সংঘাতময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি

  মনোজ সরকার ০৪ মে ২০১৮, ২২:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

পার্বত্য শান্তিচুক্তি

পার্বত্য চট্টগ্রাম সংঘাত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সৃষ্ট একটি রাজনৈতিক সংঘাতরূপে পরিচিত। বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও তার সশস্ত্র উগ্র অঙ্গসংগঠন শান্তিবাহিনীর মধ্যে এ সংঘাতের সৃষ্টি হয়।

বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী জুম্ম, চাকমা জনগোষ্ঠীসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজাতির স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের প্রেক্ষিতে এ সংঘাত ঘটে। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনামলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শান্তিবাহিনী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২২ বছর এ সংঘাত চলমান ছিল।

প্রতিক্রিয়া

সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর আক্রমণের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণহত্যা ও নৃজাতিগোষ্ঠী উচ্ছেদ হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। আনসারদের গণধর্ষণে সম্পৃক্ততার বিষয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রসঙ্গে মার্ক লেভিন ‘গণহত্যার অন্য ধরন’ নামে আখ্যায়িত করেন। এ আক্রমণকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে গণধর্ষণের সঙ্গে তুলনা করেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, জুন, ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে জুম্ম জাতিগোষ্ঠীকে তাদের ভূখণ্ডে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখেনি। বর্তমানে প্রায় ৯০ হাজার জুম্ম পরিবার স্থানচ্যুত রয়েছে।

ইতিহাস

পাকিস্তান শাসনামলে তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানে এ সংঘাতের সূচনালগ্ন হিসেবে ধরে নেয়া হয়। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ অবকাঠামো নির্মাণের ফলে লক্ষাধিক লোক স্থানচ্যুত হন। তাদের স্থানচ্যুতিতে তৎকালীন সরকার কোনো গুরুত্ব দেয়নি ও হাজারো পরিবার ভারতে চলে যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা রাজনীতিবিদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্বায়্ত্তশাসন ও ওই অঞ্চলের জনগণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য দাবি উত্থাপন করেন।

লারমা ও অন্যান্য পার্বত্য আদিবাসীর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। তাদের মতে ওই সংবিধানে নৃজাতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতিসহ অমুসলিম ও অবাঙালিদের সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

সরকারের নীতি কেবলমাত্র বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষাকে ঘিরে। এছাড়াও বাংলাদেশের সব নাগরিককে বাঙালি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার (এমএন লারমা) আলোচনা হয়।

শান্তিবাহিনী গঠন

১৯৭৩ সালে লারমা ও অন্যান্য নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) প্রতিষ্ঠা করেন। এ সমিতিতে স্থানীয় আদিবাসী ও উপজাতীয় লোকজন সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যানবাহনে প্রথমবারের মতো আক্রমণ করে শান্তিবাহিনী।

শান্তিবাহিনী তাদের আক্রমণ পরিচালনার সুবিধার্থে এ অঞ্চলকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে। স্থানীয় অধিবাসীদের জোরপূর্বক সংগঠনে যোগ দিতে বাধ্য করে ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করে।

বাঙালি ও সৈনিক, সরকারি কার্যালয়, সরকারি কর্মকর্তা ও এতদাঞ্চলের বাঙালি অধিবাসীদের লক্ষ্য করে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে। এছাড়াও এ বাহিনীর বিপক্ষে অবস্থানরত যে কোনো আদিবাসী ও সরকারকে সমর্থন দানকারীকেও আক্রমণ করতে দ্বিধাবোধ করেনি।

সরকারী তথ্য মোতাবেক, ১৯৮০ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে এক হাজার ১৮০ ব্যক্তি শান্তিবাহিনীর হাতে প্রাণ হারায়।

হিসাব করে দেখা গেছে যে, ১৯৭১ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার জুম্ম মহিলা ধর্ষণের শিকারে পরিণত হয়েছেন। ১৯৯৫ সালে এক হিসেবে দেখা যায়, ধর্ষণের অধিকাংশই ঘটেছে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে যাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পর্ক ছিল। তন্মধ্যে ৪০ শতাংশ ধর্ষণই গৌণ ছিল। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশ ধর্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল।

কবিতা চাকমা ও গ্লেন হিলের ভাষ্য মোতাবেক দেখা যায়, জুম্ম মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এ সংঘাতের সময় জুম্ম ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন, ধর্ষণ, নির্যাতন, গণহারে গ্রেফতার, কারাগারে নিক্ষেপ, অপহরণ করে যুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

সরকারি পদক্ষেপ

ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল অবস্থা চলার প্রেক্ষিতে এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক চাহিদা পূরণকল্পে একজন সেনাবাহিনীর জেনারেলের নিয়ন্ত্রণে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংস্থা গঠন করেন।

কিন্তু সরকারের এ পদক্ষেপ জনপ্রিয়তা পায়নি। বিভিন্নভাবে অপপ্রচার রটানো ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধাচরণ এর অন্যতম প্রধান কারণ। সরকার ১৯৬২ সালে সৃষ্ট কাপ্তাই বাঁধের প্রেক্ষিতে প্রায় এক লাখ বাস্তুচ্যুত অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে ব্যর্থ হয় বাস্তুচ্যুত অধিবাসীরা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেনি ও চল্লিশ সহস্রাধিক চাকমা উপজাতি ভারতে চলে যায়।

শান্তিচুক্তি

১৯৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস করে সরকার রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান তিনটি জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠন করে। প্রত্যেক পরিষদের প্রধান ছিলেন চেয়ারম্যান। তিনি আদিবাসীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন।

৩০ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ আদিবাসী এবং এক-তৃতীয়াংশ বাঙালি। আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসন জেলার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ভোটে পরিষদের সদস্যরা নির্বচিত হবেন।

স্থানীয় পরিষদ এর নিজস্ব বাজেট প্রণয়নের দায়িত্বপালন করবে। উল্লিখিত জেলা পরিষদ আইনের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি না থাকায় জনসংহতি সমিতি তা প্রত্যাখ্যান করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পাহাড়ি জনগণের বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছে। এই শান্তিচুক্তির আওতায় তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার পরিষদ সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়।

আঞ্চলিক পরিষদের গঠন কাঠামো নিম্নরূপ: চেয়ারম্যান ১, সদস্য (আদিবাসী) পুরুষ ১২, সদস্য (আদিবাসী) মহিলা ২, সদস্য (অ-আদিবাসী) পুরুষ ৬, সদস্য (অ-আদিবাসী) মহিলা ১। আদিবাসী পুরুষ সদস্যদের মধ্যে পাঁচ জন চাকমা, তিনজন মারমা, দুজন ত্রিপুরা এবং একজন করে মুরং ও তঞ্চঙ্গ্যাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন।

মহিলা সদস্যের ক্ষেত্রে একজন চাকমা এবং অপরজন অন্য আদিবাসী থেকে নির্বাচিত হবেন। অ-আদিবাসী সদস্যের ক্ষেত্রে প্রতি জেলা থেকে দুজন করে নির্বাচিত হবেন। তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন।

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা পদাধিকার বলে আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য হবেন এবং তাদের ভোটাধিকার থাকবে। আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন করবেন। পরিষদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।

এই পরিষদ তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করবে। উপজাতীয় আইন এবং সামাজিক বিচারকার্য এই পরিষদের অধীনে থাকবে।

পরিষদ এনজিওদের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয় করবে এবং ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেবে। পরিষদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করবে।

চুক্তিতে একজন উপজাতিকে প্রধান করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য একটি উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথাও বলা হয়েছে। তবে এটা সুস্পষ্ট যে, আঞ্চলিক পরিষদ একটি প্রতীকী প্রতিষ্ঠান। এর ক্ষমতা ও কার্যক্রম সমন্বয় সাধন ও তদারকি ধরনের।

পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি পাহাড়িদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্পাদিত একটি শান্তি চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতিনিধি জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং শান্তিবাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা।

এরপর ধীরে ধীরে উপজাতি-বাঙালি সংঘর্ষ হ্রাস পায়। তবে এই চুক্তির অধিকাংশ শর্ত সরকার বাস্তবায়ন করেনি। জনসংহতি সমিতির নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) অভিযোগ করেন, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়, তারা বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। সূত্র: উইকিপিডিয়া

ঘটনাপ্রবাহ : শক্তিমান চাকমা হত্যা

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter