জাতিগত নির্মূলের এক বছর

ভয়ানক ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রোহিঙ্গারা

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

যখন সশস্ত্র লোকজন দক্ষিণ মিয়ানমারের গ্রামে গ্রামে হানা দেয়া শুরু করে, ৩৩ বছর বয়সী রোহিঙ্গা নারী আনোয়ারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন- হানাদারদের কবল থেকে কীভাবে তিনি তার ছয়টি শিশু রক্ষা করবেন।

পরে যখন গ্রামবাসী তার স্বামীর মরদেহ নিয়ে আসেন, তখন তিনি ভাবতে থাকেন, কীভাবে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যাবেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে তার শিক্ষক স্বামীকে হত্যা করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

এর পর তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। প্রথমে পায়ে হেঁটে, পরে নৌকায়। বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি যেন সবকিছু ভুলে গিয়েছিলেন। পালাতেই হবে-এর বাইরে তিনি কিছু ভাবতে পারছিলেন না।

তিনি বলেন, নয় বছর বয়সী একটি মেয়ে শিশুকে আমাদের সামনেই গুলি করে হত্যা করে সশস্ত্র বাহিনী। লোকজন যত ত্রুত সম্ভব নদী পার হতে চাচ্ছিলেন, কারণ তাদের পেছনেই রয়েছে অস্ত্রধারীরা। পালাতে গিয়ে কেউ কেউ নদীতে ডুবে মারা গেছেন।

আনোয়ারা ও তার ছয় শিশু নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কয়েক মাসের পরের কথা। কক্সবাজারের বালুখালীতে তারা একটি বাঁশের ঝুপড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন। নিয়মিত খাবার ও পানি আসছে। তিনি তার মনকে প্রশ্ন করেন, এর পর কী হবে?

মিয়ানমার সরকারের দাবি, গত বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জঙ্গিরা ছোরা ও হাতে বানানো বোমা নিয়ে বার্মিজ পুলিশ ফাঁড়িতে কয়েক দফায় হামলা করলে ১২জন নিহত হন।

জবাবে দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনের গ্রামগুলোতে জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করে। এতে দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ৯০ শতাংশ পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

বছরখানেকের মধ্যে কক্সবাজারে নয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন। যাদের অধিকাংশই শিশু। সেখানে পাঁচটি আশ্রয়শিবিরে তারা বসবাস করছেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরটি কুতুপালংয়ে, অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন এতে। এসব রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নজিরবিহীন মানবিক কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আশ্রয়শিবিরে কয়েক ডজন সংস্থার সমন্বয় করা ইন্টার সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের প্রধান সুম্বুল রিজভী বলেন, বছরখানেক আগে এখানে কিছুই ছিল না। এখন বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহৎ শহরে আমরা।

কিন্তু আনোয়ারার প্রশ্নের জবাব এখানে নেই। মিয়ানমার থেকে মানবঢল শুরু হওয়ার এক বছর পর রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কেউ জানেন না।

বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থীদের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের প্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, কয়েকটি ইস্যু বিষয়টিকে অন্ধকারে রেখেছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দেশই শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে একমত। রোহিঙ্গা নেতারাও এমনটা চাচ্ছেন।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রধান মোহিব উল্লাহ বলেন, মিয়ানমার হচ্ছে আমাদের আসল দেশ, আমাদের মাতৃভূমি। আমরা দ্রুত সম্ভব সেখানে ফিরতে চাই।

কিন্তু তিনি অবশ্যই ১৯৯১ সাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও স্মরণ করেন। সে সময় প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। তাদের দেশত্যাগের সঙ্গেও মিশে ছিল বার্মিজ সেনাবাহিনীর ধর্ষণ, জোরপূর্বক শ্রম আদায় ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

বছরখানেক পর তারা প্রত্যাবাসনে রাজি হন। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পরে ফের মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের ওপর একই ধরনের নির্যাতন চালিয়েছে।

ঢাকা বলছে, কোনো রোহিঙ্গাকে অনিচ্ছাকৃত ফিরে যেতে জবরদস্তি করা হবে না।

মুহিব উল্লাহর দৃঢ় সংকল্প, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেয়া যাবে না। ১৯৯২ সাল ছিল আমাদের জন্য একটা শিক্ষা। সে সময় বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থার বার্তা ও নীতি মেনে আমাদের জনগণ সেখানে ফিরে গিয়েছিল। এর পর আমরা গণহত্যার শিকার হয়েছি। সবকিছু চরম অবনতির দিকে গেছে।

ছবি: গার্ডিয়ান

মুহিব উল্লাহর সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া লেখা রয়েছে। সেগুলোর পূরণ হওয়া ছাড়া রোহিঙ্গারা কখনো ফিরে যাবেন না।

তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই পূর্ণ নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ও নিজস্ব ভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘ জানিয়েছে, শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে সহায়তার জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কয়েক মাস আগে একটি চুক্তি সই হলেও তা ফলপ্রসূভাবে কার্যকর করা হয়নি। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ও শরণার্থী সংস্থা শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সুচি সরকারের সঙ্গে গত জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল।

জাতিসংঘের মিয়ানমারের আবাসিক ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সমন্বয়ক নাট ওসবি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, সংঘর্ষ কবলিত এলাকায় কর্মকর্তাদের ঢোকার সুযোগ দিতে অনুরোধ জানালে তাতে ব্যাপক কালক্ষেপণ করা হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ সীমিত এলাকায় জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের ঢোকার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

ওসবেই বলেন, সীমিত কয়েকটি গ্রামে কাজ করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে জাতিসংঘ।

সম্প্রতি রাখাইন থেকে ফিরে বাংলাদেশের শরণার্থীদের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের প্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ধীর অগ্রগতি হচ্ছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য ৪২টি গ্রাম পুনর্নির্মানের জন্য তারা রেখে দিয়েছেন। তারা এ ব্যাপারে আন্তরিক কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এটা কোটি টাকার প্রশ্ন। আমরা এখনো বিশ্বাস করতে চাই, মিয়ানমার তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে।

মিয়ানমারের যে সেনা অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তা নিয়ে কোনো তদন্ত করা হয়নি। অন্তত ছয় হাজার রোহিঙ্গা শিশু সীমান্ত পারি দিয়ে কক্সবাজারে এসেছে। যাদের সঙ্গে তাদের বাবা-মা ছিলেন না।

জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন বলেছে, এসব শিশুদের কতটি তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংস্থাটির মুখপাত্র ডেফনি কুক বলেন, শিশুদের একটা বড় অংশ অভিভাবকদের দেখা পেয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের জরিপ বলছে, ১৩৯টি শিশু আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অর্ধেকের বেশি এতিম। তাদের বাবা মিয়ানমারে কিংবা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথে নিহত হয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পিটিশন দাখিল করা মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ওয়েইন জর্ডাশ বলেন, দেশটিকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বসতি অস্থায়ী। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশ এ নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে আরও কয়েক বছর সহায়তা দিয়ে যাবে। শরণার্থীদের জন্য ভালো আবাসন ও শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারেও একটা শিথিল অবস্থা নেয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা তাদের মাঝারি মেয়াদের আশ্রয় দেয়ার কথা বিবেচনা করছি। যা এক কিংবা দুই বছরের বেশি স্থায়ী হতে পারে।

তিনি বলেন, শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারটিও আমরা বিবেচনায় রেখেছি। তারা যাতে দক্ষতা অর্জন করতে পারে ও যখন রাখাইনে ফিরে যাবে, তখন সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।

কিন্তু সময় যত চলে যাচ্ছে, এ সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। তার সঙ্গে কমছে বিদেশি তহবিলের সরবরাহও।

ইতিমধ্যে মানবিক সহয়তার সর্বশেষ ধাপে মাত্র ৩৪ শতাংশ পাওয়া গেছে। এতে আশ্রয়শিবির প্রশাসকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে।

রিজভীর প্রশ্ন, অপর্যাপ্ত তহবিল আসার প্রভাব কি আমরা বুঝতে পারছি? গত সেপ্টেম্বর থেকে খাদ্যের মজুত কমে যাচ্ছে। যে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাতে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, রোহিঙ্গাদের একটি প্রজন্ম শিক্ষাদীক্ষা ছাড়া বেড়ে উঠছে ও আশ্রয়শিবিরের মধ্যেই কেবল তাদের কর্মসংস্থান। এতে তারা মেধা ও মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলতে পারে।

হাকিমপাড়া এলাকায় ৫৫ হাজার লোকের বসবাস। মোহাম্মদ ইলিয়াম নামের এক রোহিঙ্গা তার একটি শিশুর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ক্যাম্পের ভেতর সে দিনে দিনে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা তার পড়াশোনার কিংবা কাজের ব্যবস্থা করতে পারিনি। সে আসলে কিছুই করতে পারছে না।

কিন্তু তিনি এর বিকল্প কিছুও দেখছেন না। ৩৫ বছর বয়সী ইলিয়াস বলেন, আমরা ফিরে যেতে পারি না। যখন আমরা রাতে ঘুমাতে যাই, আমাদের ভেতর ভয় কাজ করে। সেনাবাহিনী বুঝে আমাকে ধরে নিতে আসছে। আমাদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা সবসময় আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করি।

আনোয়ারাও বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি অনেক ভাবি। কিন্তু ভেবেও আমি কিছু করতে পারছি না। নিজের ঝুপড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমি কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পারি।

আনোয়ারা বলেন, নানা ধরনের দুঃশ্চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরেছে। কোলের শিশুকে দেখিয়ে তিনি বলেন, সে সবসময় তার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি, তোমার বাবা বাজারে গেছে। তোমার বোনও তার সঙ্গে আছে। বাজার থেকে তিনি তোমাদের জন্য খাবার কিনে নিয়ে আসবেন। এরপর সে নিরব হয়ে যায়।