মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু    |    
প্রকাশ : ০২ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পুলিশের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
সাভারের বেদে পল্লীতে দিন বদলের ছোঁয়া
গড়ে উঠেছে স্কুল কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার ও বুটিক হাউসসহ নানা প্রতিষ্ঠান * কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার নারী-পুরুষের
ঝাড়ফুঁক, ব্যথা নিরাময়ের জন্য সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলানোর নামে প্রতারণা আর সাপ খেলা দেখিয়ে যে আয় হতো তা দিয়েই সংসার চালাতেন সাভারের বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। এ সম্প্রদায়ের নারী সদস্যরাই মূলত গ্রামে গ্রামে ঘুরে উপার্জন করতেন। আর কর্মক্ষম পুরুষের বেশিরভাগই জড়িত ছিলেন মাদক ব্যবসার সঙ্গে। পুরুষ সদস্যদের কেউ কেউ আবার সন্তান লালন-পালন করে অলস সময় কাটাতেন। বছরের পর বছর এ চিত্র ছিল সাভারের বেদে পল্লীতে। সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত সেই বেদে পল্লীতে দিন বদলের ছোঁয়া লেগেছে। গড়ে উঠেছে স্কুল, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বুটিক হাউসসহ নানা প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার নারী-পুরুষের। পূর্ব পুরুষের পেশা ছেড়ে তারা এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন।
ঢাকার অদূরে সাভার উপজেলার বংশী নদীর তীরে পোড়াবাড়ি, অমরপুর, কাঞ্চনপুর ও বাড্ডা গ্রামে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে বসতি গড়ে তোলেন বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যরা। ওই পল্লীতে তাদের সদস্য এখন ২০ হাজারের ওপরে। আর ব্যতিক্রমী ও মানবিক পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এ মানুষগুলোর জীবনযাত্রা পাল্টে দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। আলোচিত এ পুলিশ কর্মকর্তা হলেন অতিরিক্ত ডিআইজি (সংস্থাপন) হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম।
পুলিশ সদর দফতরে কর্মরত এ কর্মকর্তা এবার দেশের হিজড়া সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করার কাজে হাত দিয়েছেন। হিজড়াদের মূল পেশার (প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা) বাইরে এনে তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তার এ উদ্যোগে সরকারি ছাড়াও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও এনজিও এগিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে তিনি বেদে ও হিজড়া সম্প্রদায়ের ভাগ্য উন্নয়নে ‘উত্তরণ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। বেদে পল্লীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এ সম্প্রদায়ের জন্য তৈরি হচ্ছে মিউজিয়াম।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরে অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমানের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয়। কিভাবে একটি জনপদ, একটি সম্প্রদায়কে তিনি পাল্টে দিয়েছেন তা জানান। গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম চন্দ্রদীঘলিয়ায় জন্ম হাবিবুর রহমানের। তিনি ৩ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। বাবা মরহুম আলী মিয়া ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও সমাজ সেবক।
এ পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, অনেক আগে থেকেই বেদে সম্প্রদায়ের জীবনযাপন নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। তিনি দেখতেন, বিভিন্ন বয়সী কিছু মানুষ নৌকাতেই বসবাস করেন। কখনও কখনও তারা কিছু দিনের জন্য নদী তীরে বসত গড়ে গ্রামে গ্রামে সাপ খেলা দেখিয়ে আয়-রোজগার করেন। হাবিবুর রহমান বলেন, বেদেদের সাপ খেলা দেখে মজা পেলেও তাদের ঝাড়ফুঁক, সিঙ্গা লাগানোর মাধ্যমে বাতের ব্যথা কিংবা দাঁতের পোকা ফেলানোর বিষয়টি ‘স্রেফ ধোঁকাবাজি’ তা ছোট বয়সেই বুঝতে পারেন। আর তখন থেকেই এ সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করার প্রবল ইচ্ছে জাগে। ঢাকার পুলিশ সুপার পদে দায়িত্ব পালনকালে যখন এ সুযোগটি পান, তখন তিনি তা লুফে নেন। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কর্মাবস্থায় নিজ উদ্যোগ ও ব্যক্তি পর্যায়ে সহায়তা নিয়ে তিনি এ সম্প্রদায়কে মূল ধারায় নিয়ে আসেন।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগেও সবাই সাভারের বেদে পল্লীকে ‘মাদকের হাট’ হিসেবেই জানতেন। এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সাভারসহ রাজধানীতে মাদকের বিস্তারে এ সম্প্রদায়ের সদস্যদের নেপথ্য ভূমিকার বিষয়টি প্রথমেই তার নজরে আসে। এ কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্ত—ভাবে অভিযান চালিয়ে দু’একজনকে গ্রেফতার করে কোনো ভাবেই পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় সর্বনাশা মাদকের বিস্তার রোধে তিনি বিকল্প চিন্তা করেন। শক্তি প্রয়োগ না করে সামাজিকভাবে মাদককে প্রতিহত করতে বেদে পল্লীর সর্দারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেন। এসপি থাকাকালে তিনি একদিন বেদে পল্লীর সর্দারদের সাভার থানায় ডেকেও পাঠান।
হাবিবুর রহমান বলেন, তার ডাকে বেদে পল্লীর ১৭ জন সর্দার থানায় আসেন। তবে সবার চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের আতঙ্ক। প্রথম বৈঠকেই সর্দারদের কাছে তিনি জানতে চান, আপনারা কি কাজ করেন? তারা জানান, জাত ব্যবসা (সাপের খেলা, সিঙ্গা লাগানো, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি)।

এরপর হাবিবুর রহমান প্রশ্ন করেন, আসলেই কি আপনাদের চিকিৎসায় এসব ভালো হয়? এমন প্রশ্নে বেদে পল্লীর সর্দাররা কিছুটা ঘাবড়ে যান বলে জানান এ কর্মকর্তা।
অভয় দিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি বেদে সর্দারদের কাছে প্রকৃত সত্য জানতে চান। এক পর্যায়ে সর্দারদের একজন বলেন, ‘সব ধোঁকা, স্যার’। সর্দারদের উদ্দেশে পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্ন, তাহলে এসব প্রতারণা কেন করেন? সর্দাররা জানান, ‘বাপ-দাদার পেশা, তাই তারা ছাড়তে পারেন না।’ বেদে পল্লীতে মাদক বেচাকেনার ব্যাপারে জানতে চাইলেও খোলামেলা উত্তর দেন সর্দাররা। কোত্থেকে মাদক আসে, প্রশ্নের উত্তরে এক সর্দার বলেন, ‘কক্সবাজারের উখিয়া থেকে সাপের বাক্সে করে তারা ইয়াবা এনে বিক্রি করেন।’
পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান আরও বলেন, মরণনেশা ইয়াবা সম্পর্কে তাদের বুঝিয়ে বলার পর কাজ হয়। এক পর্যায়ে বেদে সর্দাররা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে যে কোনো কাজ চান। পরে তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পল্লীতে যান। এরপর বদলে যেতে থাকে চিরচেনা দৃশ্যপট।
পুলিশ কর্মকর্তা জানান, যেহেতু বেদে সম্প্রদায়ে উপার্জনে নারীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন, তাই প্রথমেই তিনি নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। স্থানীয় যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার সহায়তায় প্রথমে ১০৫ নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন পোশাক কারখানায় ৪২ জনকে চাকরির ব্যবস্থা করেন। পরে তিনি পল্লীসংলগ্ন এলাকায় দুই হাজার ৬০০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন ‘উত্তরণ ফ্যাশন’ নামে একতলা একটি বুটিক কারখানা। উত্তরণ ফ্যাশনের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডম এবং উত্তরা সিটি সেন্টারের পাশে দুটি শোরুম রয়েছে বলে জানান হাবিবুর রহমান।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, এছাড়া এ সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে পড়ানোর জন্য বেদে পল্লীতে একটি কোচিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। যেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সাড়ে ৩শ’ শিশুকে প্রতিদিন পড়াচ্ছেন। এ সম্প্রদায়ের তরুণদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ এবং গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ফলে এক সময়ের অলস মানুষগুলো এখন কর্মব্যস্ত।
হাবিবুর রহমান জানান, সম্প্রতি স্থানীয় বিত্তবানদের সহায়তায় বেদে পল্লীতে স্কুল তৈরির জন্য ২৭ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। ২২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাভারের অমরপুরে হাবিবুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। সব মিলিয়ে এখন এ সম্প্রদায়ের সদস্যরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। এ অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিদানও দিয়েছেন বেদে পল্লীর বাসিন্দারা। তারা নিজেদের টাকা দিয়ে সেখানে একটি মসজিদ তৈরি করেছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘হাবিবিয়া জামে মসজিদ’।
হিজড়া ও বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন ও মানবিক উত্তরণে অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান যে ভূমিকা রেখেছেন, তা বাংলাদেশ পুলিশে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন অনেকেই।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত