রাজশাহী ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ১৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
রাজশাহীতে উজানের ঢলে পদ্মায় ভাঙন
২৫ গ্রামের মানুষের ঘুম হারাম : টাকা নেই পাউবোর হাতে
বর্ষায় বেড়েছে পদ্মার পানি। মৃতপ্রায় নদী আবার হয়ে উঠেছে প্রমত্তা। নদীর সেই পানি কলকলিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দিয়েছে ভাঙন। রাজশাহী মহানগরী, জেলার গোদাগাড়ী, বাঘা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে নদীতে নেমে গেছে কয়েকশ’ বিঘা আবাদি জমি এবং অনেক গাছপালা। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তোড়ে ঘুম হারাম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্তত ২৫ গ্রামের মানুষের। প্রতি মুহূর্ত কাটছে আবাস হারানোর আতঙ্কে। রাজশাহী নগরীর বুলনপুর এলাকায় গত বছর ভাঙন দেখা দেয়ায় সেখানে শুরু হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্লক বানানোর কাজ। এটিও আগের প্রকল্প। তবে সে সব ব্লক দিয়ে এখন আর কিছুই হবে না। ব্লক বসাতে আবার অপেক্ষা করতে হবে পানি কমে যাওয়া পর্যন্ত। এছাড়া ভাঙন রোধে বর্তমানে নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় শুধু বালুর বস্তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর বাইরে কোনো প্রস্তুতি নেই পাউবোর।
এদিকে নতুন করে ভাঙন ঠেকাতে আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। পাউবো রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান জানান, গত বছর নগরীর টি-গ্রোয়েন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে তারা সোয়া দুই কোটি টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু পাওয়া গেছে ৫০ লাখ টাকা। সেই টাকায়ই বর্তমানে টি-বাঁধে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। তবে অন্য কোনো এলাকার ভাঙন রোধে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলার মতোও কোনো টাকা নেই। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর রাজপাড়া থানার বুলনপুর থেকে পশ্চিমে নবগঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। তবে নগরীর বসুড়ি এলাকায় ভাঙনের পরিমাণ বেশি। এ এলাকায় বুধবার ভাঙন শুরু হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
বসুড়ি এলাকার বাসিন্দা বাবু শেখ বলেন, ভাঙনে এরই মধ্যে তাদের বাগানের ৪টি লিচু ও একটি আম গাছ নদীতে ভেসে গেছে। আরেকটি আমগাছের গোড়া পর্যন্ত ভাঙন এসেছে। এ এলাকায় গত দু’দিনে প্রায় পাঁচ মিটার নদীর পাড় ভেঙেছে বলেও জানান তিনি।
বসুড়ি এলাকার পূর্বেই নগরীর জিয়ানগর এলাকা। জিয়ানগরের নদীর পাড় থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উত্তরেই নির্মাণ করা হচ্ছে রাজশাহীর মানুষের স্বপ্নের ‘বঙ্গবন্ধু সিলিকন সিটি’। গত বছর এ এলাকাটি অনেকটাই ভেঙেছে। এবারও একটু একটু করে ভাঙছে।
শনিবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উজান থেকে পদ্মার পানি এসে ধাক্কা খাচ্ছে পাড়ে। এরপর পানির স্রোত চলে যাচ্ছে নদীর মাঝে থাকা একটি চরের দিকে। পানির ধাক্কায় সে চরও ভাঙছে। এছাড়া গত ক’দিনের ভারি বর্ষণের পানি নামার সময় নবীনগর এলাকার একটা ড্রেনের মুখ ধসে গেছে। প্রায় ১০ মিটার এলাকা নদী থেকে ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। জিয়ানগর এলাকার বাসিন্দা জালাল উদ্দিন বলেন, বসুড়ি এলাকায় নদীর পাড় থেকেই বালু তোলা হয়। শুষ্ক মৌসুমে বালু তুলে নিয়ে যায় ট্রাকে করে। আর ভরা মৌসুমে ড্রেজারের সাহায্যে বালু তোলা হয় নৌকায়। এর ফলে নদী ভেঙে ক্রমাগত উত্তরের দিকে যাচ্ছে। এবারও এর প্রভাবে বুলনপুর, নবগঙ্গা, বসুড়ি, নবীনগর ও জিয়ানগরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তারপরেও বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন। এদিকে পানির তোড়ে উপজেলার সারাংপুর, গাঙ্গোবাড়ি ও সুলতানগঞ্জ এলাকায় পদ্মার পাড় ভাঙছে। এছাড়া ভাঙতে শুরু করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কলিমপাড়া, আমিনপাড়া, লুটারুপাড়া, সরকারপাড়া, বকচর ও দেবীনগর এলাকা। ভাঙন দেখে এসব এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
এছাড়াও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর, পানি কামড়া ও চরকালদাসখালি এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকশ’ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন রোধে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
পাউবো জানিয়েছে, ১০ জুলাই থেকে পদ্মার পানি বেশি পরিমাণে বাড়ছে। ওই দিন রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৯২ মিটার। সর্বশেষ শনিবার সকাল ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৫ দশমিক ১৫ মিটার। এর আগের দিন সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা পাওয়া যায় ১৫ দশমিক ৯ মিটার। ওই দিন সকাল ৬টায় ছিল ১৪ দশমিক ৯৯ মিটার। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৪৩ মিটার। ওই দিন সন্ধ্যায় পানির উচ্চতা হয় ১৪ দশমিক ৭৮ মিটার। এক রাতেই পানি বেড়েছে ৬ সেন্টিমিটার। তবে এতে এখনও উদ্বেগের কিছু নেই বলে জানিয়েছেন পদ্মার পানি পরিমাপক এনামুল হক। তিনি বলেন, রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। সে অনুযায়ী পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার ৩ দশমিক ৪১ মিটার নিচে। এবার বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা থাকলেও এখনই ভয়ের কিছু নেই। তবে এর উচ্চতা ১৮ মিটার অতিক্রম করলেই রাজশাহীর নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে বলেও জানান পাউবোর এ কর্মকর্তা। এনামুল হক জানান, গেল ১৫ বছরে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে মাত্র দু’বার। এর মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা ৯ বছর রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। কেবল ২০০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মার সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৮৫ মিটার। এরপর ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মা বিপদসীমা অতিক্রম করে। ওই বছর পদ্মার সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৭০ মিটার। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট রাজশাহীতে পদ্মার পানির প্রবাহ উঠেছিল সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৪১ মিটার। এতেই বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে শহরে পানি ঢুকতে শুরু করে। নদীতে বিলীনও হয় অনেক এলাকা। এবার একটু আগেই দেখা দিয়েছে ভাঙন।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত