নিউমার্কেটে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরা হামলাকারী কারা?
jugantor
নিউমার্কেটে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরা হামলাকারী কারা?

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২১ এপ্রিল ২০২২, ২২:৩৭:৫০  |  অনলাইন সংস্করণ

গত ১৮ এপ্রিল রাতে তুচ্ছ ঘটনার জেরে হোটেল কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। পরে তা রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। পুরো নিউমার্কেট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওই রাতে শুরু হওয়া সংঘর্ষ থেমে থেমে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত চলে। এতে দুইজন প্রাণ হারান। আহত হন অর্ধশতাধিক।

সংঘর্ষ চলাকালে গণমাধ্যমের ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ, ছবি এবং ঘটনার আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে- রামদা, হকিস্টিক, লাঠি-রড হাতে হেলমেট পরা বেশ কয়েকজন খুবই বেপরোয়া। প্রশ্ন উঠেছে- ইট-পাটকেল ছোড়া, ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরে বেপরোয়া মারধর করল কারা?

শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, হামলা যারা চালিয়েছেন তারা তাদের লোক নন। হামলাকারীরা তৃতীয় পক্ষের কেউ। অ্যাম্বুলেন্সে হামলার ঘটনা তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতির দাবি করে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী নেতারা গতকাল (বুধবার) সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সাংবাদিকদের ওপর ও অ্যাম্বুলেন্সে হামলা কোনো ছাত্র বা ব্যবসায়ীরা করেনি। এখানে তৃতীয় পক্ষ থাকতে পারে।

অন্যদিকে ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষও সংঘর্ষের পেছনে উসকানির কথা বলেছে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের সংঘাত বাঁধিয়ে কে- কীভাবে ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছিল, তার কারণ খুঁজছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

এই লঙ্কাকাণ্ডের নেপথ্যে একাধিক গোষ্ঠীর উসকানির তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সন্দেহভাজন অন্তত ১০ দোকান কর্মচারী ও হকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

ঢাকা কলেজের কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতাও আছেন পুলিশের সন্দেহের তালিকায়। পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ছিল তাৎক্ষণিক।

তবে মঙ্গলবার দিনভর থেমে থেমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে উসকানি দিয়েছে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন নেতা। তারা একাধিক ‘ছাত্রের লাশ’ ফেলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নীলনকশায় মেতে উঠেছিল।

এ কাজে সফল হলে দায়ভার চাপাতে চেয়েছিল পুলিশের ওপর। এজন্য সংঘর্ষে লিপ্ত ছাত্র ও দোকান কর্মচারীদের নানাভাবে উসকে দেয় তারা। দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে মিলে সংঘর্ষে যোগ দেয় বহিরাগতরা।

এসব তথ্য জানতে পেরে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ‘নীলনকশায়’ লিপ্তদের কয়েকজনকে শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে ঢাকা কলেজ এলাকায় রামদা হাতে বেপরোয়া হেলমেটধারীকে ধরতেও মাঠে নেমেছে পুলিশের একটি দল। এছাড়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে ঢাকা কলেজের তিন ছাত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা সংঘর্ষের ঘটনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে বুধবার রাত ১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ঢাকা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি বৈঠক চলছিল।

এর আগে সকালে ব্যবসায়ীরা এবং রাতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ব্যবসায়ীরা সংঘর্ষের দায় তৃতীয় পক্ষকে চাপানোর ইঙ্গিত দেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা পুলিশের সংশ্লিষ্ট ডিসি, এডিসি, ওসিকে প্রত্যাহারসহ ১০ দফা দাবি পেশ করেন।

এ ছাড়া মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় বুধবার রাতে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত নাহিদের বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন।

এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আরেকটি মামলা হতে পারে বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ী-কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনার পর বুধবার পরিস্থিতি শান্ত হলেও পুরোপুরি সচল হয়নি নিউমার্কেট এলাকা। সেখানকার সব মার্কেটের দোকানপাট বুধবার সারা দিন বন্ধ ছিল।

ঢাকা কলেজের প্রধান ফটক ছিল তালাবদ্ধ। বিবদমান কোনো গ্রুপই রাস্তায় না থাকায় নতুন করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। পুরো এলাকায় মোতায়েন আছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ। তবে দোকান খুলতে বুধবার সকাল থেকেই ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা মার্কেটগুলোর সামনে জড়ো হয়েছিলেন।

আর ঢাকা কলেজের ছাত্রাবাসগুলোতে অবস্থান করছিলেন শিক্ষার্থীরা। হল ছাড়ার ঘোষণা বুধবার সারা দিনেও কার্যকর হয়নি। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কেট খোলার অনুমতি দেয়নি পুলিশ। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত দোকানপাট খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

তবে সকাল থেকেই মিরপুর রোডসহ আশপাশের সব লেন খুলে দিলে স্বাভাবিক হয় যানবাহন চলাচল। বিকালের দিকে দোকানপাট খোলার চেষ্টা করলে ঢাকা কলেজের সামনে পরপর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।

এতে ফের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সতর্ক অবস্থান নেন দোকান কর্মচারী ও হকাররা। কিছু সময়ের জন্য মিরপুর রোডে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পুলিশ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

যদিও ঘটনার শুরু থেকেই স্থানীয় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে ব্যবসায়ী ও ছাত্রদের পক্ষ থেকে। সংঘর্ষের ব্যাপকতা ছড়ানোর জন্য পুলিশের গাফিলতিকে দায়ী করেন তারা। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার কোনো উদ্যোগ নেই।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ এক মুহূর্তের জন্যও নিষ্ক্রিয় ছিল না। বরং সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। অনেকেই উসকানি দিয়ে পুলিশের ভূমিকাকে বিতর্কিত করার পাশাপাশি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছিল। তাতে তারা সফল হয়নি। শুরু থেকেই পুলিশ অ্যাকশনে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। এ কারণে পুলিশ শুরুতে ব্যবসায়ী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব মহলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই প্রক্রিয়া কাজে না আসার পর পুলিশ নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’

থেমে থেমে সংঘর্ষের নেপথ্যে : মঙ্গলবার দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষের নেপথ্যে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন নেতার যোগসাজশের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নতুন গঠিত একটি রাজনৈতিক দল, বামপন্থি একটি সংগঠন ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা বৃহৎ একটি দলের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে সংঘর্ষে লিপ্ত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন।

তাদের বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেন। তারা পুলিশকে একটি ভুল পদক্ষেপের দিকে ধাবিত করতে উসকানি দেয়। তারা একাধিক ছাত্রের লাশ চাচ্ছিল। ধৈর্যহারা হয়ে পুলিশ একটি ভুল সিদ্ধান্ত নেবে-এমন অপেক্ষায় ছিল উসকানিদাতারা।

এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ শুরুতে ঘটনাস্থলে তৎপরতা না বাড়িয়ে ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের সামনে এগিয়ে দেয়। ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের। তাদের মাধ্যমে দুপক্ষকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কলেজের দিকে এগোলেই ছাত্ররা দশতলার ওপর থেকে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছোড়ে। আবার পেছালে ছাত্ররা কলেজ থেকে বেরিয়ে মার্কেটে হামলার চেষ্টা চালায়।

দশতলায় টিয়ার শেল মারা সম্ভব না হওয়ায় সংঘর্ষ দমনে পুলিশের সামনে বিকল্প ছিল গুলি। কিন্তু গুলি করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। তাই পুলিশ সময় নিয়ে সব মহলকে সম্পৃক্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এটা পুলিশের একার সিদ্ধান্ত ছিল না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, উসকানিদাতাদের সঙ্গে যোগসূত্র থাকায় কাউকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে সন্দেহভাজন অন্তত ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই হকার ও দোকান কর্মচারী।

এছাড়া ঢাকা কলেজের কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের কয়েক নেতার গতিবিধির ওপর নজর রাখছেন গোয়েন্দারা। নিউমার্কেট এলাকা থেকে বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফুটেজে ঘুরেফিরে বেশ কয়েকজন যুবককে অতি মারমুখী দেখা গেছে। তারা বিনা কারণে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

গুজব ছড়িয়েছে যারা : দুই দোকান কর্মচারীর ঝগড়ায় একজনের পক্ষ হয়ে ঢাকা কলেজের যেসব শিক্ষার্থী ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারিতে জড়ায় তাদের তিনজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়।

তারা মারামারি করতে গিয়ে নিজেরা মার খেয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে রটিয়ে দেয় নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তারা বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

তখন ঢাকা কলেজ এলাকা থেকে হেলমেট পরা শিক্ষার্থীরা বেরিয়েও ভাঙচুর শুরু করে। পুলিশের কাছে থাকা সিসি ফুটেজে দেখা গেছে, বড় চুলের ঝুটি বাঁধা এক তরুণ মারামারিতে লিপ্ত। তার নাম বাপ্পী। সে নিউমার্কেটের ওয়েলকাম ফাস্টফুড দোকানের কর্মচারী।

সন্ধ্যায় ইফতারির টেবিল সাজানো নিয়ে তার সঙ্গে পাশের ক্যাপিটাল ফাস্টফুড দোকানের কর্মচারী কাওসারের বচসা হয়। রাত সাড়ে ১১টায় বাপ্পী ঢাকা কলেজ থেকে তার পরিচিতদের নিয়ে ফের সেখানে যান।

তারা ক্যাপিটালের কাওসার ও বাবু নামের দুই কর্মচারীকে মারধর করেন। বাবুকে ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়। একই সময়ে প্রথমে বাবুকে ইট দিয়ে ও বাপ্পীর ওপর দোকানের চাপাতি ও ছুরি দিয়ে পালটা হামলা চালায় ক্যাপিটালের কর্মচারীরা।

ফুটেজে দেখা যায়, খালি গায়ে থাকা এক কর্মচারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাপ্পীর সমর্থকদের কোপ দেয়। এই মারামারিতে অংশ নেওয়া ঢাকা কলেজের তিন শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের একজন নাসিম। তার গায়ে নিজের নাম লেখা জার্সি ছিল।

আরেকজনের নাম মাসুম। যার গায়ে ছিল সবুজ রংয়ের টি-শার্ট। আর মেরুন রংয়ের শার্ট পরা যুবকের নাম লিটন। এরা তিনজনই ঢাকা কলেজের ফরহাদ হলের ছাত্র। এই মারামারি করতে গিয়ে নাসিমের গায়ে কোপ লাগে।

ধাওয়া খেয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে তারা জানায়, কেনাকাটা করতে যাওয়ার পর নিউমার্কেটের দোকানদার ও কর্মচারীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই খবরেই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দলে দলে হেলমেট পরে বের হয়ে ধানমন্ডি হকার্স ও নিউমার্কেটে গিয়ে ভাঙচুর শুরু করে।

তখনই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। যাদের কারণে দুদিনের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নিউমার্কেট এলাকা তারা এখন গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ।

নিউমার্কেটে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরা হামলাকারী কারা?

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:৩৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

গত ১৮ এপ্রিল রাতে তুচ্ছ ঘটনার জেরে হোটেল কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। পরে তা রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। পুরো নিউমার্কেট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওই রাতে শুরু হওয়া সংঘর্ষ থেমে থেমে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত চলে। এতে দুইজন প্রাণ হারান। আহত হন অর্ধশতাধিক। 

সংঘর্ষ চলাকালে গণমাধ্যমের ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ, ছবি এবং ঘটনার আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে- রামদা, হকিস্টিক, লাঠি-রড হাতে হেলমেট পরা বেশ কয়েকজন খুবই বেপরোয়া। প্রশ্ন উঠেছে- ইট-পাটকেল ছোড়া, ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরে বেপরোয়া মারধর করল কারা?

শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, হামলা যারা চালিয়েছেন তারা তাদের লোক নন। হামলাকারীরা তৃতীয় পক্ষের কেউ। অ্যাম্বুলেন্সে হামলার ঘটনা তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতির দাবি করে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী নেতারা গতকাল (বুধবার) সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সাংবাদিকদের ওপর ও অ্যাম্বুলেন্সে হামলা কোনো ছাত্র বা ব্যবসায়ীরা করেনি। এখানে তৃতীয় পক্ষ থাকতে পারে। 

অন্যদিকে ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষও সংঘর্ষের পেছনে উসকানির কথা বলেছে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের সংঘাত বাঁধিয়ে কে- কীভাবে ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছিল, তার কারণ খুঁজছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

এই লঙ্কাকাণ্ডের নেপথ্যে একাধিক গোষ্ঠীর উসকানির তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সন্দেহভাজন অন্তত ১০ দোকান কর্মচারী ও হকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

ঢাকা কলেজের কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতাও আছেন পুলিশের সন্দেহের তালিকায়। পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ছিল তাৎক্ষণিক।

তবে মঙ্গলবার দিনভর থেমে থেমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে উসকানি দিয়েছে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন নেতা। তারা একাধিক ‘ছাত্রের লাশ’ ফেলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নীলনকশায় মেতে উঠেছিল।

এ কাজে সফল হলে দায়ভার চাপাতে চেয়েছিল পুলিশের ওপর। এজন্য সংঘর্ষে লিপ্ত ছাত্র ও দোকান কর্মচারীদের নানাভাবে উসকে দেয় তারা। দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে মিলে সংঘর্ষে যোগ দেয় বহিরাগতরা।

এসব তথ্য জানতে পেরে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ‘নীলনকশায়’ লিপ্তদের কয়েকজনকে শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে ঢাকা কলেজ এলাকায় রামদা হাতে বেপরোয়া হেলমেটধারীকে ধরতেও মাঠে নেমেছে পুলিশের একটি দল। এছাড়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে ঢাকা কলেজের তিন ছাত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা সংঘর্ষের ঘটনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে বুধবার রাত ১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ঢাকা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি বৈঠক চলছিল।

এর আগে সকালে ব্যবসায়ীরা এবং রাতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ব্যবসায়ীরা সংঘর্ষের দায় তৃতীয় পক্ষকে চাপানোর ইঙ্গিত দেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা পুলিশের সংশ্লিষ্ট ডিসি, এডিসি, ওসিকে প্রত্যাহারসহ ১০ দফা দাবি পেশ করেন।

এ ছাড়া মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় বুধবার রাতে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত নাহিদের বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন।

এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও আরেকটি মামলা হতে পারে বলে জানান তিনি। 

ব্যবসায়ী-কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনার পর বুধবার পরিস্থিতি শান্ত হলেও পুরোপুরি সচল হয়নি নিউমার্কেট এলাকা। সেখানকার সব মার্কেটের দোকানপাট বুধবার সারা দিন বন্ধ ছিল।

ঢাকা কলেজের প্রধান ফটক ছিল তালাবদ্ধ। বিবদমান কোনো গ্রুপই রাস্তায় না থাকায় নতুন করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। পুরো এলাকায় মোতায়েন আছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ। তবে দোকান খুলতে বুধবার সকাল থেকেই ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা মার্কেটগুলোর সামনে জড়ো হয়েছিলেন।

আর ঢাকা কলেজের ছাত্রাবাসগুলোতে অবস্থান করছিলেন শিক্ষার্থীরা। হল ছাড়ার ঘোষণা বুধবার সারা দিনেও কার্যকর হয়নি। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কেট খোলার অনুমতি দেয়নি পুলিশ। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত দোকানপাট খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

তবে সকাল থেকেই মিরপুর রোডসহ আশপাশের সব লেন খুলে দিলে স্বাভাবিক হয় যানবাহন চলাচল। বিকালের দিকে দোকানপাট খোলার চেষ্টা করলে ঢাকা কলেজের সামনে পরপর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।

এতে ফের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সতর্ক অবস্থান নেন দোকান কর্মচারী ও হকাররা। কিছু সময়ের জন্য মিরপুর রোডে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পুলিশ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

যদিও ঘটনার শুরু থেকেই স্থানীয় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে ব্যবসায়ী ও ছাত্রদের পক্ষ থেকে। সংঘর্ষের ব্যাপকতা ছড়ানোর জন্য পুলিশের গাফিলতিকে দায়ী করেন তারা। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার কোনো উদ্যোগ নেই। 

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ এক মুহূর্তের জন্যও নিষ্ক্রিয় ছিল না। বরং সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। অনেকেই উসকানি দিয়ে পুলিশের ভূমিকাকে বিতর্কিত করার পাশাপাশি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছিল। তাতে তারা সফল হয়নি। শুরু থেকেই পুলিশ অ্যাকশনে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। এ কারণে পুলিশ শুরুতে ব্যবসায়ী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব মহলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই প্রক্রিয়া কাজে না আসার পর পুলিশ নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’

থেমে থেমে সংঘর্ষের নেপথ্যে : মঙ্গলবার দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষের নেপথ্যে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন নেতার যোগসাজশের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নতুন গঠিত একটি রাজনৈতিক দল, বামপন্থি একটি সংগঠন ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা বৃহৎ একটি দলের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে সংঘর্ষে লিপ্ত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন।

তাদের বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেন। তারা পুলিশকে একটি ভুল পদক্ষেপের দিকে ধাবিত করতে উসকানি দেয়। তারা একাধিক ছাত্রের লাশ চাচ্ছিল। ধৈর্যহারা হয়ে পুলিশ একটি ভুল সিদ্ধান্ত নেবে-এমন অপেক্ষায় ছিল উসকানিদাতারা।

এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ শুরুতে ঘটনাস্থলে তৎপরতা না বাড়িয়ে ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের সামনে এগিয়ে দেয়। ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের। তাদের মাধ্যমে দুপক্ষকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কলেজের দিকে এগোলেই ছাত্ররা দশতলার ওপর থেকে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছোড়ে। আবার পেছালে ছাত্ররা কলেজ থেকে বেরিয়ে মার্কেটে হামলার চেষ্টা চালায়।

দশতলায় টিয়ার শেল মারা সম্ভব না হওয়ায় সংঘর্ষ দমনে পুলিশের সামনে বিকল্প ছিল গুলি। কিন্তু গুলি করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। তাই পুলিশ সময় নিয়ে সব মহলকে সম্পৃক্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এটা পুলিশের একার সিদ্ধান্ত ছিল না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, উসকানিদাতাদের সঙ্গে যোগসূত্র থাকায় কাউকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে সন্দেহভাজন অন্তত ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই হকার ও দোকান কর্মচারী।

এছাড়া ঢাকা কলেজের কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের কয়েক নেতার গতিবিধির ওপর নজর রাখছেন গোয়েন্দারা। নিউমার্কেট এলাকা থেকে বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফুটেজে ঘুরেফিরে বেশ কয়েকজন যুবককে অতি মারমুখী দেখা গেছে। তারা বিনা কারণে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। 

গুজব ছড়িয়েছে যারা : দুই দোকান কর্মচারীর ঝগড়ায় একজনের পক্ষ হয়ে ঢাকা কলেজের যেসব শিক্ষার্থী ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারিতে জড়ায় তাদের তিনজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়।

তারা মারামারি করতে গিয়ে নিজেরা মার খেয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে রটিয়ে দেয় নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তারা বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

তখন ঢাকা কলেজ এলাকা থেকে হেলমেট পরা শিক্ষার্থীরা বেরিয়েও ভাঙচুর শুরু করে। পুলিশের কাছে থাকা সিসি ফুটেজে দেখা গেছে, বড় চুলের ঝুটি বাঁধা এক তরুণ মারামারিতে লিপ্ত। তার নাম বাপ্পী। সে নিউমার্কেটের ওয়েলকাম ফাস্টফুড দোকানের কর্মচারী।

সন্ধ্যায় ইফতারির টেবিল সাজানো নিয়ে তার সঙ্গে পাশের ক্যাপিটাল ফাস্টফুড দোকানের কর্মচারী কাওসারের বচসা হয়। রাত সাড়ে ১১টায় বাপ্পী ঢাকা কলেজ থেকে তার পরিচিতদের নিয়ে ফের সেখানে যান।

তারা ক্যাপিটালের কাওসার ও বাবু নামের দুই কর্মচারীকে মারধর করেন। বাবুকে ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়। একই সময়ে প্রথমে বাবুকে ইট দিয়ে ও বাপ্পীর ওপর দোকানের চাপাতি ও ছুরি দিয়ে পালটা হামলা চালায় ক্যাপিটালের কর্মচারীরা।

ফুটেজে দেখা যায়, খালি গায়ে থাকা এক কর্মচারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাপ্পীর সমর্থকদের কোপ দেয়। এই মারামারিতে অংশ নেওয়া ঢাকা কলেজের তিন শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের একজন নাসিম। তার গায়ে নিজের নাম লেখা জার্সি ছিল।

আরেকজনের নাম মাসুম। যার গায়ে ছিল সবুজ রংয়ের টি-শার্ট। আর মেরুন রংয়ের শার্ট পরা যুবকের নাম লিটন। এরা তিনজনই ঢাকা কলেজের ফরহাদ হলের ছাত্র। এই মারামারি করতে গিয়ে নাসিমের গায়ে কোপ লাগে।

ধাওয়া খেয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে তারা জানায়, কেনাকাটা করতে যাওয়ার পর নিউমার্কেটের দোকানদার ও কর্মচারীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই খবরেই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দলে দলে হেলমেট পরে বের হয়ে ধানমন্ডি হকার্স ও নিউমার্কেটে গিয়ে ভাঙচুর শুরু করে।

তখনই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। যাদের কারণে দুদিনের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নিউমার্কেট এলাকা তারা এখন গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন