মুসতাক আহমদ    |    
প্রকাশ : ১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
উত্তরাঞ্চল-পূর্বাঞ্চলে আগাম বন্যা
জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতাই কারণ
বর্ষায় বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে দেশের নদ-নদী নতুন পানিতে টইটুম্বুর হয়। দু’কূল বিশেষ করে নদী তীরবর্তী নিন্মাঞ্চল ও চরাঞ্চল পানিতে ছাপিয়ে যায়। অনেক সময় কম-বেশি বন্যাও দেখা দেয়। যা নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু গত ক’বছর ধারাবাহিকভাবে বন্যা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, বজ পাত, পাহাড় ধস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপকহারে আক্রান্ত বাংলাদেশের মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়নই এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে এবারের বন্যাও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে। এ বছর সিলেটসহ দেশের পূর্বাঞ্চল দু’দফায় বন্যার মুখে পড়ল। প্রথম দফায় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আকস্মিক বন্যা হয়ে যায়। তাতে হাওরের বোরো ফসল মার খেয়েছে। তখন হাওরের মৎস্য ও প্রাণিজসম্পদ বেঘোরে মারা যায়। সেই ধকল কাটিয়ে না উঠতেই একই এলাকায় জুনের প্রথম সপ্তাহে ফের মৌসুমি বন্যা শুরু হয়, যা আগাম বন্যা হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। সিলেট অঞ্চল যখন বন্যার সঙ্গে লড়াই করছিল, ঠিক তখন দেশের উত্তরের একটি অংশে বন্যা শুরু হয়েছে। এটাকেও আগাম বন্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সিলেট অঞ্চলে সাধারণত মে মাসের শেষের দিকে আকস্মিক বন্যা আসে। পাহাড় কাছে থাকায় ঢল চলে আসে। তার আগে মানুষজন বোরো ধান তুলে আনে। কিন্তু এবার সেখানে এপ্রিলে বন্যা হয়। অপরদিকে এই এলাকায় জুলাইয়ের মাঝামাঝি পরের বা মৌসুমি বন্যাটি হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও একমাস আগে বন্যা শুরু হয়ে যায়।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শুধু বন্যাই নয়, অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগও গত ক’বছর ধরে বেশি হচ্ছে। গতবছরও সিলেট অঞ্চলে দুটি বন্যাই হয়েছিল। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার কারণে উত্তরাঞ্চলে গতবছর বন্যা হয়, এবারও হচ্ছে। এ বছর ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত হানল। গতবছর হয়ে গেল ‘রোয়ানু’। এর আগে ‘মহাসেন’, ‘আইলা’, ‘সিডর’ হয়ে গেল। ২০০৭ সালের পর মাত্র ১০ বছরে ৫-৭টি ঘূর্ণিঝড় হয়ে গেল। অথচ এর আগে ১৯৯৮ সালে এবং তার আগে ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড় হয়। অপরদিকে পাহাড় ধসের মতো বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বজ পাত বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ পাতের দেশ বাংলাদেশ। টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড়টি বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। এসবই জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এটা সত্যি ঘন ঘনই বন্যার মুখে পড়ছি আমরা। যেখানে ১৯৮৮ সালের পর ১৯৯৮ সালে মৌসুমি বন্যা হয়েছে, সেখানে শুধু এবার বা গতবছরই নয়, এর আগের বছরগুলোর রেকর্ডও হতাশাজনক। তিনি বলেন, এ বছর আমরা এখন পর্যন্ত বন্যার দুঃখ মোকাবেলা করছি। তবে মৌসুম যেহেতু এখনও চলমান আছে, তাই এবার সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর কী অপেক্ষা করছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এখন শুধু এটুকুই বলা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার পর ৩টা পর্যন্ত কোনো নদীতে পানি বাড়েনি। সকাল ৯টার আগের ২৪ ঘণ্টায় যতটুকু পানি বেড়েছিল, ততটুকুই আছে। আর বৃষ্টিপাত না হলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং উন্নতির দিকে যাবে।
এফএফডব্লিউসির সকাল ৯টায় প্রকাশিত বুলেটিনে দেখা যায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানির কারণে মোট ১০টি নদীর পানি বিপদসীমার উপরে আছে। বৃহস্পতিবার যেখানে ধরলা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধলেশ্বরী, সুরমা, কুশিয়ারা এবং কংস নদীর পানি ছিল বিপদসীমার উপরে। যেখানে এই তালিকায় বৃহস্পতিবার যুক্ত হয়েছে আত্রাই ও কপোতাক্ষ। আত্রাইতে ২৪ ঘণ্টায় ১৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। এটি সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িতে বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। কপোতাক্ষ নদী যশোরের ঝিকরগাছায় বিপদসীমার ৪ সেন্টিমিটার উপরে আছে। এই নদীতেও একদিনে ১৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
দেশের নদনদীতে পানির প্রধান উৎস তিনটি নদী অববাহিকা। এগুলো হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, সুরমা-কুশিয়ারা বা মেঘনা এবং গঙ্গা-পদ্মা। অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, সাধারণত সুরমা-কুশিয়ারা বা মেঘনা অববাহিকায় নতুন পানি বা বন্যাটা আগে আসে। ফলে পানিপ্রবাহ বেশি থাকলে মধ্য জুলাইয়ে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই বেসিনে ভারতের আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার পানি এসে থাকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে নতুন পানি আসে। এটা কখনো কখনো বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে। এই অববাহিকায় এবার ৭ জুলাইয়ের পর বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই অববাহিকায় আসাম, অরুনাচলসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি আসে। এছাড়া সিকিমের পানি গজল ডোবা হয়ে তিস্তার মাধ্যমেও আসে পানির একটি অংশ। সেটি এসে যুক্ত হয় ব্রহ্মপুত্রে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত