আইন শিক্ষা

অপরাধীর প্রতি ন্যায় বিচারে ‘দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানি’র গুরুত্ব

  অ্যাডভোকেট শাহনেওয়াজ ০১ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

অপরাধীর প্রতি ন্যায় বিচারে ‘দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানি’র গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন অ্যাডভোকেট শাহনেওয়াজ
অপরাধীর প্রতি ন্যায় বিচারে ‘দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানি’র গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন অ্যাডভোকেট শাহনেওয়াজ

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বিচারক সরাসরি রায়ের দিন কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে কি হয় নাই তা নির্ধারণ করে সরাসরি অভিযুক্ত আসামির অভিযোগ থেকে খালাস অথবা অপরাধের দণ্ড ঘোষণা করে। এখানে দণ্ড প্রদানের পূর্বে দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানির (Sentencing hearing) নিয়ম নেই।

যে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানির নিয়ম আছে, সেখানে বিচারিক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ যদি অভিযুক্ত আসামির বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয় তবে বিচারক আসামির অপরাধী ঘোষণা করে তাদের কৃত অপরাধের জন্য কি পরিমাণ সাজা দেওয়া যায় তার জন্য আরেকটি দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানির সুযোগ দেন।

এতে আসামিপক্ষ তাদের কৃত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তির মধ্যে নূন্যতম শাস্তি প্রদানের জন্য আদালতে বিভিন্ন যুক্তি প্রদান করতে পারে। বিচারক যদি সরাসরি বিচারিক শুনানির (judicial trial) পর দণ্ড ঘোষনা করে দেন সেক্ষেত্রে আসামীপক্ষ আদালতকে তাদের কৃত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তির মধ্যে নুন্যতম শাস্তি যুক্তি প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, আসামির পক্ষের আইনজীবীরা সাধারণত বিচারিক শুনানিতে যে সব যুক্তির অবতারণা করলে বিচারক অভিযুক্তদের কম সাজা দিবেন তা উপস্থাপন করেন না। কারণ তারা মনে করে বিচারিক শুনানিতে ‘mitigating factors’ নিয়ে শুনানি করলে তা বিজ্ঞ বিচারকের মনে তাদের মক্কেলের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করবে যার প্রভাবে বিচারকের রায় তাদের মক্কেলের বিপক্ষে যেতে পারে।

সাধারণত যেকোন অপরাধের জন্য সর্বনিম্ব থেকে সর্বোচ্চ সাজার একটি নির্ধারিত পরিসর দেওয়া থাকে, বিজ্ঞ বিচারক তা থেকে অপরাধের ধরণ ও মাত্রা বিবেচনা করে তার বিচক্ষণতা বলে তা থেকে অপরাধীর সাজার পরিমাণ নির্ধারণ করেন।

যেমন অপরাধীর বয়স, অপরাধের ধরন, অপরাধীর পারিবারিক ইতিহাস ও শৈশব, অপরাধীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সামাজিক অবস্থান, সমাজ ও রাষ্ট্রে তার অবদান, অপরাধ সংগঠনকালে তার মানুষিক অবস্থা, পূর্বের অপরাধের রেকর্ড, আর্থিক অবস্থা, শারীরিক ও মানুষিক অবস্থা, অপরাধ সংগঠনকালে কোন প্ররোচনা ও উস্কানি পেয়েছিল কিনা, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগকালে ইত্যাদি বিষয় সাজার পরিমাণ নির্ধারণের সময় ‘mitigating factors’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের দণ্ডবিধির ৭৬ থেকে ৯৫ পর্যন্ত ধারায় বিভিন্ন বিশেষ অবস্থার কথা বলা আছে। যে অবস্থায় কারও কোন কার্যকলাপ দ্বারা অন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের চরম কোন ক্ষতি হয়ে গেলেও তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে না।

তাছাড়া ধারা ৯৬ থেকে ১০৬ পর্যন্ত শরীর ও সম্পদ রক্ষার জন্য শর্ত সাপেক্ষে আক্রমণকারীর আঘাত এবং ক্ষেত্র বিশেষে আক্রমণকারীর মৃত্যু এমনকি আত্মরক্ষার জন্য নির্দোষ ব্যক্তিদের মৃত্যু ঘটালেও তা অপরাধ বলে গণ্য হবে না। দণ্ড বিধিতে অপরাধমূলক নরহত্যা ও হত্যার জন্য আলাদা আলাদা সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।

দণ্ড বিধিতে বলা হয়েছে সমস্ত অপরাধজনিত নরহত্যাই হত্যা যদি না অপরাধী আকস্মিক প্ররোচনা, আত্মরক্ষার অধিকারের সীমা অতিক্রম, সরকারী কর্ম সম্পাদনকারী সরকারি কর্মচারী অথবা সরকারী কর্মচারীর অন্য কোন ব্যক্তি সরল বিশ্বাসে আইনি অধিকারের সীমা অতিক্রম, ইত্যাদি ওজরের যে কোন একটি ওজর ও যদি হত্যাকারীর না থাকে।

এটা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, দণ্ডবিধিতে হত্যার জন্য সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান নির্ধারিত আছে অন্যদিকে অপরাধজনিত নরহত্যার জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিধান দেওয়া আছে। সুতরাং দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানির ব্যবস্থা থাকলে অভিযুক্ত অপরাধীরা তাদের স্বপক্ষে ‘plea bargaining’ এর আশ্রয় নিতে পারে, যা সাধারণত তারা বিচারিক শুনানিতে নিতে চায় না।

এছাড়াও বিচারিক শুনানিতে ‘plea bargaining’ করা হয়ে থাকলেও তা সচরাচর আইনগত বিষয়ের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। এতে আইনের বাইরেও বিভিন্ন বিষয়, পরিবেশ ও পরিস্থিতি (extra-legal mitigating factors) যা বিজ্ঞ বিচারক আমলে নিয়ে অপরাধের নূন্যতম ও সর্বোচ্চ সাজার মধ্যে সর্বনিম্ম সাজা প্রদানে প্রবৃত্ত হবে তা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকে না।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ড বিধির ৩০২ ধারায় একটি অভিযোগ গঠিত হলে স্বাভাবিকভাবেই ওই ব্যক্তি বিচারিক শুনানিতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করবে এবং এই নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য ওই আঙ্গিকেই আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করবে। কিন্তু আদালতে সে যদি দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে বিচারক ওই ব্যক্তিকে ৩০২ ধারার আলোকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে পারে।

অথচ দণ্ড পূর্ব শুনানির ব্যবস্থা থাকলে হয়ত ওই শুনানিতে ওই ব্যক্তি আদালতে সাক্ষ্য উপস্থাপন করে এটা প্রমাণ করতে পারে যে, মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে সে অধিকারের সীমা অতিক্রম করে ওই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়। এই ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমে স্বল্প মেয়াদের কারাদণ্ডে নেমে আসবে। বস্তুত দণ্ড প্রদান পূর্ব শুনানির ব্যবস্থা বিচারককে সঠিক রায় এবং অপরাধীর প্রতি ন্যায় বিচার করতে সহায়তা করে।

লেখক: অ্যাডভোকেট শাহনেওয়াজ, আইনজীবী, গবেষক ও সমাজকর্মী, [email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×