‘ডাকি নিই যাই আমার স্বামীরে তারা মারি ফেলিছে’

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৮, ১০:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

দেশের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ও র‍্যাবের মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে গত ১৯ দিনে মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে ৪২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে তিন শতাধিক সন্দেহভাজনকে। গোপন খবরের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে র‍্যাব।

নিহত সবাই মাদক-ব্যবসা ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত এবং চিহ্নিত অপরাধী বলে জানায় নিরাপত্তা বাহিনী। তাদের প্রায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থানায় এক বা একাধিক মামলা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।

নিহত সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে পুলিশ পাল্টা গুলি চালানোর অভিযোগ করলেও চুয়াডাঙ্গায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত কামরুজ্জামান সাজুর স্ত্রী নাসরিন খাতুনের দাবি, তার স্বামীর কাছে কখনও কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না।  খবর বিবিসি বাংলার।

তিনি বলেন, ‘সে কোন দিন পিস্তলের চিহারাও দেখেনি- এগুলা মিথ্যা। এলাকাবাসী বলবে- সে নিশা করত এটা অস্বীকার করার মত কিসু নাই; কিন্তু সে অস্ত্র, গুলি কিসুই চিনে না।’

নাসরিন বলেন, তার স্বামী আগে এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু চার মাস আগে তাকে অ্যারেস্ট করার পর তিনি পুলিশকে মুচলেকা দিয়া বাড়িতে বসে আছেন। পুলিশের কাছে তিনি অঙ্গীকার করে এসেছেন তিনি নিজেও এর সঙ্গে জড়িত থাকবেন না- কেউ ব্যবসা করলে পুলিশকে জানাবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন যেটুক শুনছি, তাই তাদেরকে বলছি- এখন এইভাবে ডাকি নিই যাই তারা আমার স্বামীরে মারি ফেলিছে।’

পুলিশের দাবি, মাদক চোরাচালানের খবর পেয়ে তারা যখন গ্রেফতার অভিযান চালাতে যায়, তখন অভিযুক্তরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এ কারণেই এই নিহতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন চুয়াডাঙ্গার কোতোয়ালি থানার সহকারী পুলিশ সুপার আহসান হাবীব।

তিনি বলেন, ‘যখন চোরাকারবারিরা পুলিশের অবস্থান টের পেয়ে গুলি চালিয়েছে স্বাভাবিকভাবে আমরাও আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাই। সেই অধিকার আমাদের আছে। তবে নিরস্ত্রদের ওপর গুলি চালানোর যে অভিযোগ উঠেছে সেটি সম্পূর্ণ মনগড়া। যারা এমন অভিযোগ করছে তাদের কেউই ঘটনাস্থলে ছিল না।’

তবে পুলিশের এমন দাবি অস্বীকার করেছেন চুয়াডাঙ্গায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত কামরুজ্জামান সাজুর স্ত্রী নাসরিন খাতুন। রোববার তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

তিনি জানান, তার স্বামী আগে মাদক সেবন করলেও সম্প্রতি পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তিনি সব ছেড়ে দেন।

নাসরিন বলেন, ‘আমার স্বামী দারোগারে বলছিল- ভাই আমাদের ভালো হওয়ার সুযোগ দিয়েন- আমরা একটা অটো কিনি চালাব। আমরা আর কুনো মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকব না। আমি একটু হিরোইন খাওয়া ধরিছি বলি আমি এ ব্যবসার সাথে জড়ায়ে গেছিলাম। আমরা আর এসব করব না। আমাদের ভালো হওয়ার সুযোগ দেন।’

নাসরিন খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী তো ভালো হতে চাইল, তা হলে তাকে কেন ভালো হইতে দেয়া হইল না।’

পুলিশ কয়েকবার কামরুজ্জামানকে থানায় ডেকে পাঠিয়েছিল বলে তিনি জানান। সবশেষ রোববার তিনি থানায় যাওয়ার কথা বলে আর ঘরে ফেরেননি।

নাসরিন বলেন, ‘থানায় যাওয়ার পর থেকে তার ফোন আর খুলা পাই নাই। ফোন বন্ধ। বিভিন্ন জাগায় খোঁজ করিছি- তারে পাই নাই। পরে টিভিতে খবর দেখে জানতে পারি পুলিশ আমার স্বামীরে মারি ফেলিছে।’

মাদক নির্মূল অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার এসব ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবি মানবাধিকার কর্মীদের৷ মাদক প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানালেও এতে যেন আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয় সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তারা।

গত ৩ মে রাজধানীতে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিতে বাহিনীটিকে নির্দেশ দেন।

এর পর দিন থেকেই মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবি পুলিশ।

প্রধানমন্ত্রীর সেই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ-র‌্যাবের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছি।

তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক প্রভাবশালী। তাদের কাছে সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। তাই আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী যখনই অভিযান চালাতে গেছে তাদের ওপর হামলা হয়েছে। সে কারণেই এ নিহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে।’

এর আগে মাদকবিরোধী প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে সারা দেশে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করে নিরাপত্তা বাহিনী, যার স্লোগান হল- ‘চলো যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে।’