সংসদে কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য

  সংসদ রিপোর্টার ১১ এপ্রিল ২০১৮, ২১:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সরকারপ্রধান বলেছেন, কোটা পদ্ধতি যেহেতু অযৌক্তিক, সেহেতু কোটা পদ্ধতি থাকারই প্রয়োজন নেই। আমি কোটা পদ্ধতি তুলে দিলাম। আন্দোলন যথেষ্ট হয়েছে। এবার তারা ক্লাসে ফিরে যাক।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় আরও বলেন, সবার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চাকরিতে আসবে। আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের চাকরির জন্য আমরা অন্য ব্যবস্থা করব।

বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, যারা ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত, তাদের বিচার হবে। গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত চলছে। লুটের মাল কোথায় আছে, তা ছাত্রদেরই বের করে দিতে হবে।

প্রশ্নোত্তরপর্বে বিষয়টি সরকারদলীয় সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তীব্র ক্ষোভ ও অভিমানের সুরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই।

তিনি বলেন, কোটা থাকলেই সংস্কারের প্রশ্ন আসবে। এখন সংস্কার করলে আগামীতে আরেক দল আবার সংস্কারের কথা বলবে। তখন আবারও মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে। কোটা থাকলেই ঝামেলা। সুতরাং কোটারই দরকার নেই। কোটাব্যবস্থা বাদ, এটাই আমার পরিষ্কার কথা।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেখে দুঃখ লাগে, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া বন্ধ করে কোটার সংস্কার চেয়ে আন্দোলনে নেমেছে। রোদের তাপে পুড়ে ওরা তো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাদের অবরোধের কারণে মানুষ হাসপাতালে যেতে পারছে না। অফিস-আদালতে ঠিকভাবে যেতে পারছে না। সবাইকেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশ তখন উন্নত হয় যখন একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে ওঠে। শিক্ষিত সমাজের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করতে আমরা সে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের সরকারের আমলে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে, বৃত্তি পাচ্ছে, বিনা পয়সায় বই পাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে, মানুষের মতো মানুষ হবে, তারা দেশ পরিচালনা করবে।

তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমিই তৈরি করে দিয়েছি, এখন সবাই ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষাব্যবস্থা আমিই চালু করেছি। এখন সেগুলো ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হলো, এক ছেলে মারা গেছে। রাত ১টার সময় হলের গেট ভেঙে রাস্তায় নেমে এল ছেলেমেয়েরা। পরে ওই ছেলে যখন মারা যায়নি, ওই ছেলে যখন নিজেই ফেসবুকে জানিয়ে দিল তখন তাদের মুখটা কোথায় গেল?’ প্রশ্ন রেখে এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরপর শুরু হয় যত অঘটন, ভাঙচুর, লুটপাট; এর দায় কে নেবে?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভিসির বাড়িতে আক্রমণ হলো, আমরাও তো আন্দোলন করেছি। আমরা তো কখনও এমনটি করেনি। ভিসির বাড়িতে এমন ভাঙচুর, ভিসির বাড়ির ছবি দেখে মনে হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেভাবে ভাঙচুর চালিয়েছিল, লুটপাট করেছিল ভিসির ছেলেমেয়ে ভয় পেয়ে লুকিয়ে ছিল, একতলা-দোতলা ভবন তছনছ করা হলো, পরে সিসি ক্যামেরা নিয়ে চলে গেল আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা ঘটিয়েছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে আমি মনে করি না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্ররা দাবি করেছে, আমিও বসে থাকিনি। আমাদের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে পাঠিয়েছি। তিনি ছাত্রদের সঙ্গে বসেছেন। আমি ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিয়েছি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। মন্ত্রী তাদের সঙ্গে বসল, একটা সমঝোতা হলো। অনেকে মেনে নিল কিন্তু অনেকে মানল না। টিএসসিতে অনেকে থেকে গেল, কেন?

তিনি বলেন, ‘যখন আলোচনা হয়েছে, কথা হয়েছে তাহলে কেন চারুকলায় অবস্থিত মঙ্গল শোভাযাত্রা পুড়িয়ে তছনছ করা হলো। আর মেয়েরাও হল থেকে বেরিয়ে আসল, আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। নানককে পাঠালাম, আলোচনা করল, তাদের ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলো। কিন্তু তারা মানল না, আন্দোলন চালিয়ে গেল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একটা নীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি। যারা আন্দোলনে নেমেছে তারা আমার নাতির বয়সী, তাদের ভালো কিসের, আমরা তো ভালো জানি।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সাল থেকে কোটাব্যবস্থা চলছে। ৩৩তম বিসিএসে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে ৭৭.৪০ ভাগ শিক্ষার্থীর আর ৩৫তম বিসিএসে মেধার ভিত্তিতে ৬৭.৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মেধাবীরা কিন্তু বাদ যায়নি যেখানে কোটা পাওয়া যাবে না, তালিকা থেকে দেয়া হবে। এটা কিন্তু চলছে, জানি না ছাত্ররা এটা জানে কিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, ছাত্ররা মেধাবী, তাদের লিখিত পরীক্ষায় পাস করে এ পর্যায়ে আসতে হয়। তাদের দাবিতে তো বলা আছে, কোটায় পাওয়া না গেলে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ হবে। আমরা মেধা তালিকা থেকে তো নিয়োগ দিচ্ছি। আর এ নিয়ে ঢাবির কিছু প্রফেসরও তাল মিলিয়েছেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সকালে ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি আমার কাছে আসে। তারা বলে, আমরা ঘুমাতে পারছি না, ছাত্ররা রোদে বসে আছে, তাদের তো অসুখ-বিসুখ হবে। রাস্তা অবরোধের কারণে কেউ অফিস-আদালতে যেতে পারছে না, রোগীরা হাসপাতালে যেতে পারছে না, এভাবে তো চলতে পারে না। এমনিতেই যানজট, তার ওপর রাস্তা অবরোধ করে রাখলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’

এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এত কথা, এত প্রশ্ন- তাহলে কোটাই থাকবে না, কোটার দরকার নেই, বিসিএস যে পদ্ধতিতে হয় সেভাবেই হবে। কেউ যাতে বঞ্চিত না হয় সে ব্যবস্থা তো আমাদের আছে।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা চাকরি পেত না, আগে নারীদের জজ হওয়ার সুযোগ ছিল না। পাকিস্তান আমলে নারীরা জজ হিসেবে তো আদালতে ঢুকতে পারত না। আমরা এসে নারীদের চাকরিতে ১০ ভাগ কোটার ব্যবস্থা করি, কিন্তু এখন মেয়েরাও রাস্তায়। তার মানে তারাও কোটা চায় না। ‘

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো খুশি, আমি নারীর ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি, মেয়েরা যখন চায় না তাহলে কোটার দরকার নেই’- যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। ‘যথেষ্ট আন্দোলন হয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ঢাবির ভিসির ভবন যারা ভাঙচুর করেছে, লুটপাট করেছে, ছাত্রদেরই সেগুলো খুঁজে বের করে দিতে হবে। আমরা গোয়েন্দা সংস্থা নামিয়েছি তারা খুঁজে বের করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শিক্ষকদের সম্মান করি। এখনও যেসব শিক্ষক বেঁচে আছেন তাদের আমরা সম্মান করি, শালীনতা বজায় রাখি। সবারই তো আইন মেনে চলতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ড. মো. আখতারুজ্জামানের বাড়িতে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই হামলার ছবি দেখে মনে হয়েছে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো তাণ্ডব চালানো হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। এটা কী ধরনের কথা?

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter