সোমবার থেকে কাঁচা চামড়া বেচাকেনার ঘোষণা আড়ৎদারদের

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৮ আগস্ট ২০১৯, ২১:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

সোমবার থেকে কাঁচা চামড়া বেচাকেনা করবেন আড়ৎদাররা
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে কোরবানির চামড়া সংকট নিরসনে বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত

আপনারা (ট্যানারির মালিক) আড়ৎদারদের টাকাও দিবেন না, চামড়াও কিনবেন না, এটি হতে পারে না। সরকার কারো কাছে জিম্মি হবে না। এমন পরিস্থিতি করবেন না যাতে ভবিষ্যতে এ খাতে সরকার হস্তক্ষেপ করে। তাহলে আপনাদের অবস্থা অবনতি ছাড়া ভালো হবে না। সরকার জানে পরিস্থিতি সামাল দিতে কী করতে হবে।

ট্যানারির মালিকদের এমন হুশিয়ারি দিয়ে সর্তক করা হয়েছে রোববার কোরবানির চামড়া সংকট নিরসন বৈঠকে। এ তথ্য পাওয়া গেছে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একটি সূত্র থেকে।

রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অতিগোপনীয়তা রক্ষা করে টানা আড়াই ঘণ্টা এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র আরও জানায়, ওই বৈঠকে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার বিপর্যয়ের জন্য আড়ৎদাররা প্রকাশ্যে দোষারূপ করেছেন ট্যানারির মালিকদের। তারা বলেছেন, সিন্ডিকেট ট্যানারির মালিকরাই করেন। আড়ৎদারদের সঙ্গে ট্যানারির মালিকরা মানুষ নয়, কুকুরের মতো আচারণ করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- শিল্পমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, শিল্প সচিব মো. আবদুল হামিদ, পোস্তার আড়ৎ মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বিকাল সাড়ে তিনটায় ওই বৈঠক শুরু হয়। আড়াই ঘণ্টার ওই বৈঠকে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়। যদিও বৈঠকে সংবাদকর্মীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। বৈঠকে একপক্ষ অপরপক্ষকে দোষারূপ করেন সার্বিক কোরবানির চামড়ার পরিস্থিতি নিয়ে।

এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে আড়ৎদাররা ট্যানারির মালিকদের দোষারূপ করে বলেন, প্রতিবছর কোরবানির চামড়া কেনাবেচা নিয়ে তারা (ট্যানারির মালিক) সিন্ডিকেট করেন। নিয়ম অনুযায়ী কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের পর লবণ দিয়ে তিন মাস পর্যন্ত রাখা যায়। এরপর তা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ট্যানারির মালিকরা এই সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের দু'মাসের মধ্যে চামড়া কিনতে আড়ৎগুলোতে আসেন না। সংরক্ষণের শেষ মাস এলেও মূল্য ঠিকমতো দিতে চান না। চামড়ার গুণাবলী নেই বলে অনেকে বাতিল করে দেন। এভাবে পাইকারদের জিম্মি করে তারা লবণযুক্ত চামড়া কিনেন। এর সুরাহা দরকার।

তারা আরও বলেন, তিন মাসের বেশি সময় চামড়া সংরক্ষণ করা যাবে না। এ সময় ট্যানারির মালিকরা চামড়া কিনতে না চাইলে এর সমাধান কী? রফতানিতে যাবে কিনা এ সময় সরকারের কাছে তা জানতে চান। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রফতানিতে যাওয়ার আগে এ বিষয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন। বাস্তবতার নিরীক্ষে পর্যালোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

বৈঠকে ট্যানারির মালিকরা কোরাবানির পশুর কেনাকাটায় তারল্য সংকটের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে দুষছেন। তাদের মতে, চামড়া কেনার ঋণ ইস্যু করলেও ঈদের আগে ব্যাংকগুলো টাকা ছাড় করেনি। যে কারণে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় ট্যানারির মালিকদের পাওনা অর্থের জন্য ঢালাও দোষারূপ না করার জন্য আড়ৎদারদের প্রতি দাবি জানানো হয়।

সেখানে বলা হয়, কিছু ট্যানারির মালিক আছেন যারা ভালো। আবার খারাপও কিছু আছে। তারা ব্যাংক ঋণের টাকা দিয়ে বাড়ি-গাড়ি করবে, ব্যক্তিগতভাবে ব্যয় করবে অথচ গরিবের চামড়ার মূল্য পরিশোধ করতে চায় না। এ জন্য সরকার একটি তালিকা তৈরি করতে প্রস্তাব দেয়া হয় বৈঠকে। সে তালিকায় ভালো ট্যানারির মালিকদের আলাদা করে বাকিদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ জানানো হয়।

তারা আরও বলেন, এটি উদ্দেশ্যমূলক সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃত যে সব ট্যানারির মালিক আড়ৎদারদের টাকা দেননি তাদের বিচার হওয়া উচিত।

বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি চক্র কোরবানির চামড়া নিয়ে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে। তাদের ধরতে কাজ চলছে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলা হয়, ২ থেকে ৩ জন ঋণ নিয়ে জালিয়াতির কারণেই ট্যানারির মালিকদের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আর পোস্তার ব্যবসায়ীরা যে সব টাকা ট্যানারির মালিকদের কাছে পাওনা রয়েছে তা পরস্পর মিলে সমাধান করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের কিছু করণীয় নেই বলে সাফ ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেয়া হয়।

বৈঠকে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি চামড়া নষ্ট করা হয় বলে সেখানের পাইকারদের সমালোচনা করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে বলা হয়, চট্টগ্রামে ২৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। সেখানে লবণের অভাব ছিল না। এরপরও এই চামড়াগুলো নষ্ট করা হয়। সরকার এ সব কারণে বিব্রত।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে শিল্পমন্ত্রী জানান, কোরবানির পশুর চামড়া মাত্র ১০ হাজার পিস নষ্ট হয়েছে। প্রতিবছর মোট চামড়ার দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার পিস নষ্ট হয়। এ বছর আবহাওয়া গরম থাকার কারণে দশমিক ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১০ হাজার পিস নষ্ট হয়েছে। কোরবানিতে এক কোটি চামড়া সংগ্রহ হবে। এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, কোরবানির চামড়া নিয়ে একটি চক্র কাজ করেছে। ১০ হাজার পিস চামড়া নষ্ট হয়েছে- এটি কী পুঁতে ফেলা, নদীতে বাসিয়ে দেয়া ও রাস্তায় ফেলা চামড়াগুলো বাদে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ে থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে এটি বলা হয়েছে।

কাঁচা চামড়া রফতানি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিল্পমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাঁচা চামড়া অনেক নিয়মনীতি মেনে রফতানি করা হবে।

পাওনা টাকা পরিশোধ জটিলতা কাটছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ট্যানারির মালিক ও আড়ৎদারদের মধ্যে পাওনার সংক্রান্ত বিষয়টি নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এফবিসিসিআইকে। আগামী ২২ আগস্ট সবপক্ষকে নিয়ে বসে এর সমাধান করবে।

বৈঠকে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজি মো. দেলোয়ার হোসেন ওই বৈঠকে বলেন, আজ (সোমবার) থেকে পাইকারি বাজারে কাঁচা চামড়া বেচাকেনা উন্মুক্ত করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই কেনাবেচা হবে।

ট্যানারি মালিকদের কাছে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়ার পরদিন সে অবস্থান থেকে সরে এলেন আড়ৎদাররা।

ঘটনাপ্রবাহ : চামড়া ব্যবসায় সিন্ডিকেট

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×