মাদকবিরোধী অভিযানে ফায়ারিং হবেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ১৯:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ফাইল ছবি

যেখানে মাদক, সেখানে অবৈধ টাকা ও অস্ত্র থাকে। সেখানে অভিযান চালাতে গেলে ফায়ারিং হবেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

শনিবার রাজধানীর বিআইআইএসএস অডিটরিয়ামে ‘মাদকবিরোধী অভিযান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এ কথা বলেন তিনি।

আলোচনায় সমাজের বিভিন্ন পেশার বক্তারা চলমান মাদকবিরোধী অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই অভিযান শুরুর পর অনেকে আমাকে ফোন করে প্রশংসা করেন। একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ক্রসফায়ারে দেয়ার আহ্বান জানান। তবে এই অভিযানে শুধু যে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে তা না। আমাদের কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার। বর্তমানে সেখানে ৮৬ হাজার ৩৩৯ বন্দি রয়েছেন, যার ৩৯ শতাংশ মাদকের সঙ্গে জড়িত। অভিযানে অনেককে গ্রেফতার করে মামলা ও সাজা দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, অভিযানে কাউকে হত্যার উদ্দেশ্য নেই। বিএনপিকে কোণঠাসা করাও উদ্দেশ্য না। দেশ, মেধা ও তরুণ সমাজকে বাঁচাতে এই অভিযান।

চলমান অভিযান সম্পর্কে মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা অলআউট যুদ্ধে গেছি। এ যুদ্ধে জিততে হবে। আমরা বর্ডার সিল করেছি। কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াচ্ছি, অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করছি। আমরা বলেছি, কাউকে মাদকের ব্যবসা করতে দেব না।

মাদক আইনের সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, মাদকের আইনে সিসাকে মাদক হিসেবে ধরা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে ক্লাব রেস্টুরেন্টগুলোতে তরুণরা গিয়ে সিসা টানছে। অনেক সময় ভেতরে হেরোইনের গুঁড়া দিচ্ছে। এই ভয়াবহতার কারণে আইন সংস্কার করে সিসাকে মাদকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। 

বাংলাদেশে ইয়াবার প্রবেশ বন্ধের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নাফ নদী অন্যতম একটি রুট হওয়ায় আমরা নাফে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ করেছি। মিয়ানমারের সঙ্গে এ বিষয়ে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই করেছি। মিয়ানমার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করলেও কাজ হয়নি।স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচিকে আমি নিজে বলেছি, যে মিয়ানমারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়াবার ব্যবসায় হচ্ছে। আপনারা এসব বন্ধ করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মিয়ানমার সহযোগিতা করেনি।

অভিযানে টেকনাফের কাউন্সিলর একরাম নিহতের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত চলছে, ভুল করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ গোলটেবিলে সভাপতিত্ব করেন। 

অনুষ্ঠানে মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.) বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা মানুষ নয়, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমি মাদকবিরোধী এই অভিযানকে (বন্দুকযুদ্ধ) স্বাগত জানাই, বাংলাদেশে যাকেই জিজ্ঞেস করবেন সেই বলছে অভিযান ভালো হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরলে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী পাওয়া যায় না, কেউ সাহায্য করে না, তাহলে তাদের বিচার কীভাবে হবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আমার একটাই অনুরোধ যেসব পুলিশ এই অভিযানগুলো পরিচালনা করছে সরকার যেন তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। 

সংসদ সদস্য নুরজাহান বেগম মুক্তা বলেন, এই সরকার গলায় কিছু রাখে না, সব সময় ঝেড়ে কাশি দেয়। মাদক ব্যবসায়ী সংসদের ভেতরে বাইরে যেখানেই থাকুক তাকে ধরা হবেই। এর দৃষ্টান্ত আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন টাঙ্গাইলের রানা এবং লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্য হয়েও বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে রাঘববোয়াল থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি সবাই আইনের আওতায় আসবে। এ সময় তিনি ইয়াবার আমদানি বন্ধে নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধের পরামর্শ দেন। 
অভিযানে আসামিদের নিহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আসামি যখন পুলিশকে মারে পুলিশ তখন কি করবে, পুলিশ তো দেশের নাগরিক তাদেরকেও বাঁচাতে হবে।

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. এম এনামুল হক বলেন, মাদক সমস্যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ভাবতে হবে। প্রয়োজনে সময় নিন, ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করেন। একতরফাভাবে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা না ঘটিয়ে তাদের সুযোগ দিতে হবে। দেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই। শুধু অভিযান চালালেই হবে না মূল্যায়ন করতে হবে অভিযান কেমন হলো।

বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ঘর থেকে সচেতনতা শুরু করতে হবে। আমাদের পিতামাতাদের শিক্ষিত করতে হবে। একজন সন্তানকে জন্ম দেয়ার আগে তাদের সন্তান লালনপালনের জ্ঞান নেয়া উচিত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। 

তিনি বলেন, বর্তমানে মাদক সমাজের বড় ব্যাধি হলেও ভবিষ্যতে ইন্টারনেট আসক্তি আরও ভয়াবহ হবে। একটি গবেষণা বলছে, সব বয়সী মানুষ প্রতি ৭ মিনিট পরপর একবার মোবাইল ব্যবহার করছে যা উদ্বেগজনক। ইন্টারনেট হোক কিংবা মাদক, যে কোনো দমনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিকার চিন্তা করতে হবে। গুটি কয়েক মানুষ মেরে মাদক সমস্যার সমাধান উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক শিশুর পূর্ণ আসক্ত হচ্ছে, কারণ তাদের ব্যস্ত রাখা হচ্ছে না। তাদের স্কুলে নানা ধরনের কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজে ব্যস্ত রাখতে হবে। মাদক নিয়াময়ে দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করতে হবে। এছাড়াও অনেক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে অনিয়ম হচ্ছে, সেগুলোতে সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা দেখেছি জেলখানার মধ্যেও মাদকের সেবন হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভালো শিক্ষক দিতে হবে।

বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বুলবুল বলেন, টেকনাফের সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বললেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন তার বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। আমি জানতে চাই টেকনাফের কাউন্সিলর একরাম হত্যায় একরামের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে কি প্রমাণ আছে? প্রধানমন্ত্রীও তার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চলছে। তাহলে একরামের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো তথ্য দেখাতে পারেননি কেন?

সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে আওয়ামী লীগের এক নেতার বক্তব্যকে কোট করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমার অনুরোধ আপনাদের এই অভিযান নিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী রাজনৈতিক কথা বলছে (‘এবার বিএনপির নেশাখোরদের ধরা হবে’)। এগুলো বলা থেকে তাদের বিরত রাখবেন। সবাইকে কমেন্ট করতে দিয়েন না। অভিযান সম্পর্কে বলতে চাই, ক্রসফায়ারে প্রতিকার হচ্ছে না। মাদকের চাহিদা ও জোগান বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, আগে মাদকের মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন না পেয়ে সবাই সুপ্রিমকোর্টে আসত। সেখান থেকে জামিন নিয়ে যেত। একটা কোর্টই ছিল যেটার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মাদকের কোর্ট’। আমি অবাক হই মাদকের সাড়ে ৪ হাজার মামলা পেন্ডিং কিন্তু এটার বিচারের জন্য আলাদা কোর্ট নেই। অথচ স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ মেটাতে পরিচালিত হয় ১০টি কোর্ট। মাদকের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও আলাদা কোর্টের ব্যবস্থা করা দরকার।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের এই অভিযান একটি ভুল পদক্ষেপ। কোনোমতেই বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করা উচিত না। ইয়াবা বন্ধ করা না করা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে, উনি চাইলেই বন্ধ করতে পারবেন। উনি যদি সত্যিকারের ভালো লোক বসাতে পারেন তাহলেই বন্ধ করা সম্ভব। শুধু ইয়াবা নয়, বাংলাদেশে যেগুলো এনার্জি ড্রিং রয়েছে, সেগুলোও বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি এনার্জি ড্রিংকে অ্যালকোহল রয়েছে। এটাকে বন্ধ না করে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে লাভ নেই।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, অভিযান নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনেক কথা বলেন। অথচ মাদকাসক্তরা নিজেরাও ধ্বংস হয়, তাদের সঙ্গে একটি পরিবারও ধ্বংস হয়। আমি অনেক পরিবার দেখেছি যারা মাদকাসক্তের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন মানবাধিকার কমিশন কোথায় থাকে। আমি এই অভিযানের পক্ষে। যারা মাদক দিয়ে সমাজকে ধ্বংস করছে তাদের গুলি করতে হবে। এই অভিযান থেকে পিছপা হলে জাতিকে অনেক পিছিয়ে যেতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে বাসে পোশাকশ্রমিক রূপাকে যারা ধর্ষণ করেছিল তারাও মাদকাসক্ত ছিল। যদি এই ধর্ষকদের রিমান্ডে এনে বন্দুকযুদ্ধ দিতেন সমাজের সবাই খুশি হতো। এ সময় তিনি ভারতীয় সিরিয়াল ও রাত ১২টার পর ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করার পরামর্শ দেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদকের আগ্রাসন তৃণমূলে পৌঁছে গেছে। গত বছর সব বাহিনীর অভিযানে ৪ কোটি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল। এই বছরের ৩ মাসে ২ কোটি ৬০ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েছি। যারা মাদক ব্যবসায় করে এখন গাঢাকা দিয়েছে, তাদের আমরা যত বেশি অস্থির রাখতে পারব অভিযানে তত বেশি সফলতা আসবে।একজন সাংসদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘মাদক সঙ্গে না পেলে আইন কাউকে ধরতে সাপোর্ট করে না। আইনের সংস্কার চলছে। নতুন আইনে মাদকের পেছনের ব্যক্তিরাও শাস্তির আওতায় আসবে।'

তিনি আরও বলেন, নতুন আইনে সিসাকেও মাদক হিসেবে ধরা হবে। ইতিমধ্যে দেশের জেলখানাগুলোতে মাদক নিরাময়কেন্দ্র করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৩টি কারাগারে ইতিমধ্যে কেন্দ্র করা হয়েছে। সব দিক থেকেই মাদক বন্ধে আমরা বদ্ধপরিকর। অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ১২ জন কর্মকর্তাকে ডোপ টেস্ট (বাংলায় লিখবেন) করা হয়েছে। সবার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। মাদক উদ্ধার করেও সেগুলো ‘উদ্ধার না দেখানোর কারণে’ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। ৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।