‘চলুক গুলি, টিয়ার গ্যাস পাশে আছি বাংলাদেশ’

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সমর্থনে কলকাতায় কর্মসূচি

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৮, ১৬:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে কলকাতা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে কলকাতার শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে তারা ইতিমধ্যে ফেসবুকে একটি ইভেন্টও খুলেছেন। ওই ইভেন্টের নাম দেয়া হয়েছে-‘চলুক গুলি, টিয়ার গ্যাস পাশে আছি বাংলাদেশ’। 

এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম কলকাতা টোয়েন্টিফোর। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, পথ নিরাপত্তা নিয়ে আন্দোলনে গত কয়েকদিন ধরে উত্তপ্ত বাংলাদেশ। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। এবার বাংলাদেশের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে পথে নামছে কলকাতার শিক্ষার্থীরাও। ইতিমধ্যে তারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টারও শেয়ার করেছেন।

নিরাপদ সড়ক দাবির এ আন্দোলনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে এক বিশেষ সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফেসবুকে ইভেন্ট তৈরি করে ওই সমাবেশে যোগ দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। এদিন কলকাতার পার্ক সার্কাসে সেভেন্ট পয়েন্ট থেকে হবে ওই সমাবেশ। মিছিল আসবে বাংলাদেশ হাইকমিশন পর্যন্ত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈকত সিট এই ইভেন্টটি হোস্ট করেছেন।
 
সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত সাত হাজারেরও বেশি মানুষ ওই ইভেন্টে উৎসাহ দেখিয়েছেন। সমাবেশের নাম দেওয়া হয়েছে, ‘চলুক গুলি, টিয়ার গ্যাস পাশে আছি বাংলাদেশ।’

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশের প্রশাসনকে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা জানিয়ে দিতে চায় যে ওপার বাংলার কিশোর ভাইবোনেরা বাঙালির গর্ব। এই ভাই-বোনেদের মারাত্মক যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে দাবানল সীমানার এপারেও ছড়িয়ে পড়বে। এই বার্তাই তারা পৌঁছ দিতে চায় বাংলাদেশ হাই কমিশনে।

কলকাতা টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, পথ নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হচ্ছে ঢাকায়৷ রোববার সেখানে আন্দোলন রুখতে শুরু হয় পুলিশি অভিযান৷ টিয়ার শেলও ছুঁড়েছে পুলিশ৷

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৯ জুলাইয়ে জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন ক্রমশ এত বড় আকার নেয় যে পুরো বাংলাদেশেই ছড়িয়ে পড়ে৷

ফেসবুক ইভেন্টে যা লেখা রয়েছে:
উড়তে-মানা ইচ্ছে ডানারা যখন নিজেদের উচ্ছলতায় অবাধ স্বাধীনতা অর্জন করে এবং থেমে না থেকে নিয়ম ভাঙার গান গেয়ে আরো আরো স্বাধীনতা অর্জন করতে থাকে, তখন সেই গান গাওয়ার শেষে কারোর জন্য ভোরের আকাশ অপেক্ষা ক'রে থাকে, আর কেউ বা পতনের দিন গোনে। 

বাংলাদেশের অফুরান প্রাণশক্তিতে ভরপুর স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের বর্তমান বিদ্রোহে অসংখ্য অগণিত মানুষ ভবিষ্যতের সেই ভোরের আকাশেরই ঝলক দেখছেন হয়তো। শুরুটা হয়েছিল একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলপড়ুয়া সহ অনেকের মৃত্যুমিছিলের বিচার চেয়ে। দাবি আকারে এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ থেকে প্রাথমিকভাবে উঠে আসে রাস্তা মেরামতি বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দিকটি। কিন্তু ক্ষোভ যত ধূমায়িত হয় ততই পরিবহন ব্যবস্থার এহেন বেহাল দশাকে ঘিরে নেতা-মন্ত্রী-আমলা-পুলিশের দ্বিচারিতা-দুর্নীতি-নিপীড়ন-অপক্ষমতায়নের বিভীষিকাময় চক্করটি সামনে এসে পড়ে। বস্তুত বয়সে কাঁচা কিশোর-কিশোরীরা রাষ্ট্রব্যবস্থার বেহাল দশাটিকেই তাদের অসীম উদ্ভাবনীশক্তি দিয়ে খুব সহজেই টার্গেট ক'রে ফেলে। 

বিদ্রোহের মুক্তিযুদ্ধসম তেজ, অদম্য হার-না-মানা স্পৃহা আর সমবেতভাবে তাক-লাগিয়ে-দেওয়া নতুন কিছু করতে চাওয়া তাদের শ্লোগানে, পোস্টারে, বক্তব্যে, কর্মকাণ্ডে বারেবার প্রতিফলিত হতে থাকে। মনে করিয়ে দিয়ে যায় 'হোক কলরব'-এর সেই যৌবনের প্রবল উচ্ছ্বাসের দিনগুলি। “৯টাকায় ১জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই”, “আম্মুর নির্দেশ, গায়ে গুলি না নিয়ে বাসায় ফিরবি না”, “যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তুমিই বাংলাদেশ”, “রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্র মেরামতির কাজ চলছে”, “হয়নি বলে আর হবে না, আমরা বলি ‘বাদ দে’/ লক্ষ তরুণ চেঁচিয়ে বলে- 'পাপ সরাবো হাত দে' ”,“শিক্ষকের বেতের বাড়ি নিষেধ যেই দেশে/ পুলিশের হাতে লাঠি কেন সেই দেশে?” ইত্যাদি পোস্টার মানুষের মগজে-মননে হৈচৈ ফেল দিয়েছে ইতোমধ্যেই।

কার্যত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে অন্তত তিনদিন গণপরিবহনে যাতায়াতের দাবি করা, নিজেরা হাত লাগিয়ে ভাঙা রাস্তা মেরামত করা, নিজেদের সীমিত জ্ঞান নিয়ে শহর-মহানগরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা, পুলিশ-বিচারক-জনপ্রতিনিধি সহ সকলের মোটরগাড়ি আটকে লাইসেন্স চেক করা, লাইসেন্স না থাকলে বিশেষ ক'রেনেতা-মন্ত্রী-পুলিশ-আমলাদের গাড়ি আটকে মকারি করা, অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আলাদা রাস্তা ক'রে দেওয়া, রিক্সাচালক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিজেরাই রিক্সা চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি সবাইকেই তীব্র আলোড়িত ক'রে ফেলেছে।

টিসি দেওয়ার হুমকি তারা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। অভিভাবকসহ সমাজের আর পাঁচজন সাধারণ মেহনতী মানুষ কিশোরদের এই 'অসম্ভব'কে ছোঁয়ার উত্তাপ নিচ্ছেন। 

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে কলকাতার শিক্ষার্থীদের স্লোগান- 

'স্কুল -কলেজের এইরকম শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ে কী হবে, ছাত্ররা দেশ চালাবে'- এরকম বার্তা অনেকের চোখে আনন্দের জল এনে দিয়েছে। আর সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে গেছে তাদের সেই দিগন্তভেদী শ্লোগান - ' আমার ভাইয়ের রক্ত লাল/ পুলিশ কোন চ্যাটের বাল?'

এইরকম একটা স্বতঃস্ফূর্ততাকে কোনো কায়েমী শক্তিই কেউ চাইলেও ছুঁতে পারছে না। তা সে আওয়ামী লীগই হোক কিংবা বি.এন.পি। এমনকি কোনোরকম মৌলবাদী শক্তিও ধারে-কাছে ঘেঁষতে পারছে না। 

আন্দোলন কোথায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছোবে, তা নিয়ে আশঙ্কা নানাজনেরই থাকতে পারে। সে তো ভবিষ্যৎ আমরা কেউই জানি না। কিন্তু, তা বলে এই আন্দোলনের প্রতিস্পর্ধাকে শুরু থেকেই সন্দেহের চোখে দেখলে তার সম্ভাবনাটিকেই নষ্ট করে ফেলার পথ প্রশস্ত হবে।

যেভাবে তিন-চারদিন আগে আন্দোলনরত এক পড়ুয়ার ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেভাবে গত ২৪ ঘন্টায় পুলিশ, গুন্ডা, র্যা ব, আওয়ামী লীগ ক্যাডার, ছাত্রলিগকে দিয়ে খুন-রেপ-চোখ উপড়ে নেওয়া-অঙ্গহানি ঘটানো ইত্যাদি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে এই কিশোর-কিশোরীদের ওপর তা এককথায় অবর্ণনীয়। শাসকশ্রেণীর এই নখ-দাঁত বের করে হামলে পড়া এবং তাতে বেশীরভাগ বড় মিডিয়ার ব্ল্যাক আউট করা ইতিহাসের বীভৎস দিনগুলির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভয়াবহতার মতো কিছু একটার প্রমাদ গুণছেন অনেকেই। 

বাংলাদেশের শাসককুলকে আমরা, কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা, সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিতে চাই যে এই কিশোর ভাইবোনেরা আমাদের গর্ব তথা বাঙালির গর্ব তথা সমগ্র সমাজের মেহননি আমমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা। এই ভাই-বোনেদের মারাত্মক যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে দাবানল সীমানার এপারেও ছড়িয়ে পড়বে। 

মনে রাখবেন, বাংলার মানুষের রক্তে লেখা আছে বঙ্গভঙ্গ রুখে দেওয়ার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ জেতার ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সমগ্র সমাজব্যবস্থা বদল করার আহ্বানের ইতিহাস।

কিশোর বাহিনীর এই মরণপণ লড়ে যাওয়া আসলে আমাদেরই লড়া। কোনো কাঁটাতারের বেড়া এই দাবানলকে আটকাতে পারবে না। 

'চলুক গুলি টিয়ার গ্যাস/ পাশে আছি বাংলাদেশ'- এই ব্যানারসহ মিছিল ক'রে এই বার্তা আমরা পৌঁছে দেব কলকাতার 'বাংলাদেশ হাই-কমিশনারে'-এ।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে কলকাতার শিক্ষার্থীদের স্লোগান-