মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় ফেসবুকে ক্ষোভ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ জুলাই ২০১৯, ১৫:২২ | অনলাইন সংস্করণ

মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় ফেসবুকে ক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের পর বুধবার আদালতে হাজির করা হয়। এদিন তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এ সময় এজলাসে মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে তাকে।

রিফাত হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রধান সাক্ষী মিন্নিকে গ্রেফতারের পর থেকে মামলার ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। এ ঘটনায় মিন্নির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্যে একাধিকবার দাবি করা হয়।

এমতাবস্থায় বুধবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওই দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সঞ্জিব দাস। তিনি আদালতকে জানান, এ ঘটনায় আইনজীবীদের কেউ আসামিদের পক্ষে নিয়োগ না হওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে মিন্নির পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি কেবল এ মামলার সাক্ষীই নন, তিনি নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রীও। ঘটনার দিন তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে সেই দৃশ্যও দেখা গেছে। ফেসবুকে মিন্নির এই সাহসিকতার প্রশংসাও করেছেন অনেকে। কিন্তু বুধবার বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্নির পক্ষে বারের একজন আইনজীবীও এগিয়ে আসেননি। সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ঝড় বইতে থাকে। ফেসবুকে বিভিন্ন মন্তব্য ও প্রশ্ন রেখে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিভিন্ন জন।

সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি লিখেছেন, ‘মিন্নির পক্ষে স্থানীয় কোনো আইনজীবী লড়তে চাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন- এতে তারা বিতর্কিত হবেন। আচ্ছা মিন্নি কি একজন স্বীকৃত ধর্ষক? কিন্তু স্বীকৃত ধর্ষকের পক্ষেও তো আইনজীবীরা লড়তে কুণ্ঠাবোধ করেন না। আহা দুনিয়া!’

মানবাধিকারকর্মী তাহেরা বেগম জলি তার ফেসবুকে লিখেছেন—

‘একজন আইনজীবী পাওয়ার অধিকারও মিন্নির নেই? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কতিপয় দুর্বৃত্ত মিন্নিকে নিয়ে কুৎসিত প্রচারে মেতে উঠেছে, যা শত নারী ধর্ষণের সমান। আমরাও যখন এখানে মিন্নির ব্যাপারে স্বচ্ছতার দাবি তুলছি, তখনও দু-একজন ভদ্রলোক(!) বিকৃত নোংরা পদ্ধতিতে আমাদের সামনে হাজিরা দেয়ার চেষ্টা করছেন। এই সেদিনও যে অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে নিয়ে এমনই বীভৎস খেলায় মেতে উঠেছিল সিরাজ বাহিনী, তা আসলে মনে থাকে না। আমরা ভুলে যাই, কিছু নরপশু দেখতে অবিকল মানুষের মতোই। নুসরাতের বিরুদ্ধে ঘাতক নিজে ধর্ষক সিরাজের পক্ষে ব্যানার নিয়ে রাজপথ দখল করেছিল। অবিকল কিনা জানি না, তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি মিন্নির বিরুদ্ধেও কিছু অভিজাত দুর্বৃত্ত একইভাবে মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। নুসরাতের বিরুদ্ধে ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপারের ভূমিকা আমরা সবাই জানি। ঠিক একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বরগুনাতেও। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! সেই ধর্ষক নুসরাত হত্যাকারী সিরাজের জন্য উকিলসমাজ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ধর্ষণের সাফাই গাইছে। আমরা তবে কোথায় যাব। তবু সমগ্র নারী জাতির যা হয় হবে। কিন্তু যারা বাবা-মা? তারা একটু ভাববেন না? এমন অসংখ্য উকিল তো আছেন, যারা কন্যাসন্তানের জনক-জননী। অন্তত তারা কেন দাঁড়াবেন না মিন্নির পাশে। আমি জানি না, বা এ পর্যন্ত বলিনি মিন্নি প্রশ্নবিদ্ধ নয়। কিন্তু এটুকু আমরা কেন দাবি করব না, মিন্নি আর ১০ জনের মতোই বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। মিন্নিকে নিয়ে যা ঘটছে, তাতে এই দাঁড়াচ্ছে- ওকে নিয়ে যা খুশি তাই করা যায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের এক পরিচিত সম্ভ্রান্ত নারীকে খানসেনারা দড়ি দিয়ে ট্রাকের পেছনে বেঁধে গোটা মাগুরা শহর টেনে নিয়ে বেড়িয়ে একসময় মৃত রক্তাক্ত ওই নারীকে নদীর ধারে ফেলে দেয়। আমাদের দেশের নারীদের নিয়ে খানসেনা এবং রাজাকারের সেই বীভৎস উল্লাস কি আজও বন্ধ হবে না? তা না হলে মিন্নির জন্য বরগুনার একজন আইনজীবীরও কেন মনে হলো না- কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মস্তবড় অন্যায়। মিন্নিকে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে যে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হলো, এটি স্বাধীন দেশের একটি কালো অধ্যায়!’

সাংবাদিক সালেহ বিপ্লব লিখেছেন, ‘মিন্নির পক্ষে নাকি কোনো আইনজীবী আদালতে দাঁড়াচ্ছেন না! এ কেমন কথা? এ কেমন আইনের শাসন? হতে পারে মিন্নি জড়িত ছিলেন রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে। হতে পারে মিন্নির স্বভাবচরিত্র ভালো নয়। আরও বহু কিছু হতে পারে।... কোনো আইনজীবী তার পক্ষে না দাঁড়ালে সরকারের দায়িত্ব তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা।’

মিন্নির পক্ষে আদালতে আইনজীবী না থাকার বিষয়ে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি তিন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তাদের দাঁড়ানোর কথা ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় প্রতিপক্ষের ভয়ে তারা আমার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াননি।’

মিন্নির বাবা আরও বলেন, আমার মেয়েকে বুধবার আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আদালতে আমার মেয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেট জিয়াউদ্দিন, অ্যাডভোকেট গোলাম সরোয়ার নাসির ও অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদেরের দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু কী কারণে তারা দাঁড়াননি আমি বলতে পারব না। তবে ধারণা করছি, প্রতিপক্ষের ভয়ে হয়তো কোনো আইনজীবীরা দাঁড়াননি।’

কোন প্রতিপক্ষের কারণে আইনজীবী দাঁড়াননি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোন প্রতিপক্ষ সেটি আপনারাই বুঝে নিন। আমি বলতে গেলে বরগুনা থাকতে পারব না। এ ছাড়া খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সে কারণেই হয়তো সব কাগজপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।’

প্রসঙ্গত বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় ২৬ জুন সকাল ১০টার দিকে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। বিকাল ৪টায় বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

এ হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। হত্যাকাণ্ডের পরের দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এ ছাড়া সন্দেহভাজন অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। এ মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামিসহ এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, চারজন রিমান্ডে আছে।

ঘটনাপ্রবাহ : রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×