাশে বসে সাক্ষী হয়ে রইলেন।

প্রায় চল্লিশ মিনিট খালেদা জিয়ার সঙ্গে সেদিন কথা হয়েছিল। আমাকে দেওয়া কাজটি করে দিতে পেরেছিলাম। তবে গোয়েন্দা সংস্থার চাপ সহ্য করতে হয়েছিল বেশ খানিকটা। টিকটিকি মারফত জেনে গিয়ে কোর্সমেট বেশ খেপে গিয়েছিলেন আমার ওপর। সেই চিরাচরিত অভিযোগ-আমরা ষড়যন্ত্র করছি! গুলশান অফিস থেকে বের হয়ে জে. আকবর আমাকে বললেন-তুমি তো দেখি তর্ক জুড়ে দিয়েছিলে ম্যাডামের সঙ্গে! আমি নির্বিকারভাবে ওনাকে পালটা প্রশ্ন করলাম-স্যার, ম্যাডাম কি বিরক্ত হয়েছেন? নাকি বকা দিয়েছেন? উনি তো কথা শুনলেন নিবিষ্ট মনে, নিজের যুক্তিও দিলেন। উনি কারও সঙ্গে কখনো চড়া আচরণ করেছেন বলে শুনিনি।

জে. আকবর মাথা নাড়লেন। তিনি আবার একসময় জেনারেল জিয়ার এপিএস হিসাবে দায়িত্ব পালন করায় জিয়া পরিবারকে কাছে থেকে দেখেছেন। সেদিনও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছবি তোলা হলো না। বাংলাদেশের অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। বেশির ভাগের সঙ্গেই কোনো ছবি নেই। খালেদা জিয়ার সঙ্গেও নেই। আফসোস। সেই ১৯৯৭ সালে বিএনপির মুখপত্র বলে পরিচিত দৈনিক দিনকালে সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ করার সময় তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা নিয়ে আমার লেখা একটি গ্রন্থ উপহার দিয়েছিলাম বিরোধীদলীয় নেতার মিন্টো রোডের কার্যালয়ে। তখন গ্রন্থ দেওয়ার সেই ছবিটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটিও সংগ্রহে নেই! তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে গিয়েছি। সেসবেরও কোনো ছবি নেই!

বেগম খালেদা জিয়া কখনোই কারও সঙ্গে, এমনকি তার চরম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি, কোনো কটু কথা বলেননি। সবসময় শিষ্টাচার, তার স্বভাবজাত সৌকর্য, নম্রতা, সহনশীলতা বজায় রেখেছেন। কখনোই প্রতিশোধপরায়ণ ছিলেন না, প্রতিশোধ নেননি। শেষজীবনে দীর্ঘকাল জেল খেটে, চরমভাবে মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েও গত বছর পাঁচ আগস্টের পর তিনি সবাইকে শান্ত হতে বলেছেন। ধৈর্য ধরতে বলেছেন। প্রতিশোধ নিতে নিষেধ করেছেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া যে অনিশ্চিত জীবন পার করেছেন, তা বিস্ময়কর। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করে তার স্বামী তদানীন্তন মেজর জিয়া সোজা রণাঙ্গনে চলে গেছেন। কতদিন সেই যুদ্ধ চলবে, দুই শিশুসন্তান নিয়ে সংসার চলবে কীভাবে, সেসব যদি গোনায় ধরা হয়, তাহলে এক ভয়াবহ চিত্রের অশনিসংকেত পাওয়া যায়। মেজর জিয়া তার স্ত্রীকে কিছুই বলে যেতে পারেননি। খালেদা জিয়া ওই অবস্থায় ঢাকায় এসেছেন, পালিয়ে থেকেছেন। একসময় পাক গোয়েন্দা বাহিনী তার অবস্থান জেনে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার্স মেসে একটি রুমে তাদের আটকে রাখা হয়। কী হচ্ছে বাইরে তা তিনি জানতেন না। শুধু খাবার সময় একজন আর্দালি এসে খাবার দিয়ে যেত। কোনো কথা বলত না। কোনো সংবাদপত্র দেওয়া হতো না পড়তে। চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। কতদিনে যুদ্ধ শেষে হবে, আদৌ বাংলাদেশ স্বাধীন হবে কি না, কখন স্বামীকে দেখতে পাবেন-কোনোটাই নিশ্চিত ছিল না। পাকবাহিনীর ভয়ংকর রাগ ছিল মেজর জিয়ার ওপর স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য। তার স্ত্রী, সন্তান তাই ছিল বড় টার্গেট। যদি নয় মাসে মুক্তিযুদ্ধ শেষ না হতো? যদি রাজনীতিবিদরা আপস করতেন পাকিস্তানের সঙ্গে? তাহলে কী হতো মেজর জিয়া, খালেদা জিয়ার ভাগ্যে? পাকবাহিনী ছেড়ে দিত জিয়ার পরিবারকে? না।

সেসময় ছোট্ট এক রুমে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখেও ছাব্বিশ বছর বয়সি খালেদা জিয়া ভেঙে পড়েননি। বরং ডিগনিটি ও অনার বজায় রেখেছেন। ঢাকায় পাক সেনাবাহিনীর বিমানবিধ্বংসী রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার ছিলেন লে. কর্নেল সাফায়াত আলী, যিনি মেজর জিয়াকে ভালোভাবে চিনতেন। তিনি তার আত্মজীবনী ‘দ্য সোলজার-এ মেমোয়ার’ গ্রন্থে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বন্দিকালীন দেখা হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জেনারেল জিয়ার প্রসঙ্গও এনেছেন।

লে. কর্নেল সাফায়াতের সঙ্গে মেজর জিয়ার পরিচয় হয় ১৯৬৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে। এরপর ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকায় বদলি হয়ে এলে মেজর জিয়া কয়েকবার তেজগাঁও বিমানবন্দরের পাশে অবস্থিত তার ইউনিটে এসেছিলেন দেখা করতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়, তখন ফর্মেশনের স্টাফ অফিসার মেজর আহমেদ আলী তার কাছে এসে জানান, জিয়ার পরিবারকে ধরা হয়েছে, এখন তাকে বন্দিদের দায়িত্ব নিতে হবে। লে. কর্নেল সাফায়াত মেজর আহমেদ আলীকে নিয়ে ছুটে যান যেখানে খালেদা জিয়াকে বন্দি রাখা হয়েছে সেখানে।

লে. কর্নেল সাফায়াতের বর্ণনা মতে, শাড়ি পরিহিত মহিলা ফুঁসে উঠে কঠোর কণ্ঠে ইংরেজিতে জানতে চান-হ্যাঁ, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি জনাব?

আপনি আপনার নাম বলতে পারেন।

আমি খালেদা জিয়া। মেজর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী।

জিয়া কোথায়? প্রশ্ন করেন লে. কর্নেল সাফায়াত।

উত্তরে খালেদা জিয়া বলেন-আমি জানি না। আপনারা কখনোই তাকে পাবেন না।

লে. কর্নেল সাফায়াত মেজর আহমদ আলীকে নিয়ে বাইরে এসে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব ও ব্যবহার নিয়ে আলাপ করেন। তিনি তাকে উল্লেখ করেন একজন শিক্ষিত, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী মহিলা হিসাবে, যিনি এক হারিয়ে যাওয়া বাঘের বাঘিনীর মতো আচরণ করেছেন। কর্নেল সাফায়াত মেজর আলীকে নির্দেশ দেন, শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পর এক রাতের জন্য যে কামরায় রাখা হয়েছিল, সেটায় যেন তাকে রাখা হয়। তিনি মেজর আলীকে সতর্ক করে দেন এই বলে, সবার মনে রাখা দরকার, বাঙালি নারীদের কোনো কোনো প্রজাতি পুরুষ প্রজাতি থেকেও ভয়ংকর।

পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি থাকার পরও যখন সে দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক, কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন খালেদা জিয়া কখনোই প্রতিহিংসার কথা বলেননি। বরং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য তার স্বামী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে পথ দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাই অনুসরণ করেন। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পাকিস্তান সফর করেন, তখন একজন গর্বিত বাংলাদেশি হিসাবেই নিজেকে তুলে ধরেছিলেন, মাথা উঁচু করে সেখানে গিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের সবাই তাকে গ্রহণ করেছিলেন সম্মানের সঙ্গে। এখানে একাত্তরে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দিত্বের কথা কোনো পক্ষই তোলেনি। স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়া নিজেকে উপস্থাপন করতে ভোলেননি। তার ব্যক্তিত্ব, সৌকর্য, আভিজাত্য এক্ষেত্রে অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে সব সময়। এদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তিনি সব সময় কূটনৈতিক শিষ্টাচার, আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের স্বীকৃত নিয়মাবলি মেনে চলেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে ভারতের কিছু পদক্ষেপের তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু কখনোই তা উষ্ণতার কমতি ঘটায়নি। দিল্লি সফরকালেও তাকে দেওয়া হয়েছে আন্তরিক সংবর্ধনা।

বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু বিষয়ে তিনি সব সময় ভারতের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে ভোলেননি। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনে খালেদা জিয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ইস্যুতে খালেদা জিয়া যে দৃঢ় মনোভাব দেখান, তা ছোট-বড় সব দেশকেই অবাক করে দেয়। দেশের বাঁচা-মরার সঙ্গে সম্পৃক্ত এ বিষয়টিতে তার মতো করে আর কেউই কখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি। তার এ ভাষণে ভারত হতবাক হয়ে পড়ে। ঢাকার সংবাদমাধ্যমে সেসময় বিশ্বসভায় খালেদা জিয়ার এ ভাষণটিকে জাতীয় স্বার্থের এক অনন্য প্রকাশ হিসাবে উল্লেখ করে বলা হয়, ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় প্রতিনিধিদের অবস্থা ছিল ঠিক মেঠো ইঁদুরের ছোটাছুটির মতো। এছাড়াও ভারত সরকারের মনোভাব ও বাংলাদেশে তাদের একচেটিয়া সমর্থকদের নিয়ে তিনি সেই সাড়া জাগানো মন্তব্যটি করেছিলেন ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে তার এক নির্বাচনি সভায়। ওখানে তিনি বলেছিলেন-‘আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, অন্যদের হাতে গোলামির জিঞ্জির’। এ একটি কথাতেই তার অবস্থান ও মনোভাব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতাপ্রেমী বাংলাদেশিদের মধ্যে। মুসলিমবিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবেও খালেদা জিয়া সব মুসলিম দেশ তো বটেই, পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে সম্মানের সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র যেমন তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করত, মহাচীনও তাকে প্রদান করত উঁচু মর্যাদা। কোনো ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি মাথা নুইয়ে কৃপা ভিক্ষার কোনো দৃষ্টান্ত। মাত্র পনেরো বছর বয়সে বিয়ের পর থেকে তিনি সেনাবাহিনীর সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। সে অবস্থায় ছত্রিশ বছর বয়সে নেমে পড়লেন রাজনীতির কঠিন মাঠে, যা ছিল দুটি বিপরীতমুখী জীবন। তিনি চাইলেই তার স্বামী নিহত হওয়ার পর সরকারি সুবিধাসহ বাকি জীবন একজন সেনাপতির স্ত্রী হিসাবে কাটিয়ে দিতে পারতেন। এটি হতে পারত ঝামেলামুক্ত একটি জীবন। বাকি আর দশজন হয়তো তাই করতেন। কিন্তু খালেদা জিয়া হেঁটেছিলেন দুর্গম পথ।

সেনানিবাসের জীবন থেকে কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সব পর্যায়ে তাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। তিনি মানিয়ে নিয়েছেন, যা আর কেউ পারেননি, পারবেনও না। সামরিক জীবনের গণ্ডি থেকে বেসামরিক জীবনে পা দিয়ে দেশের শীর্ষে পৌঁছার দুরতিক্রম্য বাধা তিনি অতিক্রম করেছিলেন নিজ যোগ্যতা বলে। এ এক অনন্য রূপকথা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পৃথিবীর আর কোনো সেনাপ্রধানের স্ত্রী বোধহয় তার এ রেকর্ড ছুঁতে পারেননি, পারবেনও না। কে চায়, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে একটি দরিদ্র জনসংখ্যাবহুল দেশের হাল ধরতে? তিনি ধরেছিলেন এবং সফল হয়েছিলেন। তিনি বাঘিনী ছিলেন বটে!

আবু রূশদ : সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক-বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম