সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ
jugantor
মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সংস্কৃতি রোধ
সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ
যুগান্তরের গোলটেবিল বৈঠক

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৩ জুন ২০২১, ০১:৩৬:১৩  |  অনলাইন সংস্করণ

মাদক, কিশোর গ্যাং, টিকটক-সমাজের এ তিন ব্যাধিতে বিপর্যস্ত নতুন প্রজন্ম। মাদকের ভয়াবহতায় যুব সমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সব অপরাধের মূলে মাদক। আর টিকটক-লাইকির অপব্যহার সমাজে নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। এ তিন সমস্যা সমাধানে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।

শনিবার ‘সমাজের তিন ব্যাধি (মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক) রোধে করণীয়’-শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। যুগান্তর এ বৈঠকের আয়োজন করে। পত্রিকাটির কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, তদন্তের দুর্বলতা সব বিচারকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সমস্যা সমাধানে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও ‘স্মার্ট’ হওয়ার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিভাকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন।
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রক বোর্ডের উপদেষ্টা সদস্য অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন-যুগান্তর সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেছুর রহমান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান একেএম হাফিজ আক্তার, এলিট ফোর্স র‌্যাপিড আকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এবং যুগান্তরের উপসম্পাদক আহমেদ দীপু। এছাড়া অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার। গোলটেবিল বৈঠকে সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবু। উপস্থিত ছিলেন যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক দেওয়ান আসিফ রশীদ ও বিশেষ প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজান মালিক।

গোলটেবিলে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম এমপি বলেন, মাদকের ভয়াবহতায় যুবসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবারের কোনো একজন সদস্য মাদকাসক্ত হলে গোটা পরিবারের সুখ-শান্তি বলতে আর কিছুই থাকে না। তাই মাদকের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বড় ভ‚মিকা পালন করতে পারে। তারা কাজও করছে। কিন্তু তাদের কাজকে জনগণের কাছে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর হতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে অধিদপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিটি পরিবার থেকে শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে কাদের সঙ্গে চলাফেরা করছে, রাতে যথাসময়ে ঘুমাচ্ছে কিনা, গোপনে কার সঙ্গে কথা বলছে- এসব বিষয়ে অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখতে হবে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, করোনাকালে এমনিতেই ছেলেমেয়েদের রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। তারা রাতে না ঘুমিয়ে মোবাইল ফোনে বাজে সময় পার করছে। এ বিষয়টি অভিভাবকদের মনিটরিং করতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। পরিবারের নৈতিক শিক্ষাই হলো সন্তানদের বেসিক শিক্ষা। পরিবার থেকে শিশুরা যে শিক্ষা নেয় তা সারা জীবন চালু থাকে।
সালমা ইসলাম এমপি বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই কিশোর গ্যাংয়ের কথা শুনছি। গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ খুনের ঘটনাও ঘটেছে। কিশোর গ্যাংয়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে যুগান্তরে বেশকিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্যরা নানা অপকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদের অনেক ‘বড় ভাই’ এবং গডফাদার বা মাফিয়া রয়েছে। এ মাফিয়া চক্রকে খুঁজে বের করতেই হবে। নিশ্চয়ই এতদিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মাফিয়াদের বিষয়ে বিস্তর তথ্য-উপাত্ত চলে এসেছে। আমার মতে-মাদক, কিশোর গ্যাং এবং টিকটক-লাইকিতে জড়িয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার পেছনে প্রথমত সংশ্লিষ্টদের অভিভাবকরা দায়ী। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগই তাদের বেশি বেপরোয়া করে তুলছে। যেসব গডফাদারের কারণে নতুন প্রজন্ম বেপরোয়া হয়ে উঠছে তাদের কোনো ভাইকেই ছাড় দেওয়া যাবে না। কারণ, কিশোর অপরাধীরা ধরা পড়লে ওইসব গডফাদাররাই তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার তদবির করে। যারা অপরাধীদের পক্ষে তদবির করে তারাই বড় অপরাধী। তাই সব ক্ষেত্রেই আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনকে আরও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, টিকটক ভিডিও সমাজে এখন বড় ডিজিটাল সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। যারা এটি ব্যবহার করে তারা হয়তো এর পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে। এর পক্ষে সাফাই গায়। কিন্তু আমি বলব, প্রত্যেক জিনিসের ভালোমন্দ দুটি দিকই থাকে। যেমন আমরা ধারালো ছুরি দিয়ে ফল কাটতে পারি। এটা একটি ভালো কাজ। আমরা সেটি দিয়ে মানুষও হত্যা করতে পারি। টিকটক সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা শুনেছি, তা দিয়ে ভালো কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আরও একটি মরণনেশা আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। সেটি হলো পাবজি গেমস। মোবাইল ফোনে এ গেমসে ছেলেমেয়েরা আসক্ত হয়ে পড়েছে। পাবজিসহ কিছু কিছু গেমস ছেলেমেয়েদের দাঙ্গাবাজ হতে উদ্বুদ্ধ করছে। পরিচিত বন্ধু ছাড়াও অপরিচিত অনেকে যুক্ত থাকে এসব গেমে। তাই ছেলেমেয়েরা সবার অজান্তে খারাপ নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়ছে। গোলটেবিল বৈঠক থেকে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি করছি যে, দ্রুত এসব গেম বন্ধের ব্যবস্থা নিন। শুধু টিককট ভিডিও নয়, যেসব সাইট বা ভিডিও আমাদের উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সেগুলো বন্ধ করতেই হবে। এমনিতেই করোনা মহামারির কারণে আমাদের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকের আয় কমে গেলেও ব্যয় বেড়েছে। মানুষ চাকরি বা কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সমাজে এই ধরনের বিষফোঁড়ার সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না। তাই সমাজের দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এ ধরনের বৈঠক আয়োজন করেছি। ভবিষ্যতেও অনেকে এ ধরনের আয়োজন করবে। কিন্তু এতেই সমস্যার সমাধান হবে না। গণমাধ্যম ভুল ধরিয়ে দিতে পারে। তথ্য-উপাত্ত সাজিয়ে প্রচার করতে পারে। আর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বৈঠক থেকে যেসব বিষয় উঠে এসেছে সেসব বিষয়ে সবাইকে একমত হওয়া উচিত। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করলে এসব সমস্যা থাকবে না। আর এসব সমস্যা দূর হলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে আর কোনো বাধা থাকবে না।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা ২ কোটি, যার মধ্যে এক কোটি মাদকাসক্ত এবং বাকি এক কোটি অনিয়মিত মাদকসেবী। সুতরাং নির্দিষ্টভাবে কত সংখ্যক মাদকাসক্ত আছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে, পরিস্থিতি যে ভয়াবহ তা বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্যচিত্র থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। দেশে মাদকাসক্তের ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। এর মধ্যে ৮০ ভাগ তরুণ, ৮০ ভাগ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, ৯৮ ভাগ ধূমপায়ী, ৫৭ ভাগ যৌন অপরাধী এবং ৭ ভাগ নেশা গ্রহণকারী এইচআইভি আক্রান্ত। জরিপে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত সর্বাধিক। এ ইয়াবা আসক্তদের ৮০ ভাগই শিক্ষার্থী। ইয়াবা এমনই একটি ধ্বংসাত্মক মাদক, যেটা গ্রহণ করলে সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও চরম শারীরিক ও মানসিক অবসাদ হয় এবং সেটা থেকে চরম হতাশা, নৈরাজ্য ও বিষাদে পতিত হয়, পরিণতিতে সমাজের জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে আত্মহত্যাও করতে পারে একজন ইয়াবা গ্রহণকারী।
মূল প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন- ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, খুনসহ সব অপরাধের ৮০ শতাংশই মাদকাসক্তদের দ্বারা সংঘটিত হয়। তারা এসব অপরাধের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত এবং নিশ্চিতভাবে বলা হয়েছে সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ মাদকাসক্তি। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পরও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদক। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, মাদক সেবন করার পর অনেকের মধ্যে এক ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ক্ষেত্রে মাদক বেশি প্রভাব ফেলে। অনেকেই মাদক সেবনের পর পরিবেশ পরিস্থিতির সুযোগে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। প্রতিদিন ঢাকায় গড়ে মাদকের সঙ্গে জড়িত ৫০ জন গ্রেফতার হয়। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশের চিত্র প্রায় একই। মাদক আইনে মামলা অন্যান্য অপরাধের তুলনায় অনেক বেশি। গড়ে প্রায় ৩০০ মাদক মামলা হয় প্রতিদিন।

তিনি আরও বলেন, গত ১০-১১ বছরে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গডফাদারদের নেতৃত্বে বড় ধরনের চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি এবং মাদক বিক্রির মতো কাজে যুক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন দলের বা সহযোগী সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে কিশোরদের একটি অংশ এলাকার ‘প্রভাবশালী’ বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় সারা শহরে প্রভাব বিস্তার করছে। তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা এলাকা, করছে নানা অপরাধ। গ্রুপে গ্রুপে মারামারিতে খুনোখুনিতে হচ্ছে প্রতিদিন বাড়ছে হানাহানি সংঘাত। এ সব কিশোররা দল বেঁধে মাদক সেবন করছে যেখানে সেখানে।
যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, যে বিষয়ে আজকের আয়োজন- মাদক, কিশোর গ্যাং এবং টিকটক, এর বাইরেও অনেক ব্যাধি আছে। সমাজ এখন ব্যাধিতে জর্জরিত বলা যায়। সেই ব্যাধি নিরসনের কাজও কিন্তু চলছে। আমরা সংশোধনের চেষ্টা করছি। নতুন একটা জায়গায় যাওয়ার প্রয়াস আমাদের আছে। কিন্তু তারপরেও এ মুহূর্তে এই তিনটি বিষয় দারুণভাবে আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে নাড়া দিয়েছে- এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সে কারণেই যুগান্তর মনে করেছে এ সময়ে এই বিষয়টি অনেক বেশি আলোচনায় আসা দরকার। এ বিষয়টি থেকে আমরা কীভাবে পরিত্রাণ পেতে পারি সেই দিকনির্দেশনা জাতির সামনে উপস্থাপন করা খুবই জরুরি। যুগান্তর সংবাদপত্র হিসাবে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশ এবং পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তার একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে- সেটি বিশ্বাস করে। সেই বিশ্বাসের কারণেই আমরা নানা রকম জনসেবা ও সমাজ সচেতনতামূলক আলোচনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকি। কোভিড-১৯ এর কারণে গত এক বছর সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে তিনটি বিষয় সামনে এসেছে, তা সমাজকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে বলে আমরা আজকের এ আয়োজনে কোভিডের মধ্যেও সমবেত হয়েছি।
যুগান্তর সম্পাদক বলেন, আসলে এসব ব্যাধি দূর করার জন্য একটি সমন্বিত কর্মপ্রয়াস দরকার। এ জায়গায় সমাজ পরিবর্তনের জন্য। সমাজ নিয়ে অনেক সময় আমাদের বিব্রত হতে হয়। নতুন প্রত্যাশার জায়গা যেমন তৈরি হয়েছে তেমনিভাবে নানা রকম সমস্যা ও সংকটও তৈরি হয়েছে। কিন্তু থামলে তো চলবে না। জীবনতো আর থেমে থাকে না, সময়ও থেমে থাকে না। কাজেই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সমাজ উত্তরণের এ সময়কালে আমাদের অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। সেটি যেমন পরিবার থেকে দরকার, সমাজের দরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরকার, রাষ্ট্রের দরকার। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি সেখানে মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসাবে দেশটাকে যদি আমরা গড়ে তুলতে চাই, সেক্ষেত্রে সবার যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা খুব জরুরি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন- মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এ তিন ব্যাধি থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার ও বাবা-মা। সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কি দেখে এসব জানতে হবে। সমাজে এখন মানবিক মূল্যবোধের অভাব রয়েছে, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব রয়েছে। তাই বাচ্চাদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। বাচ্চার হাতে মোবাইল দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। মোবাইল ফোন-ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধ করতে হবে। যেই অ্যাপগুলোর কারণে আমাদের বাচ্চারা ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিটিআরসির ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যারা মাদকসহ নানাভাবে কিশোর তরুণের জীবনে বিভীষিকা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঘটনা দিনে দিনে কমে আসবে। সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। প্রতিটি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। জনসচেতনতা এ মুহূর্তে অনেক বেশি প্রয়োজন। মাদক, টিকটক, কিশোর গ্যাং এগুলো আসলে একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সীমান্ত দিয়ে নারী পাচার রোধে অ্যাম্বাসি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি (ভাইস-চ্যান্সেলর বা উপাচার্য) অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বলেন, আমরা মেইন স্ট্রিম কালচারকে প্রমোট না করে সাব কালচারকে প্রমোট করছি। তা আলোচনায় এসে আরও বেশি প্রচারে যায় এবং সাব কালচার মেইন স্ট্রিম কালচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাই মেইন স্ট্রিম কালচারকে আরও বেশি প্রসারিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেই বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছে সেটি অস্ত্র কেনে এবং যুদ্ধকে আহ্বান জানায়। সেই ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে আমরা পরিবারের কথা বলি, যে পরিবার শিশুকে আদর-আহ্লাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত শেখাবে সেই পরিবারকে এখন ল্যাপটপ আর মোবাইল কিনে দিতে হয়। তাহলে বাজার অর্থনীতি আমাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে আমি তাকে নতুন ফুলের গাছ চেনাই না, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত চেনাই না। আমি তাকে ল্যাপটপ আর মোবাইলের পেছনে হন্যে হয়ে খুঁজতে গিয়ে আমি মূলত নিজের পরিবারকে বাজারের পণ্যে পরিণত করছি। আমাকে গ্রাস করেছে বাজার। আমার প্রকৃতিকে প্রতিস্থাপন করেছে বাজার অর্থনীতি, আর্মস কেনার মহড়া, আমার প্রকৃতির ভালোবাসা নষ্ট করে দিয়েছে যুদ্ধাস্ত্রের আহ্বান।

তিনি বলছেন, এ অবস্থায় যে যখন যেখানে বিভ্রান্ত হচ্ছে তার কাছে মেইনস্ট্রিম কালচারটা পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র কাজ। যিনি বিভ্রান্ত হচ্ছে তাকে ‘ইনক্লুসিভ অ্যাপ্রোচে’ আনতে হবে। তাকে হত্যা করলে তো সবই শেষ। নাগরিক হিসাবে তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কেউ যদি বিভ্রান্ত হয়, তাকে আমার পথে আনতে হবে। আর পথে আনার একমাত্র পথ মেইনস্ট্রিমে কালচার প্রসারিত করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, এ সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণে গণমাধ্যম যে সচেতনতামূলক কাজগুলো করছে এর মাধ্যমে একটা সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হবে। যত সহজে আমরা শুনি, সোসাইটিটা শেষ হয়ে গেছে, অবক্ষয় হয়েছে এগুলো এটিও কিন্তু সত্য কথা নয়। প্রত্যেকটা সমাজে একটা অবস্থা থেকে আধুনিকতার দিকে যায়। সেখানে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ আসে। গ্যাং কালচার শুরু হয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহর থেকে। এরপর এটা আমেরিকায় যায়। ১৯২২ সালে শিকাগোতে এক হাজার গ্যাংয়ের অস্তিত্ব ছিল। এখন আমেরিকাতে ৩০ হাজারের বেশি গ্যাং আছে। একটা অবস্থা থেকে যখন সমাজ অন্য একটা অবস্থায় যাচ্ছে, অর্থাৎ এ যুগসন্ধিক্ষণ কিছু সমস্যা সামনে আসে।

তিনি বলেন, আমরা চাইলেও আর পারব না, আগের সেই পারিবারিক জীবন ও অবস্থা ফিরিয়ে দিতে। তাহলে বিকল্প যে প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- ডে-কেয়ার, সাপোর্ট সেন্টার তৈরি, সেগুলো করতে হবে। কানাডায় যে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো হচ্ছে তারা এমনভাবে তৈরি করছে যাতে মনে হবে পরিবারের সঙ্গেই আছে। আগের পরিবার পাব না, খেলাঘর পাব না, সাংস্কৃতিক পরিবেশ পাব না, খেলাধুলার মাঠ পাব নাÑ আর বলব গ্যাং কালচার এখানে বন্ধ হবে। এটা হয়? হঠাৎ করে একটা পরিবর্তনের ঢেউ আমাদের এখানে লেগেছে।

ড. জিয়া রহমান বলেন, এ সমস্যাগুলো যদি আলটিমেটলি আমরা সমাধান করতে না পারি তাহলে খারাপ একটা সোসাইটিতে আমরা নিমজ্জিত হয়ে যাব। টিকটক বলা হচ্ছে, টিকটক বন্ধ করলে অন্য একটা কিছু চলে আসবে। বিষয়টি হলো যাই আসবে সেটার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যাতে যা খুশি তা দিয়ে পরিবেশ নষ্ট না করা যায়। তিনি বলেন, মাদকের ‘কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান’ লাগবে। যেভাবে বর্ডার চেক দিতে হবে, ড্রাগ ডিলারদের বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। শুধু মাদকের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করলে হবে না, পাশাপাশি রিহ্যাব, কাউন্সিলের দিকে খেয়াল করতে হবে।

ড. জিয়া বলেন, এখন যারা টিকটক করছে তাদের মধ্যে দরিদ্র্য আছে, কর্মহীনতা আছে, আবার বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। সমাজ যদি দায়িত্ব না নেয় তাহলে সেতো টিকটকের মধ্যে যাবেই। এসব গ্যাং ও যেসব মেয়েদের কথা আসতেছে তাদেরতো পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য টাকা-পয়সা দরকার। যদি ভালো কাজের ব্যবস্থা না করেন, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না করেন তাহলে এ সমস্যার প্রতিকার পাওয়া যাবে না। কমিটমেন্ট, নরমস এবং ভ্যালুজ, দেশপ্রেম, বিশ্বাস এ ব্যাপারগুলো থাকতে হবে। প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং থাকতে হবে। এক হাজার নারী পাচার হলো তারপর আমরা জানতে পারলাম টিকটক একটি বড় সমস্যা। প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং হলে একটা নারী পাচার হলেই তো আমরা জানতে পারতাম এ ভয়ংকর অবস্থার কথা। এলএসডির জন্য একটি ছেলে খুন হয়ে গেল। এটা কোনো ব্যক্তির দোষ নয়। পুরোপুরি যে ঔপনিবেশিক কাঠামো এগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মোখলেসুর রহমান বলেন, তদন্তের দুর্বলতা সব বিচারকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। এটা পুলিশে আসার আগেও শুনেছি। এসেও শুনেছি। এখনও শুনছি। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে এটা ঠিক হচ্ছে না কেন? হয় আমাদের চিন্তার মধ্যে দুর্বলতা আছে। হয়তো সঠিকভাবে আমরা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারছি না। শুধু তদন্তের দুর্বলতার কারণেই তিনটি ব্যাধির (মাদক, কিশোর গ্যাং, টিকটক-লাইকি) বাড়ছে, এটা ঠিক নয়। এর সঙ্গে আরও বেশিকিছু বিষয় রয়েছে। তদন্তের দুর্বলতা শুধু একটি পারসেপশন। তদন্তের দুর্বলতার কথা বলা মানেই দুর্বল একটি কনক্লুশনে যাওয়া। অপরাধের দ্রুত তদন্তের পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। সামাজিক তিন ব্যাধি এখন সামাজিক সমস্যা, দেশীয় সমস্যা। আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অপরাধ হলো সামাজিক অসুখ। এ থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। এটা করলে সবার আগে সঠিক চিকিৎসা করতে। মানুষের পালস বুঝতে হবে। মানুষের পালস হলো দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি কর। আমি বিচারকদের দোষারোপ করছি না। তাদের বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। এ সীমাবদ্ধতা দূর করে দিতে হবে। এটা করতে পারলে মানুষের ক্ষোভের জায়গাটি দূর হবে। যে বা যারাই অপরাধ করুক না কেন পুলিশের কেউ অপরাধ করলেও দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আরও বলেন- মাদক, টিকটক, কিশোর গ্যাং- কোনোটিই বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। একটি অপরাধ অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। সব একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। না হলে নতুন নতুন অপরাধ সামনে আসবে। আমি পুলিশকে বলে রাখব- তোমরা নিশ্চিত থাকো, লেডি গ্যাং এসে যাবে। বর্তমান সময়ে অপরাধের মূলে হলো টেকনোলজি। কিন্তু টেকনোলজিকে বাদ দেওয়া যাবে না। এসবের অপব্যবহার দূর করতে হবে। তিনি বলেন, বাবা-মা সন্তানের পুরো দায়িত্ব নিতে পারবে না। সমাজ এবং শিক্ষা ব্যস্থাকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। না হলে এসব সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করছি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত জানালা। কিন্তু তারাই আজ বেশি ভিকটিম। তিনি আরও বলেন, সামজিক তিন ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক বেশি স্মার্ট হতে হবে। পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করতে হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, টিকটক সারা বিশ্বে একটি জনপ্রিয় অ্যাপস। কারও কারও মতে এর ব্যবহারকারী ২০ কোটির বেশি। এর অপব্যবহারে সমাজ আজ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সামজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিন্মবিত্তের কনফ্লিক্টের কারণে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে তিনি বলেন, নিন্মবিত্তের ছেলেরা একসঙ্গে জড়ো হচ্ছে। তারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ব্যবহার করে দ্রুত তৈরি করছে। পরে ছেলেমেয়েদের প্রলুব্ধ করে অপরাধের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যে অনেক তরুণী পাচার হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে র‌্যাব-পুলিশ একযোগে কাজ করছে।
হাফিজ আক্তার বলেন, এক সময় একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সমাজের সবাই সবাইকে চিনত। এখন একক পরিবার। অনেকেই অনেককে চেনেন না। সামাজিক স্ট্রাকচার পরিবর্তন হয়ে গেছে। নতুন নতুন অপরাধের এটাও একটি কারণ। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি এলাকাতেই গ্যাং সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। কিশোর অপরাধ বন্ধ করতে হলে কোনো গ্যাং থাকতে দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের কাছে কিছুটা ভাটা পড়ে গেছে। তারপরও আমরা তালিকা ধরে অভিযান শুরু করেছি। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করেছি।

মাদকের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে নতুন মাদক এলএসডির ভয়াবহ চিত্রের সন্ধান পাই। এলএসডি কিভাবে এলো তা বের করতে গিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করি। কিন্তু গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ দেখতে পাইনি। যা খুবই মারাত্মক বিষয়। তাদের কাছ থেকে এলএসডির উৎস জানতে পারি। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্র এবং হাউজ টিউটরের মাধ্যমেও দেশের বাইরে থেকে আসছে এলএসডি। তিনি বলেন, এলএসডির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ব্রাউনি নামের নতুন মাদকের সন্ধান পাই। এক পিস ব্রাউনি (গাঁজার নির্যাস থেকে তৈরি) তিন থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রাউনি বাসা-বাড়িতেই তৈরি হচ্ছে। যে ছেলেটি ব্রাউনি বানাচ্ছে তারা বাবা-মায়ের সামনেই বানাচ্ছে। অথচ কেউ জানে না যে, এটি মাদক। সম্প্রতি আইস নামের আরও একটি নতুন মাদকের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি ইয়াবার চেয়ে ৫০ গুন বেশি ক্ষতিকর। তিনি বলেন, সমাজের তিন ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে বিচারিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সব অর্গানকে একযোগে কাজ করতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার বলেন, মাদকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যথেষ্ট সক্রিয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনের পরই মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন করে গেছেন। সেই ১৮ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। সরকারের সেই নীতি অনুসরণের কাজ করে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূলে সবার প্রথম যা করছি আমরা তা হচ্ছে মাদকের সাপ্লাই ডিডাকশন, যা বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনী দিয়ে নিয়মিত চালু রয়েছে। দেশে মাদকের সরবরাহ কীভাবে কমানো যায় বা রোধ করা যায় সেটাই প্রথম করণীয়। দ্বিতীয়ত ‘ডিমান্ড ডিডাকশন’। দেশের যুব সমাজই যদি মাদককে না বলে তবে সরবরাহ কমবে, চোরাচালান কমবে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া, স্কুল-কলেজে নানা ভাবে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছি আমরা। জনসচেতনতা তৈরিতে এর ক্ষতিকারক দিক উল্লেখ করা হচ্ছে ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ও র‌্যালির মাধ্যমে। আর দেশের ৩৫৮টি মাদকাসক্তদের নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে আসক্তদের চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। আরেকটি বিষয় উলে­খযোগ্য হচ্ছে- আগে পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলাসহ ক্লাবভিত্তিক যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল, এগুলো এখন অনুপস্থিত। খেলার মাঠ নেই। বিনোদনের সুব্যবস্থা নেই। এই বিষয়ে আমাদের সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে।

এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যহারের বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। ইন্টারনেটর অপব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা নারী পাচারসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব রাখব না। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা অনেক বেশি। এখন কোনো অপরাধীই অপরাধ করে পার পাচ্ছে না। কিশোর অপরাধ দূর করতে তালিকা আপডেট করছি। র‌্যাবের সব ইউনিটকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একার পক্ষে কিশোর অপরাধ দূর করা সম্ভব নয়। অভিভাবকসহ সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তা কী অভিভাবকরা জানেন?

র‌্যাব পরিচালক বলেন, কিশোর অপরাধ দূর করতে সমাজের দায়বদ্ধতা অনেক। আগে খেলার মাঠে আমরা খেলা করতাম। এখন খেলার মাঠ কমে গেছে। আগে ক্লাবগুলো ছিল খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র। এখন ক্লাবগুলোতে জুয়ার আসর বসছে। আমরা বসে নেই। অতীতে অনেক অভিযান চালিয়েছি। এখনও চালাচ্ছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ অব্যাহত আছে। গত ২ বছরে ৩০ হাজার মাদক ব্যবসায়ী-সেবীকে গ্রেফতার করেছি। লাখ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করছি। তিনি বলেন, ডিমান্ড থাকলে সাপ্লাই থাকবেই। তাই ডিমান্ড বন্ধ করতে হলে সামাজিক অন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

দেশে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের মতো তিন ব্যাধির উচ্চ সংক্রমণের জন্য বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে গাফিলতি ও অভিযানে আটক মাদক ধ্বংসের যথাযথ তথ্য না পাওয়াকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। বৈঠকে নিজের বক্তব্যে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, তদন্তে গাফিলতি থাকলেই বিচারহীনতার জায়গাটি তৈরি হয়। তদন্তের ক্ষেত্রে আমরা অনেক রকম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখি। প্রথমত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই অসংখ্য অভিযোগ যে, তারা নিজেরাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই যখন প্রয়োগের প্রশ্ন আসে তখন এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। যখন কারও কাছ থেকে মাদকদ্রব্য আটক হয় তখন এর অল্প একটু অংশ কোর্টে দেওয়া হয় নমুনা হিসাবে। বাকিটা ধ্বংস করে ফেলার কথা। সেটা আসলেই ধ্বংস করা হলো কিনা সেই মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এ ব্যবস্থাটি থাকা উচিত।

তিনি বলেন, ২০১৮ সালে আমরা নতুন আইন পেলাম। সেখানে বলা হলো ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। ট্রাইব্যুনাল গঠন না করার কারণে ২০২০ সাল পর্যন্ত শত শত মামলা জমে গেল যেখানে কোনো বিচারই হলো না। এরপর সংশোধনী এনে ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি তুলে দেওয়া হলো এখতিয়ারাধীন আদালত আনা হলো যার মাধ্যমে বিচার করা সম্ভব। কিন্তু ইতোমধ্যেই বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে। করোনার কারণে এ মামলার জট আরও বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূল অভিযান পরিচালনায় সাইবার এক্সপার্ট টিম গঠন করতে হবে। তাহলে সেটি আরও কার্যকরি হবে। ইতোমধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলে ৪৬৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এত মানুষ মারার পরেও যদি মাদকের এ ব্যবহার না কমে তাহলে প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে এ হত্যাগুলো কোনো কাজে আসেনি। তাই আইনটাকে কিভাবে কার্যকরিভাবে ব্যবহার করা যায় সেই জায়গায় আসা উচিত।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সন্তানদের নিয়ে বাব-মায়েরা যখন আমার কাছে আসে তখন কিছু কথা জিজ্ঞেস করি। আপনার সন্তান কি রাতে জেগে থাকে দিনে ঘুমায়? সন্তান কি আপনার সঙ্গে রাগ করে কথা বলে? দরজা জোরে বন্ধ করে? খাবার কি টেবিলে সবার সঙ্গে না বসে অন্য জায়গায় খায়? সে কি সারাক্ষণ কানের ভেতর হেডফোন গুঁজে রাখে? তখন বাবা-মায়েরা ‘ঠিক ঠিক’ বলে উত্তর দেন। এই যে একটি সাব-কালচার তৈরি হয়েছে তারই একটি অংশ মাদক, টিকটক এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, শিশুরা যখন বড় হতে থাকে মা-বাবা তখন বলে, বাচ্চাটি খাচ্ছে না, লম্বা হচ্ছে না। আরেকটু বড় হলে বলে ওর রেজাল্ট ভালো হচ্ছে না, জিপিএ ফাইভ পাবে কিনা জানি না। এটা আসলে শিশুদের বিকাশের চার ভাগের এক ভাগ। বিকাশের আরও তিনটি বড় ভাগ আছে। কগনেটিভ ডেভেলপমেন্ট, স্যোশিও-ইমোশনাল ডেভেলপমেন্ট, মোরাল ডেভেলপমেন্ট। এই তিনটি দিকেই আমাদের অভিভাবকদের নজর খুব কম। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা এ তিনটি বিকাশ সুষম করতে না পারব ততদিন পর্যন্ত আসলে টিকটক বন্ধ করে বা হত্যা করে এ মাদককে ঠেকানো যাবে না।

গোলটেবিল বৈঠকে যুগান্তরের উপসম্পাদক আহমেদ দীপু বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, বহনকারী এবং মাদসেবীরা ধরা পড়লেও আড়ালে থেকে যাচ্ছে গডফাদারর। গডফাদার বা নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবে না। তিনি বলেন, এখন নারী এবং কিশোররাও অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এটা কী ভবিষ্যতে আরও নিচের দিকে নামবে? তিরি আরও বলেন, আমরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু মাদক, কিশোর গ্যাং এবং টিকটক-লাইকিসহ নানা অপকর্মের কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক সংস্কৃতি রোধ

সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ

যুগান্তরের গোলটেবিল বৈঠক
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৩ জুন ২০২১, ০১:৩৬ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মাদক, কিশোর গ্যাং, টিকটক-সমাজের এ তিন ব্যাধিতে বিপর্যস্ত নতুন প্রজন্ম। মাদকের ভয়াবহতায় যুব সমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সব অপরাধের মূলে মাদক। আর টিকটক-লাইকির অপব্যহার সমাজে নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। এ তিন সমস্যা সমাধানে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।
 
শনিবার ‘সমাজের তিন ব্যাধি (মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক) রোধে করণীয়’-শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। যুগান্তর এ বৈঠকের আয়োজন করে। পত্রিকাটির কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, তদন্তের দুর্বলতা সব বিচারকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সমস্যা সমাধানে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও ‘স্মার্ট’ হওয়ার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিভাকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন।
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রক বোর্ডের উপদেষ্টা সদস্য অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন-যুগান্তর সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেছুর রহমান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান একেএম হাফিজ আক্তার, এলিট ফোর্স র‌্যাপিড আকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এবং যুগান্তরের উপসম্পাদক আহমেদ দীপু। এছাড়া অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার। গোলটেবিল বৈঠকে সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবু। উপস্থিত ছিলেন যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক দেওয়ান আসিফ রশীদ ও বিশেষ প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজান মালিক।

গোলটেবিলে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম এমপি বলেন, মাদকের ভয়াবহতায় যুবসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবারের কোনো একজন সদস্য মাদকাসক্ত হলে গোটা পরিবারের সুখ-শান্তি বলতে আর কিছুই থাকে না। তাই মাদকের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বড় ভ‚মিকা পালন করতে পারে। তারা কাজও করছে। কিন্তু তাদের কাজকে জনগণের কাছে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর হতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে অধিদপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিটি পরিবার থেকে শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে কাদের সঙ্গে চলাফেরা করছে, রাতে যথাসময়ে ঘুমাচ্ছে কিনা, গোপনে কার সঙ্গে কথা বলছে- এসব বিষয়ে অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখতে হবে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, করোনাকালে এমনিতেই ছেলেমেয়েদের রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। তারা রাতে না ঘুমিয়ে মোবাইল ফোনে বাজে সময় পার করছে। এ বিষয়টি অভিভাবকদের মনিটরিং করতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। পরিবারের নৈতিক শিক্ষাই হলো সন্তানদের বেসিক শিক্ষা। পরিবার থেকে শিশুরা যে শিক্ষা নেয় তা সারা জীবন চালু থাকে। 
সালমা ইসলাম এমপি বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই কিশোর গ্যাংয়ের কথা শুনছি। গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ খুনের ঘটনাও ঘটেছে। কিশোর গ্যাংয়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে যুগান্তরে বেশকিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্যরা নানা অপকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদের অনেক ‘বড় ভাই’ এবং গডফাদার বা মাফিয়া রয়েছে। এ মাফিয়া চক্রকে খুঁজে বের করতেই হবে। নিশ্চয়ই এতদিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মাফিয়াদের বিষয়ে বিস্তর তথ্য-উপাত্ত চলে এসেছে। আমার মতে-মাদক, কিশোর গ্যাং এবং টিকটক-লাইকিতে জড়িয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার পেছনে প্রথমত সংশ্লিষ্টদের অভিভাবকরা দায়ী। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগই তাদের বেশি বেপরোয়া করে তুলছে। যেসব গডফাদারের কারণে নতুন প্রজন্ম বেপরোয়া হয়ে উঠছে তাদের কোনো ভাইকেই ছাড় দেওয়া যাবে না। কারণ, কিশোর অপরাধীরা ধরা পড়লে ওইসব গডফাদাররাই তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার তদবির করে। যারা অপরাধীদের পক্ষে তদবির করে তারাই বড় অপরাধী। তাই সব ক্ষেত্রেই আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনকে আরও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। 
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, টিকটক ভিডিও সমাজে এখন বড় ডিজিটাল সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। যারা এটি ব্যবহার করে তারা হয়তো এর পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে। এর পক্ষে সাফাই গায়। কিন্তু আমি বলব, প্রত্যেক জিনিসের ভালোমন্দ দুটি দিকই থাকে। যেমন আমরা ধারালো ছুরি দিয়ে ফল কাটতে পারি। এটা একটি ভালো কাজ। আমরা সেটি দিয়ে মানুষও হত্যা করতে পারি। টিকটক সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা শুনেছি, তা দিয়ে ভালো কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আরও একটি মরণনেশা আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। সেটি হলো পাবজি গেমস। মোবাইল ফোনে এ গেমসে ছেলেমেয়েরা আসক্ত হয়ে পড়েছে। পাবজিসহ কিছু কিছু গেমস ছেলেমেয়েদের দাঙ্গাবাজ হতে উদ্বুদ্ধ করছে। পরিচিত বন্ধু ছাড়াও অপরিচিত অনেকে যুক্ত থাকে এসব গেমে। তাই ছেলেমেয়েরা সবার অজান্তে খারাপ নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়ছে। গোলটেবিল বৈঠক থেকে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি করছি যে, দ্রুত এসব গেম বন্ধের ব্যবস্থা নিন। শুধু টিককট ভিডিও নয়, যেসব সাইট বা ভিডিও আমাদের উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সেগুলো বন্ধ করতেই হবে। এমনিতেই করোনা মহামারির কারণে আমাদের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকের আয় কমে গেলেও ব্যয় বেড়েছে। মানুষ চাকরি বা কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সমাজে এই ধরনের বিষফোঁড়ার সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না। তাই সমাজের দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এ ধরনের বৈঠক আয়োজন করেছি। ভবিষ্যতেও অনেকে এ ধরনের আয়োজন করবে। কিন্তু এতেই সমস্যার সমাধান হবে না। গণমাধ্যম ভুল ধরিয়ে দিতে পারে। তথ্য-উপাত্ত সাজিয়ে প্রচার করতে পারে। আর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বৈঠক থেকে যেসব বিষয় উঠে এসেছে সেসব বিষয়ে সবাইকে একমত হওয়া উচিত। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করলে এসব সমস্যা থাকবে না। আর এসব সমস্যা দূর হলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে আর কোনো বাধা থাকবে না।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা ২ কোটি, যার মধ্যে এক কোটি মাদকাসক্ত এবং বাকি এক কোটি অনিয়মিত মাদকসেবী। সুতরাং নির্দিষ্টভাবে কত সংখ্যক মাদকাসক্ত আছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে, পরিস্থিতি যে ভয়াবহ তা বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্যচিত্র থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। দেশে মাদকাসক্তের ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। এর মধ্যে ৮০ ভাগ তরুণ, ৮০ ভাগ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, ৯৮ ভাগ ধূমপায়ী, ৫৭ ভাগ যৌন অপরাধী এবং ৭ ভাগ নেশা গ্রহণকারী এইচআইভি আক্রান্ত। জরিপে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত সর্বাধিক। এ ইয়াবা আসক্তদের ৮০ ভাগই শিক্ষার্থী। ইয়াবা এমনই একটি ধ্বংসাত্মক মাদক, যেটা গ্রহণ করলে সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও চরম শারীরিক ও মানসিক অবসাদ হয় এবং সেটা থেকে চরম হতাশা, নৈরাজ্য ও বিষাদে পতিত হয়, পরিণতিতে সমাজের জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে আত্মহত্যাও করতে পারে একজন ইয়াবা গ্রহণকারী।
মূল প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন- ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, খুনসহ সব অপরাধের ৮০ শতাংশই মাদকাসক্তদের দ্বারা সংঘটিত হয়। তারা এসব অপরাধের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত এবং নিশ্চিতভাবে বলা হয়েছে সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ মাদকাসক্তি। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পরও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদক। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, মাদক সেবন করার পর অনেকের মধ্যে এক ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ক্ষেত্রে মাদক বেশি প্রভাব ফেলে। অনেকেই মাদক সেবনের পর পরিবেশ পরিস্থিতির সুযোগে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। প্রতিদিন ঢাকায় গড়ে মাদকের সঙ্গে জড়িত ৫০ জন গ্রেফতার হয়। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশের চিত্র প্রায় একই। মাদক আইনে মামলা অন্যান্য অপরাধের তুলনায় অনেক বেশি। গড়ে প্রায় ৩০০ মাদক মামলা হয় প্রতিদিন।

তিনি আরও বলেন, গত ১০-১১ বছরে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গডফাদারদের নেতৃত্বে বড় ধরনের চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি এবং মাদক বিক্রির মতো কাজে যুক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন দলের বা সহযোগী সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে কিশোরদের একটি অংশ এলাকার ‘প্রভাবশালী’ বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় সারা শহরে প্রভাব বিস্তার করছে। তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা এলাকা, করছে নানা অপরাধ। গ্রুপে গ্রুপে মারামারিতে খুনোখুনিতে হচ্ছে প্রতিদিন বাড়ছে হানাহানি সংঘাত। এ সব কিশোররা দল বেঁধে মাদক সেবন করছে যেখানে সেখানে।
যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, যে বিষয়ে আজকের আয়োজন- মাদক, কিশোর গ্যাং এবং টিকটক, এর বাইরেও অনেক ব্যাধি আছে। সমাজ এখন ব্যাধিতে জর্জরিত বলা যায়। সেই ব্যাধি নিরসনের কাজও কিন্তু চলছে। আমরা সংশোধনের চেষ্টা করছি। নতুন একটা জায়গায় যাওয়ার প্রয়াস আমাদের আছে। কিন্তু তারপরেও এ মুহূর্তে এই তিনটি বিষয় দারুণভাবে আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে নাড়া দিয়েছে- এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সে কারণেই যুগান্তর মনে করেছে এ সময়ে এই বিষয়টি অনেক বেশি আলোচনায় আসা দরকার। এ বিষয়টি থেকে আমরা কীভাবে পরিত্রাণ পেতে পারি সেই দিকনির্দেশনা জাতির সামনে উপস্থাপন করা খুবই জরুরি। যুগান্তর সংবাদপত্র হিসাবে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশ এবং পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তার একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে- সেটি বিশ্বাস করে। সেই বিশ্বাসের কারণেই আমরা নানা রকম জনসেবা ও সমাজ সচেতনতামূলক আলোচনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকি। কোভিড-১৯ এর কারণে গত এক বছর সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে তিনটি বিষয় সামনে এসেছে, তা সমাজকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে বলে আমরা আজকের এ আয়োজনে কোভিডের মধ্যেও সমবেত হয়েছি।
যুগান্তর সম্পাদক বলেন, আসলে এসব ব্যাধি দূর করার জন্য একটি সমন্বিত কর্মপ্রয়াস দরকার। এ জায়গায় সমাজ পরিবর্তনের জন্য। সমাজ নিয়ে অনেক সময় আমাদের বিব্রত হতে হয়। নতুন প্রত্যাশার জায়গা যেমন তৈরি হয়েছে তেমনিভাবে নানা রকম সমস্যা ও সংকটও তৈরি হয়েছে। কিন্তু থামলে তো চলবে না। জীবনতো আর থেমে থাকে না, সময়ও থেমে থাকে না। কাজেই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সমাজ উত্তরণের এ সময়কালে আমাদের অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। সেটি যেমন পরিবার থেকে দরকার, সমাজের দরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরকার, রাষ্ট্রের দরকার। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি সেখানে মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসাবে দেশটাকে যদি আমরা গড়ে তুলতে চাই, সেক্ষেত্রে সবার যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা খুব জরুরি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন- মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক- এ তিন ব্যাধি থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার ও বাবা-মা। সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কি দেখে এসব জানতে হবে। সমাজে এখন মানবিক মূল্যবোধের অভাব রয়েছে, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব রয়েছে। তাই বাচ্চাদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। বাচ্চার হাতে মোবাইল দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। মোবাইল ফোন-ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধ করতে হবে। যেই অ্যাপগুলোর কারণে আমাদের বাচ্চারা ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিটিআরসির ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যারা মাদকসহ নানাভাবে কিশোর তরুণের জীবনে বিভীষিকা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঘটনা দিনে দিনে কমে আসবে। সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। প্রতিটি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। জনসচেতনতা এ মুহূর্তে অনেক বেশি প্রয়োজন। মাদক, টিকটক, কিশোর গ্যাং এগুলো আসলে একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সীমান্ত দিয়ে নারী পাচার রোধে অ্যাম্বাসি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি (ভাইস-চ্যান্সেলর বা উপাচার্য) অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বলেন, আমরা মেইন স্ট্রিম কালচারকে প্রমোট না করে সাব কালচারকে প্রমোট করছি। তা আলোচনায় এসে আরও বেশি প্রচারে যায় এবং সাব কালচার মেইন স্ট্রিম কালচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাই মেইন স্ট্রিম কালচারকে আরও বেশি প্রসারিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেই বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছে সেটি অস্ত্র কেনে এবং যুদ্ধকে আহ্বান জানায়। সেই ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে আমরা পরিবারের কথা বলি, যে পরিবার শিশুকে আদর-আহ্লাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত শেখাবে সেই পরিবারকে এখন ল্যাপটপ আর মোবাইল কিনে দিতে হয়। তাহলে বাজার অর্থনীতি আমাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে আমি তাকে নতুন ফুলের গাছ চেনাই না, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত চেনাই না। আমি তাকে ল্যাপটপ আর মোবাইলের পেছনে হন্যে হয়ে খুঁজতে গিয়ে আমি মূলত নিজের পরিবারকে বাজারের পণ্যে পরিণত করছি। আমাকে গ্রাস করেছে বাজার। আমার প্রকৃতিকে প্রতিস্থাপন করেছে বাজার অর্থনীতি, আর্মস কেনার মহড়া, আমার প্রকৃতির ভালোবাসা নষ্ট করে দিয়েছে যুদ্ধাস্ত্রের আহ্বান।

তিনি বলছেন, এ অবস্থায় যে যখন যেখানে বিভ্রান্ত হচ্ছে তার কাছে মেইনস্ট্রিম কালচারটা পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র কাজ। যিনি বিভ্রান্ত হচ্ছে তাকে ‘ইনক্লুসিভ অ্যাপ্রোচে’ আনতে হবে। তাকে হত্যা করলে তো সবই শেষ। নাগরিক হিসাবে তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কেউ যদি বিভ্রান্ত হয়, তাকে আমার পথে আনতে হবে। আর পথে আনার একমাত্র পথ মেইনস্ট্রিমে কালচার প্রসারিত করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, এ সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণে গণমাধ্যম যে সচেতনতামূলক কাজগুলো করছে এর মাধ্যমে একটা সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হবে। যত সহজে আমরা শুনি, সোসাইটিটা শেষ হয়ে গেছে, অবক্ষয় হয়েছে এগুলো এটিও কিন্তু সত্য কথা নয়। প্রত্যেকটা সমাজে একটা অবস্থা থেকে আধুনিকতার দিকে যায়। সেখানে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ আসে। গ্যাং কালচার শুরু হয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহর থেকে। এরপর এটা আমেরিকায় যায়। ১৯২২ সালে শিকাগোতে এক হাজার গ্যাংয়ের অস্তিত্ব ছিল। এখন আমেরিকাতে ৩০ হাজারের বেশি গ্যাং আছে। একটা অবস্থা থেকে যখন সমাজ অন্য একটা অবস্থায় যাচ্ছে, অর্থাৎ এ যুগসন্ধিক্ষণ কিছু সমস্যা সামনে আসে।

তিনি বলেন, আমরা চাইলেও আর পারব না, আগের সেই পারিবারিক জীবন ও অবস্থা ফিরিয়ে দিতে। তাহলে বিকল্প যে প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- ডে-কেয়ার, সাপোর্ট সেন্টার তৈরি, সেগুলো করতে হবে। কানাডায় যে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো হচ্ছে তারা এমনভাবে তৈরি করছে যাতে মনে হবে পরিবারের সঙ্গেই আছে। আগের পরিবার পাব না, খেলাঘর পাব না, সাংস্কৃতিক পরিবেশ পাব না, খেলাধুলার মাঠ পাব নাÑ আর বলব গ্যাং কালচার এখানে বন্ধ হবে। এটা হয়? হঠাৎ করে একটা পরিবর্তনের ঢেউ আমাদের এখানে লেগেছে।

ড. জিয়া রহমান বলেন, এ সমস্যাগুলো যদি আলটিমেটলি আমরা সমাধান করতে না পারি তাহলে খারাপ একটা সোসাইটিতে আমরা নিমজ্জিত হয়ে যাব। টিকটক বলা হচ্ছে, টিকটক বন্ধ করলে অন্য একটা কিছু চলে আসবে। বিষয়টি হলো যাই আসবে সেটার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যাতে যা খুশি তা দিয়ে পরিবেশ নষ্ট না করা যায়। তিনি বলেন, মাদকের ‘কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান’ লাগবে। যেভাবে বর্ডার চেক দিতে হবে, ড্রাগ ডিলারদের বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। শুধু মাদকের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করলে হবে না, পাশাপাশি রিহ্যাব, কাউন্সিলের দিকে খেয়াল করতে হবে।

ড. জিয়া বলেন, এখন যারা টিকটক করছে তাদের মধ্যে দরিদ্র্য আছে, কর্মহীনতা আছে, আবার বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। সমাজ যদি দায়িত্ব না নেয় তাহলে সেতো টিকটকের মধ্যে যাবেই। এসব গ্যাং ও যেসব মেয়েদের কথা আসতেছে তাদেরতো পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য টাকা-পয়সা দরকার। যদি ভালো কাজের ব্যবস্থা না করেন, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না করেন তাহলে এ সমস্যার প্রতিকার পাওয়া যাবে না। কমিটমেন্ট, নরমস এবং ভ্যালুজ, দেশপ্রেম, বিশ্বাস এ ব্যাপারগুলো থাকতে হবে। প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং থাকতে হবে। এক হাজার নারী পাচার হলো তারপর আমরা জানতে পারলাম টিকটক একটি বড় সমস্যা। প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং হলে একটা নারী পাচার হলেই তো আমরা জানতে পারতাম এ ভয়ংকর অবস্থার কথা। এলএসডির জন্য একটি ছেলে খুন হয়ে গেল। এটা কোনো ব্যক্তির দোষ নয়। পুরোপুরি যে ঔপনিবেশিক কাঠামো এগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। 

পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মোখলেসুর রহমান বলেন, তদন্তের দুর্বলতা সব বিচারকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। এটা পুলিশে আসার আগেও শুনেছি। এসেও শুনেছি। এখনও শুনছি। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে এটা ঠিক হচ্ছে না কেন? হয় আমাদের চিন্তার মধ্যে দুর্বলতা আছে। হয়তো সঠিকভাবে আমরা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারছি না। শুধু তদন্তের দুর্বলতার কারণেই তিনটি ব্যাধির (মাদক, কিশোর গ্যাং, টিকটক-লাইকি) বাড়ছে, এটা ঠিক নয়। এর সঙ্গে আরও বেশিকিছু বিষয় রয়েছে। তদন্তের দুর্বলতা শুধু একটি পারসেপশন। তদন্তের দুর্বলতার কথা বলা মানেই দুর্বল একটি কনক্লুশনে যাওয়া। অপরাধের দ্রুত তদন্তের পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। সামাজিক তিন ব্যাধি এখন সামাজিক সমস্যা, দেশীয় সমস্যা। আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অপরাধ হলো সামাজিক অসুখ। এ থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। এটা করলে সবার আগে সঠিক চিকিৎসা করতে। মানুষের পালস বুঝতে হবে। মানুষের পালস হলো দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি কর। আমি বিচারকদের দোষারোপ করছি না। তাদের বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। এ সীমাবদ্ধতা দূর করে দিতে হবে। এটা করতে পারলে মানুষের ক্ষোভের জায়গাটি দূর হবে। যে বা যারাই অপরাধ করুক না কেন পুলিশের কেউ অপরাধ করলেও দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। 

সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আরও বলেন- মাদক, টিকটক, কিশোর গ্যাং- কোনোটিই বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। একটি অপরাধ অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। সব একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। না হলে নতুন নতুন অপরাধ সামনে আসবে। আমি পুলিশকে বলে রাখব- তোমরা নিশ্চিত থাকো, লেডি গ্যাং এসে যাবে। বর্তমান সময়ে অপরাধের মূলে হলো টেকনোলজি। কিন্তু টেকনোলজিকে বাদ দেওয়া যাবে না। এসবের অপব্যবহার দূর করতে হবে। তিনি বলেন, বাবা-মা সন্তানের পুরো দায়িত্ব নিতে পারবে না। সমাজ এবং শিক্ষা ব্যস্থাকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। না হলে এসব সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করছি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত জানালা। কিন্তু তারাই আজ বেশি ভিকটিম। তিনি আরও বলেন, সামজিক তিন ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক বেশি স্মার্ট হতে হবে। পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, টিকটক সারা বিশ্বে একটি জনপ্রিয় অ্যাপস। কারও কারও মতে এর ব্যবহারকারী ২০ কোটির বেশি। এর অপব্যবহারে সমাজ আজ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সামজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিন্মবিত্তের কনফ্লিক্টের কারণে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে তিনি বলেন, নিন্মবিত্তের ছেলেরা একসঙ্গে জড়ো হচ্ছে। তারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ব্যবহার করে দ্রুত তৈরি করছে। পরে ছেলেমেয়েদের প্রলুব্ধ করে অপরাধের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যে অনেক তরুণী পাচার হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে র‌্যাব-পুলিশ একযোগে কাজ করছে। 
হাফিজ আক্তার বলেন, এক সময় একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সমাজের সবাই সবাইকে চিনত। এখন একক পরিবার। অনেকেই অনেককে চেনেন না। সামাজিক স্ট্রাকচার পরিবর্তন হয়ে গেছে। নতুন নতুন অপরাধের এটাও একটি কারণ। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি এলাকাতেই গ্যাং সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। কিশোর অপরাধ বন্ধ করতে হলে কোনো গ্যাং থাকতে দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের কাছে কিছুটা ভাটা পড়ে গেছে। তারপরও আমরা তালিকা ধরে অভিযান শুরু করেছি। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করেছি। 

মাদকের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে নতুন মাদক এলএসডির ভয়াবহ চিত্রের সন্ধান পাই। এলএসডি কিভাবে এলো তা বের করতে গিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করি। কিন্তু গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ দেখতে পাইনি। যা খুবই মারাত্মক বিষয়। তাদের কাছ থেকে এলএসডির উৎস জানতে পারি। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্র এবং হাউজ টিউটরের মাধ্যমেও দেশের বাইরে থেকে আসছে এলএসডি। তিনি বলেন, এলএসডির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ব্রাউনি নামের নতুন মাদকের সন্ধান পাই। এক পিস ব্রাউনি (গাঁজার নির্যাস থেকে তৈরি) তিন থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রাউনি বাসা-বাড়িতেই তৈরি হচ্ছে। যে ছেলেটি ব্রাউনি বানাচ্ছে তারা বাবা-মায়ের সামনেই বানাচ্ছে। অথচ কেউ জানে না যে, এটি মাদক। সম্প্রতি আইস নামের আরও একটি নতুন মাদকের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি ইয়াবার চেয়ে ৫০ গুন বেশি ক্ষতিকর। তিনি বলেন, সমাজের তিন ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে বিচারিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সব অর্গানকে একযোগে কাজ করতে হবে। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার বলেন, মাদকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যথেষ্ট সক্রিয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনের পরই মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন করে গেছেন। সেই ১৮ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। সরকারের সেই নীতি অনুসরণের কাজ করে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূলে সবার প্রথম যা করছি আমরা তা হচ্ছে মাদকের সাপ্লাই ডিডাকশন, যা বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনী দিয়ে নিয়মিত চালু রয়েছে। দেশে মাদকের সরবরাহ কীভাবে কমানো যায় বা রোধ করা যায় সেটাই প্রথম করণীয়। দ্বিতীয়ত ‘ডিমান্ড ডিডাকশন’। দেশের যুব সমাজই যদি মাদককে না বলে তবে সরবরাহ কমবে, চোরাচালান কমবে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া, স্কুল-কলেজে নানা ভাবে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছি আমরা। জনসচেতনতা তৈরিতে এর ক্ষতিকারক দিক উল্লেখ করা হচ্ছে ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ও র‌্যালির মাধ্যমে। আর দেশের ৩৫৮টি মাদকাসক্তদের নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে আসক্তদের চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। আরেকটি বিষয় উলে­খযোগ্য হচ্ছে- আগে পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলাসহ ক্লাবভিত্তিক যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল, এগুলো এখন অনুপস্থিত। খেলার মাঠ নেই। বিনোদনের সুব্যবস্থা নেই। এই বিষয়ে আমাদের সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে।

এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যহারের বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। ইন্টারনেটর অপব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা নারী পাচারসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব রাখব না। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা অনেক বেশি। এখন কোনো অপরাধীই অপরাধ করে পার পাচ্ছে না। কিশোর অপরাধ দূর করতে তালিকা আপডেট করছি। র‌্যাবের সব ইউনিটকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একার পক্ষে কিশোর অপরাধ দূর করা সম্ভব নয়। অভিভাবকসহ সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তা কী অভিভাবকরা জানেন? 

র‌্যাব পরিচালক বলেন, কিশোর অপরাধ দূর করতে সমাজের দায়বদ্ধতা অনেক। আগে খেলার মাঠে আমরা খেলা করতাম। এখন খেলার মাঠ কমে গেছে। আগে ক্লাবগুলো ছিল খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র। এখন ক্লাবগুলোতে জুয়ার আসর বসছে। আমরা বসে নেই। অতীতে অনেক অভিযান চালিয়েছি। এখনও চালাচ্ছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ অব্যাহত আছে। গত ২ বছরে ৩০ হাজার মাদক ব্যবসায়ী-সেবীকে গ্রেফতার করেছি। লাখ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করছি। তিনি বলেন, ডিমান্ড থাকলে সাপ্লাই থাকবেই। তাই ডিমান্ড বন্ধ করতে হলে সামাজিক অন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। 

দেশে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটকের মতো তিন ব্যাধির উচ্চ সংক্রমণের জন্য বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে গাফিলতি ও অভিযানে আটক মাদক ধ্বংসের যথাযথ তথ্য না পাওয়াকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। বৈঠকে নিজের বক্তব্যে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, তদন্তে গাফিলতি থাকলেই বিচারহীনতার জায়গাটি তৈরি হয়। তদন্তের ক্ষেত্রে আমরা অনেক রকম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখি। প্রথমত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই অসংখ্য অভিযোগ যে, তারা নিজেরাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই যখন প্রয়োগের প্রশ্ন আসে তখন এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। যখন কারও কাছ থেকে মাদকদ্রব্য আটক হয় তখন এর অল্প একটু অংশ কোর্টে দেওয়া হয় নমুনা হিসাবে। বাকিটা ধ্বংস করে ফেলার কথা। সেটা আসলেই ধ্বংস করা হলো কিনা সেই মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এ ব্যবস্থাটি থাকা উচিত। 

তিনি বলেন, ২০১৮ সালে আমরা নতুন আইন পেলাম। সেখানে বলা হলো ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। ট্রাইব্যুনাল গঠন না করার কারণে ২০২০ সাল পর্যন্ত শত শত মামলা জমে গেল যেখানে কোনো বিচারই হলো না। এরপর সংশোধনী এনে ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি তুলে দেওয়া হলো এখতিয়ারাধীন আদালত আনা হলো যার মাধ্যমে বিচার করা সম্ভব। কিন্তু ইতোমধ্যেই বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে। করোনার কারণে এ মামলার জট আরও বেড়েছে। 

তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূল অভিযান পরিচালনায় সাইবার এক্সপার্ট টিম গঠন করতে হবে। তাহলে সেটি আরও কার্যকরি হবে। ইতোমধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলে ৪৬৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এত মানুষ মারার পরেও যদি মাদকের এ ব্যবহার না কমে তাহলে প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে এ হত্যাগুলো কোনো কাজে আসেনি। তাই আইনটাকে কিভাবে কার্যকরিভাবে ব্যবহার করা যায় সেই জায়গায় আসা উচিত।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সন্তানদের নিয়ে বাব-মায়েরা যখন আমার কাছে আসে তখন কিছু কথা জিজ্ঞেস করি। আপনার সন্তান কি রাতে জেগে থাকে দিনে ঘুমায়? সন্তান কি আপনার সঙ্গে রাগ করে কথা বলে? দরজা জোরে বন্ধ করে? খাবার কি টেবিলে সবার সঙ্গে না বসে অন্য জায়গায় খায়? সে কি সারাক্ষণ কানের ভেতর হেডফোন গুঁজে রাখে? তখন বাবা-মায়েরা ‘ঠিক ঠিক’ বলে উত্তর দেন। এই যে একটি সাব-কালচার তৈরি হয়েছে তারই একটি অংশ মাদক, টিকটক এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। 

তিনি বলেন, শিশুরা যখন বড় হতে থাকে মা-বাবা তখন বলে, বাচ্চাটি খাচ্ছে না, লম্বা হচ্ছে না। আরেকটু বড় হলে বলে ওর রেজাল্ট ভালো হচ্ছে না, জিপিএ ফাইভ পাবে কিনা জানি না। এটা আসলে শিশুদের বিকাশের চার ভাগের এক ভাগ। বিকাশের আরও তিনটি বড় ভাগ আছে। কগনেটিভ ডেভেলপমেন্ট, স্যোশিও-ইমোশনাল ডেভেলপমেন্ট, মোরাল ডেভেলপমেন্ট। এই তিনটি দিকেই আমাদের অভিভাবকদের নজর খুব কম। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা এ তিনটি বিকাশ সুষম করতে না পারব ততদিন পর্যন্ত আসলে টিকটক বন্ধ করে বা হত্যা করে এ মাদককে ঠেকানো যাবে না।

গোলটেবিল বৈঠকে যুগান্তরের উপসম্পাদক আহমেদ দীপু বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, বহনকারী এবং মাদসেবীরা ধরা পড়লেও আড়ালে থেকে যাচ্ছে গডফাদারর। গডফাদার বা নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবে না। তিনি বলেন, এখন নারী এবং কিশোররাও অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এটা কী ভবিষ্যতে আরও নিচের দিকে নামবে? তিরি আরও বলেন, আমরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু মাদক, কিশোর গ্যাং এবং টিকটক-লাইকিসহ নানা অপকর্মের কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর