ইকবাল হাসান ফরিদ    |    
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
হাসপাতালে ব্লু হোয়েলে আসক্ত কিশোর
মিরপুরের সাড়ে ১৪ বছরের এক কিশোর। স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র। সে কৌতূহলবশত সবার অজান্তে ব্লু হোয়েল গেম খেলত। খেলতে খেলতে অতিক্রম করে ভয়ংকর ১৪টি ধাপ। ১৫তম ধাপে সে ২৭টি উচ্চমাত্রার ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ওই কিশোরের মা যুগান্তরকে বলেন, তার ছেলে ৪ বছর বয়স থেকেই নিজে নিজে কম্পিউটারে পারদর্শী হয়ে ওঠে। সে হ্যাকিং জানে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে গত কোরবানির ঈদের দু’দিন আগে থেকে অনেকটা বদলে যায়। সে অন্ধকার রুমে একা একা থাকত। গভীর রাতে বাসার ছাদে চলে যেত। আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। একপর্যায়ে সিগারেট, ঘুমের ওষুধ খেতে থাকে। এরপর দুই হাত কেটে কী যেন এঁকেছে।
তিনি বলেন, আমার চোখে এসব ধরা পড়লে আমি আমার পরিচিত একজনের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করি। তিনি আমাকে জানান ব্লু হোয়েল গেমের কথা। এরপর ইউটিউব সার্চ দিয়ে আমি এই মরণ গেম সম্পর্কে জানি। এরই মধ্যে সে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করেছে। আমি বিষয়টি পরিবারের সবাইকে জানাই। এরপর গত ১০-১২ দিন আগে তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাই।’
ওই কিশোরের মা আরও বলেন, এর মধ্যে সে তিন চারবার ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। আজ (বৃহস্পতিবার) ওই বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে সে মঙ্গলবার ঘুমের ওষুধ খায়। তিনি বলেন, ‘সে আমার কাছে ২০০ টাকা চেয়েছিল, আমি তাকে টাকা দিইনি। সে বলল, আপনি টাকা না দিলে সমস্যা হবে না। আমার বন্ধুরা দেবে। ওইদিন সে ২৭টি ঘুমের ওষুধ খায়। তার ছোট বোন দেখতে পেয়ে আমাকে বলে। এ নিয়ে সে অনেকটা উত্তেজিত ছিল। আমি তার বন্ধুদের ফোন করে বাসায় আনি। এরপর সে তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে। রাত ১০টার পরপর তার বাবা বাসায় ফেরেন। ১১টার দিকে তাকে খাওয়ানোর জন্য আমি রুমে গিয়ে দেখি দাঁতে দাঁত লেগে সে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তাৎক্ষণিক তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি।’
কিশোরের মা বলেন, বুধবার গভীর রাতে তার জ্ঞান ফিরেছে। এখন চিকিৎসকরা তাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘সে ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারে দক্ষ ছিল। রাত জেগে সে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করত। সে ব্লু হোয়েলে ১৪টি ধাপ অতিক্রম করেছে। সে আমাকে বলেছে, আমার বাঁচতে ভালো লাগে না। এই পৃথিবী ভালো লাগে না। আমার মাথায় বড় একটা বোঝা। আমি খুব মানসিক চাপের মধ্যে আছি। আমার কিছুই ভালো লাগে না।’
কিশোরের মা আরও বলেন, ‘সে একা একা মুখ দিয়ে শব্দ করত। একা থাকত। একদিন দেখি রুমের মধ্যে সে সিগারেট খাচ্ছে আর ভিডিও করছে। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে তাকে রাস্তা দিয়ে হাঁটার কমান্ড দেয়া হতো বলে সে জানিয়েছে। সে না খেয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়িয়েছে। রাতে হরর মুভি দেখত, বই পড়ত।’
ওই কিশোর বলে, ‘চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় আমি গেমটি খেলা শুরু করি। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ভালো লাগত। অ্যাডমিনরা অনেক সময় অপমান করে কথা বলত, আমাকে বোকা বলত। তাই আমি চ্যালেঞ্জগুলো পার করতাম। তারা ছাদের রেলিং ধরে হাঁটার একটি ধাপ দিয়েছিল। আমি সেটা করিনি। তাই তারা আমাকে বলেছে, আমাকে তারা কিডন্যাপ করবে।’
ওই কিশোর বলে, ‘একজন গোয়েন্দা অফিসার আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি তাকে বলেছি, এটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করেন। আম্মুকে বলেছিলাম এখানে আনলে আমি ভালো হব না। তাও আমাকে নিয়ে এসেছে।’ ওই কিশোর বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের ওয়ার্ডের একটি পেয়িং বেডে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা তার ডান হাতে ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ছেলেটি ব্লু হোয়েলে আসক্ত ছিল- এ বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়। তার শরীরের চিহ্নগুলোও এ বক্তব্য সমর্থন করে না। তাছাড়া হাসপাতালে ভর্তির তিন দিন আগে সে তার মোবাইল ফোন বিক্রি করে দিয়েছে। ব্লু হোয়েলে আসক্ত হলে সে তার মোবাইল ফোন বিক্রি করত না। তিনি বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে তার মোবাইল ফোনটি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। সেটি হাতে পেলেই সব সন্দেহ দূর হবে। এর আগে, ৫ অক্টোবর সেন্ট্রাল রোডের একটি বাড়ি থেকে অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা নামে এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। তবে ব্লু হোয়েলের নির্দেশনায় সে আত্মহত্যা করেছে কিনা সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নয় পুলিশ। তার শরীরের কোথাও ব্লু হোয়েল আঁকার চিহ্ন নেই। তবে অনেকেই বলছেন, সে ব্লু হোয়েল নির্দেশে আত্মহত্যা করেছে। একটি আন্তর্জাতিক পত্রিকা বলছে, প্রাণঘাতী এ গেমটির ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৮০ জন আত্মহত্যা করেছে। এ গেমের আসল অ্যাডমিন বুদেকিনকে আটক করা হলেও বিভিন্ন দেশে এর অ্যাডমিন থাকায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে গেমের প্রভাব এখন ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত