• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
শিক্ষক লাঞ্ছনা
বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ
নারায়ণগঞ্জের স্কুলশিক্ষক শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে পুলিশের দেয়া প্রতিবেদন গ্রহণ না করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বুধবার এ আদেশ দেন। বিচারিক তদন্ত করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমকে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ৬ নভেম্বর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
আদেশে আদালত বলেছেন, ‘আমরা সতর্কভাবে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছি। এতে দেখেছি, তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটেছে। ওই ঘটনার জন্য তিনি প্রকৃত দোষীকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আদালতের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে, পুলিশ প্রতিবেদনটি মনগড়া, অসম্পূর্ণ ও দায়সারা গোছের। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এই প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। আদেশে আরও বলা হয়, পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা না পেয়ে তা নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। কিভাবে তিনি প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে এ ধরনের আদেশ দিয়েছেন তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। আমরা মনে করি, ওই ম্যাজিস্ট্রেট এক্ষেত্রে তার বিচারিক মনন (জুডিশিয়াল মাইন্ড) প্রয়োগ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন।’
ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবোস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এ ঘটনা প্রকাশ পেলে নিন্দার ঝড় ওঠে। এ ঘটনায় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এমকে রহমান ও মহসিন রশিদ হাইকোর্টের নজরে নেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে এ ঘটনায় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে আদালতে দাখিল করতে ডিসি, এসপি ও ওসিকে নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশনায় ২৯ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসির প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ, যা দায়সারা বলে অসন্তোষ জানান হাইকোর্ট। এরপর ৮ জুন জেলা প্রশাসক নতুন করে প্রতিবেদন দেন হাইকোর্টে। এছাড়া ওই ঘটনায় বন্দর থানায় করা একটি জিডির তদন্তে অগ্রগতি আছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসি ৬০ দিন সময় চেয়ে আবেদন করেন। আদালত তখন জিডির তদন্তে আসা ফল হলফনামা আকারে ৪ আগস্ট আদালতে দাখিল করতে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। ৭ আগস্ট পুলিশের সেই প্রতিবেদন হাইকোর্টে পড়ে শোনায় রাষ্ট্রপক্ষ। এর আগে ৩ আগস্ট প্রতিবেদনটি নিু আদালতে দাখিল করে পুলিশ। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ঘটনার বিষয়ে সত্যতা না পাওয়ায় তা নথিজাত করার নির্দেশ দেন বিচারিক আদালত।
পুলিশের প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষক শ্যামল কান্তি কর্তৃক ছাত্র রিফাতকে মারধর এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ১৩ মে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা চলাকালে প্রধান শিক্ষকের বিচার স্কুলে হবে উল্লেখ করে জুমার নামাজের আগে মাইকে ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার পরেই হাজার হাজার লোক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার মধ্য থেকে কতিপয় ব্যক্তি শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনার সংবাদ পেয়ে বন্দর থানা পুলিশ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং এলাকার জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সর্বশেষ স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান বিকাল পৌনে ৪টার দিকে উপস্থিত হলে উত্তেজিত জনতা আবার ওই শিক্ষকের বিচারের দাবি জানায়। প্রধান শিক্ষককে জনগণের রোষানল থেকে রক্ষার জন্য তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কান ধরে ওঠবোস করার ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটে। এ ঘটনায় এমপি সেলিম ওসমান ও শিক্ষক শ্যামল কান্তি দু’জনই উদ্ভূত পরিস্থিতির শিকার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘটনার বিষয়ে শ্যামল কান্তিকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, এমপি সেলিম ওসমান এবং তিনি নিজে পরিস্থিতির শিকার। ঘটনার আকস্মিক পারিপার্শ্বিকতায় এটি ঘটেছে মাত্র। ফলে এ ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমনকি ঘটনায় জড়িত করে কারও সম্পর্কে কেউ কোনোরূপ জবানবন্দি প্রদান করেননি শ্যামল কান্তি। তাই এ বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে কোনোরূপ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া দীর্ঘদিন চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ১০ জুলাই থেকে শ্যামল কান্তি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে হাইকোর্টে শুনানিতে অংশ নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, পুলিশের এ প্রতিবেদন নির্জলা মিথ্যা। জিডির তদন্ত কর্মকর্তা ভিকটিম শ্যামল কান্তির সঙ্গে যোগাযোগই করেননি। এছাড়া অ্যাডভোকেট এমকে রহমান বলেন, সার্বিক বিবেচনায় এ প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। পরে আদালত পুলিশের প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন বলে জানান আইনজীবী জেডআই খান পান্না।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত