‘আন্দোলনে নেমে ভয় পেলে হেরে যেতে হবে’

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

কোটা সংস্কার আন্দোলন

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকসুর সাবেক চার ভিপি। তারা বলেছেন, এই আন্দোলনের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। এটা আন্দোলনকারীদের উপলব্ধি করতে হবে। এ আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর দাবিতে ব্যবহার করতে হবে।

শনিবার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘জনপরিসর’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।

‘কোটা সংস্কার: ছাত্রকম্পের ন্যায্যতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ডাকসুর সাবে ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সুলতান মুহাম্মদ মনসুর এবং ডাকসু সাবেক ভিপি ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আমানউল্লাহ আমান।

নাগরিক্য ঐক্য’র আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমাদের সবাইকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিঃশর্ত, অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে হবে। কারণ দেশ যখন মরুভূমিতে পরিণত, তখন এই ছাত্ররা মরুদ্যান হিসেবে আভির্ভূত হয়েছে।’ আন্দোলনকারী ছাত্র সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনে নেমে ভয় পেলে হেরে যেতে হবে’।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক ছাত্রনেতা গৌতম দাসের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিতি ছিলেন নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।

মাহমুদুর রহমান মান্না তার দীর্ঘ বক্তব্যে আরও বলেন, ‘ছাত্ররা কোটা সংস্কার বলতে কী বুঝিয়েছে তা সরকারপ্রধান বুঝেননি। এটা তার পার্লমেন্টের বক্তব্যে বুঝা গেছে। উনার বক্তব্য শুনে মনে হলো উনি জেদ করে এটা বাতিল করে দিলেন। এখন অবশ্য আমার তা মনে হয় না। রাজনীতি যারা করেন তারা খুব শান্ত স্বভাবের লোক। বাইরে গরম দেখা যায় কিন্তু ভেতরে সব সময় চিন্তা থাকে তার লক্ষ্য তাকে অর্জন করতেই হবে। আমি মনে করে এখানেও (প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে) তা আছে। তবে সেটা পরে বলবো।’

কোটা কত শতাংশ থাকা উচিত বা আদৌ থাকা উচিত কিনা এসব বিশেষজ্ঞরা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মন্তব্য করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক।

নানা ইস্যুতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংবিধানের দোহাই দেয়া প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘হঠাৎ করে ক্ষমতাসীনরা সংবিধানের প্রেমিক হয়ে যান। আমরা সংবিধানের বাইরে যেতে পারবো না। কিন্তু প্রতিনিয়তই যাচ্ছেন। আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না। সংবিধানে ছিল না। আসলো তো। আপনারা যারা সংবিধান সংশোধন করলেন তারা কি সংবিধানের বাইরে গেলেন? বলতে পারেন যে আমাদের সংখাগরিষ্ঠতা আছে আমরা চেঞ্জ করে দিলাম। তাহলে যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে তারা যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘যে কোনো কিছু ঘটলেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটা নিয়ে রাজনীতি করা চলবে না। অথচ সবচেয়ে বেশি রাজনীতি তারাই করেন। কোটার যে আন্দোলন এর মধ্যে কোনো রাজনীতি ছিল? ক্ষমতাসীনরাই প্রথম কোটার আন্দোলনে রাজনীতি ঢুকানোর চেষ্টা করলেন এবং সেটা ধ্বংসাত্মক রাজনীতি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলার নিন্দা জানিয়ে মান্না বলেন, ‘ভিসির বাড়িতে হামলা হলো। প্রথমে বলা হলো বিএনপি করেছে। পরে জামায়াতের নাম বলা হলো। কিন্তু ছাত্ররা চ্যালেঞ্জ করলো, ভিডিও ফুটেজ আছে আপনাদের কাছে। সেগুলো দেখে আমাদের যারা জড়িত আছে তাদেরকে শাস্তি দিন। সরকারপক্ষ তখন গলার স্বর একটু নামালো। পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়ার পর তারা বললো এটা প্রশিক্ষিত লোকজন এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এই প্রশিক্ষিত কারা সরকার বলছে না। আগের আরও অনেক নাটকের মতো ভিসির বাড়িতে আসলে একটা নাটক করা হয়েছে। না হলে পুলিশ যেখানে বলছে এটা প্রশিক্ষিত বাহিনীর কাজ তাহলে তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে না কেন?’

কোটা সংস্কার ইস্যুতে ঢাবি ভিসির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যিনি ভিসি গিনেস বুকে তার একটা ছবি থাকা দরকার। শেইম অন হিম! উনার তো জানার কথা কারা সেদিন তার বাড়িতে ঢুকেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাথার মধ্যে গভীর অসুখ দেখা দিয়েছে। ওরা সবাই চামচামি করে। এদের ভূমিকা দেখলে আমি অবাক হয়ে যাই। ১২টার সময় ছাত্রীদের বের করে দেয়ার ঘটনার পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন, আমি এমন ঘটনা জীবনে দেখি নাই।”

মান্না বলেন, ‘রাত ১২টার সময় অভিভাবক ডেকে মেয়েদেরকে তাদের হাতে তুলে দেয়া হল কেন? আবার তিনজনকে ফিরিয়েও নিয়েছে। কেন? যে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাতে বিনা ভোটের সরকারের বুকে কাঁপুনি ধরেছিল। এটা যে কোনো পরিণতি হতে পারবো। ছাত্রদের এত বড় অভ্যুত্থান আমি সম্ভবত আর কখনো দেখিনি।”

ছাত্রদের আন্দোলনের প্রশংসা করে বলেন, ‘এদেশের ছাত্ররা আবার দেখিয়েছে তারা তাদের ন্যায্য দাবিতে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে যে দাঁড়াতে পারে। এখনো তারাই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি।’

ছাত্রদেরকে তাদের দেশ ও সমাজ নিয়ে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি ঝুলিয়ে, শেখ হাসিনার ছবি ঝুলিয়ে স্লোগান দিয়ে তো বাঁচতে পারলেন না। তাই বলি, সরকারি শেল্টারে থেকে আন্দোলন হবে না। গণজাগরণ মঞ্চ টিকতে পারেনি।’

কোটা আন্দোলনের আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আওয়ামী আন্দোলন করতে পারে না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে আর আওয়ামী লীগ কোথায় আন্দোলন করেছিল? তবে আন্দোলন ভাঙতে আওয়ামী লীগ রেকর্ড করেছে এটা ঠিক।

আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য সব চেষ্টা চলছে। ভয়ের সংস্কৃতি ছড়ানো হচ্ছে। রাত ১২টায় অভিভাবক ডেকে সেই ভয় ছড়ানো হচ্ছে। যাতে সবাই ভয়ে জবুথবু হয়ে থাকে। ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে ওই ছাত্রদের স্থিমিত রাখা যেতে পারে, কিন্তু আমি মনে করি কোটার যে আন্দোলন শুরু হয়েছে এটি বন্ধ হবে না।’

আগামী নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের বছরে সরকার ছাত্রদের পথে থাকতে দেবে না। কারণ তারা এই নির্বাচন ছিনতাই করতে চায়। গতবার নির্বাচন ছিনতাই করা লাগেনি। বিএনপি যোগ দেয়নি। এবার তারা বলছে নির্বাচন করবে। মানুষ তো একদম ক্ষেপে আছে। একটা চান্স পেলে দেখিয়ে দেবে। কুমিল্লায় দেখিয়েছে না? বাংলাদেশে যদি মানুষ মোটামুটি ভোট দিতে যেতে পারে তাহলে নৌকার খবর থাকবে না। এত অপকর্ম করেছে। ব্যাংক লুট, নদী লুট, পানি লুট। লুট আর লুট। খালি জিডিপি বাড়ে, কিন্তু চাকরি নাই। দাম বাড়ছে। কোনো দিক থেকে কোনো উন্নতি নাই। কোনো জায়গায় ভালো অবস্থা নাই। অর্থনীতি বৈষম্যের পাহাড়। ব্যাংক লুটেরাদের নতুন করে টাকা দিচ্ছে সরকার। সরকার জনগণকে কেয়ারই করে না, তার কেয়ার করার দরকার নাই। আপনি যদি ভোট না দেন তাহলে কী অসুবিধা। সে তো ভোট চাচ্ছে না। ওরা বরং চাচ্ছে ভোটের দিন আপনি ঘরে বসে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিঃশর্ত, অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে হবে। কারণ দেশ যখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে তখন তারা মরুদ্যান হিসেবে আভির্ভূত হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এই আন্দোলনের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। এটা আন্দোলনকারীদের উপলব্ধি করতে হবে। এ আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর দাবিতে ব্যবহার করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের জনগোষ্ঠীকে অগ্রসর করতে হলে প্রশাসন পরিচালনা হতে হবে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে। তিনি বলেন ৫৬ ভাগ কোটা রাখার মাধ্যমে দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে। কোটা বাতিল নয়, বরং সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করায় ছাত্রছাত্রীদের তিনি অভিনন্দন জানান। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এত বিশাল সংখ্যক কোটা মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে দরকার ছিলো। কিন্তু এখন ৪৭ বছর পর কেন তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি নাতনিদের জন্য এত কোটা- এই প্রশ্নও তুলেন তিনি।

সিপিবি সভাপতি বলেন, কোটা সংস্কারের দাবি শুধু ছাত্রছাত্রীদের দাবি নয়, এই দাবি দেশের ১৬ কোটি মানুষের। এছাড়াও তিনি কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে মধ্যরাতে ছাত্রীদের বের করে দেওয়ার নিন্দা জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেস্টরুম কালচারের মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর নিপীড়ন বন্ধ করার আহ্বান জানান।

সুলতান মুহম্মদ মনসুর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মধ্যরাতে অভিভাবকদের ডেকে এনে ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দিয়ে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক একটি নজির স্থাপন করেছে। তিনি দাবি করেন বর্তমানে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এরকম একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটাতে পেরেছে।

গত ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়াকে অত্যন্ত পরিকল্পিত বলে দাবি করে মুনসুর বলেন, ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে না দেওয়া বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ।

আমানউল্লাহ আমান বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে এই যৌক্তিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছাত্রছাত্রীদের ভয়ভীতি দেখানোর উদ্দেশে কমিটির তিন ছাত্রনেতাকে চোখ বেঁধে তুলে নেওয়া হল। তিনি বলেন, সরকার যেকোনো ভিন্নমত দমনের উদ্দেশে গুম, খুনের মাধ্যমে যে কৌশল জারি রেখেছে এটি তারই একটি ধারাবাহিকতা।

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter