এতিম রাজীবের জীবনযুদ্ধের এ কেমন পরিসমাপ্তি

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১০:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারিয়েছিলেন তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেন।

এর পর ছোট দুই ভাই মেহেদি ও আবদুল্লাহকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন একুশ বছরের এই এতিম।

কখনও খালার বাসায় থেকে, কখনও টিউশনি করে ও কাজ করে নিজে পড়াশোনা করেছেন এবং দুই ভাইকে পবিত্র কোরআনের হাফেজ বানিয়েছেন।

রাজীবের স্বপ্ন ছিল- বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে নামকরা শিক্ষক হবেন। ছোট দুই ভাইকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করবেন। থাকবেন তিন ভাই মিলে। অন্যান্য আত্মীয়স্বজন- যাদের জীবন অন্ধকারের মুখে, আলোকিত করবেন তাদেরও।

কিন্তু সেই স্বপ্নদ্রষ্টা রাজীবই রাজধানীতে দুই বাসচালকের নিষ্ঠুর খেয়ালখুশির শিকার হয়ে প্রথমে হাত হারিয়েছেন। এরপর ১৪ দিন জীবনমৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সোমবার রাতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

রাজীব হোসেনের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে।

গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের গেটে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন তিনি। ওই সময় তার হাতটি সামান্য বাইরে বেরিয়ে ছিল। হঠাৎই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিকে গা ঘেঁষে পড়ে।

দুই বাসের প্রচণ্ড চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু-তিনজন পথচারী দ্রুত তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সেই হাতটি রাজীবের শরীরে আর জুড়ে দিতে পারেননি।

শমরিতা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাজীবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সাময়িক উন্নতির পর গত সোমবার থেকে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রাজীবের মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে যায়। সেই থেকে আর জ্ঞান ফিরেনি তার।

মৃত্যুর আগে অজ্ঞান অবস্থায় রাজীবকে রাখা হয়েছিল ঢামেকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউতে। ভাইয়ের জ্ঞান ফেরার আগে আইসিইউর সামনে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে দেখা গেছে রাজীবের ছোট দুই ভাই হাফেজ মেহেদি হাসান (১২) ও হাফেজ আবদুল্লাহকে (১১)।  

সেখানে তারা থেমে থেমে দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছিলেন যেন তাদের ভাই বেঁচে ফেরেন। প্রায় প্রতিদিনই তারা স্বজনদের কাছে জানতে চেয়েছে- ‘ভাই ভালো হবে তো?’ কিন্তু এতিম মেহেদি ও আবদুল্লাহকে রেখে চলে গেলেন রাজীব।

আইসিইউর সামনে কথা হয়েছিল রাজীবের ছোট ভাই হাফেজ মেহেদি হাসানের সঙ্গে। সে বলছিল, মা-বাবা মারা যাওয়ার সময় সে ও তার ছোট ভাই আবদুল্লাহ খুব ছোট ছিল। মা-বাবা বলতে তারা বড় ভাই রাজীবকেই বুঝত।

মেহেদি জানিয়েছিল, দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর বড় ভাই রাজীবের জন্য দুই ভাই মিলে কোরআন পড়েছে। মসজিদে দোয়া পড়িয়েছে। ওই সময় ভাইয়ের কিছু হলে আমরা বাঁচব না- বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে ভাইয়ের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছিল এ কিশোর হাফেজ।

রাজীবের খালা জাহানারা বেগম জানান, রাজীব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারায়। এর পর মতিঝিলে খালার বাসায় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে তিতুমীর কলেজে ভর্তি হয়। পরে সে যাত্রাবাড়ীতে মেসে ওঠে। ছোট দুই ভাই মেহেদি ও আবদুল্লাহ সেখানকার তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় সপ্তম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। সে টিউশনি করে নিজের খরচ এবং একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করে ছোট ভাইদের খরচ জোগাত। খুব মেধাবী ছাত্র সে। স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে নামকরা শিক্ষক হবে।

সোমবার রাতে ঢামেকের চিকিৎসকরা স্বজনদের রাজীবের মৃত্যুর কথা জানান। আজ সকালে রাজীবের লাশ গ্রামের বাড়ি বাউফল নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শৈশবে হারানো বাবা-মায়ের কবরের পাশেই শায়িত হবেন সংগ্রামী তরুণ রাজীব।