ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় যুগান্তর সাংবাদিক কারাগারে

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

দৈনিক যুগান্তরের কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আবু জাফর। ফাইল ছবি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় দৈনিক যুগান্তরের কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আবু জাফরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। 

বুধবার শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু ফোরকান মো. মারুফ চৌধুরী আসামির জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর এ আদেশ দেন।

এদিন আসামিপক্ষে আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ, নাজমুল হাসান ও মাহবুব আলম জামিন চেয়ে শুনানি করেন। 

শুনানিতে তারা বলেন, মামলার বিষয়বস্তু একজন পুলিশ কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনাকে জড়িয়ে। কিন্তু এ মামলার বাদী একজন সাধারণ ব্যক্তি। পুলিশ নন। যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টটিতে কোনো সাংবাদিকের নামও নেই। রিপোর্টটি ‘যুগান্তর রিপোর্ট’ হিসেবে এসেছে। রিপোর্টটি কে করল, তার উল্লেখ নেই। মামলার বাদী পুলিশ হলে ধরে নিতাম, তারা অনুসন্ধান করে বের করেছেন। কিন্তু মামলার বাদী তো সাধারণ পাবলিক। বাদীর তো আর অনুসন্ধানের সুযোগ নেই।

অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান ও উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম আসামির জামিনের বিরোধিতা করেন। 

সাইফুল ইসলাম বলেন, আসামির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। আসামি দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামি জামিন পেয়ে মামলার তদন্ত প্রভাবিত করতে পারেন।

এরপর সাংবাদিক আবু জাফরের পক্ষে তার আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ আদালতকে আরও বলেন, সংবাদটি মিথ্যা দাবি করা হলে প্রতিবাদ দেয়া যেতে পারত। অথবা প্রেস কাউন্সিলেও বিচার দেয়া যেতে পারত। কিন্তু তারা কোনোটিই না করে সরাসরি মামলা দিয়েছেন। আসামি একজন সাংবাদিক। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে সমাজের উপকার করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই। তিনি স্থানীয় প্রেসক্লাবের নেতা। এ সময় আদালতে উপস্থিত ২০ থেকে ২৫ জন সাংবাদিক আসামির পক্ষে হাত উঁচু করে জামিনের জন্য সম্মতি জানান। তবে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর ওই আদেশ দেন।

এর আগে এদিন আসামিকে আদালতে হাজির করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান শিকদার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়। 

এরও আগে নবাবগঞ্জ থানাধীন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. পলাশ বাদী হয়ে মঙ্গলবার ঢাকার দোহার থানায় মামলাটি দায়ের করেন। 

মামলার এজাহারে আবু জাফর, মো. আজহারুল হক, মো. হুমায়ন কবির, শামীম খান ও মেহেদী হাসান মিঠুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। 

প্রসঙ্গত, আসামিদের মধ্যে যুগান্তরের কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আবু জাফর ছাড়াও মো. আজহারুল হক নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার, এসএম হুমায়ুন কবির গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি, আশুলিয়া প্রতিনিধি মেহেদী হাসান ও যুগান্তরের ধামরাই প্রতিনিধি শামীম খান। 

জানা গেছে, মামলার বাদী মো. পলাশ নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও তিনি মূলত এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ওসি মোস্তফা কামাল বাদী পলাশকে তার ক্ষমতা অপব্যবহার ও দুর্নীতির কাজে তাকে ব্যবহার করেন। এলাকার সাধারণ মানুষ ভয়ে এদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করেন না। এ কারণে শত অপরাধ করলেও ওসি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন না। এ সুবাদে ওসির সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি এ মামলার বাদী হয়েছেন। 

এলাকাবাসী মনে করেন, সত্য খবর লিখলে সাংবাদিক কেন গ্রেফতার হবে। বরং সরকারের উচিত হবে ওসির বিষয়ে পত্রিকায় যা লেখা হয়েছে আগে তার নিরপেক্ষভাবে শক্ত তদন্ত করা। সেখানে যদি প্রতীয়মান হয় যে, পত্রিকার রিপোর্ট সঠিক নয়, সেক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল আইন ব্যবহার করে এখানে যা হল, সেটি সম্পূর্ণ অন্যায়। স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য অন্তরায়। 

এদিকে নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আজহারুল হকসহ যুগান্তরের আরও ৪ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করায় বুধবার সকালে নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাব হল রুমে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হন নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাব কার্যকরী কমিটির নেতারা।

সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আইনের অপব্যবহার করে যুগান্তর পত্রিকার কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আবু জাফরকে পুলিশ গ্রেফতার করায় সভায় তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান সাংবাদিকরা। তারা অবিলম্বে যুগান্তরের সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতার আবু জাফরের মুক্তি দাবি করেন।

নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কলাকোপা ইউপি চেয়ারম্যান ইব্রাহীম খলিলের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত ছিলেন সাহিদুল হক খান ডাবলু, মজিবর রহমান, ফজলুর রহমান, বিপ্লব ঘোষ, কাজী সোহেল, সাদের হোসেন বুলু, ইমরান সুজন, শাহীনুর রহমান তুতি। 

এছাড়া পুলিশের দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সাংবাদিকদের হয়রানি করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনলাইন রিপোর্টার্স ইউনিয়নসহ (ওআরইউ) দোহার-নবাবগঞ্জের বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা। 

অপরদিকে দোহার-নবাবগঞ্জের সুধীজন ও সুশীলসমাজ, মানবাধিকার কর্মী, প্রগতিশীল সংগঠনের নেতারা মামলার নিন্দা জানান এবং ওসি মোস্তফা কামালের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত করে তাকে অপসারণের আহ্বান জানান। 

আরও নিন্দা ও প্রতিবাদ : এ ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছেন সিলেট জেলা প্রেস ক্লাবসহ সিলেটের সাংবাদিক নেতারা। 

পৃথক পৃথক বিবৃতিতে তারা বলেন, আইসিটি আইনের কালো ধারাগুলো বাতিলের দাবিতে দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে এ আইনটি যে অপব্যবহার হতে পারে তা নবাবগঞ্জের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। 

বিবৃতিতে তারা বলেন, আইসিটি আইনের প্রশ্নবিদ্ধ ধারাগুলো বাতিলের দাবিতে সারা দেশে সাংবাদিকরা সোচ্চার। কেননা এ আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। আইনটির অপব্যবহারের কারণে গণমাধ্যমকর্মীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে এ আইনের অপব্যবহারের শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি জানান সাংবাদিক নেতারা।

বিবৃতিতে অবিলম্বে দৈনিক যুগান্তরের নবাবগঞ্জ প্রতিনিধি আজহারুল হক, কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আবু জাফর, আশুলিয়া প্রতিনিধি মো. মেহেদী হাসান মিঠু, ধামরাই প্রতিনিধি শামীম খান ও গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি এসএম হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহার ও আটক সাংবাদিক আবু জাফরকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান নেতারা। 

বিবৃতিদাতারা হচ্ছেন সিলেট জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি তাপস দাশ পুরকায়স্থ, সাধারণ সম্পাদক শাহ্ দিদার আলম নবেল, সিলেটের ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ইমজা) সভাপতি বাপ্পা ঘোষ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমদ, ওভারসিজ করসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব সিলেট ওকাস’র সভাপতি খালেদ আহমদ, সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক কমিশনের সভাপতি ফয়ছল আহমদ বাবলু, সাধারণ সম্পাদক শেখ আশরাফুল আলম নাসির, বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট ফোরামের আহ্বায়ক বদরুদ্দোজা বদর, সদস্য সচিব সাদিকুর রহমান সাকী, সাংবাদিক ইউনিয়ন সিলেটের সভাপতি এমএ মতিন ও সাধারণ সম্পাদক শহাজাহান সেলিম বুলবুল।