বিদায়, শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান
jugantor
বিদায়, শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান

  শুভ কিবরিয়া  

১৪ মে ২০২০, ২১:২৫:৫৪  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সে দিন তেমন লোকসমাগম নেই। আনিসুজ্জামান স্যার (১৯৩৭-২০২০) যখন এলেন, তখনও কেন্দ্রের চত্বরে মানুষের আনাগোনা তেমনটা জমে ওঠেনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সে দিন সাপ্তাহিক ছুটি ছিল কী না আমার ঠিক মনে নেই। কিন্তু আনিসুজ্জামান স্যার আসবেন বলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অনেকটা আগেই এসে দোতলার সেই খোলা বারান্দায় বসেছেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আধুনিক ভবন তখনও হয়নি। ঢোকার গেটটা পেরিয়ে বড় সবুজ লনটা ছুঁয়েই যেতে হোত কেন্দ্রের লাইব্রেরি সংলগ্ন একটা আমগাছ ছোঁয়া এই খোলা বারান্দায়। বেতের একসেট সাদামাটা সোফায় এখানেই বিকালে বসতেন সায়ীদ স্যার। জায়গাটা খুবই সুন্দর ছিল।

গেট থেকে আনিসুজ্জামান স্যারকে রিসিভ করে দোতলার বারান্দায় আনতেই সায়ীদ স্যার সিঁড়ির গোড়ায় নেমে এসেই আনিসুজ্জামান স্যারকে অভ্যর্থনা জানালেন। আনিসুজ্জামান স্যার খোলা বারান্দায় বসে আম গাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন সায়ীদ, তোমার এই জায়গাটা খুব সুন্দর। সায়ীদ স্যার স্বভাবসুলভ হাস্যরস করেই প্রত্যুত্তর দিলেন, ‘স্যার গরীবের বসার জায়গা!’

আনিসুজ্জামান স্যার হাসলেন পরিমিতভাবে। সে দিন আনিসুজ্জামান স্যার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে অনেকক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন। তারপর যাওয়ার সময়, গেট পর্যন্ত আনিসুজ্জামান স্যারকে এগিয়ে দিয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘দেখলে, আমাদের শিক্ষককে? কি রকম মার্জিত, পরিশীলিত।’

সায়ীদ স্যারের এই কথাটা আমি কখনও ভুলিনি। আনিসুজ্জামান স্যারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কথাটি আমার মনে পড়ল।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার ৮৩ বছরের সুদীর্ঘ জীবনকে বিবিধ কাজে লাগিয়েছেন। একজন আপাদমস্তক শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার কাজকে সাধনার মতো করে নিয়েছিলেন। গবেষণা, পাঠদান, বিদ্ব্যৎজনিত নানা আলোচনা, বক্তৃতায় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। এপার বাংলা-ওপার বাংলায় শিক্ষাবিদ হিসেবে ছিলেন সমাদৃত ও সম্মানীয়।

শিক্ষকতার কাজটাকে বহাল রেখেই সামাজিক ও রাজনৈতিক নানাবিধ কাজে তার পারঙ্গমতাও ছিল ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের নানা প্রান্তিকে তিনি ছিলেন সচল-সপ্রাণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রথম সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও যুদ্ধদিনে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলাভাষ্য রচনায় সক্রিয় ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তাকেও সহায়তা করেছেন নানাভাবে। বঙ্গবন্ধু তাকে শিক্ষাসচিব হিসেবেও নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসকের গুরু দায়িত্ব পালনের চেয়ে শিক্ষকতাকেই প্রাধিকার দিতে চেয়েছেন বলে সে দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছাড়েননি। অবশেষে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হস্তক্ষেপে সে যাত্রা রক্ষা পান। তার এ অভিজ্ঞতার কথা আনিসুজ্জামান সবিস্তারে লিখেছেন নিজের আত্মজীবনী ‘কাল নিরবধি’ বইতে।

আনিসুজ্জামানের বড় সম্পদ ছিল তার পরিশীলিত পরিমিতিবোধ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা অংশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তার সম্পৃক্ততা থাকায় বহু ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে তিনি ছিলেন ওয়াকিবহাল। নানা সময়ে সে সব ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন, লিখেছেনও। তার সে সব বক্তৃতা ও রচনায় মিলবে তার এই পরিশীলনের ও পরিমিতিবোধের পরিচয়।

সম্ভবত বাংলাদেশের আর কারও লেখায় ও বলায় এই গুণের পরিচয় পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সম্পর্কে যখন তিনি লিখেছেন বা বলেছেন তখনও ভক্তিবাদ কিংবা নিন্দাবাদ দ্বারা আক্রান্ত হননি। একধরনের নির্মোহতায় ইতিহাসের বয়ান লিখেছেন। রাজনীতিতে তার পক্ষপাত ছিল সুস্পষ্ট। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে তার অবস্থান কখনই পাল্টাননি।কিন্তু সেখানেও তার পরিমিতিবোধ ও পরিশীলন ছিল অসাধারণ ও লক্ষণীয়।

পৃথিবীর তো বটেই বাংলাদেশেরও এক দুর্দিনে আনিসুজ্জামান স্যার পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। এই করোনাকালের নানাবিধ বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সময় তার সুস্থিত মেধা, পরিমিত চিন্তা, পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি আর বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুব প্রয়োজনীয় ছিল।

বাংলাদেশের বিদ্ব্যৎসমাজ তাকে খুব মিস করবে। রাজনৈতিক পক্ষপাতের জন্য যারা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে অপছন্দ করতেন তারাও যখন বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ানের বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ানকে জানতে চাইবেন তখন তারাও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে অগ্রাহ্য করতে পারবেন না।

মৃদুভাষী, পরিমিত ও পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গির অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে জাতি তাই বহুদিন স্মরণে রাখবে।

শুভ কিবরিয়া: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাবেক সমন্বয়কারী, নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

বিদায়, শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান

 শুভ কিবরিয়া 
১৪ মে ২০২০, ০৯:২৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সে দিন তেমন লোকসমাগম নেই। আনিসুজ্জামান স্যার (১৯৩৭-২০২০) যখন এলেন, তখনও কেন্দ্রের চত্বরে মানুষের আনাগোনা তেমনটা জমে ওঠেনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সে দিন সাপ্তাহিক ছুটি ছিল কী না আমার ঠিক মনে নেই। কিন্তু আনিসুজ্জামান স্যার আসবেন বলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অনেকটা আগেই এসে দোতলার সেই খোলা বারান্দায় বসেছেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আধুনিক ভবন তখনও হয়নি। ঢোকার গেটটা পেরিয়ে বড় সবুজ লনটা ছুঁয়েই যেতে হোত কেন্দ্রের লাইব্রেরি সংলগ্ন একটা আমগাছ ছোঁয়া এই খোলা বারান্দায়। বেতের একসেট সাদামাটা সোফায় এখানেই বিকালে বসতেন সায়ীদ স্যার। জায়গাটা খুবই সুন্দর ছিল।

গেট থেকে আনিসুজ্জামান স্যারকে রিসিভ করে দোতলার বারান্দায় আনতেই সায়ীদ স্যার সিঁড়ির গোড়ায় নেমে এসেই আনিসুজ্জামান স্যারকে অভ্যর্থনা জানালেন। আনিসুজ্জামান স্যার খোলা বারান্দায় বসে আম গাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন সায়ীদ, তোমার এই জায়গাটা খুব সুন্দর। সায়ীদ স্যার স্বভাবসুলভ হাস্যরস করেই প্রত্যুত্তর দিলেন, ‘স্যার গরীবের বসার জায়গা!’

আনিসুজ্জামান স্যার হাসলেন পরিমিতভাবে। সে দিন আনিসুজ্জামান স্যার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে অনেকক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন। তারপর যাওয়ার সময়, গেট পর্যন্ত আনিসুজ্জামান স্যারকে এগিয়ে দিয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘দেখলে, আমাদের শিক্ষককে? কি রকম মার্জিত, পরিশীলিত।’

সায়ীদ স্যারের এই কথাটা আমি কখনও ভুলিনি। আনিসুজ্জামান স্যারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কথাটি আমার মনে পড়ল।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার ৮৩ বছরের সুদীর্ঘ জীবনকে বিবিধ কাজে লাগিয়েছেন। একজন আপাদমস্তক শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার কাজকে সাধনার মতো করে নিয়েছিলেন। গবেষণা, পাঠদান, বিদ্ব্যৎজনিত নানা আলোচনা, বক্তৃতায় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। এপার বাংলা-ওপার বাংলায় শিক্ষাবিদ হিসেবে ছিলেন সমাদৃত ও সম্মানীয়।

শিক্ষকতার কাজটাকে বহাল রেখেই সামাজিক ও রাজনৈতিক নানাবিধ কাজে তার পারঙ্গমতাও ছিল ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের নানা প্রান্তিকে তিনি ছিলেন সচল-সপ্রাণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রথম সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও যুদ্ধদিনে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলাভাষ্য রচনায় সক্রিয় ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তাকেও সহায়তা করেছেন নানাভাবে। বঙ্গবন্ধু তাকে শিক্ষাসচিব হিসেবেও নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসকের গুরু দায়িত্ব পালনের চেয়ে শিক্ষকতাকেই প্রাধিকার দিতে চেয়েছেন বলে সে দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছাড়েননি। অবশেষে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হস্তক্ষেপে সে যাত্রা রক্ষা পান। তার এ অভিজ্ঞতার কথা আনিসুজ্জামান সবিস্তারে লিখেছেন নিজের আত্মজীবনী ‘কাল নিরবধি’ বইতে।

আনিসুজ্জামানের বড় সম্পদ ছিল তার পরিশীলিত পরিমিতিবোধ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা অংশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তার সম্পৃক্ততা থাকায় বহু ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে তিনি ছিলেন ওয়াকিবহাল। নানা সময়ে সে সব ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন, লিখেছেনও। তার সে সব বক্তৃতা ও রচনায় মিলবে তার এই পরিশীলনের ও পরিমিতিবোধের পরিচয়।

সম্ভবত বাংলাদেশের আর কারও লেখায় ও বলায় এই গুণের পরিচয় পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সম্পর্কে যখন তিনি লিখেছেন বা বলেছেন তখনও ভক্তিবাদ কিংবা নিন্দাবাদ দ্বারা আক্রান্ত হননি। একধরনের নির্মোহতায় ইতিহাসের বয়ান লিখেছেন। রাজনীতিতে তার পক্ষপাত ছিল সুস্পষ্ট। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে তার অবস্থান কখনই পাল্টাননি।কিন্তু সেখানেও তার পরিমিতিবোধ ও পরিশীলন ছিল অসাধারণ ও লক্ষণীয়।

পৃথিবীর তো বটেই বাংলাদেশেরও এক দুর্দিনে আনিসুজ্জামান স্যার পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। এই করোনাকালের নানাবিধ বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সময় তার সুস্থিত মেধা, পরিমিত চিন্তা, পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি আর বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুব প্রয়োজনীয় ছিল।

বাংলাদেশের বিদ্ব্যৎসমাজ তাকে খুব মিস করবে। রাজনৈতিক পক্ষপাতের জন্য যারা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে অপছন্দ করতেন তারাও যখন বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ানের বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ানকে জানতে চাইবেন তখন তারাও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে অগ্রাহ্য করতে পারবেন না।

মৃদুভাষী, পরিমিত ও পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গির অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে জাতি তাই বহুদিন স্মরণে রাখবে।

শুভ কিবরিয়া: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাবেক সমন্বয়কারী, নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

 
আরও খবর