• বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯
শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ১৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
জঙ্গি সম্পৃক্ততা বা সমাজবিরোধী কাজে জড়িত কিনা, জানতে চিঠি
চট্টগ্রাম বন্দরের ৫ সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হয়রানি
প্রতিবেদন প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত আছেন কিনা বা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত আছেন কিনা, তা যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমন চিঠি পুলিশের জন্য হয়েছে পোয়াবারো। এ চিঠির সূত্র ধরে একশ্রেণীর অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা অজুহাতে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। থানায় ডেকে পাঠিয়ে আদায় করছে টাকা। না দিলে ঝুলিয়ে রাখছে প্রতিবেদন। পুলিশের এমন হয়রানিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের পাঁচ সহস াধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) লে. কর্নেল মো. আবদুল গাফফার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর একটি প্রথম ‘ক’ শ্রেণীর কেপিআই (কি পয়েন্ট ইন্সটলেশন)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা-২০১৩’ অনুযায়ী কেপিআইগুলোয় কর্মরত সব কমকর্তা-কর্মচারীর প্রতিবছর জীবনবৃত্তান্ত পুলিশ কর্তৃক এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় কর্মরত মুখ্য কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত এসবি, ডিজিএফআই ও এনএসআই কর্তৃক যাচাই নিশ্চিত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী এ তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হয়। এ কারণেই বন্দরের পক্ষ থেকে তারা প্রতিবেদন চেয়েছেন। যাকে ‘সিকিউরিটি ভ্যাটিং প্রতিবেদন’ বলা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চাকরিতে ঢোকার সময় একবার পুলিশ ভ্যারিফিকেশন প্রতিবেদন জমা দেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রতিবছরই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসিআর বা বার্ষিক সার্ভিস প্রতিবেদন দেয়া হয়। কিন্তু ‘কেপিআই নীতিমালা-২০১৩’ অনুযায়ী, প্রতিবছর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনবৃত্তান্ত প্রতিবেদন পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক যাচাই করে দেয়ার কথা থাকলেও এর আগে কখনও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ এমন উদ্যোগ নেয়ার পর তা যেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘হিতে বিপরীত’ হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কর্মরত কর্মচারীদের বাড়ি বা প্রদত্ত ঠিকানায় গিয়ে খোঁজখবর নেবেন। তাদের নাম-ঠিকানা সঠিক আছে কিনা, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলা আছে কিনা, তারা রাষ্ট্রবিরোধী বা সমাজবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন কিনা, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কিনা- এসব নিশ্চিত হয়ে প্রতিবেদন প্রদান করবেন। এক্ষেত্রে টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ আছে, পুলিশ তা না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থানায় ফোনে ডেকে পাঠানো হচ্ছে। যারা থানায় যাচ্ছে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে দাবি করা হচ্ছে ২-৩ হাজার টাকা। আবার কারও কারও কাছ থেকে নিজের নামে কী পরিমাণ সম্পত্তি আছে, তার দলিল-দস্তাবেজও চাওয়া হচ্ছে। টাকা-পয়সা কী পরিমাণ আছে, এসবও জানতে চাওয়া হচ্ছে। এসব কারণে বন্দরের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘাবড়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ টাকা দিয়ে পুলিশ প্রতিবেদন আদায় করলেও অনেকে ভয়ে আছেন। আছেন আতঙ্কে। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগে কর্মরত মুন্না নামে তৃতীয় শ্রেণীর এক কর্মচারী যুগান্তরকে জানান, তাকে পটিয়া থানার একজন কনস্টেবল ফোন করে থানায় যেতে বলেন। তার জায়গা-জমির কাগজপত্র বা খতিয়ান নিয়ে যেতে বলেন। নয়তো প্রতিবেদন পাওয়া যাবে না বলেও জানান। অভি মল্লিক নামে অপর এক কর্মচারীকে থানায় ডেকে বসিয়ে রাখা হয় ৮ ঘণ্টা। প্রতিবেদন প্রদানের জন্য ৩ হাজার টাকা দাবি করেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা। ২ হাজার টাকা দিলে সেই টাকা ছুড়ে মারেন। পটিয়া থানার এসআই সাইফুল আলম ও এসআই আবু জাহেরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। শুধু পটিয়াতেই দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা বন্দরে কর্মরত। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর থানা, পতেঙ্গা থানাসহ নগরী ও জেলার বিভিন্ন থানায় পুলিশ বন্দরের চিঠির সুযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অহেতুক হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ আছে। চট্টগ্রাম বন্দর সিবিএর কার্যকরী কমিটির কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বকুল শনিবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, বন্দর হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থানায় ডেকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে তার কাছে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। কারও আইডি কার্ড, কারও সম্পদের বিবরণী চাওয়া হচ্ছে। ‘পজিটিভ প্রতিবেদন’ প্রদানের জন্য জনপ্রতি ২-৩ হাজার টাকা করে দাবি করছেন অসাধু পুলিশ কর্মকর্তারা। এটা সে ফ হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন এবং এ হয়রানি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন বলে জানান।

সূত্র জানায়, পটিয়া থানার এসআই সাইফুল আলম ও এসআই আবু জাহেরের কাছে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতিবেদন প্রদানের দায়িত্ব পড়েছে। এ দুই কর্মকর্তা বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা দাবি ও নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে পটিয়া থানার এসআই সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বন্দরের সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনবৃত্তান্ত ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে যাচাই করে প্রতিবেদন প্রদানের দায়িত্ব পড়েছে তার ওপর। তিনি খোঁজখবর নিয়ে সাতজনেরই প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। কারও কাছ থেকে টাকা দাবি করেছেন বা নিয়েছেন- এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা ফাও কথা।’ একই থানার আরেক এসআই আবু জাহের শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘অনেকের বাড়ি দূরে। তাই তাদের থানায় ডেকে পাঠানো হচ্ছে। আবার এমন অনেকে আছেন, যারা স্থায়ী ঠিকানায় থাকেন না। এ কারণে সমস্যা হচ্ছে। প্রতিবেদন প্রদানের ক্ষেত্রে কারও কাছ থেকে টাকা চাওয়ার বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম খালেদ ইকবাল এ প্রসঙ্গে শনিবার যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর একটি প্রথম শ্রেণীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তাই বন্দরের এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনবৃত্তান্ত বা পুলিশ প্রতিবেদন চাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে পুলিশ কোথাও কাউকে হয়রানি করছে কিনা, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত