শিক্ষার্থীদের উচ্ছৃঙ্খলতা সহ্য করা হবে না: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় তার সঙ্গে ঢাবি ভিসিসহ শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। ছবি: যুগান্তর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। এ সরকার উচ্চশিক্ষা খাতে খরচ করাকে ব্যয় না, বিনিয়োগ মনে করে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এর মর্ম বুঝতে হবে। তাই কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা-উচ্ছৃঙ্খলতা করা যাবে না। এ ধরনের কোনো কিছু কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনেই সবাইকে চলতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হলের নতুন ভবন ‘৭ মার্চ’-এর উদ্বোধন করতে গিয়ে শনিবার তিনি এসব কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ স্মরণে ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গত এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়ি ভাংচুর হয়েছিল। তখনও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এতে জড়িতদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত। এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের উপার্জনে চলবে তারও বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানকার যারা শিক্ষার্থী তাদের এটা ভাবা উচিত যে, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশে দেয়া হয়ে থাকে। প্রায় শতভাগ খরচই কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দেশ গড়ার জন্য শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষ নির্মাণের জন্য এই বিনিয়োগ। এ কারণে যারা শিক্ষা দেবেন ও শিক্ষা গ্রহণ করবে, তারাও যেন নিজেকে সেভাবেই গড়ে তোলেন। এর মর্যাদা শিক্ষার্থীদের দিতে হবে। বিশৃঙ্খলা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।

শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে হলে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে সেভাবেই আচরণ করতে হবে। এটাই জাতি আশা করে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই সবদিক থেকে আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবনমান উন্নত হোক, তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ে তুলে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশের বাস্তবায়ন করুক।

বক্তব্য শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী নবনির্মিত ‘৭ মার্চ ভবন’-এর ফলক উন্মোচন করেন। তিনি ওই ভবনে রক্ষিত জাতির পিতার প্রতিকৃতি এবং ৭ মার্চ জাদুঘরও পরিদর্শন করেন। রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী লিপি আক্তার এবং শ্রাবণী ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে ‘উত্তরীয়’ পরিয়ে দেন। সঙ্গীত ও নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এতে সভাপতিত্ব করেন। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সামাদ, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরিন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দীন, রোকেয়া হলের প্রাধক্ষ্য ড. জিনাত হুদাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষার ওপর আমরা সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। শিক্ষাকে বহুমুখীকরণ ও জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা। আমরা শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড করেছি যার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও বৃত্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন জাতি গড়ে তুলতে চাই। বিজ্ঞান পড়ার দিকে ছেলেমেয়েদের ঝোঁক বাড়ানোর জন্য ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামটি ঠিক করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার জন্য। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন জেলায় আরও বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। শিক্ষাকে বহুমুখী করা ও বহুমুখী গবেষণার জন্য সরকার প্রতিবারই আলাদা বরাদ্দ রাখছে।

বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকেই প্রধানমন্ত্রী তার এবং তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে এ দেশে পুনর্বাসিত করতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, যাতে এ দেশ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, উন্নত না হতে পারে, সে জন্যই সেই জঘণ্য-নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

জাতি গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের মাতৃভাষার সংগ্রাম থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, সর্বক্ষেত্রেই অগ্রগণ্য ভ‚মিকা রেখেছে। সে কারণেই এ বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে যত সংগ্রাম-আন্দোলন হয়েছে, সব আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার প্রতিটি আন্দোলনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ‚মিকা অনেক। তিনি ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ার কথা উলে­খ করেন শেখ হাসিনা।

শনিবার তার উদ্বোধন করা ভবনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ৭ মার্চের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত। ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং সেই ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠন করা এবং দেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল জাতির পিতার জীবনের লক্ষ্য।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, একটা দুঃখ আছে মনে- আমার বাবাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি, তিনি কর্মচারীদের অধিকার আন্দোলনে গিয়ে বহিষ্কৃত হন। আর ১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডির পর আমিও আমার লেখাপড়া শেষ করতে পারিনি। তবে আমাকে অনারারি ডিগ্রি (মাস্টার্স ডিগ্রি) দেয়ায় আমি ধন্যবাদ জানাই। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ দেন।

শনিবার উদ্বোধন করা ভবনটি প্রায় ৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত। এক হাজার ছাত্রীর আবাসন সুবিধাসংবলিত এ ভবনটিতে প্রশাসনিক এবং সার্ভিস ব্লক নামে আরও দুটি ব্লক রয়েছে। ৭ মার্চ জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের দুর্লভ আলোকচিত্র এবং তথ্যাদি সন্নিবেশন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্ষমতা ভোগের বস্তু নয়, দায়িত্বের। জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করলে দেশ এগিয়ে যায়। মানুষের কল্যাণ হয়। সরকার সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের আগেই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ।