শিপন হাবীব    |    
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এ ‘সাইনবোর্ড’ কার জন্য
রাজধানী ঢাকা শহরে ৮ হাজারেরও বেশি বাস চলাচল করছে। এসব বাস যত্রতত্র সড়ক জুড়ে, ব্যস্ততম বিভিন্ন মোড়ে দাঁড়াচ্ছে। বিআরটিসি বাস চালকসহ কোনো বাস চালকই আইন কিংবা সতর্কতামূলক ‘সাইনবোর্ড’র নির্দেশনা মানছে না। মানছে না যাত্রীরাও। ‘বাস দাঁড়ানো নিষেধ দাঁড়ালেই দণ্ড’ লেখা এমন শত শত সাইনবোর্ড রাস্তার পাশে, মোড়ে বসানো হলেও তাতে প্রতিকার হচ্ছে না। বরং ওই সব সাইনবোর্ড ঘেঁষেই বাসগুলো দাঁড়াচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে বসানো সড়কের বিভিন্ন মোড়ে, পাশে ‘যাত্রী উঠানামার স্থান’ লেখা সাইনবোর্ডগুলো কাজে আসছে না। ফলে রাজধানীতে যানজট আরও প্রকট হচ্ছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ এই প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে জানিয়েছেন, নগরের সাধারণ মানুষ তথা যাত্রী সাধারণ সচেতন না হলে এমন কোনো উদ্যোগই যথাযথ সুফল বয়ে আনবে না। কারণ জোর করে মানুষকে কখনও আইন কিংবা নির্দেশনা মানানো যায় না। আইন কিংবা নির্দেশনা না মানা বাসগুলো আটক ও জরিমানা করছি। একইসঙ্গে আমরা জরিমানাসহ মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার করছি। নির্ধারিত স্থানে যাত্রীরা দাঁড়াচ্ছে না, এ সুযোগটি নিচ্ছে বাস চালকরা।
মুসলেহ উদ্দিন জানান, নগরের বিভিন্ন সড়কের পাশে, মোড়ে অসংখ্য সাইনবোর্ড বসানোসহ অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে। ট্রাফিক সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় যানজট নিয়ন্ত্রণ রাখতে। নির্ধারিত স্থানে ‘বাস দাঁড়ানো নিষেধ দাঁড়ালেই দণ্ড’ লেখা সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে। একইভাবে ওইসব সাইনবোর্ডের সঙ্গে ‘১০০ মিটার সামনে বাস থামিবে’ লেখা সাইনবোর্ডও রয়েছে। মোড়ে মোড়ে ‘যাত্রী ওঠানামার স্থান’ লেখা সাইনবোর্ড রয়েছে। তাদের এমন উদ্যোগে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন যানবাহনের চালক দিন দিন সচেতন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নগরের বিভিন্ন মোড়ে আমাদের পক্ষ থেকে সার্ভে করে একটি নকশা জমা দিয়েছি নগরের দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে। একইসঙ্গে উত্তরের সিটি কর্পোরেশনেও কাজ চলছে। উভয় সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা নকশানুযায়ী নির্ধারিত স্থানে ‘বাস থামবে’ লেখা যাত্রী ছাউনি স্থাপন করবে, যেখানে
নির্দিষ্ট ট্রাফিক সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট লোক দায়িত্ব পালন করবে। আমরা আরও কঠোর হব। বুধবার দুপুরে নগরের সোনারগাঁও মোড় এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, মোড়ের মধ্যে যত্রতত্র বাস দাঁড়াচ্ছে। ট্রাফিক সদস্যদের শত বারন আর টানা বাঁশির শব্দেও বাস চালকরা বীরদর্পে ‘বাস দাঁড়ানো নিষেধ’ লেখা জায়গায় দাঁড় করাচ্ছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে দেখা যায়, বাসগুলো কখনও দাঁড়াচ্ছে আবার কখনও ধীরগতিতে চালাচ্ছে। এর ফলে সিগন্যাল ছাড়া হলেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিআরটিসির প্রতিটি বাসই দাঁড়াতে দেখা গেছে। ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৫৯০৪ নম্বর বিআরটিসি বাসের চালক বলেন, ‘যাত্রী যেখানে জটলা বেঁধে অপেক্ষা করবে সেখানেই দাঁড়াব। নির্দেশনা দেখার সময় কই। যাত্রীদের নির্দেশনা মানতে বলেন।’ শিক্ষার্থী অনামিকা, শুভ আহমেদ জানালেন, চালকরা বেপরোয়া। যাত্রীদের নয়, তাদের ইচ্ছামতোই যাত্রী ওঠানামা করে। যাত্রী ও চালকদের কথার সত্যতা মিলল এ মোড়ে। যেখানে সাইনবোর্ডে লেখা ‘এখানে বাস থাকবে’ সেখানে কোনো যাত্রী নেই আর যেখানে লেখা ‘এখানে বাস থামবে না’ সেই স্থানে যাত্রীরা জটলা বেঁধে আছে। একই অবস্থা দেখা গেছে, রাজধানীর শাহবাগ মোড়, গুলিস্তান, এয়ারপোর্ট, মৎস্য ভবন, মহাখালী, নিউমার্কেট, ধানমণ্ডি, দৈনিক বাংলা, শাপলা চত্বর, ভাটারা নতুনবাজার, বিশ্বরোড, মিরপুর ১০ নম্বর, আগারগাঁও মোড়সহ বিভিন্ন মোড়ে। নির্ধারিত স্থানে বাসগুলো না দাঁড় করিয়ে ব্যস্ততম মোড়ে দাঁড় করানো হচ্ছে। এয়ারপোর্ট চৌরাস্তায় চালকদের বেপরোয়া হয়ে বাস দাঁড় করাতে দেখা গেছে। যাত্রীরাও হুড়োহুড়ি করে উঠতে-নামতে দেখা গেছে। অধিকাংশ যাত্রীর ভাষ্য, তারা নিরুপায়। শাহবাগ মোড়ে যত্রতত্র বাস দাঁড়ানোর চিত্র আরও ভয়াবহ। ফলে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ এলাকায় বেশ কয়েকটি হাসপাতাল থাকায় রোগীদের বিপাকে পড়তে হয়।
নগরে যানজট লেগে থাকার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে যত্রতত্র বাস দাঁড় করানো। ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত সময়ে নগরের বিমানবন্দর থেকে গুলশান ও গুলিস্তান হয়ে পোস্তগোলা পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার পথে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২২ কিলোমিটার। আর ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টায় ৯ কিলোমিটার। এ পার্থক্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে যানজট।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক যুগান্তরকে জানান, ‘সাইনবোর্ড’ লিখে অদক্ষ চালক ও অসচেতন যাত্রীদের সচেতন করে তোলা যাবে না। পুরো সিস্টেমটাকে পরিবর্তন করতে হবে। চালকরা বাড়তি মুনাফার জন্য রাস্তায় প্রকাশ্যে প্রতিযোগিতা করে আসছে, প্রতিরোধকারী সংস্থা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। চালকরা বেতনে নয়, লিজে বাস চালাচ্ছে, যা পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। চালকরা কার আগে, কোন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করবে এ নিয়ে যে প্রতিযোগিতা নগরজুড়ে হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আগে। কিন্তু এসব কারণে কোনো পরিবহনের চলাচলের অনুমতি বাতিল করার নজির আছে বলে আমার জানা নেই।
কোম্পানির অধীনে এসব বাস চলাচল করলে এমনটা হতো না জানিয়ে শামসুল হক বলেন, চালকরা নির্দিষ্ট বেতন পেত, যাত্রী উঠুক কিংবা না উঠুক। এতে যানজট কমবে। যাত্রী হয়রানিও কমবে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চুপ থাকছে। ২০৯৮ থেকে ২০০৬ কোম্পানি কর্তৃক প্রিমিয়াম নামক বাস চলাচল করেছে। ওই সময় যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠানামা করতে শেখে। চালকরা নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানে বাসগুলো দাঁড় করাত, যা এখন অতীত।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত