চোখের জলে ‘বীর’কে বিদায় সহকর্মীদের

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

চোখের জলে ‘বীর’কে বিদায় সহকর্মীদের
ছবি: সংগৃহীত

অশ্রুসিক্ত নয়নে বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনে আটকেপড়া মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দেয়া ‘বীর’ সোহেল রানাকে বিদায় জানালেন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। এ সময় তারা লাশ ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এবং এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফুলবাড়িয়ার সদর দফতরে ফায়ার সার্ভিসকর্মী সোহেল রানার লাশ আনা হলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখানেই সোহেল রানার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়।

এ সময় ফায়ারম্যান হাসান বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে অনেক দিন কাজ করেছি। কখনও ভাবতে পারিনি সোহেল এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। সোহেল খুব ভালো ছিল, কম কথা বলত, কিন্তু সবার সঙ্গে মিশত।’

কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে কর্মরত ছিলেন সোহেল রানা। এই স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার বজলুর রশীদ বলেন, ছেলেটার মুখের দিকে আমি তাকাতে পারছি না। আমরা সঙ্গে সে কাজ করত। ঘটনার দিন আমার সঙ্গেই এফআর টাওয়ারে গিয়েছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি সোহেলের বাবা, মা ও ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।’

জানাজা শেষে সোহেলের মরদেহ গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাড়ি পর্যন্ত তার বিদায় যাত্রায় পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরা সঙ্গী হয়েছেন। জানাজায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন, সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খান, পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইব্রাহীম খান, এনটিএমসির ডিজি জিয়াউল আহসান উপস্থিত ছিলেন।

জানাজার আগে বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ফায়ারম্যান সোহেল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসসহ আমরা সবাই তার পরিবারের প্রতি লক্ষ রাখব। তার পরিবারে যদি উপযুক্ত কেউ থাকে তাকে একটি চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, সোহেল রানা মানুষকে ভালোবাসতেন, দেশকে ভালোবাসতে- এর প্রমাণ তিনি রেখে গেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এফআর টাওয়ারে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তার মৃত্যুতে গোটা জাতি শোকাহত। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

এর আগে সকালে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমইএচ) হিমঘর থেকে তার লাশ ফায়ার সার্ভিসের সদর দফতরে আনা হয়। জানাজার পর সহকর্মীদের শ্রদ্ধা শেষে সোহেলের লাশবাহী গাড়ি গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনার উদ্দেশে রওনা হয়।

প্রসঙ্গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারের ভয়াবহ আগুনে ঘটনাস্থলে ২৫ জন ও হাসপাতালে একজন নিহত হন। আগুনের ঘটনায় উদ্ধার অভিযানে গিয়ে আহত ফায়ার সার্ভিসকর্মী সোহেল রানা সিঙ্গাপুরে জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান। সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় সোমবার ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত ২টা ১৭ মিনিটে সোহেল মারা যান। সোমবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে করে তার মৃতদেহ দেশে আনা হয়।

২০১৫ সালে মুন্সীগঞ্জের কমলাঘাট নদী ফায়ার স্টেশনে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন সোহেল রানা।

এর কয়েক মাস পরেই বদলি হন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে। গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন রানা। ২৩তলা ওই ভবনে আটকাপড়া মানুষকে ল্যাডারের মাধ্যমে নামাচ্ছিলেন তিনি। সোহেল চার-পাঁচজন আটকেপড়া মানুষ নিয়ে নামার সময় দেখেন তার উদ্ধারকারী ল্যাডারটি ওভারলোড দেখাচ্ছে।

ওভারলোড হলে সাধারণত সিঁড়ি নিচে নামে না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যায়। এ অবস্থায় ল্যাডারের ওজন কমাতে একপর্যায়ে সোহেল ল্যাডার থেকে বেয়ে নিচে নামতে থাকেন। এতে ল্যাডারটির ওজন কমে যাওয়ায় সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়। এরপরই দুর্ঘটনাটি ঘটে, যা তার জীবনের আলো নিভিয়ে দিল।

ল্যাডারের ভেতরে সোহেলের একটি পা ঢুকে যায়। এ ছাড়া তার শরীরের সেফটি বেল্টটি ল্যাডারে আটকে পেটে প্রচণ্ড চাপ লাগে। এরপর থেকেই সংজ্ঞাহীন সোহেল। দুর্ঘটনার পরপরই সোহেল রানাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দিলেও প্রত্যাশানুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না।

পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার। সে কারণে সিএমএইচের চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ৫ এপ্রিল রানাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : বনানীতে এফআর টাওয়ারে আগুন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×