যে মৃত্যু কাঁদাচ্ছে সবাইকে

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:০০ | অনলাইন সংস্করণ

যে মৃত্যু কাঁদাচ্ছে সবাইকে
জায়ান। ছবি: যুগান্তর

ছোট্ট শিশু জায়ান বাবা-মায়ের সঙ্গে গিয়েছিল ভ্রমণে। ফিরল লাশ হয়ে। ফুটফুটে উচ্ছ্বল এই শিশুর মৃত্যু মেনে নেয়া কঠিন।

রোববার ইস্টার সানডেতে শ্রীলংকায় রেস্তোরাঁয় সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় নিহত হয় জায়ান। সন্ত্রাসবাদের শিকার হয় ছোট্ট শিশুটি।

আর এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি তার বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স। বাবাকে আইসিইউতে রেখে লাশ হয়ে ফিরল জায়ান। ছেলেকে শেষ দেখা দেখতে পারলেন না মশিউল।

জায়ানের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউ। সবার চোখে ভাসছে জায়ানের ফুটফুটে মুখের চওড়া হাসি। তার শোক সইবে কীভাবে পরিবার?

জায়ান চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি। সপরিবারে শ্রীলংকা বেড়াতে গিয়েছিল সে। রোববার ইস্টার সানডেতে বাবা-ছেলে সেখানকার সাংগ্রি লা হোটেলের নিচতলার রেস্তোরাঁয় সকালের নাশতা করতে গিয়ে বোমা হামলার শিকার হন। সেই সময় হোটেল কক্ষে থাকায় বেঁচে গেছেন জায়ানের মা শেখ আমেনা সুলতানা সোনিয়া ও ছোট ভাই দেড় বছর বয়সী জোহান চৌধুরী।

এ ঘটনায় তার বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার বাবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। শরীরে পাওয়া গেছে বোমার স্প্লিন্টার। পাকস্থলীতেও প্রচণ্ড চোট লেগেছে। শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে তিন কেজি। ৭২ ঘণ্টা না গেলে কিছুই বলা যাবে না।

গুরুতর আহত জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সকে এখনই দেশে ফেরানো যাচ্ছে না। তিনি কলম্বোর একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বামীর পাশে থাকায় ছেলের লাশের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি জায়ানের মা এবং শেখ সেলিমের মেয়ে শেখ আমেনা সুলতানা সোনিয়া।

জায়ানের অকাল মৃত্যুতে তার নানা শেখ সেলিমের বনানীর ২/এ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়িটিতে চলছে মাতম। জন্মের পর থেকে এই বাড়িতেই নানা-নানি, মামা ও মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে থাকত জায়ান। ছোট্ট শিশুটিকে হারিয়ে তাই শোক কাটাতে পারছেন না স্বজনদের কেউ-ই।

এদিকে মাকে শ্রীলংকা রেখেই জায়ান চৌধুরী আজ ফিরেছেন নানাবাড়ি। তবে স্বাভাবিকভাবে নয়। ফিরেছেন লাশ হয়ে।

বুধবার বেলা দেড়টার দিকে ছোট্ট জায়ানের লাশবাহী গাড়ি বনানীতে শেখ সেলিমের বাসায় পৌঁছায়। আদরের নাতির লাশ বুঝে নেন নানা শেখ সেলিম। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

জায়ান ছিল শেখ সেলিমের অত্যন্ত প্রিয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে নানার বাসায়ই থাকত সে। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও নাতির জন্য সময় বরাদ্দ রাখতেন সেলিম। নানাকে দেখামাত্রই জায়ান জড়িয়ে ধরে চুমু খেত। সেই নাতির অকালে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না শেখ সেলিম।

এর আগে বুধবার বেলা ১২টা ৪২ মিনিটে শ্রীলংকা থেকে জায়ানের লাশ বহনকারী উড়োজাহাজ ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। লাশ ১টা ১০ মিনিটে আসার কথা থাকলেও আধা ঘণ্টা আগে এসে পৌঁছেছে।

বিমানবন্দরে শিশু জায়ানের লাশ গ্রহণ করেন শেখ সেলিমের স্বজনরা। সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।পরে লাশবাহী গাড়ি বনানীতে শেখ সেলিমের বাসার উদ্দেশে রওনা হয়। জায়ানের লাশের অপেক্ষায় বিমানবন্দর ও বনানীর বাসায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও ভিড় করেন।

বাদ আসর বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে জায়ানের জানাজা হবে। পরে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

৮ বছর বয়সী জায়ান রাজধানীর উত্তরার সানবিম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের কেজি-২ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।শিশু জায়ান ছিল পরিবারের মধ্যমণি। পরিবার তো বটেই নানাবাড়ি-দাদাবাড়ির সব আত্মীয়র প্রিয়মুখ ছিল জায়ান। সবার সঙ্গে মিশতে পারত ছোট্ট জায়ান।

বাসায় এলেই নানা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে উঠত সে। রাজনৈতিক শত ব্যস্ততার মাঝেও শেখ সেলিম নাতির জন্য সময় বের করতেন। তার প্রতি অন্যরকম একটা টান সবসময় অনুভব করতেন। ফুটফুটে নাতিকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল শেখ সেলিম।

জায়ান চৌধুরী নিহত হওয়ার খবরে সর্বত্র নেমে আসে শোকের ছায়া। রোববার রাতে এ খবর প্রকাশের পর দলমত নির্বিশেষে সবাই শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। শোকের ছায়া নেমে আসে বনানীর বাড়িটিতে।

এ বাড়িতেই নানা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, নানি, দুই মামা- শেখ ফজলে ফাহিম ও শেখ ফজলে নাঈম, মা শেখ আমেনা ফজলুল করিম সোনিয়া, বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকত জায়ান। সারাক্ষণ ক্রিকেট খেলে মাতিয়ে রাখত সে। নানা-নানি, মামা-মামি, বাবা-মা এমনকি বাড়ির দারোয়ান-কেয়ারটেকারদেরও প্রিয় ছিল জায়ান। ক্রিকেট খেলায় সবার সঙ্গে গড়ে ওঠে তার সখ্য।এছাড়া জায়ান ভালো কোরআন তেলাওয়াত করতে পারত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাত ভাই শেখ সেলিম। তাই পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত জায়ানের। দেখা হওয়া মাত্রই জায়ান প্রধানমন্ত্রীকে দাদু বলে জড়িয়ে ধরত। চুমু খেত। প্রধানমন্ত্রীও আদরের নাতিকে নিয়ে খুনসুটিতে মেতে উঠতেন।জায়ানে মৃত্যু দাগ কেটেছে প্রধানমন্ত্রীকে।মঙ্গলবার ব্রুনাই সফর থেকে ফিরে বিমানবন্দরেই শেখ সেলিমের কাঁধে হাত রেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী।

জায়ানের মতো আর কেউ যেন সন্ত্রাসের শিকার না হয়। আর কোনো শিশু যেন নৃশংস হামলায় নিহত না হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : শ্রীলংকায় গির্জা ও হোটেলে সিরিজ হামলা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×