যে কারণে ঝরল এত প্রাণ

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৪:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ছবি: এএফপি

পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের অধিকাংশই সড়কের যানজটে আটকে পড়ে, দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শাটার বন্ধ করে দেয়ায় ভেতরেই মারা গেছেন। আগুনের কবল থেকে পালিয়ে বাঁচার আগেই মৃত্যু তাদের গ্রাস করে নিয়েছে।

স্থানীয় লোকজন ও অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা বলেন, চুড়িহাট্টা বড় মসজিদের সামনের চৌরাস্তায় প্রায় সময় যানজট লেগে থাকে। অগ্নিকাণ্ডের সময় এর ভয়াবহতা এতটা তীব্র ছিল যে, সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় অবস্থানরত প্রাইভেটকার, রিকশা, সাইকেল, ভ্যানগাড়ি, মোটরসাইকেল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

সরেজমিন দেখা যায়, চুড়িহাট্টা ওহাব ভবনের সামনে পড়ে আছে প্রায় ৩০টির মতো রিকশা, চারটি পিকআপভ্যান, তিনটি প্রাইভেটকার, প্রায় ২০টির মতো মোটরসাইকেল। আগুনে পুড়ে এগুলোর অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। 

বডি স্প্রে ও রাসায়নিক কারখানা থাকায় আগুনের ভয়াবহতা বেশি ছিল। সড়কজুড়ে বডি স্প্রে ও সুগন্ধির বোতল পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জুবায়ের বলেন, যখন সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে, তখন লোকজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করলে কেউ কেউ নিরাপদে সরে যেতে পারেননি। অনেকে গাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়ার আগেই গাড়িতে আগুন ধরে যায়। আশপাশে ভবনের আগুন লেগে অনেক দোকানি মারা গেছেন।

ইকবাল আহমেদ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, অনেকে গাড়ি থেকে বের হয়েছেন। বের হওয়ার পর আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাননি। অনেক রিকশা যাত্রী ও সাইকেলচালকও আগুনের কবলে পড়ে মারা গেছেন।

তিনি বলেন, বেশি মারা গেছেন রাস্তায় থাকা লোকজন। আগুন লাগার পর যারা ভবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাস্তায় এসেছেন, তাদের অনেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেননি।

ফায়ার সার্ভিসের প্রধান আলী আহমেদ আলজাজিরা টেলিভিশনকে বলেন, একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে। আর ভবনের ভেতর প্লাস্টিকের দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থ থাকায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, চারটি লাগোয়া অবকাঠামোর ভেতর দিয়ে আগুনের বিস্তার ঘটেছে। এসব ভবনে প্লাস্টিকের দানা ও বডি স্প্রের মজুদ ছিল।

‘সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে- আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন সড়কজুড়ে যানজট ছিল। এতে সরু গলির ভেতর দিয়ে লোকজন পালাতে পারেননি।’

অগ্নিকাণ্ডে আহত হাজী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, আমি নিজ চোখে দেখেছি- ব্যাপক বিস্ফোরণে রাস্তার পাশে দেয়াল ভেঙে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে।

‘বিস্ফোরণটি যখন ঘটে, তখন আমি রিকশায় ছিলাম। রিকশাটির চালক বেঁচে আছেন কিনা, তা আমি জানি না।’

অগ্নিনির্বাপণ কর্মী আজিজুল ইসলাম বলেন, যে ভবনটি থেকে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়েছে, সেটির নিচতলার মার্কেটের করিডরের শেষ মাথা থেকে একসঙ্গে ২৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

‘মনে হয়েছে, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তারা দৌড়ে গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।’

এছাড়া আশপাশের দোকান ও রেস্তোরাঁ থেকেও লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

প্লাস্টিক ব্যবসায়ী পারভেজ বলেন, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় রানা টেলিকম, বিপরীতে হাবিব টেইলার্স, হায়দার ফার্মেসিসহ আশপাশের দোকানের শাটার বন্ধ করে দেয়।

‘তারা হয়তো ভেবেছিলেন, শাটার বন্ধ করে দিলে আগুন থেকে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু আগুনের তেজ বাড়ায় তারা সেখানেই নিহত হয়েছেন।’

নূর ইসলাম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, রাজমহল ও উল্টোদিকের হোটেলে যারা ছিলেন, তারা সেখানেই ভস্মীভূত হয়েছেন।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, পাঁচতলা ভবনটির প্রধান ফটকটি আটকানো ছিল। কাজেই সেখানকার অধিবাসীরা ফাঁদে পড়ে বের হতে পারেননি।

ঢাকা ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ইব্রাহীম খান এএফপিকে বলেন, নিহতদের মধ্যে পথচারীও রয়েছেন। কেউ কেউ তখন রেস্তোরাঁয় খাচ্ছিলেন। আবার পাশের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে মশগুল ছিলেন কেউ কেউ।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একটি রিকশার ওপর আমি এক দগ্ধ নারীর মরদেহ দেখেছি। এ সময় তার মেয়েও তার কোলে ছিল।

হাজী আবদুল কাদেরের দোকানটি পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় আমি ফার্মেসিতে ছিলাম। তখন আমি বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছি। ফিরে দেখি যানজটে অচল হয়ে আছে সড়ক। আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।