‘মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সমাজকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে’
jugantor
‘মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সমাজকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে’

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১২ জুন ২০২১, ২১:১৩:৩৪  |  অনলাইন সংস্করণ

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এই তিনটি ব্যাধি বর্তমানে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক দায়িত্বটা বেশি। পরিবারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।

‘মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- সমাজের তিন ব্যাধি রোধ করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। শনিবার দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবুর সঞ্চালনায় বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন যুগান্তরের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, সাবেক মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি।

পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, একটি পরিবারের সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে সেই পরিবারে যে অশান্তি নেমে আসে তা বর্ণনাতীত। কিশোর গ্যাংয়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে গত কয়েক দিনে যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো যা বলছে, তাতে আমি মনে করি কিশোর গ্যাং ও টিকটক ভিডিওর বিষয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আরও তৎপর হতে হবে। রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চয়ই যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে তাদের কাজকে জনগণের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

কোমলমতিদের এসব অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার বিষয়ে সালমা ইসলাম বলেন, করোনায় বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিক রুটিনমাফিক চলছে না। তারা রাত জাগছে, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটে বেশি সময় দিচ্ছে। সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটায়, মোবাইল ফোন-ল্যাপটপে কী করে- সেটি মনিটরিং করতে হবে। সন্তান নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বাবা-মায়ের। এ সময়টিতে অভিভাবকদের উচিত হবে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, তাদের বেসিক শিক্ষা চালু রাখতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ বিষয়ে সালমা ইসলাম বলেন, যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী- কিশোর গ্যাংগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে তাদের কথিত বড়ভাই। যাদের মাফিয়া বলা হচ্ছে। সবার আগে এ চক্রগুলোর মাফিয়াদের খুঁজে বের করতে হবে। আমি মনে করি, কিশোররা এসব গ্যাংয়ে জড়িত হয়ে পড়ার জন্য প্রথমত পরিবারই দায়ী। দ্বিতীয় অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় এরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমি মনে করি, এদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলে যারা তাদের ছাড়িয়ে আনতে যান তারাও সমান অপরাধী। এজন্য প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।

টিকটক, লাইকির বিষয়ে সালমা ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে টিকটক ডিজিটাল অপরাধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অনেকে টিকটকের পক্ষে সাফাই গাইবেন। এর ভালো দিকগুলো তুলে ধরবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে আসা খবরে যা জেনেছি, তাতে আমি বিশ্বাস করি, এই টিকটক দিয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। টিকটকে ভালো কিছু করার সুযোগ নেই। টিকটকের মতো আরেকটি মরণনেশা আমাদের তরুণ সমাজ ধ্বংস করে দিচ্ছে; সেটি হচ্ছে- ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেম। ছেলেমেয়েরা নেশার মতো এসব গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এসব গেম কোমলমতিদের মারপিট, দাঙ্গা-সন্ত্রাসে উদ্বুদ্ধ করছে। তাছাড়া অনলাইনে খেলতে গিয়ে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তারা। এতে খুব দ্রুত সবার অজান্তেই একটি খারাপ নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ছে সন্তানরা। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমি অনুরোধ করব, টিকটক, পাবজির মতো যেসব গেম, অ্যাপস আমাদের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে তা দ্রুত বন্ধ করুন বা নিয়ন্ত্রণে নিন। করোনা মহামারিতে এসব গেম সামাজিক বিষফোঁড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব বিষয়ে কম্প্রমাইজ করা উচিত হবে না। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যুগান্তর মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের দৌরাত্ম্য রোধে সুপারিশ করছে।

স্বাগত বক্তব্যে যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ব্যথায় জর্জরিত এ সমাজ। সমাজে ব্যাধির শেষ নেই। সেই ব্যাধি নিরসনেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এই তিনটি ব্যাধি বর্তমানে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে। এটা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। যে কারণে এ তিনটি সামাজিক ব্যাধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। কীভাবে এর থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটবে সেই দিকনির্দেশনা, সুপারিশ নিয়ে আলোচনা খুবই জরুরি মনে করেছে যুগান্তর। যুগান্তর মনে করে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশের পাশাপাশি তার সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই কোভিড-১৯ এর মধ্যেও আমরা এ আয়োজনে সমবেত হয়েছি। সমাজকে দূষণমুক্ত করতে পরবর্তী সময়েও দেশের সুশীল সমাজ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুচিন্তিত মতামত গ্রহণ করে যুগান্তর প্রকাশ করবে।

কিশোর গ্যাং, মাদক ও টিকটক রোধে সাইফুল আলম বলেন, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক দায়িত্বটা বেশি। পরিবারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি তাকে মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের সবার যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের খারাপ যা কিছু আছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার একটা সমন্বিত কর্মপ্রয়াস চালাতে হবে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করার মানসিকতা প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করব, কিন্তু সেখানের খারাপ বিষয়টি পরিহার করব। তাহলেই সমাজ থেকে এসব ভয়ঙ্কর অপরাধ নির্মূল হতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে সমাজের।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সমাজকে কীভাবে গ্রাস করেছে এবং এগুলোর কড়াল গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসার উপায় তথ্য-উপাত্তসহ উপস্থাপন করেছেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদক একটি অন্যতম সামাজিক ব্যাধি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিনরাত শ্রমের পরও এ থেকে মুক্তি মিলছে না। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছেই। বেসরকারিভাবে দেশে প্রায় ৭৫ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। গণমাধ্যমগুলোতে সম্প্রতি উঠে আসা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা ২ কোটি। এদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশই তরুণ। এসব তরুণদের ৮০ ভাগই এই মাদক জোগানে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারাই সংঘবদ্ধ হয়ে পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে। আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক তৈরিতে সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। টিকটক, ফেসবুককে অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ডে জড়ায় তারা।

দেশের অপরাধের সব কর্মকাণ্ডের মূলে মাদক দায়ী বলে দাবি করেন ড. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদনগুলো বলছে, ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, কিডন্যাপ, গুম, রাহাজানি, ছিনতাই সব ধরনের অপরাধের ৮০ শতাংশই মাদকাসক্ত। গেল কয়েক বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছেন, নেশার জন্য ২৫০ নারীকে খুন করেছে তাদের স্বামী। নেশার টাকা না পেয়ে বাবার হাতে ২২ দিনের নবজাতক কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরে মার্চে কুর্মিটোলায় ঢাবিছাত্রী ধর্ষণে গ্রেফতার ব্যক্তিও মাদকাসক্ত ছিলেন। একই বছরের ১০ মার্চে কাউলার ঝোপে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতাররা সবাই মাদকসক্ত ছিল।

পুলিশের বরাতে ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ মাদকাসক্তি। অপরাধের মাত্রা কমাতে হলে সবার আগে দেশে মাদকের ব্যাপকতা কমাতে হবে। অথচ সরকারের এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির পরও কিছুতেই মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

ড. অরূপ রতন চৌধুরী তথ্য দেন, শুধু ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে মাদকের সঙ্গে জড়িত ৫০ জন গ্রেফতার হন। দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ মামলা হয় মাদকের।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মাদক ইয়াবা জানিয়ে ড. অরূপ রতন চৌধুরী তথ্য দেন, দেশে মোট ইয়াবার ৮০ ভাগ আসে মিয়ানমার হতে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে। এরপর দেশব্যাপী তরুণ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। তরুণদের গ্রাহকে পরিণত করতে মাদক কারবারিদের লক্ষ্য হয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অনেকাংশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা দায়ী বলে মন্তব্য করেন ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

তার দেওয়া তথ্যমতে, গত তিন বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ৭৩১টি মামলা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইয়াবাকেন্দ্রিক। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রোহিঙ্গারাই এখন ইয়াবা ও মাদকের বড় বাহক।

এ বিষয়টিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই সমাজসেবক।

সামাজিক ব্যাধি কিশোর গ্যাং নিয়ে ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, গত ১০-১১ বছরে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাং দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিশোর গ্যাংগুলোর গডফাদারদের নেতৃত্বে কোমলমতিদের দিয়ে বড় ধরনের চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক বিক্রির কার্যক্রম চলছে। রাজধানীতে ৬২টি কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যার মধ্যে ৪২টি সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে কেবল রাজধানীতেই ১০ থেকে ১৫ হাজার কিশোর এই গ্যাং কালচারে ঢুকে পড়ে অপরাধে জড়িত হয়েছে।

এসব অপরাধের জন্য কিশোররা টেকনোলজির অপব্যবহার করছে বলে জানান তিনি।

উদাহরণস্বরূপ টিকটক, লাইকির মতো অ্যাপসকে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, টিকটক ও লাইকির মাধ্যমে অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে মাদক পাচার, নারী পাচারে মেতে উঠেছে কিশোররা।

সে হিসেবে দেশে মাদকের বিস্তার বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে অনুরোধ করেন তিনি। পাশাপাশি অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের পারিবারিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে বলে জানান তিনি।

ছেলে বা মেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটুকু সময় ব্যয় করছে আর স্মার্টফোন কি কাজে লাগাচ্ছে নিয়মিত তার মনিটরিং করতে হবে বলে জানান তিনি।

মাদক আইনে বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্টে কার্যক্রমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও গাড়িচালকদের অন্তর্ভুক্তকরণের সুপারিশ করেন ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার।

নাছিমা বেগম বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এই তিন ব্যাধি থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বাবা-মা।

তিনি জানান, জাপানে শিশুদের স্কুলে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নৈতিকতা শেখানো হয়, কী করা উচিত আর কি অনুচিত শেখানো হয়। বাংলাদেশেও জাপানের মতো পরিবারকেই স্কুল বানাতে হবে। সেখানেই ছেলে-মেয়েরা শিখবে কোনটি খারাপ আর কোনটি ভালো। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে তাদের ফেরাতে হবে। শিশু যেন পর্নোগ্রাফিতে না ঝুঁকে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের দৌরাত্ম্য রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও কম নয় বলে জানান নাছিমা বেগম।

তিনি জানান, অনতিবিলম্বে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সীমান্ত দিয়ে নারী পাচার রোধে অ্যাম্বাসি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এ তিন সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যথেষ্ট সক্রিয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনের পরই মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন করে গেছেন। সেই ১৮ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। সরকারের সেই নীতি অনুসরণের কাজ করে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

তিনি বলেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূলে প্রথমে যে কাজ করেছি তা হচ্ছে- মাদকের সাপ্লাই ডিডাকশন; যা বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনী দিয়ে নিয়মিত চালু রয়েছে। দেশে মাদকের সরবরাহ কীভাবে কমানো যায় বা রোধ করা যায় সেটাই প্রথম করণীয়।

দ্বিতীয়ত ডিমান্ড ডিডাকশন। দেশের যুব সমাজই যদি মাদককে না বলে তবে সরবরাহ কমবে, চোরাচালান কমবে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া, স্কুল-কলেজে নানা ভাবে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছি আমরা। জনসচেতনা তৈরিতে এর ক্ষতিকারক দিক উল্লেখ করা হচ্ছে ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ও র্যালির মাধ্যমে। আর দেশের ৩৫৮টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে আসক্তদের চিকিৎসা চালানো হচ্ছে।

দেশে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের মতো তিন ব্যাধির উচ্চসংক্রমণের জন্য বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, তদন্তে গাফিলতি ও অভিযানে আটক মাদক ধ্বংসের যথাযথ তথ্য না পাওয়াকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

বৈঠকে নিজের বক্তব্যে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, মাদকের শত শত মামলা জমে আছে আদালতে। করোনার কারণে এ মামলার জট আরো বেড়েছে। তদন্তে গাফিলতি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাই মাদককাণ্ডে জড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু ঘটনায় মাদকসেবীরা বহু মামলায় পার পেয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, মাদক নির্মূল অভিযান পরিচালনায় সাইবার এক্সপার্ট টিম গঠন করতে হবে। গুলি করে মেরে ফেলাই সমস্যার সমাধান নয়। তথ্য অনুযায়ী গত বছরে মাদককাণ্ডে ৪৬৪ জনকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তাতে দেশে মাদক, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে কোনো প্রভাব পড়েনি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ তিন সামাজিক ব্যাধি রোধ করতে প্রথম পদক্ষেপ আসবে পরিবার থেকেই। বাবা-মাকেই জানতে হবে সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কোন বিষয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে। সন্তানের সঙ্গী হয়ে থাকতে হবে অভিভাবককে। সন্তান যেন মানসিকভাবে একা না হয়ে পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন- সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার, র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বদ্ধপরিকর যে, দেশ থেকে গ্যাং কালচারটিই নির্মূল করা হবে। এজন্য জেলাভিত্তিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। আমরা এটা দৃঢ়চিত্তে বলতে পারি যে, বর্তমানে অপরাধ করে কোনো অপরাধী পার পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ৩০ হাজারের মতো আসামি ধরা হয়েছে। মাদকসেবীদের নতুন নতুন কৌশলকেও ট্র্যাক করে ধরা হচ্ছে। মাদক কারবারিরা নারিকেলে, পাকস্থলিতে করে ইয়াবা নিয়ে আসছে। র্যাবের চৌকস অভিযানে তাদের অভিনব সব কৌশল ধরা পড়ছে।

সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান বলেন, এক্ষেত্রে র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো স্মার্ট হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। দেশে মাদকের এত ব্যাপকতার জন্য মামলায় তদন্তে দুর্বলতা দায়ী।

তদন্তকে আরও শক্তিশালী করে বিচার ব্যবস্থার দ্রুতকরণের সুপারিশ জানান তিনি।

তিনি বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের অপব্যবহার বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এগুলোর একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একই নেটওয়ার্ক। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে দমন করলে কাজ হবে না। সবগুলোকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর তা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টেকনোলজির প্রয়োগ বাড়াতে হবে এবং বিচার ব্যবস্থাকেও ডিজিটালাইজড করতে হবে।

অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, সমাজের বিকাশকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। কিশোর গ্যাং ও মাদকের সমস্যা অনেক আগে থেকেই আছে। ১৯২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ১ হাজার গ্যাং ছিল, যা বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি। বর্তমানে পুঁজিবাদের অর্থনীতিতে কিশোর গ্যাং তৈরি হবেই। কারণ দেশে খেলার মাঠ নেই, কচিকাঁচার মেলা নেই, সংস্কৃতির চর্চা নেই।

তিনি বলেন, আসলে টিকটক, লাইকি, ফেসবুক এগুলো নাথিং বাট বিজনেস। এখানে অর্থ উপার্জনই সব। এগুলোকে আমি খারাপ বলছি না। এসবের অপব্যবহারকে রুখতে হবে। এক কথায় ফিল্টারিং করতে হবে। এখানে শিশুদের শুধু ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা যাবে না বাবা-মায়ের।

মাদক নিরোধে বর্ডার চেকে কঠোর হতে হবে, দেশের ভেতরে ড্রাগ ডিলারদের শনাক্ত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা রিহ্যাব সেন্টার বাড়াতে হবে।

তিনি যোগ করেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং বেশি বেশি করতে হবে। টিকটকের মাধ্যমে ভারতে ১ হাজারের মতো নারী পাচারের ঘটনা প্রকাশের পর আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার পর দেশে এলএসডির মতো ভয়ঙ্কর মাদক ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে পেরেছি। এসব অপরাধ কেন শুরুতেই জানা গেল না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে তৈরি হতে হবে; যাতে অপরাধের শুরুতেই তা সন্ধান করে দমন করা যায়।

‘মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সমাজকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে’

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১২ জুন ২০২১, ০৯:১৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এই তিনটি ব্যাধি বর্তমানে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক দায়িত্বটা বেশি। পরিবারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।

‘মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- সমাজের তিন ব্যাধি রোধ করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। শনিবার দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবুর সঞ্চালনায় বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন যুগান্তরের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, সাবেক মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি।

পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, একটি পরিবারের সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে সেই পরিবারে যে অশান্তি নেমে আসে তা বর্ণনাতীত। কিশোর গ্যাংয়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে গত কয়েক দিনে যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো যা বলছে, তাতে আমি মনে করি কিশোর গ্যাং ও টিকটক ভিডিওর বিষয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আরও তৎপর হতে হবে। রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চয়ই যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে তাদের কাজকে জনগণের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

কোমলমতিদের এসব অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার বিষয়ে সালমা ইসলাম বলেন, করোনায় বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিক রুটিনমাফিক চলছে না। তারা রাত জাগছে, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটে বেশি সময় দিচ্ছে। সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটায়, মোবাইল ফোন-ল্যাপটপে কী করে- সেটি মনিটরিং করতে হবে। সন্তান নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বাবা-মায়ের। এ সময়টিতে অভিভাবকদের উচিত হবে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, তাদের বেসিক শিক্ষা চালু রাখতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ বিষয়ে সালমা ইসলাম বলেন, যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী- কিশোর গ্যাংগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে তাদের কথিত বড়ভাই। যাদের মাফিয়া বলা হচ্ছে। সবার আগে এ চক্রগুলোর মাফিয়াদের খুঁজে বের করতে হবে। আমি মনে করি, কিশোররা এসব গ্যাংয়ে জড়িত হয়ে পড়ার জন্য প্রথমত পরিবারই দায়ী। দ্বিতীয় অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় এরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমি মনে করি, এদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলে যারা তাদের ছাড়িয়ে আনতে যান তারাও সমান অপরাধী। এজন্য প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। 

টিকটক, লাইকির বিষয়ে সালমা ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে টিকটক ডিজিটাল অপরাধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অনেকে টিকটকের পক্ষে সাফাই গাইবেন। এর ভালো দিকগুলো তুলে ধরবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে আসা খবরে যা জেনেছি, তাতে আমি বিশ্বাস করি, এই টিকটক দিয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। টিকটকে ভালো কিছু করার সুযোগ নেই। টিকটকের মতো আরেকটি মরণনেশা আমাদের তরুণ সমাজ ধ্বংস করে দিচ্ছে; সেটি হচ্ছে- ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেম। ছেলেমেয়েরা নেশার মতো এসব গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এসব গেম কোমলমতিদের মারপিট, দাঙ্গা-সন্ত্রাসে উদ্বুদ্ধ করছে। তাছাড়া অনলাইনে খেলতে গিয়ে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তারা। এতে খুব দ্রুত সবার অজান্তেই একটি খারাপ নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ছে সন্তানরা। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমি অনুরোধ করব, টিকটক, পাবজির মতো যেসব গেম, অ্যাপস আমাদের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে তা দ্রুত বন্ধ করুন বা নিয়ন্ত্রণে নিন। করোনা মহামারিতে এসব গেম সামাজিক বিষফোঁড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব বিষয়ে কম্প্রমাইজ করা উচিত হবে না। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যুগান্তর মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের দৌরাত্ম্য রোধে সুপারিশ করছে।

স্বাগত বক্তব্যে যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ব্যথায় জর্জরিত এ সমাজ। সমাজে ব্যাধির শেষ নেই। সেই ব্যাধি নিরসনেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এই তিনটি ব্যাধি বর্তমানে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে। এটা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। যে কারণে এ তিনটি সামাজিক ব্যাধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। কীভাবে এর থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটবে সেই দিকনির্দেশনা, সুপারিশ নিয়ে আলোচনা খুবই জরুরি মনে করেছে যুগান্তর। যুগান্তর মনে করে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশের পাশাপাশি তার সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই কোভিড-১৯ এর মধ্যেও আমরা এ আয়োজনে সমবেত হয়েছি। সমাজকে দূষণমুক্ত করতে পরবর্তী সময়েও দেশের সুশীল সমাজ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুচিন্তিত মতামত গ্রহণ করে যুগান্তর প্রকাশ করবে।

কিশোর গ্যাং, মাদক ও টিকটক রোধে সাইফুল আলম বলেন, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক দায়িত্বটা বেশি। পরিবারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি তাকে মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের সবার যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের খারাপ যা কিছু আছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার একটা সমন্বিত কর্মপ্রয়াস চালাতে হবে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করার মানসিকতা প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করব, কিন্তু সেখানের খারাপ বিষয়টি পরিহার করব। তাহলেই সমাজ থেকে এসব ভয়ঙ্কর অপরাধ নির্মূল হতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে সমাজের।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সমাজকে কীভাবে গ্রাস করেছে এবং এগুলোর কড়াল গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসার উপায় তথ্য-উপাত্তসহ উপস্থাপন করেছেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদক একটি অন্যতম সামাজিক ব্যাধি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিনরাত শ্রমের পরও এ থেকে মুক্তি মিলছে না। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছেই। বেসরকারিভাবে দেশে প্রায় ৭৫ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। গণমাধ্যমগুলোতে সম্প্রতি উঠে আসা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা ২ কোটি। এদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশই তরুণ। এসব তরুণদের ৮০ ভাগই এই মাদক জোগানে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারাই সংঘবদ্ধ হয়ে পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে। আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক তৈরিতে সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। টিকটক, ফেসবুককে অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ডে জড়ায় তারা।

দেশের অপরাধের সব কর্মকাণ্ডের মূলে মাদক দায়ী বলে দাবি করেন ড. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদনগুলো বলছে, ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, কিডন্যাপ, গুম, রাহাজানি, ছিনতাই সব ধরনের অপরাধের ৮০ শতাংশই মাদকাসক্ত। গেল কয়েক বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছেন, নেশার জন্য ২৫০ নারীকে খুন করেছে তাদের স্বামী। নেশার টাকা না পেয়ে বাবার হাতে ২২ দিনের নবজাতক কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরে মার্চে কুর্মিটোলায় ঢাবিছাত্রী ধর্ষণে গ্রেফতার ব্যক্তিও মাদকাসক্ত ছিলেন। একই বছরের ১০ মার্চে কাউলার ঝোপে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতাররা সবাই মাদকসক্ত ছিল। 

পুলিশের বরাতে ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ মাদকাসক্তি। অপরাধের মাত্রা কমাতে হলে সবার আগে দেশে মাদকের ব্যাপকতা কমাতে হবে। অথচ সরকারের এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির পরও কিছুতেই মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

ড. অরূপ রতন চৌধুরী তথ্য দেন, শুধু ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে মাদকের সঙ্গে জড়িত ৫০ জন গ্রেফতার হন। দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ মামলা হয় মাদকের। 

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মাদক ইয়াবা জানিয়ে ড. অরূপ রতন চৌধুরী তথ্য দেন, দেশে মোট ইয়াবার ৮০ ভাগ আসে মিয়ানমার হতে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে। এরপর দেশব্যাপী তরুণ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। তরুণদের গ্রাহকে পরিণত করতে মাদক কারবারিদের লক্ষ্য হয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অনেকাংশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা দায়ী বলে মন্তব্য করেন ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

তার দেওয়া তথ্যমতে, গত তিন বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ৭৩১টি মামলা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইয়াবাকেন্দ্রিক। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রোহিঙ্গারাই এখন ইয়াবা ও মাদকের বড় বাহক।

এ বিষয়টিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই সমাজসেবক।

সামাজিক ব্যাধি কিশোর গ্যাং নিয়ে ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, গত ১০-১১ বছরে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাং দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিশোর গ্যাংগুলোর গডফাদারদের নেতৃত্বে কোমলমতিদের দিয়ে বড় ধরনের চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক বিক্রির কার্যক্রম চলছে। রাজধানীতে ৬২টি কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যার মধ্যে ৪২টি সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে কেবল রাজধানীতেই ১০ থেকে ১৫ হাজার কিশোর এই গ্যাং কালচারে ঢুকে পড়ে অপরাধে জড়িত হয়েছে।

এসব অপরাধের জন্য কিশোররা টেকনোলজির অপব্যবহার করছে বলে জানান তিনি।

উদাহরণস্বরূপ টিকটক, লাইকির মতো অ্যাপসকে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, টিকটক ও লাইকির মাধ্যমে অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে মাদক পাচার, নারী পাচারে মেতে উঠেছে কিশোররা।

সে হিসেবে দেশে মাদকের বিস্তার বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে অনুরোধ করেন তিনি। পাশাপাশি অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের পারিবারিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে বলে জানান তিনি।

ছেলে বা মেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটুকু সময় ব্যয় করছে আর স্মার্টফোন কি কাজে লাগাচ্ছে নিয়মিত তার মনিটরিং করতে হবে বলে জানান তিনি। 

মাদক আইনে বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্টে কার্যক্রমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও গাড়িচালকদের অন্তর্ভুক্তকরণের সুপারিশ করেন ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার।

নাছিমা বেগম বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এই তিন ব্যাধি থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বাবা-মা। 

তিনি জানান, জাপানে শিশুদের স্কুলে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নৈতিকতা শেখানো হয়, কী করা উচিত আর কি অনুচিত শেখানো হয়। বাংলাদেশেও জাপানের মতো পরিবারকেই স্কুল বানাতে হবে। সেখানেই ছেলে-মেয়েরা শিখবে কোনটি খারাপ আর কোনটি ভালো। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে তাদের ফেরাতে হবে। শিশু যেন পর্নোগ্রাফিতে না ঝুঁকে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের দৌরাত্ম্য রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও কম নয় বলে জানান নাছিমা বেগম। 

তিনি জানান, অনতিবিলম্বে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সীমান্ত দিয়ে নারী পাচার রোধে অ্যাম্বাসি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এ তিন সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যথেষ্ট সক্রিয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনের পরই মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন করে গেছেন। সেই ১৮ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। সরকারের সেই নীতি অনুসরণের কাজ করে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

তিনি বলেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূলে প্রথমে যে কাজ করেছি তা হচ্ছে- মাদকের সাপ্লাই ডিডাকশন; যা বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনী দিয়ে নিয়মিত চালু রয়েছে। দেশে মাদকের সরবরাহ কীভাবে কমানো যায় বা রোধ করা যায় সেটাই প্রথম করণীয়।

দ্বিতীয়ত ডিমান্ড ডিডাকশন। দেশের যুব সমাজই যদি মাদককে না বলে তবে সরবরাহ কমবে, চোরাচালান কমবে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া, স্কুল-কলেজে নানা ভাবে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছি আমরা। জনসচেতনা তৈরিতে এর ক্ষতিকারক দিক উল্লেখ করা হচ্ছে ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ও র্যালির মাধ্যমে। আর দেশের ৩৫৮টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে আসক্তদের চিকিৎসা চালানো হচ্ছে।

দেশে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের মতো তিন ব্যাধির উচ্চসংক্রমণের জন্য বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, তদন্তে গাফিলতি ও অভিযানে আটক মাদক ধ্বংসের যথাযথ তথ্য না পাওয়াকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

বৈঠকে নিজের বক্তব্যে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, মাদকের শত শত মামলা জমে আছে আদালতে। করোনার কারণে এ মামলার জট আরো বেড়েছে। তদন্তে গাফিলতি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাই মাদককাণ্ডে জড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু ঘটনায় মাদকসেবীরা বহু মামলায় পার পেয়ে যাচ্ছে। 

তিনি আরো বলেন, মাদক নির্মূল অভিযান পরিচালনায় সাইবার এক্সপার্ট টিম গঠন করতে হবে। গুলি করে মেরে ফেলাই সমস্যার সমাধান নয়। তথ্য অনুযায়ী গত বছরে মাদককাণ্ডে ৪৬৪ জনকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তাতে দেশে মাদক, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে কোনো প্রভাব পড়েনি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ তিন সামাজিক ব্যাধি রোধ করতে প্রথম পদক্ষেপ আসবে পরিবার থেকেই। বাবা-মাকেই জানতে হবে সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কোন বিষয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে। সন্তানের সঙ্গী হয়ে থাকতে হবে অভিভাবককে। সন্তান যেন মানসিকভাবে একা না হয়ে পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন- সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার, র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বদ্ধপরিকর যে, দেশ থেকে গ্যাং কালচারটিই নির্মূল করা হবে। এজন্য জেলাভিত্তিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। আমরা এটা দৃঢ়চিত্তে বলতে পারি যে, বর্তমানে অপরাধ করে কোনো অপরাধী পার পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ৩০ হাজারের মতো আসামি ধরা হয়েছে। মাদকসেবীদের নতুন নতুন কৌশলকেও ট্র্যাক করে ধরা হচ্ছে। মাদক কারবারিরা নারিকেলে, পাকস্থলিতে করে ইয়াবা নিয়ে আসছে। র্যাবের চৌকস অভিযানে তাদের অভিনব সব কৌশল ধরা পড়ছে।

সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান বলেন, এক্ষেত্রে র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো স্মার্ট হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। দেশে মাদকের এত ব্যাপকতার জন্য মামলায় তদন্তে দুর্বলতা দায়ী।

তদন্তকে আরও শক্তিশালী করে বিচার ব্যবস্থার দ্রুতকরণের সুপারিশ জানান তিনি।

তিনি বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের অপব্যবহার বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এগুলোর একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একই নেটওয়ার্ক। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে দমন করলে কাজ হবে না। সবগুলোকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর তা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টেকনোলজির প্রয়োগ বাড়াতে হবে এবং বিচার ব্যবস্থাকেও ডিজিটালাইজড করতে হবে।

অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, সমাজের বিকাশকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। কিশোর গ্যাং ও মাদকের সমস্যা অনেক আগে থেকেই আছে। ১৯২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ১ হাজার গ্যাং ছিল, যা বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি। বর্তমানে পুঁজিবাদের অর্থনীতিতে কিশোর গ্যাং তৈরি হবেই। কারণ দেশে খেলার মাঠ নেই, কচিকাঁচার মেলা নেই, সংস্কৃতির চর্চা নেই।

তিনি বলেন, আসলে টিকটক, লাইকি, ফেসবুক এগুলো নাথিং বাট বিজনেস। এখানে অর্থ উপার্জনই সব। এগুলোকে আমি খারাপ বলছি না। এসবের অপব্যবহারকে রুখতে হবে। এক কথায় ফিল্টারিং করতে হবে। এখানে শিশুদের শুধু ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা যাবে না বাবা-মায়ের।

মাদক নিরোধে বর্ডার চেকে কঠোর হতে হবে, দেশের ভেতরে ড্রাগ ডিলারদের শনাক্ত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা রিহ্যাব সেন্টার বাড়াতে হবে।

তিনি যোগ করেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং বেশি বেশি করতে হবে। টিকটকের মাধ্যমে ভারতে ১ হাজারের মতো নারী পাচারের ঘটনা প্রকাশের পর আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার পর দেশে এলএসডির মতো ভয়ঙ্কর মাদক ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে পেরেছি। এসব অপরাধ কেন শুরুতেই জানা গেল না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে তৈরি হতে হবে; যাতে অপরাধের শুরুতেই তা সন্ধান করে দমন করা যায়।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন