দুঃসময় ও সংকটে জাতির দিশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
jugantor
দুঃসময় ও সংকটে জাতির দিশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  আতাউর রহমান  

০১ জুলাই ২০২১, ১৮:৫৮:৫৯  |  অনলাইন সংস্করণ

শতবর্ষ পূর্ণ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। একশ' বছর আগে আজকের দিনে পথচলা শুরু করে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপীঠ। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আজ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিছক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা ভুল। এটি এই অঞ্চলের বহু ঘটনার সাক্ষী ও ক্রীড়নক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রারের সূতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয়। বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের মুক্তির সংগ্রামের আঁতুরঘর এটি। এখানকার ছাত্র-শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে।

বেশ কিছু জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য। যেকোনো দু:সময়-সঙ্কটে জাতিকে দিশা দিয়ে আসছে এই বিদ্যাপীঠ। সারা দুনিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেটি কিনা একটি জাতিকে স্বাধীন দেশের পতাকা দিয়েছে। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার নজির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেই। মুক্তির সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এত শিক্ষকের রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও অম্লান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের মানুষগুলোর কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে নিরন্তর। শিক্ষা-গবেষণায় গেৌরবোজ্জল ভূমিকা রেখে আসছে এক শতাব্দী ধরে। ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করার পর থেকে আজ অবধি সুনাম ও সফলতার সঙ্গে পথ চলছে প্রাণের এই প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও জাতির জন্য শতবর্ষের দিনটি নি:সন্দেহে বিশেষ আনন্দের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ' বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে জাতির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি ২০০৯ সাল থেকে টানা ৮ বছর ভিসি পদে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ তম এই উপাচার্য ২০১৭ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।

টানা ৮ বছর দায়িত্ব পালনকালে আরেফিন সিদ্দিককের বেশ কিছু পদক্ষেপ প্রশংসিত হয় সর্বমহলে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট কমাতে কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম-ধর্মঘটেও ক্লাস হয়েছে। বিদেশের বিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার সিস্টেম চালু করেন আরেফিন সিদ্দিক। শিক্ষা-গবেষণায় তিনি জোর দেন। নতুন নতুন বিভাগ খুলে শিক্ষার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

আরেফিন সিদ্দিকের দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব যুগান্তরের পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: শতবর্ষে ঢাকা বিদ্যালয়, সাবেক ভিসি হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী?

আরেফিন সিদ্দিক: আজকের দিনটি আমাদের সবার জন্য গেৌরবের। শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষক নয়, বাঙালি জাতির জন্যও দিনটি বিশেষ গুরুত্ববহ। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপীঠের জন্মদিনে দিনে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকসহ দেশের প্রতিটি মানুষকে শুভেচ্ছা জানাই। এই দিনে আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করি। যিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধেরও নেতৃত্ব দিয়েছে এখানকার শিক্ষার্থীরা। এই অঞ্চলে শিক্ষার বিস্তারে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিদ্যাপীঠ সময়ে-অসময়ে-দু:সময়ে পাশে থেকে জাতির আস্থার বাতিঘরে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন: প্রাপ্তি সম্পর্কে জানতে চাই। একশ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের মানুষকে কী দিতে পেরেছে। আপনার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন...

আরেফিন সিদ্দিক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি অনেক বেশি, যা একদিনে বলে শেষ করা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা-গবেষণার বিস্তারে এই অঞ্চলে শতাব্দিজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় বাংলা ভাষা সমুন্নত হয়েছে। স্ব-ভাষায় পড়ালেখা, কথা বলা, ভাব বিনিময় ও গবেষণার পথ বিস্তৃত হয়েছে।
আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে। এখান থেকেই বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের পতাকা দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় বিনা পয়সায় পড়ালেখার সুযোগ করে দিয়েছে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে। বৃটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে বিদেশ যাওয়া সহজ ছিল না। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেখা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় তখন এখানকার লোকজন প্রায় বিনা পয়সায় বিশ্ব মানের শিক্ষাটা পেয়েছে।
বৃটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭৭ জন ছাত্রের বিপরীতে ছাত্রী ছিল মাত্র ১ জন। আজকে মোট শিক্ষার্থীর ৪০ শতাংশ ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে।

স্বাধীনতার পরও বহুকাল এদেশে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এটি। তখন উচ্চ শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলে নারীদের পড়ালেখার ব্যবস্থা হতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি সম্পর্কে আমি বলব, বাংলাদেশের অর্জন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই। এদেশের মানুষের সব অর্জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনন্য। তাই বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করা যাবে না।

প্রশ্ন: প্রাচ্যের এই অক্সফোর্ড থেকে কী প্রত্যাশা ছিল, পেয়েছেন কতটুকু?

আরেফিন সিদ্দিক: প্রাপ্তি সম্পর্কে তো এতক্ষণ বললামই। প্রত্যাশা হচ্ছে- সামনের দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সমহিমায় এগিয়ে যেতে হবে। সেজন্য একশ' বছরের পরিকল্পনা থাকা ভালো। একটি বিশ্বমানের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলতে হলে এখানকার সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। শিক্ষা-গবেষণায় বাজেট স্বল্পতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সীমাবদ্ধতা। এটি দূর করতে হবে। আমাদের পর স্বাধীন হয়েছে এমন দেশগুলো আজ উচ্চশিক্ষায় যে পরিমাণ বরাদ্দ দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ সেই তুলনায়ও অনেক কম।

শিক্ষকদের মূল্যবোধ, মেধা, সততা বাড়াতে হবে। যেটি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দেবে। ভালো মানের শিক্ষক বাড়াতে হবে। গবেষণায় আরও জোর দিতে হবে, এ জায়গায় আমরা পিছিয়ে।

৪০ বছর ধরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমার পর্যবেক্ষণ, মেধাবীরাই এখানে পড়তে আসে। তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বগুণ, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, মূল্যবোধের বিস্তার ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা-গবেষণায় বিচরণের জায়গা বিস্তৃত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পূর্ণ মনুষত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে।

প্রশ্ন: শিক্ষা-গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি পেছাচ্ছে না এগোচ্ছে?

আরেফিন সিদ্দিক: আমার দৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিন দিন ভালো করছে। এখানে শুধু র্যাং কিং দেখলে হবে না। শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কৃতিত্ব এসব দিক থেকে আমরা বহু এগিয়েছি।

আমাদের শিক্ষার্থীরা অক্সফোর্ড-হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিযোগিতা করে সফল হচ্ছে। মেধার জোরেই এটা হচ্ছে। তাদের সেই মেধা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত। এটি আমাদের জন্য গর্বের।

প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিতে সাবেক ভিসি হিসেবে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

আরেফিন সিদ্দিক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষ দিন জাতির জন্য মাহেন্দ্র ক্ষণ। এই বিশ্ববিদ্যালয় হাজার হাজার বছর স্বগেৌরবে বেঁচে থাকবে এই আমার প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত আত্মসমালোচনা করা। ভুল-ত্রুটি-সীমাবদ্ধতা দূর করে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আগামী একশ' বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। আমার বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সেই যোগ্যতা ও চিন্তাশীলতা আছে। আমাদের সবার প্রিয় বিদ্যাপীঠকে চিরভাস্বর রাখতে সব ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার প্রত্যাশী আমি।

দুঃসময় ও সংকটে জাতির দিশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 আতাউর রহমান 
০১ জুলাই ২০২১, ০৬:৫৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

শতবর্ষ পূর্ণ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। একশ' বছর আগে আজকের দিনে পথচলা শুরু করে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপীঠ। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আজ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিছক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা ভুল। এটি এই অঞ্চলের বহু ঘটনার সাক্ষী ও ক্রীড়নক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রারের সূতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয়। বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের মুক্তির সংগ্রামের আঁতুরঘর এটি। এখানকার ছাত্র-শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। 

বেশ কিছু জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য। যেকোনো দু:সময়-সঙ্কটে জাতিকে দিশা দিয়ে আসছে এই বিদ্যাপীঠ। সারা দুনিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেটি কিনা একটি জাতিকে স্বাধীন দেশের পতাকা দিয়েছে। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার নজির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেই। মুক্তির সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এত শিক্ষকের রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও অম্লান। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের মানুষগুলোর কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে নিরন্তর। শিক্ষা-গবেষণায় গেৌরবোজ্জল ভূমিকা রেখে আসছে এক শতাব্দী ধরে। ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করার পর থেকে আজ অবধি সুনাম ও সফলতার সঙ্গে পথ চলছে প্রাণের এই প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও জাতির জন্য শতবর্ষের দিনটি নি:সন্দেহে বিশেষ আনন্দের। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ' বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে জাতির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি ২০০৯ সাল থেকে টানা ৮ বছর ভিসি পদে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ তম এই উপাচার্য ২০১৭ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।

টানা ৮ বছর দায়িত্ব পালনকালে আরেফিন সিদ্দিককের বেশ কিছু পদক্ষেপ প্রশংসিত হয় সর্বমহলে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট কমাতে কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম-ধর্মঘটেও ক্লাস হয়েছে। বিদেশের বিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার সিস্টেম চালু করেন আরেফিন সিদ্দিক। শিক্ষা-গবেষণায় তিনি জোর দেন। নতুন নতুন বিভাগ খুলে শিক্ষার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

আরেফিন সিদ্দিকের দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব যুগান্তরের পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: শতবর্ষে ঢাকা বিদ্যালয়, সাবেক ভিসি হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী?

আরেফিন সিদ্দিক: আজকের দিনটি আমাদের সবার জন্য গেৌরবের। শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষক নয়, বাঙালি জাতির জন্যও দিনটি বিশেষ গুরুত্ববহ। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপীঠের জন্মদিনে দিনে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকসহ দেশের প্রতিটি মানুষকে শুভেচ্ছা জানাই। এই দিনে আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করি। যিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধেরও নেতৃত্ব দিয়েছে এখানকার শিক্ষার্থীরা। এই অঞ্চলে শিক্ষার বিস্তারে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিদ্যাপীঠ সময়ে-অসময়ে-দু:সময়ে পাশে থেকে জাতির আস্থার বাতিঘরে পরিণত হয়েছে। 

প্রশ্ন: প্রাপ্তি সম্পর্কে জানতে চাই। একশ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের মানুষকে কী দিতে পেরেছে। আপনার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন...

আরেফিন সিদ্দিক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি অনেক বেশি, যা একদিনে বলে শেষ করা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা-গবেষণার বিস্তারে এই অঞ্চলে শতাব্দিজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় বাংলা ভাষা সমুন্নত হয়েছে। স্ব-ভাষায় পড়ালেখা, কথা বলা, ভাব বিনিময় ও গবেষণার পথ বিস্তৃত হয়েছে।
আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে। এখান থেকেই বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের পতাকা দিয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় বিনা পয়সায় পড়ালেখার সুযোগ করে দিয়েছে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে। বৃটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে বিদেশ যাওয়া সহজ ছিল না। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেখা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় তখন এখানকার লোকজন প্রায় বিনা পয়সায় বিশ্ব মানের শিক্ষাটা পেয়েছে। 
বৃটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭৭ জন ছাত্রের বিপরীতে ছাত্রী ছিল মাত্র ১ জন। আজকে মোট শিক্ষার্থীর ৪০ শতাংশ ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। 

স্বাধীনতার পরও বহুকাল এদেশে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এটি। তখন উচ্চ শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলে নারীদের পড়ালেখার ব্যবস্থা হতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি সম্পর্কে আমি বলব, বাংলাদেশের অর্জন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই। এদেশের মানুষের সব অর্জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনন্য। তাই বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করা যাবে না।

প্রশ্ন: প্রাচ্যের এই অক্সফোর্ড থেকে কী প্রত্যাশা ছিল, পেয়েছেন কতটুকু?

আরেফিন সিদ্দিক: প্রাপ্তি সম্পর্কে তো এতক্ষণ বললামই। প্রত্যাশা হচ্ছে- সামনের দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সমহিমায় এগিয়ে যেতে হবে। সেজন্য একশ' বছরের পরিকল্পনা থাকা ভালো। একটি বিশ্বমানের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলতে হলে এখানকার সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। শিক্ষা-গবেষণায় বাজেট স্বল্পতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সীমাবদ্ধতা। এটি দূর করতে হবে। আমাদের পর স্বাধীন হয়েছে এমন দেশগুলো আজ উচ্চশিক্ষায় যে পরিমাণ বরাদ্দ দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ সেই তুলনায়ও অনেক কম। 

শিক্ষকদের মূল্যবোধ, মেধা, সততা বাড়াতে হবে। যেটি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দেবে। ভালো মানের শিক্ষক বাড়াতে হবে। গবেষণায় আরও জোর দিতে হবে, এ জায়গায় আমরা পিছিয়ে।

৪০ বছর ধরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমার পর্যবেক্ষণ, মেধাবীরাই এখানে পড়তে আসে। তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বগুণ, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, মূল্যবোধের বিস্তার ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা-গবেষণায় বিচরণের জায়গা বিস্তৃত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পূর্ণ মনুষত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। 

প্রশ্ন: শিক্ষা-গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি পেছাচ্ছে না এগোচ্ছে?

আরেফিন সিদ্দিক: আমার দৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিন দিন ভালো করছে। এখানে শুধু র্যাং কিং দেখলে হবে না। শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কৃতিত্ব এসব দিক থেকে আমরা বহু এগিয়েছি। 

আমাদের শিক্ষার্থীরা অক্সফোর্ড-হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিযোগিতা করে সফল হচ্ছে। মেধার জোরেই এটা হচ্ছে। তাদের সেই মেধা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। 
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত। এটি আমাদের জন্য গর্বের। 

প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিতে সাবেক ভিসি হিসেবে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

আরেফিন সিদ্দিক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষ দিন জাতির জন্য মাহেন্দ্র ক্ষণ। এই বিশ্ববিদ্যালয় হাজার হাজার বছর স্বগেৌরবে বেঁচে থাকবে এই আমার প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত আত্মসমালোচনা করা। ভুল-ত্রুটি-সীমাবদ্ধতা দূর করে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আগামী একশ' বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। আমার বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সেই যোগ্যতা ও চিন্তাশীলতা আছে। আমাদের সবার প্রিয় বিদ্যাপীঠকে চিরভাস্বর রাখতে সব ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার প্রত্যাশী আমি। 
 
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ

০১ জুলাই, ২০২১
০১ জুলাই, ২০২১
আরও খবর