বনানীর আগুনে নিহত অন্তঃসত্ত্বা রুমকির শেষ ফোনালাপ

  ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি ২৯ মার্চ ২০১৯, ২১:৩৭:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

রুমকি আক্তার ও তার স্বামী মাকসুদুর রহমান জেমি। ফাইল ছবি

রাজধানীর বনানীতে বহুতল ভবন এফ আর টাওয়ারে বৃহস্পতিবার দুপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার গ্রামে বাবা আশরাফ হোসেনের মেয়ে রুমকি আক্তার (৩০)।

রুমকি ওই টাওয়ারে হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস নামে এক ট্রাভেল এজেন্সিসে চাকরি করতেন।

আগুন লাগার পর ওই ভবনের ভেতর থেকে বাবা আশরাফের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় রুমকির। রুমকি বাবাকে বলেন, 'বাবা চারদিকে আগুন আর ধোঁয়া। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে বাবা। আমি আর হয়তো বাঁচব না বাবা। তোমার জামাইকেও খুঁজে পাইনি। তার মোবাইলও বন্ধ। বাবা আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। আমি তোমাদের কাছে কোনো ভুল করে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা। আমার জন্য তোমরা সবাই দোয়া কর বাবা।'

এরপর মোবাইলের লাইনটি ডিসকানেন্ট হয়ে যায়। এই কথাগুলো ঠিক এভাবে মোবাইলে ফোনে বাবাকে বলেছিল রুমকি আক্তার। রুমকির এই কথাগুলোর রেকর্ড ভাসছিল এলাকায়।

ওই ঘটনায় রুমকির স্বামী মাকসুদুর রহমান জেমি (৩২) ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হন। মর্মান্তিক শুধু নয়, রীতিমতো হৃদয়বিদারক।

রুমকির মা রিনা বেগমের মৃত্যুর ৫ মাস যেতে না যেতে রুমকিও পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিলেন।

শুক্রবার দুপুর ১২টায় রুমকির লাশ নিয়ে আসা হয় জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের চেংমারী বিন্নাকুড়ি আদর্শপাড়া গ্রামে। সেখানে দেখা যায় পরিবারের আহাজারি। চলছে শোকের মাতম। উপজেলার দূরদূরান্ত এলাকা থেকে হাজারো নারী-পুরুষ ছুটে আসেন এখানে। জুমার নামাজ বাদ বিকাল ৩টায় জানাজা শেষে মা রিনা বেগমের পাশে দাফন করা হয় রুমকিকে। পারিবারিক সূত্রমতে, রুমকি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

সূত্র জানায়, জলঢাকা বিন্নাকুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, জলঢাকা রাবেয়া কলেজ থেকে এইচএসসি, রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ব্যবসায় বাণিজ্যে অনার্স এবং ঢাকার তিতুমীর কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন রুমকি।

ঢাকায় মাস্টার্সে পড়াকালীন হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস ট্রাভেল এজেন্সিসে চাকরি নেন রুমকি। একই এজেন্সিতে চাকরিরত ঢাকা গেন্ডারিয়া থানার আলমগঞ্জ ইউনিয়নের মৃত মিজানুর রহমানের ছেলে মাকসুদার রহমানের (৩২) সঙ্গে পরিচয়ের পর একটি ভালো সর্ম্পক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।

পরে পারিবারিকভাবে তিন বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয় তাদের।
গত ১৭ মার্চ ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন রুমকি। গত চারদিন আগে ফিরে যান ঢাকায়। সে সময় রুমকি বলে গিয়েছিল রোজার ঈদে আবার আসবেন। কিন্তু এর আগেই লাশ হয়ে ফিরলেন রুমকি।

ব্যবসায়ী আশরাফ আলীর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রুমকি আক্তার সবার ছোট ছিলেন। রুমকির চাচা সৈয়দ আলী জলঢাকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। বড়ভাই রফিকুল ইসলাম রকি বাবার সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত। ছোট ভাই রওশন আলী রনি গ্রামের বিন্যাকুড়ি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

ছোট ভাই রওশন আলী জানান, মাস্টার্সে পড়াকালীন ওই ট্রাভেলস কোম্পানিতে চাকরি নেন বোন রুমকি। কোম্পানির মতিঝিল প্রধান অফিসে রুমকি কাজ করতেন তখন থেকে।৩-৪ দিন আগে মতিঝিলের অফিস মেরামত কাজ করায় তাকে বনানী অফিসে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে স্বামী মকসুদারসহ চাকরি করছিলেন। আগুনের ঘটনায় তারা দুজনই মারা গেলেন।

ঘটনার দিন রাত ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রুমকির লাশ ও ইউনাইটেড হাসপাতালে রুমকির স্বামীর লাশ শনাক্ত করা হয়।

লাশ নিয়ে আসতে বাবা আশরাফ হোসেন, মামা রউফুল ইসলাম ও ফুফা আতাউর রহমান ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টায় সৈয়দপুর থেকে বিমানে ঢাকায় গিয়েছিলেন।

রুমকির চাচা জলঢাকা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী জানান, ৫ মাস আগে মারা যান রুমকির মা রিনা বেগম। আজ আমরা হারালাম মেয়ে এবং জামাইকে।

রুমকির বাবা জানান,তিন বছরের সংসারে প্রথমবারের মতো আমার মেয়ে রুমকি সন্তানসম্ভবা ছিল। ভেবেছিলাম নাতনি আসছে। নাতনিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। ৫ মাস আগে রুমকির মাকে হারিয়েছি। আজ মেয়েকেও হারালাম। এক নিমিষেই আমার সব শেষ হয়ে গেল। আজ বাবা হয়ে মেয়ের লাশ আমাকে ঢাকা থেকে গ্রামে বহন করে নিয়ে আসতে হলো। বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছে। আল্লাহ ওদের জান্নাতবাসী করুক।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দুপুরে আগুন লাগে এফ আর টাওয়ারে। ভবনের নবম তলায় আগুনের সূত্রপাত। পরে ছড়িয়ে পড়ে ২৩ তলা ভবনের বেশ কয়েকটি তলায়। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ও বিমানবাহিনীর পাঁচটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। ভবনটির ছাদে আটকেপড়া অনেককে উদ্ধার করে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার। এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপণে হেলিকপ্টার থেকে ভবনটিতে পানিও ফেলা হয়।

ভয়াবহ এই আগুনে ২৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের লাশও বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আহত অন্তত ৭৩ জন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত