আর কত দিন মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস?

  শিপন হাবীব ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারি
হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারি

কোনো কোনো শোকও কি বোমার শেলের মতো? তার আঘাত সইতে পারে না কোনো কোনো মানুষ? করুণ মৃত্যু স্বজনদের শুধু সারা জীবন কাঁদায়ই না, মৃত্যুর দিকেও ঢেলে দেয়।

পুরান ঢাকার চকবাজার অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে ৭০টি তাজা প্রাণ নিঃশেষ হয়ে গেল। বুধবার রাত ১০টা ৩০ মিনিট। হঠাৎ বিকট শব্দে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাঁচটি ভবনে। এরপর সেই বিধ্বংসী আগুন রাস্তায় থাকা যানবাহন পুড়ে অঙ্গার করে দেয়। পরে লাশ মেলে বাসায়, রাস্তায়, দোকানে দোকানে।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে লাশ উদ্ধার শুরু হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল পুরাতন ও নতুন মর্গে এক এক করে স্তূপ হয় ৬৭টি লাশে। পেশাগত কারণে ছুটে যেতে হয়েছে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে। মানুষ যে কোনো কোনো সময় কী পরিমাণ যে অসহায় হয়, তা খুব কাছ থেকে দেখা গেছে।

ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ ৯ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। জাতীয় বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন বললেন, আগুনে পোড়া ব্যক্তিরা ৮ থেকে ১০ শতাংশ পুড়লেও শঙ্কামুক্ত বলা যায় না। কারণ, তাদের অধিকাংশেরই শ্বাসনালি পুড়ে যায়। দগ্ধ ব্যক্তিদের কেউ রিকশাচালক কেউ বা সাধারণ শ্রমিক, ব্যবসায়ী।

বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই হাসপাতালের দুই মর্গের সামনে স্বজনদের ভিড় বাড়তে থাকে। লাশ পাওয়ার জন্য, একটি বার দেখার জন্য স্বজনরা টানা বিলাপ করছিল। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। যিনি সান্ত্বনা দেবেন, তিনিই কাঁন্না করছিলেন।

মর্গের সামনে থাকা সাংবাদিক ও কৌতূহলী মানুষের জটলাও কম নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য তথা হাসপাতাল স্টাফ মানুষকে দূরে দাঁড়াতে বলছিলেন। পুলিশ নির্ধারিত এলাকায় ক্রাইম সিন দিয়ে দর্শনার্থী, স্বজনদের আটকে দিচ্ছে।

জরুরি বিভাগের পাশে থাকা লাশঘরে ‘জরুরি মর্গ’ ১১টি লাশ রাখা হয়। স্বজন আর কৌতূহলী মানুষের চাপে এ লাশ ঘরের দরজা লাগানো কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না সংশ্লিষ্টদের। একের পর স্বজনরা বিলাপ করে করে লাশগুলো চিহ্নিত করা চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু, কী করে সম্ভব? পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। কোনো কোনো স্বজনরা লাশের ওপর বারবার আছড়ে পড়ছিলেন। বিলাপ করে বলছিলেন, আমার বাবা কই, আমার ছেলে কই, আমার বোন কই, আমার ভাই কই...।

নতুন মর্গে মোট ৫৯টি লাশ রাখা হয়। বাকি ১১টি জরুরি মর্গে। মর্গের সামনে রিয়া ও রিফাত দম্পতির লাশ খোঁজ করছিলেন স্বজনরা। দুই বছর আগে তাদের বিয়ে হয়।

স্বজনরা জানান, রিয়া গর্ববতী ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় ওয়াহিদ ম্যানশনের তৃতীয়তলায় ছিলেন তারা। স্ত্রী (রিয়া) অসুস্থ থাকায় ভবন থেকে নামতে পারেনি। স্ত্রীকে না নিয়ে নামতে চাইছিল না স্বামী রিফাতও। মুহূর্তেই রিয়া, রিফাতসহ তাদের অনাগত সন্তান বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে করুণ মৃত্যু হয়।

একমাত্র ছেলে ওয়াসিস উদ্দিন মাহিদকে হারিয়ে মর্গের সামনে চিৎকার করছিলেন বৃদ্ধা বাবা নাছির উদ্দিন। বারবার মর্গের ভেতরে থাকা সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করছিলেন, ‘দয়া করে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিন। আমার মানিককে আমি দেখি। আমার মানিক কই’।

ভেতর থেকে বলছিলনে, একটু অপেক্ষা করুন। আমরা লাশ ময়নাতদন্ত করছি। কিন্তু বাবার মন কিছুতেই মানছিল না। একপর্যায়ে এ বাবা জোর করে মর্গের ভেতর ঢুকে পড়েন।

ছেলেকে শনাক্ত করতে পেরে লাশের ওপর আছড়ে পড়ে কান্নায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। বাবার এমন কান্না আর আহাজারি দেখে ইন্টার্ন করা ডাক্তারদের চোখও ভিজে গিয়েছিল।

মর্গের ভেতর জায়গা না হওয়ায় প্রায় ৩৫টি লাশ মর্গের ভেতরস্থ বারান্দায় ময়নাতদন্ত করেন চিকিৎসকরা।

মাহফুজ নামের এক যুবক বাবার লাশের ওপর পড়ে বিলাপ করছিলেন। বলছিলেন, ‘ও বাবা তুমি কথা বল, বাবা, অ বাবা তুমি কথা বল না...।

ওই সময় যুবকটির পিঠে একজন পুলিশ হাত দিয়ে বলছিল, বাবা শক্ত হও। বাবার জন্য দোয়া কর। ওই সময় ওই পুলিশের চোখের কোণোয় জল টলমল করছিল।

শিক্ষার্থী কাওসার আহমেদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বন্ধুদের নিয়ে চকবাজার শাহী জামে মসজিদ এলাকায় আল-মদিনা ফার্মেসি দেন। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কাওসারের প্রাণ কেড়ে নেয়।

তার লাশ শনাক্ত করতে মর্গে এসেছিল তার স্ত্রীসহ স্বজনরা। স্ত্রীর সঙ্গে এসেছিল তাদের ১১ মাস বয়সী যমজ শিশুও। স্ত্রী ও স্বজনদের আহাজারিতে মর্গ এলাকায় সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

রোহান নামের এক যুবকের ছবি বুকে নিয়ে মর্গের পাশে দৌড়াচ্ছিলেন তার চাচা লোকমান। চাচা লোকমান বলছিলেন, রোহানকে পাওয়া যাচ্ছে না। বেঁচে আছে কিনা তা-ও তারা জানেন না। বুধবার রাত ১১টার পর থেকে তার খোঁজ নেই। রোহান নর্থ সাউথে বিবিএ পড়ত। তার লাশও পাওয়া কিংবা শনাক্ত করতে পারছেন না।

অন্য দিকে বৃহস্পতিবার রাত ৮টা পর্যন্তও স্বজনকে জীবিত অথবা মৃত খুঁজে পেতে কেউবা এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছিল।

মর্গের চারদিকে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। কেউ ছেলের, কেউ মেয়ের, কেউ স্বামী, কেউ বাবার, কেউ মায়ের লাশ নিতে এসেছেন। কেউ লাশ শনাক্ত করতে পারছেন, কেউ পারছেন না।

লাশ শনাক্ত না করতে পারা স্বজনদের বিলাপ যেন শেষ হচ্ছে না। পরিস্থিতিটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বজনদের সঙ্গে কথাও বলা যাচ্ছে না। কেউ শোকে পাথর হয়ে আছেন, কেউ টানা কান্না করছেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ জানালেন, ওই সময় তিনি স্বজনদের ডাকছিলেন। লাশ দেখে শনাক্ত করতে বারবার অনুরোধ করছেন। কিন্তু লাশ শনাক্ত হচ্ছিল না।

সোহেল মাহমুদ বললেন, এসব আর কত দিন। মানুষ কি সচেতন হবে না। মানুষের এমন মৃত্যু আমাদের অনেক কাঁদায়। সন্ধ্যা ৭টা পযর্ন্ত ৩৬টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও লাশ শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। শনাক্ত না করা লাশগুলো আমরা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করব। তিনি বলেন, লাশ হয়তো এমন করে হস্তান্তর করা হবেই, শনাক্ত না হলে ডিএনএর মাধ্যমে। শনাক্ত না হওয়া লাশগুলো হয়তো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে। কিন্তু এর শেষ কোথায়। এমনটা বারবার বলছিল লোকজন।

সচেতন লোকজন বলছিল, এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মানবসৃষ্ট। অর্থাৎ এমন মৃত্যু নিশ্চিত করে বলা যায়, হত্যা কিংবা খুন।

পুরান ঢাকায় মানুষকে মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস করতে হয়। তথ্যমতে, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক পণ্যের গুদাম রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতে। আর মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন।

এসব তথ্য বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। দগ্ধ হয় প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ। নিমতলীর ঘটনার পরও কি পুরান ঢাকা রাসায়নিক গুদাম মুক্ত হয়েছে? আর মুক্ত না হওয়ায় প্রতিনিয়তই এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

সব মহলের ভাষ্য, পুরান ঢাকায় মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস আর কত দিন? আর কত দিন এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে বসবাস করবে মানুষ। আর কত দিন মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস করতে দেয়া হবে?

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×