বুয়েটের প্রতিবেদন
বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৫, ০১:৪৭ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান কার্যালয় ভবন। এ ভবনের কয়েকটি পিলারে ফাটল ধরেছে। ওইসব পিলারের ভেতরের রডে মরিচা পড়েছে। পিলার ও বিমের ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) একটি টিম ভবনের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে এক প্রতিবেদনে এ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে।
ওই প্রতিবেদনে দ্রুত ভবনটিতে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) মো. মহিদুল ইসলামকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভবনের নকশা লঙ্ঘন করে প্রতিটি ফ্লোরে ডেকোরেশন করা হয়েছে। ১১তম তলায় বিশাল মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কারণে ভবনের ওজন বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে পিলার ও বিমের ওপর। তারা আরও জানান, আপাতত ১১তম তলার সব স্থাপনা এবং বিভিন্ন ফ্লোরের অপ্রয়োজনীয় কাঠামো সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভবনের ওজন কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয় অন্যত্র নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা যুগান্তরকে বলেন, আমরা দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসাবে একটি প্রকল্প নেওয়া অথবা থোক বরাদ্দের মাধ্যমে সরকারি অর্থ চাওয়ার পরিকল্পনা করছি। এর মাধ্যমে অন্যত্র সংস্থার জন্য জমি কিনে ভবন নির্মাণ করা হবে। আর স্বল্প মেয়াদে নবম তলা থেকে ওপরের অংশের স্থাপনা কমিয়ে ভবনের লোড কমানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
সংস্থাটির প্রশাসন ও মানব সম্পদ বিভাগের পরিচালক কাজী ওয়াকিল নওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, বুয়েটের একটি টিম ৩ জুলাই বিআইডব্লিউটিএ ভবনে তাদের প্রাপ্ত তথ্যের ওপর একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছেন। সেখানে নানা ধরনের ঝুঁকির কথা বলেছে। এরপর কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটি কাজ করছে।
রাজধানীর মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় বিআইডব্লিউটিএর প্রধান ভবন অবস্থিত। ১৯৭৫ থেকে ৮২ সাল পর্যন্ত এ ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের ব্যবহারযোগ্য ফ্লোর এরিয়া হচ্ছে এক লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ বর্গফুট। মাত্র ৪২ বছরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভবনটিতে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস করেন। এছাড়াও কয়েকশ সেবাগ্রহিতা ও ঠিকাদার এ ভবনে যাতায়াত করে থাকেন।
গত বছর বিআইডব্লিউটিএর প্রধান ভবনের পাঁচটি পিলারে ফাটল দেখা যায়। তখন অবকাঠামো নিরাপত্তা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বুয়েটের সিভিল বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রাকিব আহসানের নেতৃত্বাধীন টিম ফাটল ধরা পাঁচটি পিলারসহ ভবনের বিভিন্ন অংশের স্থাপনা পরীক্ষা করেন। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ভবনের বেইজমেন্ট ও অষ্টম তলার পাঁচটি পিলারে ফাটল রয়েছে। ফাটলের আসল কারণ হচ্ছে পিলারের ভেতরে থাকা রডে মরিচা ধরেছে। এছাড়া যখন এ ভবন নির্মাণ করা হয়, তখন বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড না থাকায় তা অনুসরণ করা হয়নি। তখন হ্যান্ড মিক্সিং করে কংক্রিট মিক্সিং করা হতো। এর ফলে ভবনের একেক জায়গায় অবকাঠামোগত কম্প্রেসিভ স্ট্রেংথ একেক রকম পাওয়া গেছে। বেইজমেন্টের একটি কলামে স্ট্রেংথ পাওয়া গেছে ৬১০ পিএসআই। নবম তলার একটি পিলারে ৮৭০ পিএসআই পাওয়া গেছে, যা স্ট্যান্ডার্ড মানের চেয়ে অনেক কম। একইভাবে রডের স্ট্রেংথ পাওয়া গেছে ৪০ কেএসআই, যা ৬০ কেএসআই থাকার কথা। প্রতিবেদনে দ্রুত ভবন খালি করা বা এ ভবনের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ভবনটি ভবিষ্যতে ব্যবহারযোগ্য করা যায় কিনা, সেজন্য এর কাঠামোগত অংশগুলো মেরামত বা শক্তিশালী করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের প্রতিবেদন পেয়ে তারা হতবাক। ঢাকায় সংস্থাটির আর কোথাও নিজস্ব জমি নেই। নতুন কোথাও ভবন নির্মাণ করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। এছাড়া হঠাৎ করেই এত বড় আয়তনের ভাড়া ভবন পাওয়া সহজ নয়। এমন পরিস্থিতিতে আপাতত ১১তম তলার সব স্থাপনা ভেঙে ফেলা এবং স্টোর রুমের মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ভবনের লোড কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
