অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের দায়েই খালেদা জিয়ার দণ্ড

  যুগান্তর রিপোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমানসহ ৬ আসামি ‘রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী’ হিসেবে গণ্য হবেন বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। তারা একে অপরের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত আসামিদের সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন।

রায় ঘোষণার ১২ দিন পর সোমবার বিকাল ৪টার দিকে মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন বিচারক। ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। সাজা ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে নাজিমউদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এ মামলায় আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে বর্তমানে ওই টাকা খুব বেশি না হলেও ঘটনার শুরুতে ওই পরিমাণ অনেক ছিল। আসামিদের মধ্যে খালেদা জিয়া ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে কাজী কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন। আসামি ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা হয়ে আসামি খালেদা জিয়াকে সরকারি এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা করেছেন। পরবর্তী সময়ে ওই হিসাব থেকে দুটি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে সরকারি অর্থের চেক বেআইনিভাবে প্রদান করে ওই দুই আসামিকে (খালেদা জিয়া ও কাজী সালিমুল হক কামাল) অপরাধ করতে সহায়তা করেছেন।

আসামি তারেক রহমান, মমিনুর রহমান ও শরফুদ্দিন আহমেদ কৌশল অবলম্বন করে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা একে অপরের সহাযোগিতায় আত্মসাৎ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। এর মাধ্যমে ওই ৬ জন আসামির সবাই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন। তারা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবেও গণ্য হবেন। অর্থনৈতিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে এবং তার বাজে প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রামিত হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় তার নির্দেশে তার সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামের একটি তহবিল খোলেন।

ওই তহবিলের নামে ১৯৯১ সালের ২ জুন সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় চলতি হিসাব নং-৫৪১৬ খোলেন। ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ডিডি মূলে ওই অ্যাকাউন্টে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান আসে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে ওই অর্থ প্রদান করা হয়। তিনি ওই অর্থ গ্রহণ না করে ফেরত দিতে পারেন। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) গ্রহণ করায় তা সরকারি অর্থে রূপান্তরিত হয়।

ওই এতিম তহবিলের জিম্মাদার ছিলেন খালেদা জিয়া। ওই অর্থের ওপর তার আধিপত্য ছিল। ওই সম্পত্তির তিনি কাস্টডিয়ান ছিলেন। ওই অর্থ থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা করে দুটি চেক জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দেয়া হয়।

এতিম তহবিলের কাস্টডিয়ান হওয়া সত্ত্বেও ওই তহবিল থেকে বেআইনিভাবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ওই টাকা প্রদান করা হয়। পরে ওই ট্রাস্টের নামে এসটিডি হিসাব ৭ থেকে আসামি তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানের স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় এবং সেখান থেকে ওই ব্যাংকের নিউ ইস্কাটন শাখায় টাকা আসে। সেখান থেকে আসামি কাজী সালিমুল হক এবং জনৈক গিয়াস উদ্দিনের হাত হয়ে আসামি শরফুদ্দীন আহমেদের হাতে ওই টাকা চলে যায়। এভাবেই প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

ওই এতিম তহবিলের টাকার ওপর খালেদা জিয়ার এনট্রান্সমেন্ট ছিল। যেভাবে ওই টাকা ব্যয় করা উচিত ছিল তা না করে নিজেই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অথবা অন্য আসামিদের লাভবান করা বা ওই টাকা আত্মসাৎ করার কাজে সহায়তা করে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন।

রায়ে আদালত বলেন, আসামিদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি এতিম তহবিলের ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই ধারায় সংঘটিত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর মেয়াদ পর্যন্ত দণ্ড হতে পারে। অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিষয়েও বিধান রয়েছে।

প্রসিকিউশনপক্ষ উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে আসামি খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মমিনুর রহমান, কাজী সালিমুল হক এবং ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী উভয় আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার বিধান মোতাবেক শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তবে ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৬ ধারার বিধান বিবেচনায় গ্রহণ করে আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ ছাড়া বাকি পাঁচ আসামিকে যে কোনো একটি আইনে দণ্ডিত করে আদেশ দেয়া বিধেয় হবে।

আদালত আরও বলেন, আসামি খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, কাজী সালিমুল হক ওরফে কাজী কামাল, শরফুদ্দীন আহমেদ, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান কেবলমাত্র দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারার অধীনে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তাদের ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অধীনে শাস্তি প্রদান করা যাচ্ছে না। যদিও তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় বিধান মোতাবেক সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ড, যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিরা একে অপরের সহায়তায় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন। সে কারণে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে আসামিদের বয়স ও সামাজিক অবস্থা এবং আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ বিবেচনা করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা সমীচীন হবে না।

আসামি খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। এ ছাড়া তিনি একটি রাজনৈতিক দলের কর্ণধার। তিনি একজন বয়স্ক মহিলা। ফলে তার শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা সমীচীন হবে। বাকি পাঁচ আসামিকেও তাদের বয়স ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রত্যেকের দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারার অধীনে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা উচিত।

ঘটনাপ্রবাহ : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.