আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে মানুষের মতো মানুষ হয়: প্রধানমন্ত্রী

  গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি-যুগান্তর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিশুদের জন্য একটি সুন্দর বাসযোগ্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা। শিশুরা জাতির ভবিষ্যত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আজকের শিশুরা আগামীতে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তারা দেশের নেতৃত্ব দেবে।

তিনি বলেন, আমাদের শিশুরা যাতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্কে গড়ে তুলতে পারে এবং শিক্ষা ও খেলাধুলায় তাদের পারদর্শীতা গড়ে ওঠে সেদিকে আমরা দৃষ্টি দিয়েছি। বঙ্গবন্ধু যেভাবে দেশটাকে গড়তে চেয়েছিলেন-আমরা তার সে স্বপ্নের দেশকে গড়তে কাজ করে যাচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার জন্য সময় পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এরই মধ্যে তিনি শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন।

রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, মাধ্যমিক পর্যন্ত তিনি মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেন। বঙ্গবন্ধু অনেক দূরদর্শী ছিলেন। ১৯৭৪ সালে শিশুদের অধিকার সংরক্ষনে আইন প্রণয়ন করেন। জাতিসংঘ শিশুদের জন্য তখনও কোন আইন করেনি। জাতিসংঘ ১৯৮৯ সালে শিশুদের জন্য আইন করেছে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধুর সেই উদ্দেশ্যের আলোকে আমরা জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করি। শিশুর অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করেছি। কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া, ল্যাব তৈরি করে দিয়েছি যাতে এসব আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে দেশের সকল শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে বই দিচ্ছি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের ব্রেইল বইয়ের ব্যবস্থা করেছি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দিচ্ছি যাতে শিক্ষার্থীদের বাবা-মা তাদের স্কুলে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া স্কুলে টিফিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেয়েদের জন্য সুব্যবস্থা করে দিচ্ছি যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা মানুষের মতো মানুষ হয়।

তিনি বলেন, টুঙ্গিপাড়ার এই মাটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহন করেছেন এবং এই মাটিতে তিনি তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। যে নেতার জন্ম না হলে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেতাম না। “বঙ্গবন্ধুর জম্মদিন, শিশুর জীবন করো রঙ্গিন ” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবছর জাতির জনকের ৯৯-তম জম্মবার্ষিকী এবং জাতীয় শিশু দিবস উদযাপিত হচ্ছে। সেই মহান নেতার জম্ম শতবার্ষিকী আমরা উদযাপন করতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মার্চ মাস আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাসে জাতির পিতা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন। এ মাসেই জাতির পিতা জন্মগ্রহন করেন। আর এ মাসেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ মাসে আমরা জাতির পিতার ৯৯-তম জন্মদিন পালন করছি। আগামীতে আমরা জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন কবর। এছাড়া ২০২০-২১ সালের এই বর্ষকে আমরা মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছি।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ এবং তিনি যেভাবে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবেসেছিলেন-তা আর কোন নেতার মধ্যে ছিল না। বাংলাদেশের মানুষ ছিল নিপীড়িত, বঞ্চিত ও দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত। ছোট বেলা থেকেই এসব মানুষগুলোকে দেখে বঙ্গবন্ধুর হৃদয় কাঁদত। তাই তিনি জীবনের সবকিছুই বিলিয়ে দিয়েছিলেন এসব মানুষের কল্যানের জন্য।

তিনি বলেন, এদেশের মানুষের কথা বলতে গিয়েই তিনি বছরের পর বছর কারা নির্যাতন ভোগ করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তার জীবনে নেমে আসে সীমাহীন অত্রাচার ও নির্যাতন। কিন্তু কোন অত্যাচার নির্যাতন এমনকি ফাঁসির দড়িও তাকে দমাতে পারেনি। তিনি কখনও অন্যায়ের কাছে আপোষ করেননি। তিনি তার সংগ্রাম অব্যাহত রেখে আমাদের জন্য একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় শিশু দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে একটি সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এদেশের প্রতিটি শিশু তার জীবন মান গড়ে তুলবে, শিক্ষা ও উন্নত জীবন পাবে এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু জাতির পিতা তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারলেন না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে ঘাতকের বুলেট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার মা, আমার ছোট তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল , শেখ জামাল তাদের স্ত্রী, ছোট ভাই শিশু রাসেল ও আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসেরকে হত্যা করে ঘাতকরা। তারা আমার তিন ফুফুর বাড়িতে আক্রমণ করে। তাদের উপর হত্যযজ্ঞ চালানো হয়। ওই হত্যাযঞ্জে প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী সেইদিনের সেই দুঃসহ ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় তার চোঁখে অশ্রুবর্ষণ হতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, আমরা পরিবার হারিয়েছি। আপনজন হারিয়েছি। আমরা দুইবোন বিদেশে, ছিলাম বলে বেঁচে যাই। কিন্তু সেদিন বাংলাদেশের মানুষ হারিয়েছিল তাদের বেঁচে থাকার সকল সম্ভবনা, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ৭৫-র পর আমরা শিশু, কিশোর, যুবক কেউ আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি তার সঠিক ইতিহাস জানতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। তবে সত্যকে কখনও মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায়না। সত্যের জয় একদিন হবেই। সেটাই প্রমাণ হয়েছে যে সত্য আজ উদভাসিত হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বিগত ২১ বছর ওই ভাষণ বাজানো যেত না। বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভাষণ বাজাতে গিয়ে তাদের আঘাত পেতে হয়েছে। জীবন দিতেও হয়েছে অনেককে। তারপরে ওই ভাষণ তারা ধরে রেখে ছিল। তাদের এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ভাষণটি আজ জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়ে বিশ্ব দরবারে মর্যাদা পেয়েছে। পাশাপাশি ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক দলিলে স্থান পেয়েছে। যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মুখের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে তার বক্তব্যে বলেন, শিশুকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু মানুষকে ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন মানবদরদী। মাইলের পর মাইল স্কুলে হেঁটে আসত এমন শিক্ষার্থীর নিজের ছাতা দিয়ে দিতেন। ছাত্রজীবনে গরিব ছাত্রদের যাদের বই কেনার সমর্থ ছিল না বঙ্গবন্ধু তাদের নিজের বই দিতেন। ক্ষুধার্ত ছাত্রদের বাড়িতে নিয়ে এসে নিজের খাবার ভাগ করে খেতেন। ওই সময় আমাদের দেশে প্রায়ই দুর্ভিক্ষ হতো। বঙ্গবন্ধু কারো কাছে না শুনে ক্ষুধা পিড়িতদের ধানের গোলা কেটে বিলিয়ে দিতেন। আমার দাদা-দাদি বঙ্গবন্ধুকে এসব কাজে কখনও তাকে বাধা দিতেন না। বরং সমর্থন করতেন। বাবা-মায়ের সমর্থনের কারণেই বঙ্গবন্ধু এতোবড় আত্মত্যাগ করতে পেরেছেন।

কবি সুকান্তের কবিতার কয়েকটি চয়ন “চলে যাব, তব যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপনে এ পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল। এ বিশ্বকে মিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার অঙ্গীকার।”

আবৃত্তির মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রী শিশু সমাবেশে তার বক্তব্য শেষ করেন।

শিশু প্রতিনিধি লামিয়া সিকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিশু প্রতিনিধি আরাফাত হোসেন।

এ সময় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার এ এম আলী আজম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ মোখলেসুর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×