রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক
সংস্কার বাস্তবায়নে বড় দলগুলোর বিরোধ
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫, ০২:০০ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর যেসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে বড় দলগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব ছিল সরকার গঠনের পর দুই বছরের মধ্যে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তা মেনে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, নির্বাচনের আগেই সংস্কারের আইনি ভিত্তি জরুরি। না হলে তারা সংস্কার প্রস্তাবে স্বাক্ষর করবে না। বুধবার বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এসব উঠে আসে। কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বৃহস্পতিবার (আজ) গ্রহণযোগ্য খসড়া সনদ সব দলের কাছে তুলে দেওয়া হবে।
এ সময় তিনি বলেন, সংসদে নারী আসনসহ ১৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আজকের মধ্যে বাকিগুলোয় ঐকমত্যে পৌঁছানোর আশা করছি।
প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের আলোচনাও শেষ পর্যায়ে এসেছে। বুধবার ছিল আলোচনার ২২তম দিন। এদিন আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব, সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান। এছাড়াও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, ইলেকটোরাল কলেজ, সংসদের উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, এখতিয়ার, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রের মূলনীতি। এদিন সব বিষয় আলোচনায় আনা সম্ভব হয়নি।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বৃহস্পতিবার গ্রহণযোগ্য খসড়া সনদ সব দলের কাছে তুলে দেওয়া হবে। ‘বুধবারের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, এর একটি তালিকা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৌঁছে যাবে। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে সব দল মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের নীতিগত অবস্থানে একমত হয়েছে। তবে সংবিধানে এ বিষয়ে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিয়ে কিছু ভিন্নমত রয়ে গেছে। এ প্রক্রিয়ায় বিএনপির দেওয়া সুপারিশ ও আপত্তিগুলো স্পষ্টভাবে কমিশনের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা এগিয়ে নিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রস্তাব এখনো প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু অন্য বিষয়গুলোয় দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। আজ বৃহস্পতিবারও আলোচনা চলবে। বৈঠকের মাঝপথে দলগুলো তাদের অবস্থান সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যা করে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই সনদ আসলে একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকারনামা, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে জাতিকে একটি নতুন দিশা দেখাবে। এই সনদের মূল শক্তি হলো এতে থাকা অঙ্গীকারনামা, যেখানে ঐকমত্যে পৌঁছানো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আইন, সংবিধান ও বিধির পরিবর্তনের প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিশ্র“তিগুলো বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদই হবে মূল মঞ্চ। তিনি বলেন, আমরা একমত হয়েছি যে, সংসদ গঠনের দুই বছরের মধ্যে সব অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে। আর এর আগেই অনেক সংস্কার প্রস্তাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে যাচ্ছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, এই সনদের চূড়ান্ত কপি প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরসহ কমিশনের সব সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের স্বাক্ষরে প্রকাশিত হবে। এটি জাতির সামনে ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে উন্মুক্ত থাকবে। এরপর কোনো রাজনৈতিক দল কি সাহস করবে একে ভাঙার? তাহলে কী বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে, সেই ঝুঁকি কি কোন দল নেবে?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, আমার তো মনে হয় না, এর চেয়ে বড় বেশি কোনো কনসেনসাস (ঐকমত্য) হতে পারে? এর চেয়ে বড় বেশি কোনো মেমো অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (সমঝোতা স্মারক) হতে পারে। এর চেয়ে বড় কোনো সোশ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট (সামাজিক চুক্তি) হতে পারে না। অর্থাৎ জাতীয় ঐকমত্যকে তিনি একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসাবে উল্লেখ করেন। বিএনপি নেতা আরও বলেন, ‘এই চুক্তি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নয়। এটি পুরো জাতির সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে, একটি ঐক্যমূলক প্রতিশ্রুতি। তার মতে, ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮২৬টি সংস্কারের সুপারিশের মধ্যে ৬৫৯টিতে একমত পোষণ করেছি। মাত্র ৫১টিতে বিএনপি একমত হয়নি। আর বাকি ১১৬টিতে দ্বিমত পোষণ করেছি। তারপরও বলবে, বিএনপি সংস্কার চায় না। সেটা জাতি দেখেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর আইনগত ভিত্তি না থাকলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হবে না। জনগণের কাছে এর কোনো মূল্য থাকবে না। তাতে সই করবে না জামায়াত। তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনায় যেসব সংস্কার প্রস্তাবে একমত হয়েছি, তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে বাংলাদেশে একটি গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু মঙ্গলবার কমিশনের পক্ষ থেকে যে সনদের খসড়া পাঠানো হয়েছে, তা দেখে খুব হতাশ হয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, দুই বছরের মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সরকারের মেয়াদ বা কমিশনের এখতিয়ার সম্পর্কিত কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
জামায়াতের নায়েবে আমির আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই সরকার কি তাহলে দুই বছর ক্ষমতায় থাকতে চায়? যদি বর্তমান সরকার না থেকে পরবর্তী সরকার এসব বাস্তবায়ন করে, তাহলে এতদিন আমরা যে পরিশ্রম করেছি, তা কি কেবল পরামর্শ দেওয়ার জন্যই ছিল? তাহলে তো এর কোনো মূল্যই থাকল না। তিনি আরও বলেন, আমরা শুরু থেকেই ধরে নিয়েছিলাম, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো আইনগত ভিত্তি পাবে এবং তা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু যদি আইনগত ভিত্তি না থাকে, তাহলে এটি কেবল কথার কথা থেকে যাবে। জনগণ তা মানবে না, গুরুত্ব দেবে না।
ডা. তাহের বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই ধরনের পরিস্থিতি বহুবার তৈরি হয়েছে। তখনো আইনি জটিলতা পেরিয়ে সমাধানের পথ বের করা হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, এরশাদসহ অনেক শাসক আইনগত প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় গেছেন, সংসদ গঠন করেছেন, আইন পাশ করিয়েছেন। ফলে এবারও আইনি ভিত্তি দেওয়ার সুযোগ আছে। আইনজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের প্রস্তাব করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সেখানে আলোচনা হবে কীভাবে সংস্কার প্রস্তাব আইনগত ভিত্তি পেতে পারে। এখনই সেই আলোচনার সুযোগ দিলে ভালো হয়। ডা. তাহের আরও বলেন, জুলাই সনদ যদি বাস্তবায়নযোগ্য না হয়, আইনগত ভিত্তি না থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতীকী দলিল হয়ে থাকবে। তাতে আমরা সই করব না। কারণ, জনগণের কাছে যার কোনো বাস্তব মূল্য নেই, এমন প্রস্তাবে সই করে লাভ কী?
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ৩৬ জুলাইয়ের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে হবে। এ নিয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। এর আইনি ভিত্তি দিতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে নিয়ে ঐকবদ্ধভাবে আদায় করা হবে। আর ঐকমত্য কমিশনের একমত হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে জুলাই সনদও হতে হবে আইনিভাবে। তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, অনেকে জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদকে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ দুটি বিষয় আলাদা। সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামোর বিষয়গুলো সন্নিবেশিত হবে। আর ঘোষণাপত্রে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ। আখতার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হওয়া বিষয়গুলোকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে। অন্যথায় এর কোনো মূল্য থাকবে না। একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসাবেই থাকবে। আর এটি দুই বছরের প্রস্তাবকে এনসিপি নাকচ করছে। এমনটি হলে আমরা সই করব না। কারণ পরবর্তী সরকার এর স্বীকৃতি দেবে এমন কথা ফাঁকিবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি জানান, জুলাই ঘোষণাপত্রের ড্রাফট হাতে পেয়েছেন। সরকারের কাছে সংশোধনী দেবেন। তিনি জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য সফর রাজ হোসেন, বিচারপতি এমদাদুল হক, বদিউল আলম মজুমদার, ইফতেখারুজ্জামান ও আইয়ুব মিয়া। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে মঙ্গলবারের আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ ৩০টির রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি অন্যতম।
