মিজান চৌধুরী    |    
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ত্রাণ নিয়ে এমপি নদভীর ফাউন্ডেশনের নয়ছয়
শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সরকারদলীয় এমপি ড. আবু রেজা নদভীর আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন রোহিঙ্গাদের ত্রাণ নিয়ে ‘নয়ছয়’ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদেশ থেকে পাঠানো ত্রাণের বিপুল অংশ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ত্রাণ নদভীর নিজ এলাকায় গরিব-দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি তিনটি এনজিও সংস্থাকে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করতে নিষেধ করেছে। যার একটি এমপি নদভীর আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন। অন্য দুই সংস্থা হল মুসলিম এইড ও ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ। এগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভিন্ন উদ্দেশ্যে’ ত্রাণ বিতরণের অভিযোগ এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পরও নদভীর এনজিও সংস্থা ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এমপি নদভী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই। কোনো চিঠিপত্রও পাইনি। তবে আইনি বিষয় হচ্ছে, বিদেশি ফান্ড মনিটরিং করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সে হিসাবে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই চাইলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া যাবে। আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র
সহকারী সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আমার ফাউন্ডেশনের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাব।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ার এনজিও সংস্থা ‘কেলাপুত্রা-১’-এর চেয়ারম্যান সে দেশের ধর্ম ও হজমন্ত্রী। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এনজিও কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন এমপি নদভী। তিনি আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। কেলাপুত্রা-১ থেকে দুই দফায় ১ হাজার ৬০০ টন ত্রাণসামগ্রী পেয়েছে এমপি নদভীর ওই এনজিও সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে ১৬০ টাকা কেজি দরের বাসমতি চাল ছাড়াও ডাল, তেল, চিনি, ময়দা ইত্যাদি। প্রথম দফায় সাত মাস আগে ১ হাজার ৭০ টন এবং দ্বিতীয় দফায় ৫ মাস আগে ৫৩০ টন ত্রাণসামগ্রী আসে। সূত্র জানায়, দ্বিতীয় দফায় আসা ত্রাণসামগ্রীর আনুমানিক মূল্য ৭০ কোটি টাকা। এই ত্রাণ খালাসের ক্ষেত্রে বন্দর ও কাস্টমসের ২ কোটি টাকার চার্জও মওকুফ করে দেয়া হয়। জানা যায়, গেল মাসের শেষ সপ্তাহে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় কয়েক দফায় গরিব-দুস্থদের মাঝে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। অন্তত ৭ হাজার পরিবারকে ১৬ কেজি করে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ময়দা ইত্যদি দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এমপি নদভীর ছবিসংবলিত ব্যানার এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ছবিসংবলিত ব্যানার পাশাপাশি টানানো হয় ত্রাণ বিতরণের সময়। ব্যানারে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ প্রেরণ বিষয়টি লেখা ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো ত্রাণ নিজ এলাকায় কেন বিতরণ করা হচ্ছে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ অনেকেই এর সমালোচনা করে বলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য দিচ্ছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো। আর সেই ত্রাণ নিজ এলাকায় বিলি করে এমপি অনৈতিক কাজ করেছেন। সমালোচনার জবাবে এমপি নদভী যুগান্তরকে জানান, মালয়েশিয়ার কেলাপুত্রা-১ নামে যে দাতা বা এনজিও সংস্থাটি ত্রাণ পাঠিয়েছে সেই সংস্থার চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব রয়েছে। বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই বিপুল পরিমাণ এ ত্রাণ সাহায্য দেয়া হয়। প্রথম দফায় পাঠানো ১ হাজার ৭০ টন ত্রাণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্রহণ ও বিতরণ করে। দ্বিতীয় দফায় পাঠানো ৫৩০ টন ত্রাণ তিনি চুক্তি অনুযায়ী বিতরণ করছেন। প্রদত্ত ত্রাণের ৫০ ভাগ রোহিঙ্গাদের জন্য বাকি ৫০ ভাগ নিজ এলাকায় ও চট্টগ্রাম জেলার গরিব-দুস্থদের মাঝে বিতরণ করার চুক্তি রয়েছে। সে অনুযায়ী বিতরণ করতে এনজিও ব্যুরো পরিপত্র জারি করে। ৬ সেপ্টেম্বর থেকে সপ্তাহব্যাপী সাতকানিয়ায় গরিব-দুস্থদের মাঝে অন্তত ২০ কোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বাকি ত্রাণ উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করা হয় বলে জানান নদভী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৪ সেপ্টেম্বর উখিয়ার কুতুপালংয়ে শরণার্থীদের জন্য খোলা কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ত্রাণ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের এন্ট্রি খাতায় দেখা যায়, আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের নামে ৩ হাজার প্যাকেট ভর্তি একটি ট্রাক ঢোকে। ওই ট্রাকের ত্রাণ এমপি নদভী নিজেই বিতরণ করেন। এর একদিন আগে এমপি নদভীর নামে আরেকটি ট্রাক এন্ট্রি করা হয়। ৪৬৬ নম্বরে এন্ট্রি হওয়া ওই ত্রাণের মধ্যে দেখা যায়, শুকনো খাবার ৩৪০ প্যাকেট, হাঁড়ি-পাতিল ৩৪০ পিস, কাপড় ৩৪০ পিস। এসব ত্রাণসামগ্রী ওই দিন এমপি নদভীর স্ত্রী মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রিজিয়া রেজা বিতরণ করেন। এর আগে ২২ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ত্রাণভাণ্ডারে এক ট্রাক ত্রাণ দেন এমপি নদভী। ওই ট্রাকে ২ হাজার ৮২৫ বস্তা ত্রাণ ছিল। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর কোনো ত্রাণ দেয়ার তথ্য নেই কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ত্রাণ নিবন্ধন খাতায়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সর্বশেষ আসা ৭০ কোটি টাকার ত্রাণের মধ্যে নিজ সংসদীয় এলাকায় ২০ কোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি সংস্থার চেয়ারম্যান এমপি নদভীর। অন্যদিকে নিবন্ধন হিসাব অনুযায়ী, উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে বড়জোর এক কোটি টাকার ত্রাণ প্রদান করা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বাকি ত্রাণ গেল কোথায়? এ প্রসঙ্গে এমপি নদভী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘৫৩০ টন ত্রাণের সিংহভাগই বিতরণ করা হয়েছে। এখন আমরা হিসাব-নিকাশ করছি কোথায় কী পরিমাণ ত্রাণ দেয়া হয়েছে। অডিট ও হিসাব-নিকাশ শেষে বিস্তারিত বলা যাবে। পরে তা এনজিও ব্যুরোতেও পাঠানো হবে। ত্রাণ নিয়ে ‘নয়ছয়’ করার কোনো সুযোগ নেই দাবি করে তিনি বলেন, একটি মহল নির্বাচনে আমাকে ঘায়েল করার জন্য এ ধরনের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত