এসএসএফের নামে কোম্পানি খুলে প্রতারণা, অতঃপর...
jugantor
এসএসএফের নামে কোম্পানি খুলে প্রতারণা, অতঃপর...

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৪ আগস্ট ২০২২, ১৯:১৯:১৫  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, জাতির পিতার পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নামে কোম্পানি খুলে প্রতারণা করে আসছে- এমন একটি প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরানবাজার র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন র‌্যাব-৩ এর সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ।

র‌্যাব জানায়, রাজধানী অভিজাত এলাকায় মিরপুর ডিওএইচসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সিকিউরিটি গার্ড, সহকারী সুপারভাইজার, সুপারভাইজার, সিকিউরিটি ইনচার্জ, মার্কেটিং অফিসার (পুরুষ), মার্কেটিং অফিসার (মহিলা), অফিস সহকারী, লেডি গার্ড, অফিস রিসিপশনস (মহিলা) পদে আকর্ষনীয় অনলাইন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে একটি চক্র প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে।

বিষয়টি জানতে পেরে র‌্যাব-৩ এর সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদের নির্দেশনায় র‌্যাব-৩ এর একটি দল গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে গত ৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বিপুল সংখ্যক চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণাপূর্বক অর্থ আত্মসাতকারী চক্রের মূলহোতা মো. মাছুম বিল্লাহকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়। তার সঙ্গে চক্রের খাইরুল আলম রকি (২০), মো. কামরুজ্জামান ডেনিশ (২২), মো. মাহমুদুল হাসান (৩২), মাসুদ রানা (২৪) ও এসএম রায়হানকে (২৪) গ্রেফতার করে র‌্যাব।

ওই অভিযানে চক্রটির কাছ থেকে ৮টি মোবাইল ফোন, ৮টি সিমকার্ড, নগদ ৫ হাজার ৫৪০ টাকা, ১টি মনিটর, ১টি কী বোর্ড, ১টি মাউস, ১টি সিপিইউ, ৪টি ক্যাবল, ১টি ল্যাপটপ, ২টি রাউটার, ২টি স্ট্যাম্প প্যাড, ২টি এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড ব্যানার, ২টি ডায়েরি, শতাধিক ভর্তি ফরম, ২ শতাধিক সিভি, ২টি চেকবই, ৫টি স্ট্যাম্প, ২টি অঙ্গীকারনামা, ১টি রেজিস্টার Ligend king power Booster Ltd-এর অর্ধশতাধিক ডিলার/পরিবেশক নিয়োগপত্র, ভিজিটিং কার্ড, পণ্য তালিকা, মূল্য তালিকা, অর্ধশতাধিক ডিপো এবং নিয়োগপত্র উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব জানতে পারে, কর্মজীবনের শুরুতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নামসর্বস্ব নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রতারণার শিকার হয়। এরপর তারা নিজেরাই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তারা সবাই পেশাদার সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করত। গ্রেফতার মো. মাছুম বিল্লাহ ওই প্রতারক চক্রের মূলহোতা। তিনি নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন জানান, মাছুম আইনজীবী পরিচয়ের কারণে ভিকটিমরা তাকে খুব ভয় পেত। তিনি ভিকটিমদের মামলা করার ভয় দেখিয়ে তাদের টাকা আত্মসাৎ করতেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার কারণে তিনি সুকৌশলে তার প্রতারণাকে বৈধভাবে উপস্থাপন করার জন্য ভূয়া লাইসেন্স তার অফিসে ঝুলিয়ে রাখতেন এবং তার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত এবং গভ. রেজি. নং সি-১৫৭৭৬৩’ উল্লেখ করতেন। তার অন্যতম সহযোগী গ্রেফতার খাইরুল আলম রকি ও মো. কামরুজ্জামান ডেনিশ পূর্বে ‘সিনথীয়া সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড’ নামে একটি নামসর্বস্ব কোম্পানিতে একইভাবে প্রতারণার কাজ করতেন। ওই কোম্পানিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর তারা গ্রেফতার মাছুম বিল্লাহর সঙ্গে যোগ দেন।

র‌্যাব জানায়, গ্রেফতার খায়রুল আলম রকি অফিসে আসা চাকরি প্রার্থীদের প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে মগজ ধোলাই করে জামানতের টাকা আদায় করতেন। গ্রেফতার কামরুজ্জামান ডেনিশ, এসএম রায়হান ও মাসুদ রানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে সারা দেশে আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টারভিউয়ের জন্য অফিসে নিয়ে আসতেন। আর মো. মাহমুদুল হাসান চাকরি প্রার্থীদের ফরম পূরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্র জমা নিতেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন জানান, প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো. মাছুম বিল্লাহ সাকিলা সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামে ২০১৯ সালে একটি ট্রেড লাইসেন্স নেন। কিন্তু করোনা মহামারি শুরু হলে তিনি তার ব্যবসা শুরু করতে পারেননি এবং পরবর্তীতে তিনি তার লাইসেন্স আর নবায়ন করেননি। এরপরও তিনি সাকিলা সিকিউরিটি সার্ভিস কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি ভুয়া লাইসেন্স বাধাই করে তাদের অফিসের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখেন।

র‌্যাব জানায়, প্রতারণার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মাছুম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময় চমক সৃষ্টি এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে তাদের বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমেই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত, এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড, গভ. রেজি. নং সি-১৫৭৭৬৩’ লেখা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতেন। যা দেখে চাকরি প্রার্থীরা ওই প্রতিষ্ঠানকে সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান মনে করত। এছাড়াও এসএসএফ একটি বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থার নাম হওয়ায় চাকরি প্রার্থীরা ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানকে তাদের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মনে করত।

‘প্রতারণার দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের অফিস থেকে চাকরি প্রার্থীদের মোবাইলে ফোন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট তারিখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অফিসে এসে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য বলা হতো। প্রতারণার তৃতীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট তারিখে চাকরি প্রার্থীরা ইন্টারভিউয়ের জন্য অফিসে আসার পর তাদেরকে একটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হতো এবং ফরমে সংযুক্তি হিসেবে ছবি, অঙ্গীকারনামা, প্রার্থীর নিজ এবং বাবা-মায়ের এনআইডির অনুলিপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, নাগরিকতার সনদপত্র প্রদান করতে হতো।’

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন জানান, এরপর প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে মগজ ধোলাই করা হতো। এরপর তাদের কাছ থেকে ভর্তি ফরম, ট্রেনিং এবং আইডি কার্ড বাবদ ১২ হাজার ৫০০ টাকা জামানত আদায় করা হতো।পরবর্তীতে ওই সিকিউরিটি অফিসে যোগদান করলে তাদের নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা হতো প্রতি মাসে নতুন নতুন চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করতে হবে এবং নতুন চাকরি প্রার্থী সংগ্রহের ভিত্তিতে কমিশন হিসেবে তাদের বেতন প্রদান করা হবে মর্মে আশ্বাস প্রদান করা হতো।

‘কিন্তু কাজে যোগদান করার পর তাদেরকে কোনো বেতন দেওয়া হতো না। ভিকটিমরা ওই কোম্পানির প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে জামানতের টাকা ফেরত চাইলে তারা বিভিন্ন টালবাহানা করতে থাকে এবং টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়।’

এছাড়াও মাছুম লিজেন্ড কিং গ্রুপ অব কোম্পানি নামে একটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ওই ব্যবসায় তার সহযোগীরা তাকে সহযোগিতা করত। প্রতারণা করে সফল হওয়ার কারণে তিনি নিত্য নতুন প্রতারণার কৌশল রপ্ত করায় নিয়োজিত ছিলেন, জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন।

র‌্যাব জানায়, গ্রেফতার মাহমুদুল হাসান ফাজিল পাশ। তিনি এসএসএফ সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানে দশ হাজার টাকা জামানত দিয়ে চাকরি নেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদান করার দিন এসে দেখেন ওই প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলছে। পরে প্রতিষ্ঠানেরই নিচতলায় তার ওই চক্রের মূলহোতার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং নিজেই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন মাহমুদুল।

এ ছাড়া গ্রেফতার এসএম রায়হান অনার্স পাশ এবং মাসুদ রানা এসএসসি পাশ। তারা মূলহোতা মাছুম বিল্লাহ ও তার অন্যতম সহযোগী খাইরুলের প্ররোচণায় প্রতারণাকে পেশা বেছে নেন।

গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

এসএসএফের নামে কোম্পানি খুলে প্রতারণা, অতঃপর...

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৪ আগস্ট ২০২২, ০৭:১৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, জাতির পিতার পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নামে কোম্পানি খুলে প্রতারণা করে আসছে- এমন একটি প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরানবাজার র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন র‌্যাব-৩ এর সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ।

র‌্যাব জানায়, রাজধানী অভিজাত এলাকায় মিরপুর ডিওএইচসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সিকিউরিটি গার্ড, সহকারী সুপারভাইজার, সুপারভাইজার, সিকিউরিটি ইনচার্জ, মার্কেটিং অফিসার (পুরুষ), মার্কেটিং অফিসার (মহিলা), অফিস সহকারী, লেডি গার্ড, অফিস রিসিপশনস (মহিলা) পদে আকর্ষনীয় অনলাইন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে একটি চক্র প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে।

বিষয়টি জানতে পেরে র‌্যাব-৩ এর সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদের নির্দেশনায় র‌্যাব-৩ এর একটি দল গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে গত ৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বিপুল সংখ্যক চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণাপূর্বক অর্থ আত্মসাতকারী চক্রের মূলহোতা মো. মাছুম বিল্লাহকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়। তার সঙ্গে চক্রের খাইরুল আলম রকি (২০), মো. কামরুজ্জামান ডেনিশ (২২), মো. মাহমুদুল হাসান (৩২), মাসুদ রানা (২৪) ও এসএম রায়হানকে (২৪) গ্রেফতার করে র‌্যাব। 

ওই অভিযানে চক্রটির কাছ থেকে ৮টি মোবাইল ফোন, ৮টি সিমকার্ড, নগদ ৫ হাজার ৫৪০ টাকা, ১টি মনিটর, ১টি কী বোর্ড, ১টি মাউস, ১টি সিপিইউ, ৪টি ক্যাবল, ১টি ল্যাপটপ, ২টি রাউটার, ২টি স্ট্যাম্প প্যাড, ২টি এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড ব্যানার, ২টি ডায়েরি, শতাধিক ভর্তি ফরম, ২ শতাধিক সিভি, ২টি চেকবই, ৫টি স্ট্যাম্প, ২টি অঙ্গীকারনামা, ১টি রেজিস্টার Ligend king power Booster Ltd-এর অর্ধশতাধিক ডিলার/পরিবেশক নিয়োগপত্র, ভিজিটিং কার্ড, পণ্য তালিকা, মূল্য তালিকা, অর্ধশতাধিক ডিপো এবং নিয়োগপত্র উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব জানতে পারে, কর্মজীবনের শুরুতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নামসর্বস্ব নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রতারণার শিকার হয়। এরপর তারা নিজেরাই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তারা সবাই পেশাদার সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করত। গ্রেফতার মো. মাছুম বিল্লাহ ওই প্রতারক চক্রের মূলহোতা। তিনি নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতেন। 

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন জানান, মাছুম আইনজীবী পরিচয়ের কারণে ভিকটিমরা তাকে খুব ভয় পেত। তিনি ভিকটিমদের মামলা করার ভয় দেখিয়ে তাদের টাকা আত্মসাৎ করতেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার কারণে তিনি সুকৌশলে তার প্রতারণাকে বৈধভাবে উপস্থাপন করার জন্য ভূয়া লাইসেন্স তার অফিসে ঝুলিয়ে রাখতেন এবং তার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত এবং গভ. রেজি. নং সি-১৫৭৭৬৩’ উল্লেখ করতেন। তার অন্যতম সহযোগী গ্রেফতার খাইরুল আলম রকি ও মো. কামরুজ্জামান ডেনিশ পূর্বে ‘সিনথীয়া সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড’ নামে একটি নামসর্বস্ব কোম্পানিতে একইভাবে প্রতারণার কাজ করতেন। ওই কোম্পানিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর তারা গ্রেফতার মাছুম বিল্লাহর সঙ্গে যোগ দেন। 

র‌্যাব জানায়, গ্রেফতার খায়রুল আলম রকি অফিসে আসা চাকরি প্রার্থীদের প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে মগজ ধোলাই করে জামানতের টাকা আদায় করতেন। গ্রেফতার কামরুজ্জামান ডেনিশ, এসএম রায়হান ও মাসুদ রানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে সারা দেশে আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টারভিউয়ের জন্য অফিসে নিয়ে আসতেন। আর মো. মাহমুদুল হাসান চাকরি প্রার্থীদের ফরম পূরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্র জমা নিতেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন জানান, প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো. মাছুম বিল্লাহ সাকিলা সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামে ২০১৯ সালে একটি ট্রেড লাইসেন্স নেন। কিন্তু করোনা মহামারি শুরু হলে তিনি তার ব্যবসা শুরু করতে পারেননি এবং পরবর্তীতে তিনি তার লাইসেন্স আর নবায়ন করেননি। এরপরও তিনি সাকিলা সিকিউরিটি সার্ভিস কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি ভুয়া লাইসেন্স বাধাই করে তাদের অফিসের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখেন। 

র‌্যাব জানায়, প্রতারণার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মাছুম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময় চমক সৃষ্টি এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে তাদের বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমেই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত, এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড, গভ. রেজি. নং সি-১৫৭৭৬৩’ লেখা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতেন। যা দেখে চাকরি প্রার্থীরা ওই প্রতিষ্ঠানকে সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান মনে করত। এছাড়াও এসএসএফ একটি বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থার নাম হওয়ায় চাকরি প্রার্থীরা ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানকে তাদের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মনে করত। 

‘প্রতারণার দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের অফিস থেকে চাকরি প্রার্থীদের মোবাইলে ফোন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট তারিখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অফিসে এসে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য বলা হতো। প্রতারণার তৃতীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট তারিখে চাকরি প্রার্থীরা ইন্টারভিউয়ের জন্য অফিসে আসার পর তাদেরকে একটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হতো এবং ফরমে সংযুক্তি হিসেবে ছবি, অঙ্গীকারনামা, প্রার্থীর নিজ এবং বাবা-মায়ের এনআইডির অনুলিপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, নাগরিকতার সনদপত্র প্রদান করতে হতো।’ 

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন জানান, এরপর প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে মগজ ধোলাই করা হতো। এরপর তাদের কাছ থেকে ভর্তি ফরম, ট্রেনিং এবং আইডি কার্ড বাবদ ১২ হাজার ৫০০ টাকা জামানত আদায় করা হতো।পরবর্তীতে ওই সিকিউরিটি অফিসে যোগদান করলে তাদের নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা হতো প্রতি মাসে নতুন নতুন চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করতে হবে এবং নতুন চাকরি প্রার্থী সংগ্রহের ভিত্তিতে কমিশন হিসেবে তাদের বেতন প্রদান করা হবে মর্মে আশ্বাস প্রদান করা হতো। 

‘কিন্তু কাজে যোগদান করার পর তাদেরকে কোনো বেতন দেওয়া হতো না। ভিকটিমরা ওই কোম্পানির প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে জামানতের টাকা ফেরত চাইলে তারা বিভিন্ন টালবাহানা করতে থাকে এবং টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়।’

এছাড়াও মাছুম লিজেন্ড কিং গ্রুপ অব কোম্পানি নামে একটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ওই ব্যবসায় তার সহযোগীরা তাকে সহযোগিতা করত। প্রতারণা করে সফল হওয়ার কারণে তিনি নিত্য নতুন প্রতারণার কৌশল রপ্ত করায় নিয়োজিত ছিলেন, জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন।

র‌্যাব জানায়, গ্রেফতার মাহমুদুল হাসান ফাজিল পাশ। তিনি এসএসএফ সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানে দশ হাজার টাকা জামানত দিয়ে চাকরি নেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদান করার দিন এসে দেখেন ওই প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলছে। পরে প্রতিষ্ঠানেরই নিচতলায় তার ওই চক্রের মূলহোতার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং নিজেই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন মাহমুদুল।

এ ছাড়া গ্রেফতার এসএম রায়হান অনার্স পাশ এবং মাসুদ রানা এসএসসি পাশ। তারা মূলহোতা মাছুম বিল্লাহ ও তার অন্যতম সহযোগী খাইরুলের প্ররোচণায় প্রতারণাকে পেশা বেছে নেন।

গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর